লগইন রেজিস্ট্রেশন

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

লিখেছেন: ' বেদুইন' @ শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০০৯ (৩:৫৫ পূর্বাহ্ণ)

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ১ম পর্ব )

পৃথিবীতে পদার্পণের পর থেকেই মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে ও জীবনমান উন্নয়নের জন্যে সচেষ্ট হয়েছে ৷ এ পৃথিবীকে বশীভূত করার ও প্রকৃতিকে জয় করে একে মানুষের কল্যাণে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করার লক্ষ্যেই কৃষি ও শিল্প-বিপ্লবগুলো সংঘটিত হয়েছিল ৷ বর্তমানে উন্নয়নে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এমন সব দেশ বা স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে ৷ আজকাল উন্নয়ন বিভিন্ন পরিকল্পনা ও নীতিমালার মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে ৷ কিন্তু উন্নয়ন বলতে কি বোঝায় এবং কোন কোন মানদন্ড বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে তা খুব দ্রুত অর্জন করা সম্ভব? উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতি- এ শব্দগুলো প্রায়ই বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংক্রান্ত লেখালেখি বা আলোচনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ অধিকাংশ অর্থনৈতিক গবেষণায় এ শব্দগুলো অনেকটা সমার্থক শব্দ হিসেবে পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়৷ প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়ন এ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন৷ প্রবৃদ্ধি বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ও পরিমাণগত কিছু চালিকাশক্তি বা মানদন্ডকে বোঝানো হয় ৷ যেমন, মাথাপিছু আয়, গড় জাতীয় আয় বা উৎপাদন ইত্যাদি৷ অন্যদিকে উন্নয়ন বলতে এইসব অর্থনৈতিক সূচকের অবস্থা বিবেচনার পাশাপাশি অবকাঠামোগত পরিবর্তনকেও বিবেচনা করা হয়৷ অন্য কথায় উন্নয়নের পরিধি আরো ব্যাপক এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার রয়েছে বহুমাত্রিক দিক বা বিভাগ৷ একদল অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সম্পদের সুষম ও ন্যায্য বন্টন, দারিদ্র বিমোচন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, কাঙিখত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং জনকল্যাণ-এসবই হলো উন্নয়নের প্রধান কিছু সূচক৷ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মাইকেল টডারো বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো সমাজের সকল স্তরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন৷ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবাদে এই উন্নতি ঘটে থাকে৷ আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে তখনই যখন উৎপাদনের ক্ষমতাগুলো যথাযথভাবে বা উন্নত পন্থায় ব্যবহার করা হয়৷
গত কয়েক দশক ধরে ”টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন” শব্দটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে৷ টেকসই উন্নয়নের সমর্থকরা পরিবেশ সংরক্ষণকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবিচেছদ্য অংশ এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে মনে করেন৷ অন্য কথায় তাদের মতে, উন্নয়নের সূচক হিসেবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলো ছাড়াও পরিবেশ সংরক্ষণকেও গুরুত্ব দেয়া উচিত৷ কারণ যে উন্নয়নে পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক অন্যান্য শক্তিকে গুরুত্ব দেয়া হয় না, দীর্ঘমেয়াদে সেই উন্নয়নের কার্যকারীতা থাকে না৷ আর এ অবস্থায় উন্নয়ন টেকসই হয় না৷ আবার অনেক বিশেষজ্ঞ উন্নয়ন বলতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন ছাড়াও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনকেও উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করেন৷ কারণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি একইসাথে ঘটলে উন্নয়ন ও নৈতিকতা বা মূল্যবোধগুলোর মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়৷ অর্থাৎ তাদের মতে, প্রত্যেক জাতি সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার জাতীয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুযায়ী অগ্রসর হবে পশ্চিমা দেশগুলোর বা উন্নত দেশগুলোর সংস্কৃতি অনুযায়ী নয়৷
