লগইন রেজিস্ট্রেশন

বুকের উপর হাত বাঁধা : বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা

লিখেছেন: ' Anonymous' @ বৃহস্পতিবার, মার্চ ২২, ২০১২ (৯:৫২ পূর্বাহ্ণ)

শায়খ আলবানীর ভ্রান্ত গবেষণা এবং স্বঘোষিত আহলে হাদীসদের ভ্রান্ত আ’মালের আরেকটি নমুনা দেখুন। ধন্যবাদ আলকাউসার

‘‘নামাযে হাত বাঁধা ও নাভীর নিচে হাত বাঁধা’’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে হাত বাঁধার দুটো নিয়ম চলে আসছে : বুকের নীচে হাত বাঁধা ও নাভীর নীচে হাত বাঁধা। মুসলিম উম্মাহর বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণও এ দুটো নিয়ম গ্রহণ করেছেন।

নিকট অতীতে হাত বাঁধার নতুন কিছু নিয়ম আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল না এবং কুরআন-সুন্নাহর প্রাজ্ঞ মনীষী ও মুজতাহিদগণের সিদ্ধান্তেও তা পাওয়া যায় না। বলাবাহুল্য, এসব নিয়ম ‘শুযুয’ ও বিচ্ছিন্নতা বলে গণ্য, যা দ্বীন ও শরীয়তের বিষয়ে সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, সম্প্রতি এইসব বিচ্যুতি ও বিচ্ছিন্নতাকেই ‘সুন্নাহ’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং চরম দায়িত্বহীনতার সাথে সাধারণ মানুষের মাঝেও তা প্রচার করা হচ্ছে।
আমরা মনে করি, সাধারণ মুসলমানদেরকে দলীল-প্রমাণের শাস্ত্রীয় জটিলতার মুখোমুখি করা অনুচিত, কিন্তু এ সকল অনাচারের প্রতিরোধ ও আম মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষার জন্য এখন কিছু বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার বিকল্প নেই। যথাসম্ভব সহজ ভাষায় আমরা তা উপস্থাপনের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হেদায়েতের উপর থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

নামাযে হাত বাঁধার ক্ষেত্রে যেসব শুযুয ও বিচ্ছিন্নতা দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

শুযুয ১ : বুকের উপরের অংশে থুতনীর নিচে হাত রাখা
সমসাময়িক গায়রে মুকাল্লিদ আলিমরাও এই নিয়মকে খন্ডন করেছেন। শায়খ বকর বিন আবদুল্লাহ আবু যায়েদ ‘‘লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ’’ পুস্তিকায় আরো কিছু নতুন নিয়মের সাথে এ নিয়মটিকেও খন্ডন করেছেন। ভূমিকায় তিনি লেখেন, ‘আমরা দেখেছি, কিছু লোক কোনো শায ও বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করে তার প্রচারে কিংবা কোনো দুর্বল রুখসত ও অবকাশ গ্রহণ করে তার প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করে। এদের খন্ডনের জন্য মনীষী আলিমদের এই নীতিই যথেষ্ট যে, ‘ইলমের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছিন্ন মত এবং (বিধানের ক্ষেত্রে) কোনো অপ্রমাণিত অবকাশ সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

‘কিন্তু সম্প্রতি যে দলটির উদ্ভব ঘটেছে, তাদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানদের প্রতিদিনের ইবাদত-বন্দেগীর ওয়াজিব-মুস্তাহাব বিষয়ে, যে ইবাদত-বন্দেগী ইসলামের মহান নিদর্শন ও প্রতীকও বটে, এমন সব ধারণার বিস্তার ঘটছে যেগুলোর সাথে কোনো যুগে আলিমসমাজের কোনো পরিচিতি ছিল না। অতিনমনীয় ভাষায় বললে, এসব ধারণার কোনো কোনোটির সূত্র হচ্ছে বহুকাল আগের বর্জিত কিছু মত।
‘আর কোনো ধারণা পরিত্যক্ত হওয়ার জন্য তো এ-ই যথেষ্ট যে, তা সকল আলিমের মতামত থেকে বিচ্ছিন্ন।
‘ইসলামের দ্বিতীয় রোকন নামাযের ক্ষেত্রেও এমন নতুন কিছু কাজ ও অবস্থা আবিষ্কার করা হয়েছে, যার কোনোটা নামাযীকে একটা অস্বাভাবিক রূপ দান করে, অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সম্পর্কে বলেছেন-
وما انا من المتكلفين
‘… এবং আমি ভনিতাকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।’-সূরা সোয়াদ (৩৮) : ৮৬

‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
بعثت بالحنيفية السمحة
‘তেমনি তা নামাযীর মাঝে একটা উদ্যত ভঙ্গি সৃষ্টি করে, অথচ নামায হচ্ছে আপন রব ও মাবুদের সামনে বান্দার বিনয় ও অক্ষমতার অবস্থা!
‘কোনো কোনো ধারণার অর্থ দাঁড়ায়, ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত গোটা মুসলিম উম্মাহ ছিল সুন্নাহ বর্জনকারী ও সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত। অন্যভাষায়, তারা ছিল সম্মিলিতভাবে পাপী ও অপরাধী।

‘তো এই সকল ভ্রান্তির কারণ কী?
‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে অতিশয়তা, আর কখনো (আরবী) ভাষার বাকরীতি ও হাদীস-ফিকহের মূলনীতি সম্পর্কে উদাসীনতা।
‘এই সকল বিভ্রান্তি হচ্ছে দলীলের বিষয়ে মূলনীতি বর্জনের এবং নামাযের স্বাভাবিক অবস্থা ও ফিকহ-খিলাফিয়াতের কিতাব থেকে বিমুখতার কুফল। অথচ ঐ সকল কিতাবে আহকাম ও বিধানের তত্ত্ব, কারণ ও বিশেষজ্ঞদের মতভিন্নতার আলোচনা থাকে। …’-লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ পৃ. ৩-৪

বুকের উপরের অংশে গলদেশে হাত বাঁধার ‘দলীল’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কুরআন মজীদের আয়াত-
فصل لربك وانحر
-এর তাফসীরে আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করা হয়। বায়হাকী তা বর্ণনা করেছেন (২/৩১) এবং তার সূত্রে তাফসীরের বিভিন্ন কিতাবে তা বর্ণিত হয়েছে। যেমন দেখুন : আদ্দুররুল মানছূর ৮/৬৫০-৬৫১
‘এই রেওয়ায়েত সহীহ নয়। কারণ এর সনদে রওহ ইবনুল মুসাইয়াব আলকালবী নামক একজন রাবী আছেন। তার সম্পর্কে দেখুন : আলমাজরূহীন ১/২৯৯

সূরায়ে কাওসারের ঐ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, তার অর্থও তা-ই যা নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে-
قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العالمين
(বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহর জন্য, যিনি রাববুল আলামীন।’
অর্থাৎ ঐ আয়াতে وانحر অর্থ কুরবানী, গলদেশে হাত রাখা নয়।)
‘ইবনে জারীর এই তাফসীরকেই সঠিক বলেছেন এবং ইবনে কাছীর তা সমর্থন করেছেন। তাঁর মন্তব্য-এটি অতি উত্তম (ব্যাখ্যা)।’-লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ, বকর আবু যায়েদা পৃ. ৯

উপরে যে রেওয়ায়েতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তার পূর্ণ আরবী পাঠ সনদসহ তুলে দেওয়া হল-
أخبرنا أبو زكريا بن أبي اسحاق، أنبأ الحسن بن يعقوب بن البخاري، انبأ يحي بن أبي طالب، انبأ زيد بن الحباب، ثنا روح بن المسيب، قال : حدثني عمرو بن مالك النكري عن أبي الجوزاء عن ابن عباس رضي الله عنهما في قول الله عز وجل “فصل لربك وانحر” قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة عند النحر.
-সুনানে বায়হাকী ২/৩০-৩১
রওহ ইবনুল মুসাইয়্যাব সম্পর্কে ইবনে হিববান রাহ. (৩৫৪ হি.) বলেন, ‘সে ছিকা রাবীদের সূত্রে মওযু রেওয়ায়েত বর্ণনা করে। তার থেকে বর্ণনা করা বৈধ নয়।’
يروي الموضوعات عن الثقات لا تحل الرواية عنه
-কিতাবুল মাজরূহীন

ইবনে আদী বলেন, ‘সে ছাবিত ও ইয়াযীদ আররাকাশী থেকে এমন সব রেওয়ায়েত বর্ণনা করে, যা মাহফুয নয় (সঠিক নয়)।’
يروي عن ثابت ويزيد الرقاشي أحاديث غير محفوظة
-আলকামিল ফী জুয়াফাইর রিজাল ৩/১৪৩
আরো দেখুন : মীযানুল ইতিদাল ২/৫৭; লিসানুল মীযান ২/৪৬৮

সারকথাঃ এই রেওয়ায়েত নির্ভরযোগ্য নয়। আর এর দ্বারা উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর করা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আয়াতের সঠিক তাফসীর তা-ই যা ইবনে জারীর তাবারী রাহ. গ্রহণ করেছেন এবং ইবনে কাছীর যাকে ‘অতি উত্তম’ বলেছেন।

শুযুয ২: নামাযে যিরার উপর যিরা রাখা
আরবীতে হাতের আঙুলের মাথা থেকেই কনুই পর্যন্ত অংশকে ‘যিরা’ বলে। সম্প্রতি কিছু মানুষ যিরার উপর যিরা রাখাকে সুন্নাহ মনে করেন এবং ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর না রেখে ডান হাতের যিরা বাম হাতের যিরার উপর রাখেন। হাত বাঁধার ক্ষেত্রে এটাও একটা বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতা। কোনো সহীহ হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই, সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না এবং কোনো মুজতাহিদ ইমাম এই নিয়মের কথা বলেননি। যারা একে সুন্নাহ মনে করেন তারা এ বিষয় কোনো সহীহ-সরীহ নস (বিশুদ্ধ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য) উপস্থাপন করতে পারেননি। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলীল হচ্ছে, দুটো সহীহ হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা।
নীচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

প্রথম হাদীস : সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, ‘লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন তার ডান হাত বাম যিরার উপর রাখে।’
হাদীসটির আরবী পাঠ এই-
كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة. قال أبو حازم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم.
-মুয়াত্তা মালিক পৃ. ৫৫ ; সহীহ বুখারী ১/১০৪
এই হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই। বাম যিরার উপর ডান হাত রাখার কথা আছে।
দ্বিতীয় হাদীস : ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের একটি পাঠ। তাতে আছে, ‘(আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর রাখলেন।’
রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد
-মুসনাদে আহমদ ৩১/১৬০, হাদীস : ১৮৮৭০; সুনানে আবু দাউদ ১/৪৮৩, হাদীস : ৭২৭
এই বর্ণনাতেও বলা হয়নি ডান যিরা রেখেছেন। বলা হয়েছে, ডান হাত রেখেছেন।
এই দুই হাদীসে ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরা-এর কোনো প্রমাণ নেই; বরং এই ব্যাখ্যা করা হলে তা হবে এই দুই হাদীসের শায ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা। কারণ হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো ইমাম ও ভাষ্যকার এই ব্যাখ্যা করেননি।

উল্লেখিত পাঠটি কি ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের মূল পাঠ
ওয়াইল ইবনে হুজর রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে নামায পড়েছেন এবং যেভাবে তাঁকে নামায পড়তে দেখেছেন তা বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই বিবরণ বেশ কয়েকজন রাবীর সূত্রে পাওয়া যায়। যেমন : ১. আলকামা ইবনে ওয়াইল ২. আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইল। (এরা দু’জন ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর পুত্র। আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইল তার বড় ভাই আলকামা ইবনে ওয়াইল রাহ. থেকেই পিতার বিবরণ গ্রহণ করেছেন। দেখুন : সহীহ মুসলিম ফাতহুল মুলহিম ২/৩৯) ৩. হুজর ইবনুল আম্বাস, ৪. কুলাইব ইবনে শিহাব, প্রমুখ। শেষোক্ত কুলাইব ইবনে শিহাব রাহ.-এর বর্ণনাই আমাদের আলোচ্য বিষয়।

কুলাইব ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন তার পুত্র আসিম ইবনে কুলাইব রাহ.। আসিম ইবনে কুলাইব রাহ. থেকে অনেক রাবী এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমন
শো’বা ইবনুল হাজ্জাজ
বিশর ইনুল মুফাদ্দাল
কায়স ইবনুর রাবী
আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ
খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ
আবু ইসহাক
আবুল আহওয়াস
আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস
মুসা ইবনে আবী আয়েশা
আবু আওয়ানা ও
যাইদা ইবনে কুদামা প্রমুখ।

