লগইন রেজিস্ট্রেশন

দারসুল কুরআন :- (সূরা কলম : ১-৪)

লিখেছেন: ' আব্দুল্লাহ আল নোমান' @ সোমবার, ডিসেম্বর ২১, ২০০৯ (১১:৫১ অপরাহ্ণ)

অনুবাদ : নুন, কলমের শপথ এবং যা তারা লিখে তার শপথ, হে মুহাম্মদ আপনি আপনার রবের অনুগ্রহে উš§াদ নন। অবশ্যই আপনার জন্য এমন নিয়ামত রয়েছে যা নিঃশেষ হবে না। আর নিঃসন্দেহে আপনি মহাচরিত্রের ওপর বহাল রয়েছেন। খুব শিগগিরই আপনিও দেখতে পাবেন এবং তারাও দেখতে পাবে, যে তোমাদের মধ্যে কারা পাগলামিতে নিমজ্জিত। – - – (সূরা কলম :১-৪)

শানে নুজুল : জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশার মহানবী (সা) যখন অহির বাতি প্রজ্জ্বলিত করলেন, তখন মক্কার আবু জাহিলদের হৃদয়কম্পন শুরু হয়ে গেল। জ্বালিয়ে দিল তার বিরোধিতার দাবানল। বিভিন্ন প্রশ্ন, গালাগাল ও অহেতুক ওজর আপত্তি তুলে চেয়েছিল তারা তাঁকে বিরক্ত করতে, যেন তিনি তাদের চাপের মুখে সবকিছু ছেড়ে সরে দাঁড়ান। কাফিরদের দাঁতভাঙা জবাব এবং মহানবী (সা) কে উত্তম সান্ত¡না প্রদান করে আল্লাহ এ সূরায় অনেক আয়াত নাজিল করে দিলেন।

শিক্ষণীয় দিক : উল্লিখিত আয়াত ক’টির তাফসির শানে নুজুল, প্রেক্ষাপট শব্দ প্রয়োগ ও বাচনভঙ্গির দিকে সূক্ষ্মভাবে তাকালে আমাদের সামনে কতিপয় বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, যা মুমিন জীবনের পাথেয় হিসেবে পরিগণিত।

১. প্রথমে (নুন) অক্ষরটি আল্লাহর নামের একটি অক্ষর, অর্থাৎ (আর রহমান) এর নুন। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা তাঁর দয়ালু নামের শপথ করে মহানবী (সা) তথা সমগ্র মুসলিম জাতিকে আশ্বস্ত করছেন। কারো মতে অক্ষরটি (সাহায্যকারী) শব্দ থেকে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর সাহায্যকারী নামের শপথ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি তাঁর রাসূল ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের যে কোন সময় এবং যে কোন অবস্থায় সাহায্য করবেন। তবে এটিও এ ধরনের বর্ণগুলো যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধ্যে এক গোপন সাঙ্কেতিক আলাপ তা নিঃসন্দেহে বুঝা যায়।

২. সহীহ মুসলিম শরিফে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এর একটি বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূল (সা) বলেন, আসমান জমিন সৃষ্টি করার ৫০ হাজার বছর আগেই সকল মাখলুকাতের সকল তাকদির আল্লাহতায়ালা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। ঐ লিপিবদ্ধকারী কলমের শপথ করে আল্লাহ বলেছেন, ওরা বিরোধিতা করে কিছুই করতে পারবে না, যা হবার তাই হবে। তিনি তাঁর রাসূল ও বান্দাদের কপালে যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে এরা না কোন ক্ষতি করতে পারবে, না কোন কল্যাণ করতে পারবে।

৩. সুলেখক সর্বদা সম্মানীয়, কেননা তারা কলম দ্বারাই লিখেন। আর মহান আল্লাহ কলম দ্বারা শপথ করেছেন। আল্লাহর জন্য যে কোন বস্তু দ্বারা শপথ করা বৈধ, বান্দাদের জন্য আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা শপথ করা বৈধ নয়।