গত শতকের ৭০’র দশকের আগে উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনা বা লেখালেখিতে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ জাতীয় ধারণার কোনো অস্তিত্ব ছিল না৷ শুধু অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলোই ছিল উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনার মূল বিষয়৷ কিন্তু ৭০’র দশকে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত কতগুলো সম্মেলনে সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তিগুলোর মতো কিছু চালিকাশক্তি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে৷ কিন্তু জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা বা ইউনেস্কোর বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে বাস্তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মসূচিতে সাংস্কৃতিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয় নি৷ একটি দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন কিভাবে শুরু করতে হবে ?- এ প্রশ্নের প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত৷ কোন্‌ শ্রেণী বা দলগুলো উন্নয়নকে কাজে লাগাবে বা উন্নয়নের মাধ্যমে উপকৃত হবে অথবা কিসের বিনিময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জিত হবে?-এটাও এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক প্রশ্ন৷ আয় উপার্জন বৃদ্ধির জন্যে নৈতিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক সাম্য বা সুবিচার ও জনকল্যণকে বিসর্জন দিতে হবে বলে কেউ কেউ মনে করেন৷ কিন্তু এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন৷ ন্যায় বিচার, স্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদা এবং মানবীয় মূল্যবোধগুলো বজায় রেখেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব৷
উন্নয়ন সম্পর্কে ধর্মীর্য় চিন্তামুক্ত বিভিন্ন ঘরাণার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনার পর এবার আমরা পবিত্র ধর্ম ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন বলতে কি বোঝায় তা নিয়ে আলোচনা করবো৷ ইসলাম ধর্ম এমন এক ধর্ম যা মানুষের সব ধরনের চাহিদার ব্যাপারে সার্বিক বা পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে৷ তাই ইসলাম উন্নয়নকেও তার দৃষ্টিসীমার বাইরে স্থান দেয় নি৷ ইসলামের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বজগতে মানুষের অবস্থান, এ পৃথিবীতে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য এবং দুনিয়ার সুযোগ সুবিধা বা নেয়ামত ভোগ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভুত৷ ইসলামী নীতিমালা বা শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এ শিক্ষায় সরকার ও সমাজের অর্থনৈতিক আচরণ বা তৎপরতা এবং সামাজিক পরিবেশকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে এর ফলে টেকসই ও কাঙিখত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জিত হয়৷ আর তা ইসলামী সমাজের উচচতর লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্যেই অর্জিত হয়ে থাকে৷ এখানে মনে রাখা দরকার ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক তৎপরতায় মানবীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ বা বিধানগুলোর ভূমিকা রয়েছে৷ আর এ কারণে ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক তৎপরতাগুলো সুস্থ পরিবেশে এবং সঠিক নীতিমালা বা বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ২য় পর্ব )

পৃথিবীতে পদার্পণের পর থেকেই বা গুহায় বসবাসের যুগ থেকেই মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে সমৃদ্ধি অর্জন ও জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা করেছে ৷ এসব প্রচেষ্টার ফলে মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন বা সমৃদ্ধি ঘটেছে৷ কিন্তু বর্তমানে শিল্পোন্নত সমাজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রতিবাদ করা হচ্ছে তা হলো, শিল্পোন্নত সমাজগুলো মানুষকে নিজের কাছে আত্মপরিচয়হীন, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা বিবর্জিত এবং মূল্যহীন করেছে ৷