শেষোক্ত রাবী যাইদা ইবনে কুদামা-এর বর্ণনার পাঠ সকলের চেয়ে আলাদা। এ কারণে তার পাঠকে আসিম ইবনে কুলাইবের বর্ণনার মূল পাঠ সাব্যস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এই সকল বর্ণনা সামনে রাখলে প্রতীয়মান হয়য, ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস থেকে যিরার উপর যিরার নিয়ম গ্রহণ করার অবকাশ নেই।
কারণ :
এক. আগেই বলা হয়েছে, আসিম ইবনে কুলাইব থেকে অন্যান্য ছিকা রাবী উপরোক্ত শব্দে বর্ণনা করেননি। যাইদার রেওয়ায়েতের পাঠ তাদের সবার রেওয়ায়েতের পাঠ থেকে আলাদা। সুতরাং যাইদার বর্ণনার উপর ভিত্তি করে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, এটিই আসিম ইবনে কুলাইবের পাঠ। অর্থাৎ আসিম ইবনে কুলাইব হুবহু এই শব্দে বর্ণনা করেছেন।
দুই. আলোচিত হাদীসের মূল রাবী হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.। আসিম ইবনে কুলাইবের সূত্র ছাড়া আরো বেশ কিছু সূত্রে তাঁর বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে। সেসব রেওয়ায়েতের পাঠও যাইদার পাঠের চেয়ে আলাদা। সুতরাং তাঁর পাঠটিকেই ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর বিবরণের মূল পাঠ সাব্যস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
তিন. যাইদার পাঠটিও স্পষ্টভাবে ‘যিরার উপর যিরার’ নিয়ম নির্দেশ করে না; বরং সামান্য চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এই পাঠের অর্থও তা-ই যা এ হাদীসের অন্য সকল পাঠ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে পূর্ণ ‘সায়িদ’ (যিরা) উদ্দেশ্য নয়। সায়িদের কিছু অংশ উদ্দেশ্য, যা কব্জি সংলগ্ন।
চার. আসিম ইবনে কুলাইবের বিবরণ বহু সনদে বর্ণিত হয়েছে। এসব বিবরণের মৌলিক পাঠ দু’ ধরনের : ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরা এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা। যেসব রেওয়ায়েতে أخذ বা إمساك (ধরা) শব্দ আছে সেখানে হাত দ্বারা যে হাতের পাতা উদ্দেশ্য তা তো বলাই বাহুল্য। আর যেসব রেওয়ায়েতে وضع (রাখা) শব্দ আছে সেখানে কনুই পর্যন্ত হাত বোঝানো হয়েছে-এই দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ এর অর্থ হবে আসিম ইবনে কুলাইব রাহ. ওয়াইল ইবনে হুজরের যে বিবরণ উল্লেখ করেছেন, পরবর্তী রাবীদের বর্ণনায় শব্দগত পার্থক্যের কারণে একে দুই বিবরণ ধরে নেওয়া হয়েছে : একটি হল, ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাত ধরা। আরেকটি ডান যিরা বাম যিরার উপর বিছিয়ে রাখা!
এক্ষেত্রে সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তা হচ্ছে, যেসব বর্ণনায় ‘ডান হাত রাখা’ আছে তারও অর্থ ডান হাতের পাতা রাখা, কনুই পর্যন্ত রাখা নয়।
পাঁচ. এটা আরো শক্তিশালী হয় যখন দেখা যায়, এ হাদীসের অসংখ্য বর্ণনার মাঝে একটি সহীহ রেওয়ায়েতেও ‘ডান হাতের যিরা’ বাম হাতের উপর রেখেছেন এমন কথা পাওয়া যায় না।

সুতরাং যিরার উপর যিরা একটা আরোপিত ব্যাখ্যা, হাদীস শরীফের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণেই হাদীস ও ফিকহের কোনো নির্ভরযোগ্য ইমাম থেকে হাদীসের এই ব্যাখ্যা এবং হাত বাঁধার এই নিয়ম বর্ণনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, উপরোক্ত নিয়মটি যেমন হাত বাঁধার বিচ্ছিন্ন ও নবউদ্ভাবিত একটি নিয়ম তেমনি এই নিয়ম দ্বারা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যাও একটি শায ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা।

ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ কী ব্যাখ্যা করেছেন
যাইদা ইবনে কুদামার এই পাঠ হাদীস ও ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে উদ্ধৃত হয়েছে। বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ তার অর্থ করেছেন ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর রাখা।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা রাহ. (৩১১ হি.) সহীহ ইবনে খুযায়মায় হাদীসের এই পাঠ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘যিরার উপর যিরা’র অর্থ গ্রহণ করেননি। তিনি এই হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন-
باب وضع بطن الكف اليمنى على كف اليسرى والرسغ والساعد جميعا.
অর্থাৎ ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখা। (দেখুন : সহীহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২, বাব : ৯০)

বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, নামাযে হাত এমনভাবে রাখা উচিত, যাতে ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার কিছু অংশ, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর থাকে। তাঁরা ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের এই পাঠ এবং হযরত সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. (৬২০ হি.) বলেন, (নামাযে) ডান হাত বাম হাতের কব্জি ও তৎসংলগ্ন অংশের উপর রাখা মুস্তাহাব। কারণ হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামাযের বিবরণ দিয়েছেন এবং সে বিবরণে বলেছেন, ‘অতপর তিনি তাঁর ডান হাত রাখলেন তার বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর।’
ويستحب أن يضعهما على كوعه وما يقاربه لما روى وائل بن حجر أنه وصف صلاة النبي صلى الله عليه وسلم وقال في وصفه : ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد.
-আলমুগনী ২/১৪১

একই কথা বলেছেন আল্লামা ইবনে কুদামা মাকদেসী রাহ. (৬৮২ হি.)। তাঁর বক্তব্যের আরবী পাঠ এই-
ويضعهما (كذا) على كوعه أو قريبا منه لما روى وائل بن حجر أنه وصف صلاة النبي صلى الله عليه وسلم وقال في وصفه : ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد.
-আশশারহুল কাবীর (আলমুগনীর সাথে মুদ্রিত) ১/৫৪৯

ইমাম নববী রাহ. (৬৭৬ হি.) ‘‘শরহুল মুহাযযাব’’ গ্রন্থে (৪/৩২৭) শাফেয়ী মাযহাবের মনীষীদের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন যে, ‘সুন্নাহ হচ্ছে, তাকবীরে (তাহরীমার) পর দুই হাত নামিয়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখবে এবং ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাতের পাতার গোড়া এবং কব্জি ও বাহুর কিছু অংশ ধরবে। কাফফাল বলেছেন, ডান হাতের আঙ্গুল আড়াআড়িভাবে কব্জির উপর রাখা বা বাহুর উপর ছড়িয়ে দেওয়া দুটোরই অবকাশ আছে।

এরপর বলেন, (পৃ. ৩২৯) আমাদের মনীষীগণ সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীস দ্বারা এ নিয়ম প্রমাণ করেছেন। তেমনি ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘অতপর (আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত রাখলেন বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর।’
واحتج أصحابنا أصحاب بحديث أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل يده اليمنى على ذراعه في الصلاة، قال أبو حازم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم، رواه البخاري وهذه العبارة صريحة في الرفع إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم، وعن وائل بن حجر أنه رأى رسول الله صلى الله عليه وسلم رفع يديه حين دخل في الصلاة، ثم التحف بثوبه، ثم وضع يده اليمنى على اليسرى، رواه مسلم بهذا اللفظ، وعن وائل بن حجر ايضا قال : قلت لانظر إلى صلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم كيف يصلي فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم فاستقبل القبلة فكبر فرفع يده حتى حاذى أذنيه، ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد، رواه أبو داود بإسناد صحيح … .

ইমাম আবুল ওয়ালিদ আলবাজী রাহ. (৪৯৪ হি.) হযরত সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ হাদীসের অর্থ হচ্ছে, ডান হাত কব্জির উপর রাখবে। কারণ ডান হাত বাম হাতের পাতার উপর রাখা যাবে না। তা রাখতে হবে বাম হাতের গোড়া ও কব্জির উপর। আর তার উপর ভর দেওয়া যাবে না। আরবী পাঠ এই-
قوله أن يضع الرجل يده اليمنى على ذراعه اليسرى، يريد أن يضعها على رسغه، لأن يده اليمنى لا يضعها على كف يده اليسرى، وإنما يقتصر بها على المعصم والكوع من يده اليسرى، ولا يعتمد عليها.
-আলমুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা ২/১৬৪

ইমাম আবুল আববাস আহমদ ইবনে উমার আলকুরতুবী রাহ. সহীহ মুসলিমে বর্ণিত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের আলোচনায় বলেন, ইবনুল মাজিশূন ইমাম মালিক রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, (নামাযী) ডান হাত দ্বারা তার বাম হাতের গোড়া ও কব্জি পেঁচিয়ে ধরবে। উপরের হাদীসটি তার দলীল। …
আরবী পাঠ -
قوله : ثم وضع يده اليمنى على اليسرى اختلف فيه على ثلاثة أقوال : فروى مطرف وابن الماجشون عن مالك أنه قال : يقبض باليمنى على المعصم والكوع من يده اليسرى تحت صدره، تمسكا بهذا الحديث، وروى ابن القاسم : أنه يسدلهما وكره له ما تقدم، ورأى أنه من الاعتماد على اليد في الصلاة المنهي عنه في كتاب أبي داود، وروى أشهب التخيير فيهما والاباحة.
-আলমুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখীসি কিতাবি মুসলিম ২/২১

ইবনে তাইমিয়া রাহ. ও ইবনে হাযম রাহ.
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. নামাযে হাত বাঁধার নিয়ম সম্পর্কে বলেন, ‘তাকবীর সমাপ্ত হওয়ার পর দুই হাত ছেড়ে দিবে এবং ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর এমনভাবে রাখবে যে, ডান হাত দ্বারা কব্জির গোড়ার হাড় পেঁচিয়ে ধরবে কিংবা ডান হাত কব্জির উপর এমনভাবে বিছিয়ে দিবে যে, হাতের আঙ্গুলিসমূহ যিরার দিকে (ছড়ানো) থাকে। ডান হাত যদি কব্জির ওপরের দিকে (যিরার উপর) কিংবা কব্জির নিচে বাম পাতার উপর রাখে তবে সেটাও জায়েয।’

এরপর তিনি হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস, যাইদা ইবনে কুদামার বর্ণনা, সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীস ও হুলব রা.-এর হাদীসকে দলীল হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন।
আলোচনার আরবী পাঠ এই-
يعني : إذا انقضى التكبير فإنه يرسل يديه ويضع يده اليمنى فوق اليسرى على الكوع، بأن يقبض الكوع باليمنى، أو يبسط اليمنى عليه، ويوجه أصابعه إلى ناحية الذراع، ولو جعل اليمنى فوق الكوع أو تحته على الكف اليسرى، جاز لما روى وائل بن حجر أنه رأى النبي صلى الله عليه وسلم حين دخل في الصلاة، ثم التحف بثوبه ثم وضع يده اليمنى على اليسرى، رواه مسلم، وفي رواية لأحمد وأبي داود : وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد، وعن أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة، قال أبو حازم : ولا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم. رواه أحمد والبخاري.
وعن قبيصة بن هلب عن أبيه قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه، رواه أحمد وأبو داود وابن ماجه والترمذي وقال : حديث حسن، وعليه العمل عند (أكثر) أهل العلم من أصحاب النبي والتابعين …
-শরহুল উমদা পৃ. ৬৫-৬৬

আল্লামা ইবনে হাযম রাহ. (৪৫৬ হি.) ‘‘আলমুহাল্লা’’ গ্রন্থে (৩/২৯-৩০) নামাযে হাত বাঁধার বিষয়ে বলেছেন, ‘মুস্তাহাব এই যে, নামাযী কিয়ামের হালতে তার ডান হাত বাম হাতের পাতার গোড়ায় রাখবে।’
এরপর তিনি সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসসহ আরো কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আলোচনার শেষে বলেন, ‘আবু মিজলায, ইবরাহীম নাখায়ী, সায়ীদ ইবনে জুবাইর, আমর ইবনে মায়মূন, মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন, আয়্যুব ছাখতিয়ানী ও হাম্মাদ ইবনে সালামা থেকেও আমরা বর্ণনা পেয়েছি যে, তাঁরাও (নামাযে) এভাবে করতেন (হাত বাঁধতেন)।

আর এটি আবু হানীফা, শাফেয়ী, আহমদ ও দাউদ-এর সিদ্ধান্ত। আরবী পাঠ এই-
مسألة : ويستحب أن يضع المصلي يده اليمنى على كوع يده اليسرى في الصلاة في وقوفه كله فيها … ومن طريق مالك عن أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة … وروينا فعل ذلك عن أبي مجلز، وإبراهيم النخعي، وسعيد بن جبير، وعمرو بن ميمون، محمد بن سيرين، وأيوب السختياني، وحماد بن سلمة : أنهم كانوا يفعلون ذلك، وهو قول أبي حنيفة، والشافعي، وأحمد، وداود.