৪. মহানবী (সা) মক্কাবাসীদের নিকট ছিলেন একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। সত্যের বাণী নিয়ে তিনি যখন মানুষের সামনে হাজির হলেন, তখন তাদের চোখে তিনি একজন উš§াদ, জাদুকর ও খারাপ লোক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন। তখন তারা তাঁর সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, বিচার-বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার কথা ভুলে গিয়ে নানা প্রকার কটূক্তির আশ্রয় নিল। তাদের এ সকল মিথ্যা কটূক্তির প্রতিবাদ করতে গিয়েই মহান আল্লাহ কলম ও লিখার শপথ করেছেন।

৫. মহান আল্লাহ যেসব বস্তুর শপথ করেছেন সে সব বিষয়গুলো শপথের ওপর একটি সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হয়ে আছে। এখানেও পৃথিবীর ইতিহাসে যা লিখা হয়েছে, তবে এবং হচ্ছে সে সব বিষয়কে সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ভেবে দেখ, এমন মহান ব্যক্তিত্বকে এরা কিভাবে পাগল বলে আখ্যায়িত করছে? অথচ তাঁর বক্তব্য ও উপস্থাপিত জীবনাদর্শ লিপিবদ্ধ হচ্ছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির পথনির্দেশিকা হিসেবে চির উন্নত হয়ে থাকবে।

৬. আপনি পাগল নন। অর্থাৎ আপনি সত্য নবী, আপনার মুখ দিয়ে যেসব কথা বের হচ্ছে তা এদের অসহনীয়। এদের সকল জাহেলি আচরণে কুঠারাঘাত হানছে, তাই তারা পাগল হয়ে পড়েছে। নিজেদের হীন চরিত্র, পাগলামি, সর্বোপরি সামাজিক প্রাতপত্তিকে অক্ষুণœ রাখতে আপনাকে পাগল বলা শুরু করেছে। সত্য ও ন্যায়কে পাগলামি বলার তাদের হঠকারিতা প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। তারাই পাগল বলে চিহ্নিত হচ্ছে এবং হবে।

৭. আপনার জন্য অশেষ নিয়ামত আছে। অর্থাৎ হে রাসূল, এত তিরস্কার এত বিরোধিতা বা এত বাধার পরও আপনি যে হাসিমুখে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে ধৈর্যের সাথে সত্যের আহ্বান চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নবুয়্যতের বোঝা বহন করে চলছেন। এ জন্য ইহ-পরকালে আপনার অশেষ নিয়ামত ও সওয়াব জমা হচ্ছে।

৮. আপনি মহা চরিত্রের ওপর বহাল আছেন, অর্থাৎ যত প্রকার সৎগুণ হতে পারে সব মহানবীর (সা) জীবনে মজুদ আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে সকল প্রকার অন্যায়, গর্হিত কাজ তথা জাহেলি আচরণ থেকে মুক্ত রেখে নবুয়্যতের জন্য সরাসরি প্রস্তুত করেছেন। যে বয়সে মানুষ সামাজিক কর্মকা-, রীতি-নীতি ও বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করে সে বয়সে মহান আল্লাহ মহানবী (সা)-কে অনেক দূরে রেখেছেন, মক্কার জাহেলি সমাজের বেড়াজাল থেকে তিনি তাঁকে নির্মল ও স্বচ্ছ পরিম-লে নিয়ে মা হালিমার মুক্ত গৃহে লালন-পালন করিয়েছেন। এ দ্বারা বুঝা যায়, কোন সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে গড়তে হলে চাই উত্তম মা-বাবা, উত্তম পরিবেশ ও স্বচ্ছ আকিদা-বিশ্বাসের উৎকর্ষতা।

৯. মহানবীর (সা) এর মহাচরিত্রের কতিপয় দিক : মহাচরিত্র বলতে এখানে মহান দ্বীন-ইসলামকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মহানবী (সা) কে জীবনব্যবস্থা হিসেবে দ্বীন-ইসলাম দেয়া হয়েছে। ক্স হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, মহানবী (সা)-এর চরিত্র কী ছিল? তিনি বলেছিলেন, তোমরা কি কুরআন পড়ো না? পুরো কুরআনই তো ছিল তাঁর বাস্তব চরিত্র। অর্থাৎ কুরআনে কারীমে যে সব উত্তম উত্তম কাজ ও চরিত্র আলোচিত হয়েছে সে সব কিছুর মূর্ত প্রতীক ছিলেন মহানবী (সা)। হযরত আনাস (রা) বলেন, আমি একাধারে