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে কাঙিখত উন্নয়ন ঘটা উচিত ৷ মানুষই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়ায় উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক- এ উভয় চাহিদাই মেটানো দরকার৷ আর এটাও স্পষ্ট যে আধ্যাত্মিক বা আত্মিক চাহিদাগুলোর দিকে লক্ষ্য না রেখে শুধু বস্তুগত চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা হলে বিভিন্ন ধরনের সংকট বা অসঙ্গতি সৃষ্টি হবে৷ অন্যদিকে যে কোনো সমাজের উন্নয়ন সে সমাজে প্রচলিত ও জনপ্রিয় রীতি নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত৷ বিশ্ব জগত, মানুষ ও জীবন সম্পর্কে প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে৷ প্রত্যেক জাতিরই রয়েছে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য ৷ আর এসব বৈশিষ্টের আলোকেই জাতিগুলোর ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছে৷ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এ বৈশিষ্ট্যগুলোকে গুরুত্ব দেয়া উচিত ৷ তা না হলে জাতিগুলোর নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি বাইরের সাংস্কৃতির মাধ্যমে বিপদাপন্ন বা হুমকিগ্রস্ত হবে ৷ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অসচেতন হবার কারণে বিশ্বের বহু ইসলামী দেশ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে৷ অনেক ইসলামী দেশ পাশ্চাত্যের উদ্ভাবিত উন্নয়নের কাফেলায় পৌঁছার জন্যে তাড়াহুড়ো করেছে এবং এ লক্ষ্যে এসব দেশ তাদের অনেক সাংস্কৃতিক রীতি বা প্রথা পরিবর্তন করেছে অথবা তাদের সংস্কৃতি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে৷ মুসলিম দেশগুলোর ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই দেশগুলোর উন্নয়ন শুধু ভেতর থেকে এবং স্থানীয় মূল্যবোধ তথা ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্বের আলোকেই সম্ভব হতে পারে ৷
ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন ও এ সংক্রান্ত কর্মপন্থার ব্যাখ্যা দেয়ার আগে মানুষ, তার জীবন এবং দুনিয়ার নেয়ামত বা সম্পদ সম্পর্কে ইসলামের ব্যাখ্যা বা বক্তব্য শোনা যাক৷ উন্নয়নের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি এবং মানুষের উচিত খোদায়ী বিধি বিধান অনুযায়ী উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চেষ্টা করা ৷ মানুষ যেসব সম্পদ ভোগ করে, ইসলামের দৃষ্টিতে সেই সব কিছুর প্রকৃত মালিক হলেন মহান আল্লাহ৷ পবিত্র কোরআনেই এ বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে৷ মহান আল্লাহ পৃথিবীতে বা বিশ্ব জগতে মানুষকে অন্য সব সৃষ্টির চেয়ে বেশী মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছেন এবং পৃথিবীর সব কিছু মানুষের আওতাধীন করে দিয়েছেন যাতে মানুষ তার প্রতিনিধিত্ব বা দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে৷ এরই আলোকে ইহকাল ও পরকালে মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার আচার আচরণের প্রকৃতির ওপর ৷ এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরানের সূরা বনি ইসরাইলের ৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ”আমরা মানুষকে মর্যাদা দিয়েছি৷ ভূভাগে ও সাগরে তাঁদের জন্যে পরিবহনের ব্যবস্থা করেছি এবং তাদেরকে পবিত্র জীবিকাসমূহ দিয়েছি ও তাদেরকে অনেক সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও অনুগ্রহ দান করেছি ৷”
পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ মানুষের প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ মাত্র যাতে মানুষ একদিকে তাদের চাহিদাগুলো পুরণ করতে পারে ও এভাবে নিজেকে উন্নত করার সুযোগ পেতে পারে এবং অন্যদিকে তাকওয়া বা খোদাভীরুতা অবলম্বনের মাধ্যমে ক‚প্রবৃত্তিগুলো দমন করতে পারে ৷ সূরা বাক্বারার ১৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ”হে মানুষ! জমিনে যা কিছু আছে তা থেকে হালাল বা বৈধ ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ কর এবং শয়তানের পদক্ষেপের অনুসরণ করো না, কারণ, সে অবশ্যই তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু ৷”
ধর্মীয় ইমাম ও বুজুর্গানে দীনের অনেক বাণী ও উপদেশ দেখা যায় যাতে তারা বৈষয়িক বা দুনিয়াবী ক্ষেত্রে উন্নতি বা উন্নয়নের জন্যে চেষ্টা চালাতে বলেছেন ৷ এর পাশাপাশি এও বলেছেন, যে মানুষ যেন খোদার দেয়া নেয়ামতগুলো ভোগ করতে গিয়ে নিজের আত্মা ও চরিত্রকে উন্নত করার কথা ভুলে না যায় ৷