আল্লামা শাওকানী রাহ.ও (১২৫৫ হি.) ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের এই ব্যাখ্যাই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাদীসের অর্থ এই যে, ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর উপর রাখবে। তবারানীর রেওয়ায়েতে আছে, (আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামাযে তাঁর ডান হাত রাখলেন বাম হাতের পিঠের উপর কব্জির কাছে। (ইমাম) শাফেয়ী রাহ.-এর শাগরিদরা বলেছেন, ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাতের পাতার গোড়া, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশ পেঁচিয়ে ধরবে। হাদীসটি হাতের পাতা হাতের পাতার উপর রাখার বৈধতা প্রমাণ করে। এটিই অধিকাংশ মনীষীর গৃহীত নিয়ম। …’ এরপর তিনি নামাযে হাত ছেড়ে রাখার প্রসঙ্গ আলোচনা করেন।

তার আলোচনার আরবী পাঠ এই-
والمراد أنه وضع يده اليمنى على كف يده اليسرى ورسغها وساعدها. ولفظ الطبراني : وضع يده اليمنى على ظهر اليسرى في الصلاة قريبا من الرسغ، قال أصحاب الشافعي : يقبض بكفه اليمنى كوع اليسرى وبعض رسغها وساعدها.
والحديث يدل على مشروعية وضع الكف على الكف، وإليه ذهب الجمهور …
-নায়লুল আওতার ২/১৮১
এরপর হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে বলেন, ‘যিরার কোন অংশে ডান হাত রাখা হবে তা এ হাদীসে অস্পষ্ট। তবে আহমদ ও আবু দাউদের রেওয়ায়েতে (যাইদা ইবনে কুদামার সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস) যা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে তা পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায়।
قوله على ذراعه اليسرى أبهم هنا موضعه من الذراع، وقد بينته رواية أحمد وأبي داود في الحديث الذي قبله
-প্রাগুক্ত ২/১৮৯

সুতরাং শাওকানী রাহ.-এর মতেও সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসের অর্থ হাতের পাতা হাতের পাতার উপর রাখা, তবে এমনভাবে, যেন তা যিরার কিছু অংশের উপর থাকে।

সারকথা
নামাযে ‘যিরার উপর যিরা’ রাখা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে পরবর্তী শত শত বছর এই নিয়মের কোথাও কোনো অস্তিত্ব ছিল না। নিকট অতীতে আবিষ্কৃত এই নিয়ম প্রমাণের জন্য হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. ও হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত দুটি হাদীসের যে ব্যাখ্যা করা হয় তা ভুল ব্যাখ্যা। হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো ইমাম এই ব্যাখ্যা করেননি। বস্ত্তত এই ভুল ব্যাখ্যাই হচ্ছে উপরোক্ত শায ও বিচ্ছিন্ন নিয়মটির প্রধান সূত্র।

শুযুয-৩ : বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ ও একমাত্র সুন্নাহ মনে করা।
ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে বুকের উপর হাত বাঁধার নিয়ম পাওয়া যায় না। কোনো সহীহ মরফূ হাদীসেও এই নিয়ত বর্ণিত হয়নি। মুসলিমউম্মাহর কোনো মুজতাহিদ ইমাম থেকেও নিখুঁত ও অগ্রগণ্য বর্ণনায় এই নিয়ম পাওয়া যায় না। কিছু শায ও মুনকার রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, যেগুলো হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। তেমনি কোনো কোনো মুজতাহিদ ইমাম থেকে পরবর্তীদের অসতর্ক কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলো ঐ ইমামের বিশিষ্ট শাগরিদ ও মনীষীদের বর্ণনার বিরোধী।

এ ধরনের একটি মতকে সুন্নাহ ও একমাত্র সুন্নাহ মনে করা যে মারাত্মক বিভ্রান্তি তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

রেওয়ায়েতসমূহের পর্যালোচনা
বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব রেওয়ায়েতের সহযোগিতা নেওয়া হয় এখানে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করছি।

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইলের রেওয়ায়েত
তাঁর বিবরণ অনুযায়ী সুফিয়ান ছাওরী রাহ., আসেম ইবনে কুলাইব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নামায পড়লাম … তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের উপর রাখলেন।

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
أخبرنا أبو طاهر، نا أبو بكر، نا أبو موسى، نا مؤمل، نا سفيان، عن عاصم بن كليب، عن أبيه، عن وائل بن حجر قال : صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، ووضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره.
-সহীহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২, হাদীস : ৪৭৯

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইলের পূর্ণ বিবরণ সঠিক নয়। হাদীস শাস্ত্রের নীতি অনুসারে এ বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা ‘মুনকার’। অর্থাৎ সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর বর্ণনায় তা ছিল না। মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল ভুলক্রমে তা বাড়িয়ে দিয়েছেন।

কারণ সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে এই হাদীস মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ফিরয়াবী ও আবদুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ রাহ.ও বর্ণনা করেছেন।

তাঁরা দু’জনই ছিকা ও শক্তিশালী রাবী। তাঁদের রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই। দেখুন : মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮; আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/৩৩

রেওয়ায়েত দুটির সনদসহ আরবী পাঠ নিম্নরূপ :
قال الإمام أحمد : حدثنا عبد الله بن الوليد، حدثني سفيان، عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر قال : … ورأيته ممسكا بيمينه على شماله في الصلاة …
وقال الإمام الطبراني : حدثنا عبد الله بن محمد بن سعيد بن أبي مريم ثنا محمد بن يوسف الفريابي ثنا سفيان عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يضع يده اليمنى على اليسرى وإذا جلس افترش رجله اليسرى …
قال الراقم : ومحمد بن يوسف الفريابي ذكره المزي في الرواة عن الثوري وابن عيينة كلهيما إلا أنه يستظهر برواية الدارقطني أنه الثوري. ففي إتحاف المهرة 13/662 تحت حديث : سمعت النبي صلى الله عليه وسلم إذا قال غير المغضوب عليهم ولا الضالين قال آمين، يمد بها صوته : قط في الصلاة … وعن يحي بن صاعد، عن ابن زنجوية، عن الفريابي، عن الثوري، عن سلمة، نحوه. أي عن حجر أبي العنبس عن وائل بن حجر.
وقد ذكرهما صاحب أنيس الساري 10/335 في الرواة عن الثوري. رقم الحاشية : (1)

এটা শুধু পাওয়া যায় মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল রাহ.-এর বর্ণনায়, যাঁর সম্পর্কে জারহ-তাদীলের ইমামদের সিদ্ধান্ত এই যে, তিনি সাধারণভাবে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হলেও রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে তাঁর প্রচুর ভুল হয়েছে। এমনকি ইমাম বুখারী রাহ. তাকে ‘মুনকাররুল হাদীস’ বলেছেন।ইমামগণের মন্তব্য নীচে উল্লেখ করা হল-
قال البخاري : منكر الحديث، وقال أبو حاتم الرازي : صدوق شديد في السنة كثير الخطأ، يكتب حديثه، وقال أبو زرعة الرازي : في حديثه خطأ كثير، وقال ابن سعد : ثقة كثير الغلط، وقال الساجي : صدوق، كثير الخطأ وله أوهام يطول ذكرها. وقال الدارقطني : ثقة كثير الخطأ.
দেখুন : তাহযীবুল কামাল ১৮/৫২৬; তাযীবুত তাহযীব ১০/৩৪০; মীযানুল ইতিদাল ৮৯৪৯; আলমুগনী ফী যুআফা ৬৫৪৭

শায়খ আলবানীও সিলসিলাতুয যয়ীফার অনেক জায়গায় তাঁকে জয়ীফ বলেছেন এবং তাঁর সম্পর্কে ইমামগণের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
দেখুন : সিলসিলাতুয যয়ীফা ১/১৩১; ২/২৪৬, ৩/১৭৯; ৩/২২৭; ৪/৪৫৫ ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত : সুফিয়ান ছাওরী রাহ. ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর বিবরণ বর্ণনা করেছেন আসিম ইবনে কুলাইব থেকে। আসিম ইবনে কুলাইব থেকে এই হাদীস আরো বর্ণনা করেছেন :
১. শোবা ইবনুল হাজ্জাজ,
২. বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল
৩. কায়স ইবনুর রাবী
৪. যাইদা ইবনে কুদামা
৫. আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ
৬. খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ
৭.আবু ইসহাক
৮. আবুল আহওয়াস
৯. আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস,
১০. মুসা ইবনে আবী আয়েশা
১১. আবু আওয়ানা প্রমুখ হাদীসের বিখ্যাত ইমাম ও ছিকা রাবীগণ। তাঁরা সকলে আসিম ইবনে কুলাইব থেকে নামাযে হাত বাঁধার হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কেউ على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা বর্ণনা করেননি।

এঁদের রেওয়ায়েতগুলোর জন্য দেখুন যথাক্রমে :
১. মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৯, হাদীস : ১৮৮৭৮
২. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭২৬; সুনানে নাসায়ী, কুবরা, হাদীস : ১১৮৯; মুজতাবা, হাদীস : ১২৬৫; মুসনাদে বাযযার-আলবাহরুয যাখখার, হাদীস : ৪৪৮৫; আলমু’জামুল কাবীর তবারানী ২২/৩৭
৩. আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ২২/৩৩
৪. মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮; আলমুজামুল কাবীর ২২/৩৫
৫. মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৬
৬. সুনানে কুবরা বায়হাকী ২/১৩১
৭. আলমুজামুল আওসাত তবারানী ২/৪২৩
৮. মুসনাদে আবু দাউদ ত্বয়ালিসী ২/৩৫৮, হাদীস : ১১১৩; আলমুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/৩৪
৯. সহীহ ইবনে হিববান ৫/২৭১; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৩/৩১৭
১০. মুসনাদে বাযযার আলবাহরুয যাখখার, হাদীস : ৪৪৮৯
১১. মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার বায়হাকী ৩/৫০

এ থেকে বোঝা যায়, আসিম ইবনে কুলাইব বুকের উপর হাত বাঁধার কথা বর্ণনা করেননি। তাহলে সুফিয়ান ছাওরীর সঠিক বর্ণনায় তা কীভাবে থাকতে পারে?

তো এই সকল ইমাম ও ছিকা রাবীর বর্ণনার সাথে তুলনা করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, এ হাদীসে على صدره অংশটা মুনকার তথা অগ্রহণযোগ্য।

উল্লেখ্য, কুলাইব ইবনে শিহাব ছাড়া অন্যদের সূত্রেও ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর এই হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো সহীহ সনদে على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা পাওয়া যায় না।
দেখুন : বুগয়াতুল আলমায়ী ফী তাখরীজিয যায়লায়ী, নসবুর রায়াহর হাশিয়ায় ১/৩১৬

২. হুলব আতত্বয়ী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসে মুসনাদে আহমদের ‘শায’ অংশ
বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণ করার জন্য হুলব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসের উদ্ধৃতিও দেওয়া হয়ে থাকে। অথচ ঐ হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় ‘বুকের উপর হাত বাঁধা’র কথা নেই। একটিমাত্র বর্ণনায় এই অতিরিক্ত কথাটি পাওয়া যায়, যা অন্য সকল বর্ণনার পরিপন্থী। রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই -
أحمد : حدثنا يحي بن سعيد عن سفيان : ثني سماك عن قبيصة بن هلب عن أبيه قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم ينصرف عن يمينه وعن يساره، ورأيته ـ قال ـ يضع هذه على صدره. وصف يحي اليمنى على اليسرى فوق المفصل.
-মুসনাদে আহমদ ৫/২২৬

এই রেওয়ায়েতে দেখা যাচ্ছে, ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ রাহ. এই হাদীসটি সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে এই হাদীস আরো বর্ণনা করেছেন
১. ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ
২. ইমাম আবদুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম
৩. ইমাম আবদুর রহমান ইবনে মাহদী
৪. মুহাম্মাদ ইবনে কাছীর
৫. আবদুস সামাদ ইবনে হাসসান
৬. হুসাইন ইবনে হাফস
প্রমুখ ইমাম ও ছিকা রাবীগণ। তাঁদের কারো বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই।

দেখুন যথাক্রমে : ১. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১/৩৯০; ২. মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২/২৪০; ৩. সুনানে দারাকুতনী ২/৩৩, হাদীস : ১১০০;
৪. আলমুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/১৬৫; ৫. মারিফাতুস সাহাবা, আবু নুয়াইম ১৯/১৭২
৬. সুনানে কুবরা বাইহাকী ২/২৯৫

তদ্রূপ সিমাক ইবনে হারব থেকে সুফিয়ান ছাওরী রাহ. ছাড়া আরো বর্ণনা করেছেন :
১. আবুল আহওয়াস
২. হাফস ইবনু জুমাই
৩. শরীক
৪. আসবাত ইবনে নাসর
৫. শো’বা ইবনুল হাজ্জাজ
৬. যাইদা ইবনে কুদামা আলকূফী প্রমুখ রাবীগণ।
এঁদের কারো বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই।
(দেখুন যথাক্রমে : ১. জামে তিরমিযী ১/৩১২, হাদীস : ২৫০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ৮০৯; আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/১৬৫;
২. আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/১৬৫; ৩. মুসনাদে আহমদ ৫/২২৬, হাদীস : ২১৯৬৯; ৪. আলমুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/১৬৫; ৫. ইবনে আবী আসিম ২৪৯৫-আনীসুস সারী ১০/৩৪৩; ৬. ইবনু কানি ৩/১৯৯-আনীসুস সারী ১০/৩৪৩)

এ থেকে প্রতীয়মান হয়, ছিমাক ইবনে হারবের বর্ণনায় এ অংশটি ছিল না। সুতরাং সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর বিশুদ্ধ বর্ণনায় তা কীভাবে থাকতে পারে?