১০ বছর মহানবী (সা)-এর খিদমত করেছি, তিনি আমাকে কখনো বলেননি যে, এটা করলে কেন? এটা ছাড়লে কেন? অর্থাৎ মহানবী (সা) একবার নিজে করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, অমুক কাজ এভাবে করবে। হযরত আনাস (রা) এ কাজ ঐভাবেই করতেন। ভুল হয়ে গেলে ধমক না দিয়ে মহানবী নিজে আবার করিয়ে দেখাতেন। ক্স মুসলিম শরিফে আছে, তিনি নিজের জন্য কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। ক্স তিনি কোথাও হইচই করেননি। ক্স বদ কাজের জবাব কখনো বদ দিয়ে দেননি। ক্স উত্তম চরিত্রের অধিকারীদের মর্যাদা ঐ ব্যক্তির মর্যাদার সমান, যে রাতে ইবাদত ও দিনে রোজা রাখে। ১০. মহানবী (সা) নৈতিকতার এক উচ্চতর মর্যাদার অধিষ্ঠিত। এ কারণেই তিনি বিশ্বমানবতাকে সুপথে আনতে আজীবন বহু কষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। নতুবা কোন দুর্বল চরিত্রের অধিকারীর পক্ষে এত কিছু করা সম্ভবপর হতো না। কেননা দুর্বল নীতির কোন ব্যক্তি নানা বাধাবিপত্তি, কটূক্তি ও পরনিন্দা ইত্যাদিকে উপেক্ষা করে দায়ী ইলাল্লাহর কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয় না।

১১. আপনিও দেখতে পাবেন, আর তারাও দেখতে পাবে। অর্থাৎ কে পাগল আর কে আবোলতাবোল বকছে, কে সত্যের ওপর দৃঢ় আর কে অসত্যের ওপর চলছে অচিরেই তা মানুষের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। সত্যিই কয়েক বছরের ব্যবধানে দুনিয়াবাসী স্পষ্টভাবে দেখতে পেলো যে, যারা তাঁকে পাগল বলে আখ্যা দিয়েছিল তাদের হাজার হাজার নেতা সর্বোপরি ইসলাম কায়েমের লক্ষ্যে নিজেদের জানমাল কুরবানি করে দেয়ার বজ্র শপথ গ্রহণ করেছিল। অপর দিকে একটি ক্ষুদ্র অংশ যারা জেদ ধরে বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ করেছিল, তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। উপসংহার : কোন মানুষের আচার ব্যবহার ও স্বভাব দ্বারাই তার চারিত্রিক গুণ বা ত্রুটি প্রকাশ পায়। মহানবী (সা) এদিক থেকে অনুপম ও অনন্য আদর্শ। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি এতই মধুর ছিল যে, শত্রুরা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে যেতো। তিনি আমাদের দুটো পন্থায় উত্তম চরিত্র শিখিয়েছেন এক ভাল কাজ করতে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। দুই নিজে ভালো কাজ করে ও মন্দ কাজ থেকে দূরে থেকে উদাহরণ পেশ করে গেছেন। এ কারণেই মহান আল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যে বলেন ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ আমাদের মহানবীর মাঝে ছিল সকল মানবিক উত্তম গুণাবলি, যা সকল মুসলিমের জন্য আদর্শ ও নমুনা। তিনি ছিলেন আল্লাহ সর্বাধিক অনুগত। পরম ক্ষমাশীলতা তাঁকে চরম বিরোধী সমাজের মনের গহিনে স্থান করে নিতে সহযোগিতা করেছে। সর্বকালে সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ এই মহামানব তাই আমাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
২৮৯ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

৫ টি মন্তব্য

  1. ভাই, আস-সালামু আলাইকুম,

    আপনার লেখাটা একটু প্যারা করে ভাগ ভাগ করে দিলে পড়তে সুবিধা হতো । ধন্যবাদ

    Abdullah

    @হাফিজ, vai prothom bar a jonno vul holo pore insha-allah hobena

    হাফিজ

    @Abdullah, আমিন , আপনাকে নতুন মনে হচ্ছে । এই ব্লগে স্বাগতম । ওয়াস-সালাম।

    Abdullah

    @হাফিজ, vai আপনাকেও ধন্যবাদ