পবিত্র ধর্ম ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক চাহিদাগুলোর দিকে লক্ষ্য রেখে তাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ খোলা রেখেছে ৷ কিন্তু ইসলামের কাঙিক্ষত উন্নয়ন মানব জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতই কিছু নিয়ম কানুন বা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে সীমিত ৷ মানুষ যাতে বস্তুগত বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে ছুটতে গিয়ে লোভ-লালসা, অপচয়, জুলুম ও অত্যাচারে জড়িয়ে না পড়ে সে জন্যেই এই সীমারেখা বা সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে৷ একজন মানুষের জন্যে দুনিয়া ও এর সম্পদগুলো তখনই অপছন্দনীয় যখন তা তাকে খোদাদ্রোহীতার দিকে নিয়ে যায় এবং এর ফলে সে অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি ও জুলুমের অতল গহবরে নিক্ষিপ্ত হয়৷ এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোঃ বাক্বের সাদর ” আমাদের অর্থনীতি বা একতেসাদুনা” নামক গ্রন্থে লিখেছেন, মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য, তবে এটাই মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়৷ কারণ, উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করে এবং মানবীয় গুণাবলীকে বিকশিত করে ৷ একমাত্র এ অবস্থায় সম্পদের বিকাশ পারলৌকিক কল্যাণের জন্যে খুবই সহায়ক হবে ৷ কিন্তু সম্পদ অর্জনই যদি মানুষের সমস্ত তৎপরতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে থাকে তাহলে তা সমস্ত ভুল ভ্রান্তির উৎসে পরিণত হয় এবং এর ফলে মানুষ আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায় ৷ উন্নতি বা সমৃদ্ধি ও সম্পদ অর্জনের জন্যে একজন মানুষকে সচেষ্ট হতে হবে, কিন্তু এজন্য সম্পদ বা সমৃদ্ধির গোলামে পরিণত হওয়া উচিত নয়, বরং সম্পদকেই নিজের কর্তৃত্বে রাখা উচিত৷ আর এভাবে একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে এবং উচচতর লক্ষ্যগুলো অর্জনে সচেষ্ট হয়৷ এভাবে আমরা দেখতে পাচিছ, পবিত্র ধর্ম ইসলাম মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষয়িক বা বস্তুগত উন্নয়নকে স্বাগত জানায়৷ কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এসব উন্নয়ন হতে হবে ইসলামী মূল্যবোধ ও মানুষের মানবীয় উন্নয়ন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৩য় পর্ব )

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শীর্ষক আলোচনার গত কয়েকটি পর্বে আমরা বলেছি মহান আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা ৷ মহান আল্লাহ পৃথিবীর সব কিছুকে মানুষের জন্যে বশীভূত করেছেন যার মাধ্যমে মানুষ তাঁর এই মর্যাদা ও কাঙিখত পরিপূর্ণতায় উপনীত হতে পারে ৷ আমরা এও বলেছিলাম যে, পার্থিব জগতের সম্পদ বা সুযোগ সুবিধাগুলো এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে তা মানুষের আত্মিক পূর্ণতার সহায়ক হয়৷ অন্যদিকে মানুষ যদি সম্পদ আহরণকেই জীবনের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করে তা তাকে জুলুম ও ভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত করবে ৷ ইসলাম ইহজগত বা এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর প্রতি অত্যন্ত যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে৷ ইসলাম মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ও বৈষয়িক সমৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে কাজে লাগানোর বিরোধী নয় ৷ কিন্তু ইসলাম মানবজীবনের শুধু একমুখী উন্নয়ন বা বৈষয়িক উন্নতির বিরোধী ৷ এ ধর্মের দৃষ্টিতে মুসলমানরা যদি ইসলামী মূল্যবোধ ও বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সঙ্গতি রেখে উন্নয়ন বা সমৃদ্ধি অর্জন করে কেবল তখনই তারা কাংঙিখত সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনের অধিকারী হবে ৷ পবিত্র কোরআনে ও হাদীসে উন্নয়ন সম্পর্কে যেসব ধারণা দেয়া হয়েছে আজ আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো ৷
নিঃসন্দেহে মানুষের বৈষয়িক জীবনের পূর্ণতার জন্য পৃথিবীর উৎপাদনমুখী কাজ, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির মাত্রা সব সময়ই বাড়াতে হবে৷ এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সূরা হুদের ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ” তিনিই মহান আল্লাহ, যিনি তোমাদেরকে ভূমি বা মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি চান মানুষ যেন ভূ-ভাগকে আবাদ বা সমৃদ্ধ করে ৷”