দ্বিতীয় কথা এই যে, ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তানের রেওয়ায়েত মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার বসরী-এর সূত্রে ‘‘মুখতাসারুল আহকাম’’ তূসীতেও (২/৯৭, হাদীস : ২৩৪) রয়েছে। কিন্তু ঐ কিতাবে ‘আলা সাদরিহী’ নেই।

সনসদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
أخبرنا بندار محمد بن بشار، قال : ثنا يحي وهو ابن سعيد عن سفيان، عن سماك، عن قبيصة بن الهلب عن أبيه قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم ينصرف عن شقيه عن يمينه وعن يساره ويضع اليمنى على اليسرى.

তৃতীয় কথা এই যে, মুসনাদে আহমদেও বর্ণনাটি যেভাবে আছে, তা গভীরভাবে পাঠ করলে আল্লামা নীমভী রাহ. যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন তা বেশ শক্তিশালী মনে হয়। তা এই যে, মুসনাদে আহমদের বর্ণনাতেও على صدره বুকের উপর কথাটা ছিল না। এটা লিপিকারের ভ্রান্তিপ্রসূত। মূল রেওয়ায়েত সম্ভবত এ রকম -
يضع هذه على هذه

শেষোক্ত هذه লিপিকরের ভ্রান্তির কারণে صدره তে পরিণত হয়ে থাকতে পারে। প্রাচীন হস্তলিখিত পান্ডুলিপিতে এ ধরনের ভ্রান্তি বিরল নয়। এসব ভ্রান্তি চিহ্নিত করার নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে হাদীসশাস্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এবং মুহাদ্দিসগণ সফলভাবে তা প্রয়োগও করেছেন।

রেওয়ায়েতের বিশুদ্ধ পাঠ যদি সেটিই হয়, যা আল্লামা নীমাভী রাহ. বলেছেন তাহলে এর অর্থ হবে-‘তিনি এই হাত এই হাতের উপর রাখলেন।’ হাদীসটি বর্ণনা করার পর রাবী ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ রাহ. ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখে দেখালেন।’’
রেওয়ায়েতের শেষ বাক্যটিও এই সম্ভাবনাকে সমর্থন করে।

মোটকথা, এ রেওয়ায়েতেও على صدره বুকের উপর কথাটা ‘শায’ বা মুসাহহাফ, যা পরিত্যক্ত।

এই দুটি রেওয়ায়েত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের আগে আরো যে বিষয়গুলো চিন্তা করা উচিত তা এই যে, ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস ও হুলব আতত্বয়ী রা.-এর হাদীস, উভয় হাদীসেরই রাবী ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রাহ.। এই দুই হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره থাকলে অবশ্যই তিনি বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ মনে করতেন এবং বুকের উপর হাত বাঁধতেন। কিন্তু তিনি হাত বাঁধতেন নাভীর নিচে, বুকের উপর নয়। দেখুন : আলমুগনী ইবনে কুদামা ২/১৪১; আলমাজমূ শরহুল মুহাযযাব ৪/৩৩০

দুই. মুসনাদে আহমদের সহীহ রেওয়ায়েতে ‘‘আলা সাদরিহী’’ থাকলে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ. কেন বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ বলেননি? তেমনি ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, ইবনে হাযম ও দাউদ জাহেরী রাহ. থেকেও কেন বুকের উপর হাত বাঁধার নিয়ম পাওয়া যায় না?

তিন. দু’ দুটি স্পষ্ট হাদীস বিদ্যমান থাকলে মুসলিম জাহানের কোনো মুজতাহিদ ইমাম বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ বলবেন না তা কীভাবে সম্ভব? তবে কি বলতে হবে আল্লাহর রাসূলের হাদীস ত্যাগ করার বিষয়ে হাদীস ও ফিকহের সকল ইমাম একমত হয়ে গেছেন? (নাউযুবিল্লাহ)

৩. সূরায়ে কাউসারের তাফসীরে হযরত আলী রা. থেকে একটি বর্ণনা
হযরত আলী রা. থেকে সূরায়ে কাওছারের দ্বিতীয় আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করা হয় যে, তিনি বলেছেন, ‘ডান হাত বাম হাতের মাঝে রাখা, অতপর তা রাখা বুকের উপর।’
সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
حماد بن سلمة : ثنا عاصم الجحدري، عن أبيه، عن عقبة بن صهبان قال : إن عليا رضي الله عنه قال في هذه الآية : فصل لربك وانحر، قال : وضع يده اليمنى على وسط يده اليسرى، ثم وضعهما على صدره.
-সুনানে বায়হাকী ২/৩০; আসলু ছিফাতিস সালাহ, আলবানী পৃ. ২১৭
এই রেওয়ায়েত সহীহ নয়। আল্লামা ইবনুত তুরকুমানী রাহ. (৭৪৫ হি.) বলেছেন, ‘এই রেওয়ায়েতের সনদ ও মতনে ইযতিরাব রয়েছে।’
وفي سنده ومتنه اضطراب
-আলজাওহারুন নাকী, সুনানে বায়হাকীর সাথে মুদ্রিত ২/৩০

শায়খ আলবানীও এর সনদের ইযতিরাব স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ রেওয়ায়েতের সনদের ইযতিরাব স্বীকৃত। সুতরাং এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন নেই। …’
وأما الاضطراب في السند : فهو مسلم، فلا حاجة لإطالة الكلام ببيانه …
-আসলু ছিফাতিস সালাহ, পৃ. ২২১

মতনের (বক্তব্যের) ক্ষেত্রেও ইযতিরাব স্বীকার করতে হবে কিংবা বলতে হবে, এই রেওয়ায়েতেও على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা শায্ ও বিচ্ছিন্ন এবং এ হাদীসের যে বর্ণনা على صدره ছাড়া সেটিই অগ্রগণ্য। কারণ এ হাদীসের কেন্দ্রীয় বর্ণনাকারী আসিম আলজাহদারী রাহ.। তার থেকে বর্ণনা করেন হাম্মাদ ইবনে সালামা ও ইয়াযীদ ইবনে আবী যিয়াদ। হাম্মাদ ইবনে সালামার বর্ণনায় ‘ইখতিলাফ’ ও ভিন্নতা পাওয়া যায়। হাম্মাদ ইবনে সালামা থেকে মিহরান, আবু সালেহ খুরাসানী ও শাইবানের বর্ণনা এবং মুসা ইবনে ইসমাইলের এক বর্ণনায় على صدره আছে। মুসা ইবনে ইসমাইলের দ্বিতীয় বর্ণনায় এবং আবদুর রহমান-এর বর্ণনায় على صدره নেই। তাদের রেওয়ায়েতের আরবী পাঠ এই-
قال ابن جرير الطبري : حدثنا ابن حميد، قال : ثنا مهران، عن حماد بن سلمة، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن ظهير، عن أبيه، عن علي رضي الله عنه فصل لربك وانحر قال : وضع يده اليمنى على وسط ساعده اليسرى، ثم وضعهما على صدره.
وقال الطبري : حدثنا ابن حميد، قال : ثنا أبو صالح الخراساني، قال : ثنا حماد، عن عاصم الجحدري، عن أبيه، عن عقبة بن ظبيان، أن علي بن أبي طالب رضي الله عنه قال في قول الله تعالى : فصل لربك وانحر، قال : وضع يده اليمنى على وسط ساعده الأيسر، ثم وضعهما على صدره.
وقال البيهقي في السنن : أخبرنا أبو بكر أحمد بن محمد بن الحارث الفقيه أنبأ أبو محمد بن حيان أبو الشيخ، ثنا أبو الحريش الكلابي، ثنا شيبان ثنا حماد بن سلمة ثنا عاصم الجحدري عن أبيه عن عقبة بن صهبان كذا قال أن عليا رضي الله عنه قال في هذه الآية فصل لربك وانحر قال : وضع يده اليمنى على وسط يده اليسرى، ثم وضعهما على صدره.
وقال البخاري في التاريخ الكبير : قال موسى : حدثنا حماد بن سلمة : سمع عاصما الجهدري عن أبيه عن عقبة بن ظبيان عن علي رضي الله عنه : فصل لربك وانحر. وضع يده اليمنى على وسط ساعده على صدره. (2911)
وقال الطبري : حدثنا ابن بشار، قال : ثنا عبد الرحمن، قال : ثنا حماد بن سلمة، عن عاصم ابن ظبيان،عن أبيه، عن علي رضي الله عنه فصل لربك وانحر قال : وضع اليد على اليد في الصلاة.
وقال الحاكم في المستدرك في تفسير سورة الكوثر: … منهما ما حدثناه علي بن حمشاذ العدل، ثنا هشام بن علي ومحمد بن أيوب قالا : ثنا موسى بن إسماعيل، ثنا حماد بن سلمة، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن صهبان، عن علي رضي الله عنه فصل لربك وانحر، قال : هو وضع يمينك على شمالك في الصلاة.
-তাফসীরে তবারী (সূরাতুর কাউছার) ১২/৭২১-৭২২; আততারীখুল কাবীর, বুখারী ৬/৪৩৭; মুসতাদরাকে হাকিম ৩/৩৩৯; সুনানে বায়হাকী ২/৩০

পক্ষান্তরে ইয়াযীদ ইবনে আবী যিয়াদ থেকে ওকী ইবনুল জাররাহ, মুহাম্মাদ ইবনে রবীআ ও হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান প্রমুখ বর্ণনা করেছেন। তাদের কারো বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ নেই। তাদের রেওয়ায়েতের আরবী পাঠ এই-
قال الطبري : حدثنا أبو كريب، قال : حدثنا وكيع، عن يزيد بن أبي زياد، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن ظهير، عن علي رضي الله عنه : فصل لربك وانحر. قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة.
وقال : حدثني عبد الرحمن بن الأسود الطفاوي، قال : ثنا محمد بن ربيعة، قال : ثني يزيد بن أبي زياد بن أبي الجعد، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن ظهير، عن علي رضي الله عنه في قوله تعالى فصل لربك وانحر. قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة.
قال البخاري في التاريخ الكبير : وقال قتيبة، عن حميد بن عبد الرحمن عن يزيد بن أبي الجعد عن عاصم الجحدري عن عقبة من أصحاب علي عن علي رضي الله عنه : وضعها على الكرسوع.
-তাফসীর তবারী (সূরাতুল কাউছার) ১২/৭২১-৭২২; আততারীখুল কাবীর, বুখারী ৬/৪৩৭; সুনানে বায়হাকী ২/২৯

শায়খ আলবানী মতনের (বক্তব্যের) ইযতিরাব অস্বীকার করেছেন এবং على صدره রেওয়ায়েতকে অগ্রগণ্য বলেছেন। তার এই প্রয়াস যথার্থ নয়। কারণ তিনি শুধু হাম্মাদ ইবনে সালামার রেওয়ায়েতের ইখতিলাফ ও ভিন্নতা উল্লেখ করে মুসা ইবনে ইসমাইলের বর্ণনাকে ‘গরীব’ আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে ওকী ইবনুল জাররাহ, মুহাম্মাদ ইবনে রবীআ ও হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণিত ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদের রেওয়ায়েত, যেগুলোতে على صدره নেই, সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। বলাবাহুল্য, এভাবে মূল মতনের ইযতিরাবহীনতা প্রমাণ হয় না। তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কর্ম আপত্তিমুক্ত নয়।

হাম্মাদ ইবনে সালামা রাহ.-এর রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ কথার সমর্থনে আরেকটি রেওয়ায়েত পেশ করা হয়। কিন্তু তা সঠিক নয়। কারণ : এক. ঐ রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ শব্দই নেই। তাতে আছে فوق السرة নাভীর উপর।

দুই. ঐ রেওয়ায়েতের অগ্রগণ্য বর্ণনায় فوق السرة শব্দটিও নেই।
বর্ণনাটি এই-
গযওয়ান ইবনে জারীর আদদাববী রাহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, ‘আলী রা. যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন তার ডান হাত কব্জির উপর রাখতেন। কাপড় গোছানো বা শরীর চুলকানোর প্রয়োজন না হলে রুকু পর্যন্ত এভাবেই থাকতেন।’ সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
حدثنا وكيع قال : حدثنا عبد السلام بن شداد الجريري أبو طالوت، عن غزوان بن جرير الضبي، عن أبيه قال : كان علي إذا قام في الصلاة وضع يمينه على رسغه، فلا يزال كذلك حتى يركع متى ما يركع، إلا أن يصلح ثوبه أو يحك جسده.
-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৩/৩২২, হাদীস : ৩৯৬১

ইমাম বায়হাকী রাহ.ও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তার সনদে এই হাদীসের রাবী জারীর আদাদাববী রাহ. সম্পর্কে আছে যে, ‘তিনি ছিলেন হযরত আলী রা.-এর সার্বক্ষণিক সহচর।’
বায়হাকী আরো বলেন, ‘এই হাদীসের সনদ হাসান।’

বায়হাকীর বর্ণনার সনদসহ আরবী পাঠ এই-
… ثنا مسلم بن إبراهيم ثنا عبد السلام بن أبي حازم ثنا غزوان بن جرير عن أبيه أنه ـ وكان شديد اللزوم لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه ـ قال : كان علي إذا قام إلى الصلاة فكبر ضرب بيده اليمنى على رسغه الأيسر، فلا يزال كذلك حتى يركع، إلا أن يحك جلدا أو يصلح ثوبه، … هذا إسناد حسن.
-সুনানে কুবরা ২/২৯

ইমাম বুখারী রাহ. এই আছরটি সহীহ বুখারীতে এনেছেন। তবে সনদ উল্লেখ করেননি। তার বর্ণনার আরবী পাঠ এই-
ووضع علي رضي الله عنه كفه على رصغه الأيسر إلا أن يحك جلدا أو يصلح ثوبا. (كتاب العمل في الصلاة. باب استعانة اليد في الصلاة إذا كان من أمر الصلاة)

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. সনদসহ মূল পাঠ উদ্ধৃত করেছেন। তার আলোচনার আরবী পাঠ এই-
وكذلك رواه مسلم بن إبراهيم أحد مشائخ البخارى عن عبد السلام بن أبي حازم عن غزوان بن جرير الضبي عن أبيه ـ وكان شديد اللزوم لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه ـ قال : كان علي إذا قام إلى الصلاة فكبر ضرب بيده اليمنى على رصغه الأيسر، فلا يزال كذلك حتى يركع، إلا أن يحك جلدا أو يصلح ثوبا، هكذا رويناه في السفينة الجرائدية من طريق السلفي بسنده إلى مسلم بن إبراهيم.
-ফাতহুল বারী ৩/৮৭

এই বর্ণনাগুলোতে হযরত আলী রা.-এর নামাযে হাত বাঁধার বিবরণ আছে। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় :

এক. এই বিবরণ বর্ণনা করেছেন জারীর আদদাববী রাহ., যিনি ছিলেন হযরত আলী রা.-এর সার্বক্ষণিক সহচর।
উপরের নির্ভরযোগ্য একাধিক বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, এই বিবরণে ডান হাত (ডান হাতের পাতা) বাম হাতের কব্জির উপর রাখার কথা আছে। কিন্তু فوق السرة নাভীর উপরে রাখার কথা নেই।

দুই. ইমাম বুখারী রাহ. সহীহ বুখারীতে এই বর্ণনাটিই (تعليقا) উল্লেখ করেছেন। সহীহ বুখারীতে উল্লেখিত রেওয়ায়েতে فوق السرة (নাভীর উপর) শব্দ নেই।

তিন. ইমাম বায়হাকী রাহ. এই রেওয়ায়েতের, অর্থাৎ فوق السرة বিহীন রেওয়ায়েতের সনদকেই হাসান বলেছেন।

চার. এই রেওয়ায়েতের পরবর্তী বর্ণনাকারী আবদুস সালাম ইবনে আবী হাযিম থেকে একাধিক রাবী এই বিবরণ বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ ও মুসলিম ইবনে ইবরাহীম (যিনি ইমাম বুখারীর উস্তাদ)-এর বর্ণনায় فوق السرة ‘নাভীর উপর’ নেই। এটা শুধু পাওয়া যায় আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনায়, যিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ছিলেন না।

শুজা ইবনুল ওয়ালীদের রেওয়ায়েত সনদসহ তুলে দেওয়া হল-
حدثنا محمد بن قدامة بن أعين، عن أبي بدر، عن أبي طالوت عبد السلام، عن ابن جرير الضبي، عن أبيه قال : رأيت عليا رضي الله عنه يمسك شماله بيمينه فوق السرة،
قال المزي : هذا الحديث في رواية أبي الحسن بن العبد، وأبي سعيد بن الأعرابي وغير واحد، عن أبي داود، ولم يذكره أبو القاسم.
-সুনানে আবু দাউদ ১/৪৯৫, হাদীস : ৭৫৭; তাহকীক শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা, টীকা
তুহফাতুল আশরাফ ৭/৩৪৯, হাদীস : ১০০৩০

আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদ রাহ. ছিলেন কুফার অন্যতম আবিদ ও নেককার ব্যক্তি। তবে বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি শক্তিশালী ছিলেন না। ইমাম আবু হাতিম রাযী রাহ. তার সম্পর্কে বলেন-
ولين الحديث، شيخ ليس بالمتين، لا يحتج به، إلا أن عنده عن محمد بن عمرو أحاديث صحاح.
অর্থাৎ তিনি শক্তিশালী রাবী নন, তাঁর দ্বারা দলীল দেওয়া যায় না। তবে মুহাম্মাদ ইবনে আমরের সূত্রে তিনি কিছু সহীহ হাদীস বর্ণনা করেন। -মীযানুল ইতিদাল ২/২৪৪

আলোচিত বর্ণনাটি ঐ সহীহ বর্ণনাগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এটা আবু তালূত আবদুস সালাম থেকে তার বর্ণনা।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-
صدوق ورع له أوهام
অর্থাৎ তিনি সত্যবাদী, নেককার। তবে বর্ণনায় ভুল-ভ্রান্তি আছে।-তাকরীবুত তাহযীব পৃ. ২৯৮

শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. আবু দাউদের সূত্রে এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করেছেন। তবে সনদ উল্লেখ করেছেন আবু বদর-এর পর থেকে! এরপর বলেছেন, বায়হাকী এই সনদটিকে হাসান বলেছেন! … এবং বুখারী আলী রা. থেকে তার (?) এই হাদীস দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের আরবী পাঠ এই-
ويشهد لرواية علي : ما أخرجه أبو داود (1/120) من طريق أبي طالوت عبد السلام عن ابن جرير الضبي عن أبيه قال : رأيت عليا رضي الله عنه يمسك شماله بيمينه على الرسغ فوق السرة، وهذا إسناد قال البيهقي (2/30) : حسن … وقد علق البخاري حديثه هذا مطولا في صحيحه 3/55، بصيغة الجزم عن علي.
-আসলু সিফাতিস সালাহ ১/২১৭-২১৮

অথচ ইমাম বায়হাকী আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনা সম্পর্কে উপরোক্ত মন্তব্য (হাসান) করেননি। করেছেন মুসলিম ইবনে ইবরাহীমের বর্ণনা সম্পর্কে, যে বর্ণনায় فوق السرة নেই।

দ্বিতীয়ত ইমাম বুখারীও সহীহ বুখারীতে শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনা উল্লেখ করেননি। তিনি যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তাতে فوق السرة নেই।
গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য কি না তা পাঠক ভেবে দেখবেন।

৪. সুলায়মান ইবনে মুসা-এর সূত্রে একটি মুরসাল রেওয়ায়েত
তাউস রাহ. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন এবং তা বুকের উপর রাখতেন।
সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
قال الإمام أبو داود : ثنا أبو توبة، ثنا الهيثم ـ يعني : ابن حميد، عن ثور عن سليمان بن موسى عن طاؤو‍س قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يضع اليمنى على يده اليسرى، ثم يشد بينهما على صدره، وهو في الصلاة.
-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৯; মারাসীলে আবু দাউদ, তুহফাতুল আশরাফ, হাদীস : ১৮৮২৯

তাউস রাহ. পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ গ্রহণযোগ্য, যদিও মাঝের তিনজন রাবী সম্পর্কে কিছু আপত্তিও আছে।

এ বর্ণনার রাবী সুলায়মান ইবনে মুসা রাহ. সম্পর্কে ইমামগণ প্রশংসা করেছেন, তবে তার কিছু রেওয়ায়েত ‘মুনকার’ ছিল। এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী রাহ. তার সমালোচনা করেছেন। ইমাম আবু হাতিম রাযী তার বর্ণনায় কিছু ইযতিরাব ও ইমাম ইবনে আদী রাহ. তার ‘তাফাররুদে’র কথা উল্লেখ করেছেন। দেখুন তাহযীবুল কামাল ২৫৫৪
আরবী পাঠ এই-
قال البخاري : عنده مناكير، قال النسائي : أحد الفقهاء وليس بالقوي في الحديث، وقال أبو حاتم : محله الصدق، وفي حديثه بعض الاضطراب، ولا أعلم أحدا من أصحاب مكحول أفقه منه ولا أثبت منه، وقال ابن عدي : وسليمان بن موسى فقيه راوٍ، حدث عنه الثقات من الناس، وهو أحد علماء الشام، وقد روى أحاديث ينفرد بها يرويها، لا يرويها غيره، وهو عندي ثبت صدوق.

এছাড়া এ রেওয়ায়েত দুটি মৌলিক কারণে মা’লুল।
এক. রেওয়ায়েতটি মুরসাল এবং এর সমর্থনে অন্য সনদে বর্ণিত কোনো মারফূ হাদীস বা আছর পাওয়া যায় না। ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল এর বর্ণনা এবং হুলব রা. এর হাদীসের মুসনাদে আহমদের বর্ণনাকে এর সমর্থনে পেশ করা হয়, কিন্তু ইতিপূর্বে দেখানো হয়েছে যে, এ দুটো বর্ণনা শায ও মুনকার। আর শায, মুনকার রেওয়ায়েত শাহিদ (সমর্থক বর্ণনা) হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই. মুসলিম জাহানের কোনো প্রসিদ্ধ ফকীহ ও মুজতাহিদ ইমাম বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ বলেছেন এমনটা পাওয়া যায় না। এমনকি শাম অঞ্চলের বিখ্যাত ফকীহদের থেকেও পাওয়া যায় না। অথচ উপরোক্ত মুরসাল রেওয়ায়েতের সবকজন রাবী শাম ও শামের নিকটবর্তী অঞ্চলের এবং অধিকাংশ রাবীরই ফকীহ-পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু না শামের ফকীহগণ বুকের উপর হাত বাঁধার ফতোয়া দিয়েছেন, না শামের সাধারণ আলিমগণ এই নিয়মের সাথে পরিচিত ছিলেন। এটি এ রেওয়ায়েতের একটি ‘ইল্লত’ (ত্রুটি), যাকে পরিভাষায় ইল্লতে মান’বিয়্যাহ বা শুযূযে মানবী বলে।

উল্লেখ্য, ইমাম শাফেয়ী রাহ. সম্পর্কে কোনো কোনো কিতাবে বলা হয়েছে যে, তাঁর মাযহাব, বুকের উপা হাত বাঁধা। এই বর্ণনা সঠিক নয়। ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর মাযহাব হচ্ছে বুকের নীচে (নাভীর উপর) হাত বাঁধা।

ইমাম নববী রাহ. বলেন-
ويجعلهما تحت صدره وفوق سرته، هذا هو الصحيح المنصوص، وفيه وجه مشهور لأبي إسحاق المروزي أنه يجعلهما تحت سرته، والمذهب الأول.
-আলমাজমু শরহুল মুহাযযাব ৩/২৬৮। আরো দেখুন : আলমিনহাজ ‘আননাজমুল ওয়াহহাজ-এর সাথে মুদ্রিত’ ২/১৮০; আলমাজমূ ৩/২৬৯

সারকথা
রেওয়ায়েতসমূহের পর্যালোচনা থেকে যা পাওয়া গেল তা এই-

১. ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره নেই। কারণ সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে দু’জন শক্তিশালী রাবী আবদুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ ও মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ এবং সুফিয়ান ছাওরীর উস্তাদ আসিম ইবনে কুলাইব থেকে অন্তত ১১জন ইমাম ও ছিকা রাবী এই হাদীসের হাত বাঁধার বিবরণ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কারো বর্ণনায় على صدره নেই। একমাত্র মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈলের বর্ণনায় এটা পাওয়া যায়, যার বর্ণনার ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে জারহ-তাদীলের ইমামগণ বিশেষভাবে সাবধান করেছেন। এ কারণে হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী তাঁর বর্ণনার অতিরিক্ত অংশটি ‘মুনকার’ ও অগ্রহণযোগ্য।

২. হুলব রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনাতেও على صدره নেই। শুধু মুসনাদে আহমদে ও যেসব কিতাবে মুসনাদে আহমদের সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে সেইগুলোতেই হাদীসটি
على صدره সহ পাওয়া যায়।
এই হাদীসের অন্যান্য বর্ণনার সাথে তুলনা করলে এমনকি মুসনাদে আহমদের বর্ণনাটিও গভীরভাবে পাঠ করলে প্রতীয়মান হয় এই হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره নেই।

৩. সূরা কাউসারের তাফসীরে হযরত আলী রা. থেকে যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয় তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। সনদ-মতন দুদিক থেকেই তা ‘মুযতারিব’। এই হাদীসের على صدره ওয়ালা রেওয়ায়েতটিকে কোনোভাবেই অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা যায় না।
শায়খ আলবানী সনদের ইযতিরাব স্বীকার করেছেন, কিন্তু মতনের ইযতিবাব খন্ডন করতে গিয়ে এমন কিছু কাজ করেছেন, যা দুঃখজনক।