এ আয়াতের মর্মার্থ অনুযায়ী মহান আল্লাহ পৃথিবীর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দায়িত্ব মানুষের ওপর ন্যস্ত করেছেন যাতে তারা পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর দেয়া সম্পদ এবং নেয়ামতগুলো ভোগ করতে পারে৷ আর এ কারণেই ইসলাম সম্পদ বৃদ্ধি ও সম্পদের উন্নততর ব্যবহারকে স্বীকৃতি দেয়৷ এমনকি যেসব মানুষ নিজেকে আল্লাহর অনুগ্রহ বা নেয়ামতসমূহ থেকে বঞ্চিত করে ইসলাম তাদের নিন্দা করেছে৷ সূরা আরাফের ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ”বল আল্লাহ যেসব সুন্দর জিনিষ মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন সেগুলো এবং পবিত্র জীবিকাগুলোকে কে হারাম বা অবৈধ করে ?” ইসলামের মনীষী ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞগণও ভূমি ও খনিসমূহ ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছেন৷ যেমন,আমীরুল মুমেনীন আলী (আঃ) বলেছেন, পানি ও ভূমি বা জমির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি (তাতে বিনিয়োগ বা পরিশ্রম না করার কারণে) অভাবগ্রস্ত হবে সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকবে৷
কৃষিকাজের গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ”কৃষকরা ভূমির বা জমির সম্পদ৷” কোরআন ও হাদীস মানুষের জরুরী চাহিদাগুলো মেটানো এবং তাদের কল্যাণ ও আরাম আয়েশের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে৷ তবে এক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায়বিচার বজায় রাখতে এবং সম্পদ বৃদ্ধির ফলে কেউ যেন খোদাদ্রোহী ও জালেমে পরিণত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে বলেছে৷ আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন বস্তুগত উন্নয়নকে আধ্যাত্মিক উন্নতির মতো উচচতর লক্ষ্য পূরণে ব্যবহার করা হবে৷ তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ বেশী ধন-সম্পদের অধিকারী হলে আল্লাহকে ভুলে যায় বা খোদার বিরোধী কিংবা ধর্মদ্রোহী হয়ে পড়ে৷ অথচ ধন সম্পদ বা আয় উপার্জন বৃদ্ধির পর আল্লাহর প্রতি আরো বেশী কৃতজ্ঞতা হওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে বেশী মনোযোগী হওয়া উচিত৷ এটা স্পষ্ট, মানুষ যদি আল্লাহর আদেশ নিষেধ মান্য করে এবং আল্লাহর নেয়ামতগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞ হয় তাহলে আল্লাহ তাদের জন্য তাঁর নেয়ামত ও বরকত বাড়িয়ে দিবেন ৷ পবিত্র কোরআনে সূরা আরাফের ৯৬ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ”যদি সেইসব জনপদের অধিবাসী ঈমান আনতো ও খোদাভীরু বা মোত্তাকী হতো তাহলে তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবী হতে কল্যাণরাশি উন্মুক্ত করতাম ৷”
বর্তমান যুগে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে ৷ মানুষ তার জ্ঞান বৃদ্ধি করেছে৷ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও তার দক্ষতা বেড়েছে৷ আর এ দুটি বিষয় হলো মানব সম্পদ উন্নয়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ বা সূচক৷ কারণ উন্নয়নের জন্য জ্ঞানগত দক্ষতা বা বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরী ৷ ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগতি অর্জন করা৷ ইসলাম এর ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে৷ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে কলমের ও তা দিয়ে যা লেখা হয় তার তথা জ্ঞানের শপথ নিয়েছেন৷ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে চিন্তা ভাবনা করার ও গবেষণা করার ওপর এবং জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে৷ পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে যারা জানে ও যারা জানে না তারা সমান নয়৷ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এটা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, মানুষকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে পরিশুদ্ধ করা এবং জ্ঞান দেয়ার উদ্দেশ্যে নবী ও রাসূলগণকে পাঠানো হয়েছে৷ এ থেকে বোঝা যায় ইসলাম আত্মসংশোধন ও জ্ঞান অর্জনকে কত বেশী গুরুত্ব দিয়েছে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)’র একটি বিখ্যাত হাদীস হলো,”সকল মুসলমান নারী পুরুষের জন্যে জ্ঞান অর্জন ফরজ ৷”