৪. সুলায়মান ইবনে মুসার সূত্রে বর্ণিত যে মুরসাল রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করা হয়, তাউস রাহ. পর্যন্ত এর সনদ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হলেও তা অন্তত দুটো কারণে ‘মা’লূল’। সুতরাং তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১,১৪৩ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)

২৪ টি মন্তব্য

  1. এভাবেই স্বঘোষিত আহলে(বাস্তবিক আহলে নফস)রা জঈফ হাদীসের উপর আ’মাল করে অথচ মুখে সহীহ হাদীসের খই ফুটে।

    ম্যালকম এক্স

    @Anonymous, সহমত।

  2. দেখুন আলবানী কিভাবে ভুল করেছেন–

    শায়খ আলবানী মতনের (বক্তব্যের) ইযতিরাব অস্বীকার করেছেন এবং على صدره রেওয়ায়েতকে অগ্রগণ্য বলেছেন। তার এই প্রয়াস যথার্থ নয়। কারণ তিনি শুধু হাম্মাদ ইবনে সালামার রেওয়ায়েতের ইখতিলাফ ও ভিন্নতা উল্লেখ করে মুসা ইবনে ইসমাইলের বর্ণনাকে ‘গরীব’ আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে ওকী ইবনুল জাররাহ, মুহাম্মাদ ইবনে রবীআ ও হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণিত ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদের রেওয়ায়েত, যেগুলোতে على صدره নেই, সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। বলাবাহুল্য, এভাবে মূল মতনের ইযতিরাবহীনতা প্রমাণ হয় না। তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কর্ম আপত্তিমুক্ত নয়।

    এভাবেই উনি অসংখ্য স হীহ রেওয়ায়েত এড়িয়ে গেছেন। একটু নিরপেক্ষ দৃষ্টিভংগী নিয়ে বেবচনা অনুরোধ জানাচ্ছি।

  3. আরও দেখুন,
    শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. আবু দাউদের সূত্রে এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করেছেন। তবে সনদ উল্লেখ করেছেন আবু বদর-এর পর থেকে! এরপর বলেছেন, বায়হাকী এই সনদটিকে হাসান বলেছেন! … এবং বুখারী আলী রা. থেকে তার (?) এই হাদীস দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের আরবী পাঠ এই-
    ويشهد لرواية علي : ما أخرجه أبو داود (1/120) من طريق أبي طالوت عبد السلام عن ابن جرير الضبي عن أبيه قال : رأيت عليا رضي الله عنه يمسك شماله بيمينه على الرسغ فوق السرة، وهذا إسناد قال البيهقي (2/30) : حسن … وقد علق البخاري حديثه هذا مطولا في صحيحه 3/55، بصيغة الجزم عن علي.
    -আসলু সিফাতিস সালাহ ১/২১৭-২১৮

    অথচ ইমাম বায়হাকী আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনা সম্পর্কে উপরোক্ত মন্তব্য (হাসান) করেননি। করেছেন মুসলিম ইবনে ইবরাহীমের বর্ণনা সম্পর্কে, যে বর্ণনায় فوق السرة নেই।

    দ্বিতীয়ত ইমাম বুখারীও সহীহ বুখারীতে শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনা উল্লেখ করেননি। তিনি যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তাতে فوق السرة নেই।
    গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য কি না তা পাঠক ভেবে দেখবেন।

  4. আলবানী সাহেবে আরও ভুল।

    ৩. সূরা কাউসারের তাফসীরে হযরত আলী রা. থেকে যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয় তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। সনদ-মতন দুদিক থেকেই তা ‘মুযতারিব’। এই হাদীসের على صدره ওয়ালা রেওয়ায়েতটিকে কোনোভাবেই অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা যায় না।
    শায়খ আলবানী সনদের ইযতিরাব স্বীকার করেছেন, কিন্তু মতনের ইযতিবাব খন্ডন করতে গিয়ে এমন কিছু কাজ করেছেন, যা দুঃখজনক

  5. আলবানী সাহেবের গবেষণা গুলো এভাবেই ভুলে ভরা। এরপরও আমাদের কিছু ভাই উনাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকেন।

    দেখুন এই প্রবন্ধের লেখক মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ প্রামান্য দলীলের ভিত্তিতে উনার ভুল গুলোকে খন্ডন করেছেন, কিন্তু উনার প্রতি কোন খুবই সম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করেছেন। অথচ আমাদের স্বঘোষিত আহলে হাদিস ভাইয়েরা আমাদের দলীল খন্ডন না করতে পেরে গালাগালি করেন। সম্মনিত ইমাম সাহেবেদের নামে মিথ্যা অপবাদ চাপান। আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়া’লা সহীহ বুঝ দান করুন। আমীন।

    ABU TASNEEM

    @Anonymous, আপনি আমাকে বলেছিলেন আমি কপি পেস্ট কারী । এখন দেখতেছি আপনি নিজেই কপি পেষ্টকারী । আপনি যাদের অন্ধ অনুসরণ করেন তাদের লেখাগুলো কপি পেষ্ট করেন ঠিক এই ভাবে । আপনি হয়তো রেফারেন্সের কিতাবগুলো চোখেও দেখেননি । আর আমাকে আল-হামদুলিল্লাহ অসংখ্য কিতাব পড়ার (মাদ্রাসায় পড়ারও) তৌফিক দান করেছেন । তৌফিক দান করেছেন সত্যকে চেনারও । আলহামদু লিল্লাহ ।

    Anonymous

    @ABU TASNEEM,আমি কপি পেস্ট করাকে খারাপ বলিনি। সহীহ জিনিস কপি পেস্ট করাই উচিত। আল্লহর রসুল সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিজের জিন্দগীতে কপি পেস্ট না করাই বরং অন্যায়। আমি বলেছি আপনি কপি পেস্ট করেছেন অথচ স্বীকার করেন নি। বলেছেন আপনি নিজে ঘেটে বের করেছেন। কিন্তু আপনি সময়মত হাজির করতে পারেন নি।

    আপনি অসংখ্য কিতাব পড়েছেন এবং মাদ্রাসায় পড়েছেন এটা বিশ্বাস করা কষ্ট। আপনার কমেন্ট গুলো পড়লেই বুঝা যায় আপনি উপরে পোস্টটি পড়েও দেখেন নি কোন ক্রমে চোখ বুলিয়ে গেছেন। আপনাদের মন মত না হলে আপনারা পড়েও দেখেন না। আমার এক কলিগ ছহিল আহলে নফসের অনুসারী (আহলে হাদীসের মিথ্যাদাবী করতেন)। শাইখ ইলিয়াস ফয়সালের কিতাবটা পড়তে দিয়েছিলাম। উনি ছুঁয়েও দেখেন নি।

    আপনাদের মত স্বঘোষিত আহলে (মুনকিরে) হাদীসের লোকরা এমন অহরহই বলে থাকেন। আপনাদের মুখস্থ করা কিছু কথা আছে যেমন হানাফী পরিবারের ছেলে, মাদ্রাসায় পড়েছি, তবলীগে গিয়েছি, সহীহ হাদিস ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনি যে সকল রেফারেন্স দেন এগুলো সব আহলে মুনকিরে হাদীস লোকেরাই দিয়ে থাকেন। এবং বার বার দিয়ে থাকেন। কেউ দলীল খন্ডন করলে আবারও একই কথা বলেন। গোয়েবলসের মত।

    ABU TASNEEM

    @Anonym , আপনি কি বিশ্বাস করলেন কি করলেন না তাতে আমার কিছু আসে যায় না । আমি সত্য কথা বললাম না মিথ্যা বললাম সেটা বিচার করার দ্বায়ীত্ব আল্লাহর আপনার নয় । কিন্তু আজকাল এটাও আপনারাই করছেন । আপনারা আল্লাহর মত অন্তর্যামী হয়ে গেছেন ।

    আর এই যে কথায় কথায় আলবানী কে গালাগালী করছেন । এটা কি ঠিক হচ্ছে । আপনারাই বলছেন , আপনাদের কিতাব অপরিচিত , আপনাদের কিতাবে জাল যঈফ হাদীসের পরিমাণ বেশী , কুতুস সিত্তায় কিছু জাল যঈফ হাদীস থাকলেও পরিমাণ কম । আর আপনাদের এই জাল যঈফ হাদীসে প্রায় ভর্তি কিতাবে বর্ণিত হাদীস নিয়ে এসে বুখারীর হাদীসকে যঈফ আমলের অযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে পরে লেগেছেন । বুখারীতে যঈফ হাদীস আছে এটা কোন মুহাদ্দীস এমনকি আলবানীও বলেননি । শুনুন আপনাদের হানাফি আলেম ড: আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর এর লেখা একটি বই হাদীসের নামে জালিয়াতি । বইটি পড়ে দেখুন তিনি আপনাদের অপরিচিত হাদীসগ্রন্থগুলি সম্পর্কে কি বলেছেন । সেখানে আরেক হানাফি আলেম আব্দুল হক্ক মুহাদ্দীস দেহলভীর মতামত তুলে ধরেছেন । তার মতামত গুলিও পরে দেখুন । আশা করি সত্য বুঝতে পারবেন ।

    ABU TASNEEM

    দুখিঃত একটি নাম ভুল হয়েছে , আব্দুল হক্ক নয় উনার নাম ওয়লিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী ।

    Anonymous

    @ABU TASNEEM, আপনি তাহলে ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহ’মাতুল্লহ আ’লাইহি কে হানাফী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন? অনেক আহলে (মুনকিরে) হাদিস ভাই কিন্তু উনাকে আহলে হাদিস বলেন। এবং বলে থাকেন উনি এদেশে প্রথম আহলে হাদিসের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এবং উনি যে সমালোচনাগুলো করেছেন তা পুঁজি করে আমাদের সমলোচনা করে থাকেন। আসলে কেউ ভুল হলে তা সংশোধন করে দেয়াটাই যোগ্য উস্তাদের বৈশিষ্ট্য।

    এবং একথাও সত্য উনিই এদেশে প্রথম আহলে হাদিসের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এখানে আহলে হাদিস বলতে আপনাদের বুঝাচ্ছি না। আপনারা আহলে মুনকারে হাদিস এবং আহলে নফস। আমি আহলে হাদিস বলতে ইমাম বুখারী, ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানিফা প্রমুখ রহি’মাহুমুল্লহ উনাদের বুঝাচ্ছি। যেমন আহলে বাইত বা ঘরওয়ালা কারা, যারা ঘরের খুঁটিনাটি সব কিছু জানে যেমন ঘরে কয়টি রুম আছে, কোন রুমে কি কি আছে, রুমের কোথায় আছে, কিভাবে আছে, কি ওরিয়েন্টেশনে আছে ইত্যাদি সমস্ত বিষয় জানে। একই ভাবে আহলে হাদীস বা হাদীস ওয়ালা কারা? যারা হাদীসের সব কিছু জানেন। কি কি হাদীস আছে, কোন হাদীসের কোন সনদ, কোন কোন রাবী বর্ণনা করেছেন, কোন রাবী কেমন, কোথায় বাড়ি, কবে ইন্তেকাল করেছেন, তার সম্পর্কে অন্য রা কে কি বলছেন, এই হাদীস থেকে কি কি দলীল দেয়া যাবে, এর বিপরীতে অন্য কি কি হাদিস আছে, ঐসব হাদিসের প্রকৃতি কেমন ইত্যাদি পুংখানুপুংখ ভাবে এবং ব্যপক ভাবে যিনি জানেন তিনিই আহলে হাদিস। এই প্রেক্ষিতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহ’মাতুল্লহ আ’লাইহি আহলে হাদিস ছিলেন এবং অসংখ্য আহলে হাদিস তৈরী করে গেছেন।

    এর বিপরীতে আপনারা হলেন স্রেফ কল্পনা বিলাশী এবং আত্মপ্রব্ন্ঞক।

    Anonymous

    @ABU TASNEEM,দুঃখিত ভাই, আপনি ভুল বুঝছেন। আমি অন্তরযামী হবার চেষ্টা করিনি। আমি বলেছি এটা আপনদের common nature। আপনারা এভাবেই বলে থাকেন। বিভিন্ন ব্লগে আপনাদের মানসিকতার লোকদের দেয়া দলীলগুলো কাছাকাছি। একই দলীল, একই ব্যাখ্যা। এবং আপনাদের দেয়া যে কোন দলীলের খন্ডনের বিপরীতে হয় পুরাতন কথা গুলোই আবার বলেন বা চুপ থাকেন বা প্রসংগ ঘুরিয়ে দেন অথবা নতুন আরেকটি বিতর্ক উত্থাপন করেন। একই ভাবে কিছু কমন কথাবার্তা শুনা যায় আপনাদের কাছে। যেমন সহীহ হাদিস, আলবানী এযুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মাদরাসায় পড়া, তাবলীগে যাওয়া, অনেক অনেক কিতাব পড়া। আপনি একটু খেয়াল করলে আপনি জিনিসটা লক্ষ করবেন।

    আলবানীকে গালাগালি করা হচ্ছে না। উনার ভুল গুলোকে ভুল বলা হচ্ছে। এবং উনার সঠিকগুলোকে সঠিক বলা হয়েছে। খেয়াল করে দেখুন, বেশ কিছু যায়গায় উনার কিতাব থেকে রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। কিন্তু উনার ভুলের পরিমাণ অনেক বেশী এজন্য সাধারণ মানুষের পক্ষ উনার কিতাব থেকে দেখে আ’মাল করা ঈমান ও আ’মালের জন্য বেশ risky। বাস্তবিক যারা আহলে হাদীস তাদের তো আলবানীর উপর নির্ভর করার দরকার নেই। কেননা তারা তো সরাসরি হাদিস মানবেন কারও via হবার তো দরকার নেই। আপনি তো সকল (সকল শব্দটা খেয়াল করুন, শুধু কয়েকটি নিলে আপনি আহলে হাদিস হতে পারবেন না) হাদিসের সংকলণ সংগ্রহ করবেন। সকল রাবীর সকল ইতিহাস সংগ্রহ করবেন। এরপর গবেষণা করবেন। এরপর সহীহ হাদিস সংগ্রহ করবেন। এরপর আ’মাল করবেন। আহলে হাদিসের দাবী তো এটাই, নাকি? যদি কোন সহীহ হাদিস পাও তাহলে তার উপর আ’মাল কর। হাদিস সংগ্রহ করে গবেষণা না করলে সহীহ হাদিস পাবেন কোথায়। আলবানীর উপর নির্ভরশীলতা আর মাযহাবের উপর নির্ভরশীলতা কোন পার্থক্য?

    কিতাবগুলো আপনার কাছে অপরিচিত। কেননা আলবানীর কিছু কিতাব, মতিউরে কিছু ভিডিও আর অতি পরিচিত কিছু হাদীসের বাংলা অনুবাদ ছাড়া আপনারা খুব কম কিতাবই পড়ে থাকেন। এবং উলামা কেরামের কাছে আপনারা যান না। কিভাবে কিতাবের সাথে পরিচিত হবেন? মতিউর শুরুতেই আপনাদের মধ্যে ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে এদেশের উলামা কেরাম ওহাদাতুল ওজুদ বিশ্বাস করে তাই তাদের কাছে যাওয়া যাবে না। অথচ ওহাদাতুল ওজুদ এর ব্যাখ্যা ইতিমধ্যেই পেয়েছেন। আর অপরিচিত হলেই তা অগ্রহণ যোগ্য হয় না।

    আর অপরিচিত হলেই তা অগ্রহণযোগ্য হয় না। আলবানী এবং উনার কিতাব সমুহ একসময় এদেশে অপরিচিতই ছিল। “আপনাদের কিতাব অপরিচিত , আপনাদের কিতাবে জাল যঈফ হাদীসের পরিমাণ বেশী” এটা কোন যুক্তির কথা হল না। আর কোন দলীল জঈফ হাদীস থেকে দেয়াও হয় নি। মুল পোস্টের বিশ্লেষণগুলো দেখুন। এভাবেই চুলচেরা বিশ্লেষণের পরেই কোন একটা হাদীস কে গ্রহণ করা হয়েছে। তাই কোন কিতাবে জঈফ হাদিস থাকলেই ঐ কিতাব থেকে রেফারেন্স দেয়া যাবে না বরং বুখারী শরীফ থেকেই দিতে এটা ভুল সিন্ধান্ত। আসল কথা হল সহীহ হাদিস যেখানে আছে ওখান থেকেই আমরা সংগ্রহ করব। এটাই সালাফের দাবী। “এই জাল যঈফ হাদীসে প্রায় ভর্তি কিতাবে” প্রায় কথাটি খেয়াল করুন। এভাবে বিনা প্রমাণে প্রায় সব হাদীসকে জাল বা জঈফ বলা, এটা মুহাদ্দিসদের উপর মিথ্যা অপবাদ। “বুখারীতে যঈফ হাদীস আছে এটা কোন মুহাদ্দীস এমনকি আলবানীও বলেননি” এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা

    জনাব আলবানী সাহেব (ওনার কথা বললাম কারন আপনারা ওনাকে খুব মানেন) বুখারী-মুসলিমের অসংখ্য হাদীসকে জয়ীফ বলেছেন। প্রমাণ দেখুন………..

    1. Hadith: The Prophet (Sall Allahu alaihi wa Aalihi wa Sallim) said: “Allah says I will be an opponent to 3 persons on the day of resurrection: (a) One who makes a covenant in my Name but he proves treacherous, (b) One who sells a free person (as a slave) and eats the price (c) And one who employs a laborer and gets the full work done by him, but doesn’t pay him his wages.” [Bukhari no 2114-Arabic version, or see the English version 3/430 pg 236].

    Al-Albani said that this Hadith was DAEEF in “Daeef al-Jami wa Ziyadatuh, 4/111 no. 4054″.

    Little does he know that this Hadith has been narrated by Ahmad and Bukhari from Abu Hurayra (Allah be pleased with him)!!

    2. Hadith: “Sacrifice only a grown up cow unless it is difficult for you, in which case sacrifice a ram.”
    [Muslim no. 1963-Arabic edition, or see the English version 3/4836 pg. 1086].

    Al-Albani said that this Hadith was DAEEF in “Daeef al-Jami wa Ziyadatuh, 6/64 no. 6222.”

    Although this Hadith has been narrated by Imam’s Ahmad, Muslim, Abu Dawood, Nisai and Ibn Majah from Jaabir (Allah be pleased with him)!!

    3. Hadith: “Amongst the worst people in Allah’s sight on the Day of Judgement will be the man who makes love to his wife and she to him, and he divulges her secret.” [Muslim no. 1437- Arabic edition].

    Al-Albani claims that this Hadith is DAEEF in “Daeef al-Jami wa Ziyadatuh, 2/197 no. 2005.”

    Although it has been narrated by Muslim from Abi Sayyed (Allah be pleased with him)!!

    4. Hadith: “If someone woke up at night (for prayers) let him begin his prayers with 2 light rak’ats.”
    [Muslim no. 768].

    Al-Albani stated that this Hadith was DAEEF in “Daeef al-Jami wa Ziyadatuh, 1/213 no. 718.”

    Although it is narrated by Muslim and Ahmad from Abu Hurayra (may Allah be pleased with him)!!

    ড: আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর উনার নাম আমি শুনিনি। উনি হানাফী কিনা তাও জানিনা। অবশ্য তার দরকারও নেই। যদি কেউ কোন ভুল কে সঠিক দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে ভুল বলেন তাহলে তো তিনি স্বাগতম। কিন্তু জানার সীমাবদ্ধতার কারণে যদি কেউ সহীহ জিনিস কে ভুল বলেন তাহলে তা খুবই গর্হিত।

    ABU TASNEEM

    @Anonymous , কোন ভায়া-মাধ্যম মানা যাবে না । এটা আহলে হাদীসদের কথা নয় এটা আপনাদের অপব্যাখ্যা । ভায়া-মাধ্যম ছাড়া ইলম শিখা সম্ভব নয় । তা আপনারাই সব চেয়ে ভাল বুঝেন । মানুষকে হক্ক কথা বুঝতে না দেয়ার জন্য আপনারা এ অযৌক্তিক যুক্তি পেশ করেন । ইমাম বুখারী , মুসলিম , আবু দাউদ (রহঃ) উনারা কি ভায়া মাধ্যম নয় । রিজাল শাস্ত্র যারা লিখেছেন তারা কি ভায়া মাধ্যম নয় । এগুলি অস্বীকার করলে তো সরাসরি নবী (সাঃ) এর কাছে গিয়ে এলেম শিখতে হবে । বরং আহলে হাদীসদের দাবী যৌক্তিক । কোন ভায়া-মাধ্যম ভুলের উর্দ্ধে নয় । আমরা এসমস্ত ভায়া মাধ্যম থেকেই ইলম শিখব কিন্তু তাদের কোন ভুল হলে সে ভুলকে প্রত্যাখ্যান করব । এটাই সুরা নিসার ৫৯ আয়াতের শিক্ষা । যা আপনারা মেনে চলেন না । আপনারা আপনাদের আকাবিরদের কোন ভুলকে ভুল স্বীকার করেন না ।

    আর পড়াশুনার কথা বলছেন । আমি সবধরনের লেখাই পড়ি । বরং আপনারাই আপনাদের বিপরীত মতামত হলে পড়ে দেখেন না । তার প্রমাণ আমার দেয়া পোস্ট । আপনি প্রথমে বললেন কমেন্ট কেন বন্ধ রেখেছি । যেটা আমার অনিচ্ছাকৃত ছিল , পরে ঠিক করে দিয়েছি । তারপরে তো আপনার একটি কমেন্টও দেখলাম না । তাহলে কি ধরে নেব যে আপনার কাছে আমার লেখা দলীল ভিত্তিক মনে হয়েছে । নাকি পড়েনই নি ।

    যাই হোক , আমি যঈফ ও জাল হাদী্স সিরিজের তিনটি খন্ড পড়েছি । তাতে বুখারী মুসলিমের কোন হাদীসকে যঈফ বলেছেন এমন পাইনি । কিম্বা তিনি যেমন সুনানে আরবায়া কে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন (সহীহ আবু দাউদ , যঈফ আবু দাউদ , সহীহ ইবনে মাজাহ , যঈফ ইবনে মাজাহ……….) বুখারী মুসলিমকে এরকম ভাগ করেছেন বলে আ্মার জানা নেই । আমি আপনার উদ্ধৃতি গুলি মনে রাখবো এবং খুঁজে দেখবো ইনশা-আল্লাহ !

    Anonymous

    @ABU TASNEEM, আপনি সত্য বলছেন না। আমরা আবু হানীফা রহ’মাতুলল্ল আ’লাইহি ও তাঁর ছাত্রদের সিলসিলার অন্যান্যদের উপর আস্থা রাখি বলে আপনাদের বহু গালি আমরা শুনেছি। আমরা সবসময়ই ভায়া মানি কেননা এছাড়া উপায় নেই আমরা যেহেতু রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে অনেক দুরে।

    “বরং আহলে হাদীসদের দাবী যৌক্তিক” আহলে হাদিসের পরিচয় আরেকটা কমেন্টে ইতিমধ্যেই দিয়েছি। আপনারা আহলে মুনকারে হাদিস।

    “কোন ভায়া-মাধ্যম ভুলের উর্দ্ধে নয় । আমরা এসমস্ত ভায়া মাধ্যম থেকেই ইলম শিখব কিন্তু তাদের কোন ভুল হলে সে ভুলকে প্রত্যাখ্যান করব ” কিন্তু আপনারা করেন না। অংসখ্য প্রমাণ এই ব্লগে দেয়া হয়েছে। আপনার কাছে অনেক প্রশ্ন করা হয়েছিল কিন্তু আমি কোন উত্তর দেন নি বা আপনি ভুল করেছিলেন এখন ভুল ভাঙল এমন কোন বিবৃতও দেন নি। বরং কখনও কখনও আপনার দেয়া যে হাদীসগুলো খন্ডন করা হয়েছে ওগুলোই আবার পেশ করেছেন। এই পোস্টেও যে দলীল দেয়া হয়েছে আর কোন জবাবও দেন নি আবার স্বীকারও করেন নি।

    “আপনারা আপনাদের আকাবিরদের কোন ভুলকে ভুল স্বীকার করেন না ।” আপনার এদাবীও সত্য নয়। হানাফী মাযহাবের অনেক মাসায়ালাই ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লহ আ’লাইহির মতামতের বিপরীত। একই রকম ভাবে অনেক মাসায়ালা ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহা’ম্মাদ রহিমাহুমাল্লহ এর বিপরীত। এমনি ভাবে অতি নিকটকালের মাওলানা থানভী রহমাতুল্লহ আ’লাইহির মাইকের ব্যব্হার নিয়ে দেয়া মাসায়াল উনি নিজেই পরে সংশোধন করেছেন। আর পাকিস্তানের ব্যপারে উনার ইজতিহাদ ভুল ছিল এটা উনার যে কোন খলিফাই স্বীকার করবেন। এছাড়াও অতি সাম্প্রতিক কালের আহকামে জিন্দেগী ও ফাতওয়া রহমানিয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখতে পাবেন। এভাবেই প্রচুর মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষদের আপনারা ধোঁকা দিয়ে থাকেন।

    “বুখারী মুসলিমকে এরকম ভাগ করেছেন বলে আ্মার জানা নেই” এটা আপনার ব্যর্থতা। আপনি মূল কিতাব পড়েন না। আপনি কোন আংশিক অনুবাদ পড়েছেন।

    আর আপনি যে পোস্ট দিয়েছেন তা আগেও এই ব্লগে ও অন্যান্য আরও ব্লগে দেয়া হয়েছে। এবং তার উত্তরও সেখানে দেয়া আছে। তাই নতুন করে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। কিন্তু আমি যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম তার উত্তর কখনওই পাইনি।

    হাফিজ

    @ABU TASNEEM, আপনি যাকে হানাফী আলেম বলছেন “ড: আব্দুল্লাহ জাহাংগীর” সে মুলত আপনার মতো আহলে হাদিস দলের। যে ঢাকার মীরপুরের এক পীর সাহেবের মেয়ের জামাই।

  6. আপনারা যেভাবে হাত বাঁধেন তাতে তা কোমরের উপর (নাভীর নিচে) যায় । আর কোমরের উপর হাত বেধে সালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে । দেখুন সুনানে নাসাঈ , ২য় খন্ড , পৃ: নং ৩৮-৩৯ , হাদীস নং ৮৯৩-৮৯৪ ।

    Anonymous

    @ABU TASNEEM, এটা বলতে পারলাম না। আমি আলেম নই, আমার কাছে সুনানে নাসাঈ নেই। আপনি কোন soft copy বা online copy দিলে কৃতজ্ঞ হব। যাই হোক, ধরে নিলাম সহীহ হাদীস। কিন্তু ওখানে কোমরের উপর হাত বাঁধতে নিষেধ করা আছে। অথচ আপনি এর অর্থ করলেন আমরা যেভাবে সলাত আদায় করি তা নিষেধ করা আছে? এভাবেই আপনারা এক জিনিসের ব্যাখ্যা আরেকটা করেন।

    এবার দেখুন আমরা আদৌ নাভির নিচে হাত বাঁধি কিনা। দুটি হাদিস দেখুন

    প্রথম হাদীস : সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, ‘লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন তার ডান হাত বাম যিরার উপর রাখে।’
    হাদীসটির আরবী পাঠ এই-
    كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة. قال أبو حازم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم.
    -মুয়াত্তা মালিক পৃ. ৫৫ ; সহীহ বুখারী ১/১০৪

    দ্বিতীয় হাদীস : ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের একটি পাঠ। তাতে আছে, ‘(আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর রাখলেন।’
    রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-
    ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد
    -মুসনাদে আহমদ ৩১/১৬০, হাদীস : ১৮৮৭০; সুনানে আবু দাউদ ১/৪৮৩, হাদীস : ৭২৭
    কোন হাদিসেই ডান যিরার কথা বলা হয়নি। প্রথম হাদিসে ডান হাতকে বাম হাতের যিরার উপর রাখার কথা বলা আছে। দ্বিতীয় হাদীসে আরও স্পষ্ট করে বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার কথা বলা হয়েছে। পরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ২য় হাদীসে যিরা শব্দটা অতিরিক্ত।

    এ ব্যপারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লহ আ’লাইহি বলেন,
    ‘তাকবীর সমাপ্ত হওয়ার পর দুই হাত ছেড়ে দিবে এবং ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর এমনভাবে রাখবে যে, ডান হাত দ্বারা কব্জির গোড়ার হাড় পেঁচিয়ে ধরবে কিংবা ডান হাত কব্জির উপর এমনভাবে বিছিয়ে দিবে যে, হাতের আঙ্গুলিসমূহ যিরার দিকে (ছড়ানো) থাকে। ডান হাত যদি কব্জির ওপরের দিকে (যিরার উপর) কিংবা কব্জির নিচে বাম পাতার উপর রাখে তবে সেটাও জায়েয।’

    এরপর তিনি হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস, যাইদা ইবনে কুদামার বর্ণনা, সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীস ও হুলব রা.-এর হাদীসকে দলীল হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন।
    আলোচনার আরবী পাঠ এই-
    يعني : إذا انقضى التكبير فإنه يرسل يديه ويضع يده اليمنى فوق اليسرى على الكوع، بأن يقبض الكوع باليمنى، أو يبسط اليمنى عليه، ويوجه أصابعه إلى ناحية الذراع، ولو جعل اليمنى فوق الكوع أو تحته على الكف اليسرى، جاز لما روى وائل بن حجر أنه رأى النبي صلى الله عليه وسلم حين دخل في الصلاة، ثم التحف بثوبه ثم وضع يده اليمنى على اليسرى، رواه مسلم، وفي رواية لأحمد وأبي داود : وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد، وعن أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة، قال أبو حازم : ولا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم. رواه أحمد والبخاري.
    وعن قبيصة بن هلب عن أبيه قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه، رواه أحمد وأبو داود وابن ماجه والترمذي وقال : حديث حسن، وعليه العمل عند (أكثر) أهل العلم من أصحاب النبي والتابعين …
    -শরহুল উমদা পৃ. ৬৫-৬৬

    আমরা এভাবেই হাত বাঁধি। এতে সবার জন্য হাত নাভীর নিচে যাবে না। যারা মোটা তাদের নাভির উপরেই থাকব, যারা একটু বেশি পাতলা গড়নের তাদের হাত হয়ত তলপেটে চলে যাবে। তাই নাভির নিচে হাত বাঁধা এটা কোন নিয়ম নয়।

    কোমরের উপর হাত বাঁধে না কেউ। তাই আপনার হাদিস এখানে প্রযোজ্য হবে না।

    Anonymous

    @ABU TASNEEM, ভাই একটা অনলাইন কপি বা সফট কপি চেয়েছিলাম, সন্ধান দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। আপনার হাদীসখানা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। “আর কোমরের উপর হাত বেধে সালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে” এখানে উপর মানে কি on নাকি over? যদি on হয় অর্থাৎ কোমর যেখানে ওখানে তাহলে আমরা এবং আপনারা উভয়েই এই হাদীসের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছি। আমরা কেউই কোমরে হাত রেখে দাঁড়াই না। কিন্তু যদি over হয়, অর্থ্যাৎ কোমর থেকে উপরে তাহলে আপনারা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছেন, কেননা বুক কোমর থেকে উপরে। আর এই হাদীস অনুযায়ী কোমর থেকে উপরে হাত বাঁধা নিষেধ।

    ABU TASNEEM

    @Anonymous, এখানে আপনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সুনানে নাসাঈ । কিন্তু সেখানে on/over তা পাবেন না । কারণ অনুবাদ বাংলায় । আর আপনারা হাত বাধেন নাভীর নিচে অর্থাৎ কোমরের উপরে । এটাই বাস্তব ।

    ABU TASNEEM

    @ABU TASNEEM, স্যরি লিংটি প্রকাশিত হয়নি । লিংটি হচ্ছে বাংলা ভাষায় ইসলামী বই

    Anonymous

    @ABU TASNEEM,লিংকটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

    ” নাভীর নিচে অর্থাৎ কোমরের উপরে” কথাটা মানা গেল না বলে দুঃখিত। এগুলো অন্যদের ঘায়েল করার জন্য আপনাদের বানোয়াট ব্যাখ্যা। নাভী বরাবর দুই পাশের অংশকে কোমর বলে। ওখানে কাউকে (মাযহাব বা লা-মাযহাব) দেখিনি কখনও। নাভী বরাবর হাত বাধলেও তা হয়ত কোমর বরাবর বলে চালানো যেত। কিন্তু হাত আসলে নাভীর নিচে বাধার কথা বলা হয়। বরং বুক কোমরের উপরে। তাই কোমরের উপরে হাত বাঁধা নিষেধ মানে হল বুকে হাত বাঁধা নিষেধ। আপনারা তাই করছেন।

    শুধু এই একটি হাদিস নয়। নাভীর নিচে হাত বাধা সম্পর্কে আরও সহীহ হাদিস পাওয়া যায়। আলাদা পোস্ট আকারে দেয়া হয়েছে দেখুন। আর এই পোস্টে দেখুন চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখনো হয়েছে বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসগুলো জঈফ বা বিছিন্ন ব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছু না।
    আশা করি নিরপেক্ষ ভাবে পড়বেন এবং সহীহ হাদীসের উপর আ’মাল করবেন।

  7. যিরা শব্দ যোগে হাদীস দেখুন
    ১। মিশকাতুল মাসাবিহ হাদীস নং ৭৯৮ । প্রথম খন্ড , পৃ। নং ৩৩৪ ।
    ২। সহীহ বুখারী , হাদীস নং ৭০৪ , দ্বিতীয় খন্ড , পৃ: নং ১০২ ।

    আপনি বলেছেন , এখানে বাম হাতের যিরআর উপর ডান হাত রাখার কথা বলা হয়েছে । আর ডান হাত বলতে ডান হাতের যিরআ এটা প্রমাণ করে না । অবশ্যই প্রমাণ করে । ডান হাতের যিরআ হলেই কেবল বাম হাতের যিরআর উপর রাখা যায় । ডান হাতের শুধু কব্জি বাম হাতের যিরআ ( মধ্যমা আঙ্গুলের মাথা থেকে কনুই পর্যন্ত ) এর উপর রাখা যায় না । সুতরাং ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরআ ।

    রাসূল সাঃ বাম হাতের উপর ডান হাত রাখতের এর প্রমাণে আরও কিছু হাদীস দেখুন :
    ৩। সহী মুসলিম , ২য় খন্ড , হাদীস নং ৭৯১ , অনুচ্ছেদ ১৫ , পৃ: নং ১৬৮ ।
    ৪। সুনানে আবু দাউদ , ১ম খন্ড , হাদীস নং ৭৫৪ পৃ: নং ৪০৯ , হাদীস নং ৭৫৯ , অনুচ্ছেদ ১২৬ , পৃ: নং ৪৪১ , নাভীর নিচে হাত বাঁধার হাদীস বর্ণনাকারী রাবীকে ইমাম আবু দাউদ রহঃ নিজেই দুর্বল বলেছেন , দেখুন হাদীস নং ৭৫৮ ।
    ৫। সুনানু নাসাঈ , ২য় খন্ড , হাদীস নং ৮৯২ , পৃ: নং ৩৮ ।

    Anonymous

    @ABU TASNEEM, আপনি বলেছেন , এখানে বাম হাতের যিরআর উপর ডান হাত রাখার কথা বলা হয়েছে । আর ডান হাত বলতে ডান হাতের যিরআ এটা প্রমাণ করে না । অবশ্যই প্রমাণ করে । ডান হাতের যিরআ হলেই কেবল বাম হাতের যিরআর উপর রাখা যায় । ডান হাতের শুধু কব্জি বাম হাতের যিরআ ( মধ্যমা আঙ্গুলের মাথা থেকে কনুই পর্যন্ত ) এর উপর রাখা যায় না । সুতরাং ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরআ ।

    এটাই তাক্বলীদে শাখছীর নমুনা। যেহেতু আলবানী সাহেব যিরার উপর যিরা রাখার কথা বলেছেন তাই তা প্রমাণ করতেই হবে এর বিপরীতে কোন ব্যাখ্যা বা হাদিসের পাত্তা দেয়া যাবে না! যিরার উপর যিরা রাখার আহলে নফস প্রদত্ত দলীল দেখুন, অবশ্যই প্রমাণ করে, সুতরাং ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরআ। বাহ! বাহ!! তাহলে কি আমরা বলতে পারি, আবু তাসনীম অর্থ আবু তাসনীম মিথ্যুক?

    বাস্তব কথা হচ্ছে ডান হাতের তালু দিয়ে বাম হাতের কব্জি ধরলেই ডান হাতের কিছু অংশ যিরার উপর চলে যায়।

    আর যিরা শব্দটিও অতিরিক্ত সংযোজন। মূল হাদিসে যিরা শব্দটা ছিল না। এব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপরে দেয়া হয়েছে। নতুন করে আবার উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করি না।

    আর বাম হাতের উপর ডান হাত দ্বারা বুকের উপর হাত বাধা প্রমাণিত হয় না।

    এভাবেই আপনারা জঈফ হাদিস, বানোয়াট ব্যাখ্যার উপর আ’মাল করেন। সহিহ হাদিস প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ মুখে সহিহ হাদিসে তুবরী ছুটান। একটু সত্য করে বলবেন রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের সাথে আপনাদের এত শত্রুতা কেন?

  8. শায়খ আলবানী রহমাতুল্লহ আ’লাইহি। উনাকে আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়া’লা মাফ করুন এবং জান্নাতবাসী করুন। উনি এভাবেই বেশ কিছু ভুল করেছেন। উনার ভুলকে ভুল বলাই উনার প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন। কেননা উনার ভুলকে ভুল না বলে বরং ঐ ভুলের উপর যুক্তি দেখিয়ে আ’মাল করলে উনার আ’মালনামায় গুনাহ যেতে থাকবে। উনার সঠিক জিনিসের উপর তো আ’মাল করতে হবে কিন্তু ভুলকে সংশোধন করতে হবে।

    এখানে দুটি লিংক দিলাম। এখানে আপনারা দেখবেন উনি কিভাবে একই হাদিসকে সহীহ কখনও জঈফ বলেছেন। এমন প্রায় ২১০ হাদিসের ক্ষেত্রে উনি করেছেন। এগুলো হাদিস বিশ্লষণে ভুল। আর ফিকাহ ও অন্যান্য সব কিছু মিলে ভুলের সংখ্যা প্রায় ১২০০। আমার সময় থাকলে আমি বাংলায় অনুবাদ করে দিতাম। পরে সময় পেলে করব ইনশা আল্লহ। খেয়াল করে দেখবেন লিংক দুটিতে কিন্তু উনার প্রতি খুবই শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়েছে এবং উনার শানে দুআ’ করা হয়েছে।

    লিংক ১
    লিংক ২