বিশ্বনবী (সাঃ)’র এই অমূল্য হাদীসের আলোকেই একজন মুসলমান তাঁর নীতিমালা নির্ধারণ করে থাকে৷ কারণ, এ হাদীস অনুযায়ী একজন মুক্তমনা মানুষের জন্যে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি শোভনীয় নয় বরং তাকে সর্বদা অজানাকে জানার সাধনায় নিয়োজিত থাকতে হবে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সব সময় তাঁর কথা ও কাজে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরতেন৷ তিনি বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হওয়া লোকদের মধ্যে যারা শিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ছিল তাদের মুক্তির শর্ত হিসেবে বেশ কিছু মুসলমানকে লেখাপড়া শেখাতে বলেছিলেন৷ আমিরুল মুমেনীন হযরত আলী (আঃ)ও জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে মানুষের জন্যে মানবীয় সম্পদ বা পুঁজি বলে অভিহিত করেছেন৷ তিনি কুমাইল নামের তাঁর এক সঙ্গীকে বলেছিলেন, ” জ্ঞান সম্পদের চেয়ে উত্তম৷ কারণ, জ্ঞান তোমার রক্ষক বা জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়, কিন্তু সম্পদ রক্ষার জন্যে তোমাকেই পাহারাদার হতে হবে৷ দান করার ফলে সম্পদ কমে যায়, কিন্তু অন্যকে জ্ঞান দানের ফলে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়৷”
ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়নের আরেকটি মৌলিক চালিকাশক্তি হলো কাজ বা পরিশ্রম করা৷ কাজ করা বা পরিশ্রমের মাধ্যমেই মানুষ সমাজের জন্যে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দ্রব্য বা পন্য উৎপাদন করে এবং এভাবে সমাজকে সহায়তা করে৷ ইসলাম ব্যবসা বাণিজ্য করা এবং কলকারখানার মাধ্যমে উৎপাদন করাকে উৎসাহ দিয়েছে৷ যারা অলসতার কারণে বা অনীহার কারণে উন্নতি করতে পারে না ইসলাম তাদের তিরস্কার করে৷ ইসলামের মনীষীগণ উৎপাদনমূলক কাজকর্মকে গুরুত্ব দিতেন এবং তাঁরা নিজেরাও বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনমূলক কাজে জড়িত ছিলেন৷ আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) কোনো পেশাগত বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতেন৷ তিনি বিভিন্ন ধরনের কাজ কারবারে জড়িত না থেকে প্রতিদিন একই ধরনের কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিতেন৷ আমীরুল মুমিনীন বলতেন, যারা বিভিন্ন ধরনের কাজ কারবারে জড়িত হয়, তারা কোনো কাজেই সফল হয় না৷ হযরত আলী (আঃ) আরো বলেছেন, রিজিকের দরজাগুলো বন্ধ থাকে, এই বন্ধ দরজাগুলোকে পরিশ্রম ও কাজের মাধ্যমে খুলে ফেল, কারণ, কাজের মধ্যে রয়েছে বরকত বা কল্যাণ৷”
এভাবে আমরা দেখছি ইসলাম উন্নতি বা প্রগতির অন্তরায় নয় বরং ইসলাম উন্নয়নের সহায়ক শক্তি ৷ ইসলাম মানুষকে জ্ঞান অর্জন করতে বলে এবং কোনো বিষয়ের বিশেষ জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জন করতে বলে ৷ এ ধর্ম কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য মানুষকে পরিশ্রম করতে বলে যাতে মানুষ স্বাচছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারে ৷ বলা হয়, জনগণ তখনই আরাম আয়েশ, কল্যাণ ও অগ্রগতি অর্জন করবে যখন তারা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সফল হবে এবং এজন্য তাদের কাছে যথেষ্ট উপায়-উপকরণ বা সম্পদ থাকতে হবে ৷ কিন্তু উন্নয়ন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী অন্যান্য অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভিন্ন ধরনের ৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৪র্থ পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার গত কয়েকটি পর্বে আমরা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসের উদ্বৃতি দিয়ে বলেছি ইসলাম উন্নয়নের পরিপূর্ণ সহায়ক শক্তি এবং ইসলাম বিভিন্ন সঠিক কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে প্রকৃত উন্নয়নের দিকে আহবান জানায়৷ চিন্তাবিদরা মনে করেন কোনো সমাজকে উন্নত হতে হলে তার জন্যে তিনটি প্রধান চালিকাশক্তি অর্জন করা জরুরী ৷ এ চালিকাশক্তিগুলো হলোঃ ধর্ম, উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার ৷ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিশেষ করে বৃহৎ ধর্মগুলোর আবির্ভাবের পর থেকে এ তিনটি মূল লক্ষ্য অর্জন ছিল মানবজাতির বৃহত্তম আকাঙক্ষা৷ যুগে যুগে এ লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্যে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে৷ এসব প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে যখন সারা বিশ্বে সত্য ধর্ম বিস্তৃত হবে, সেদিন মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে উন্নতি ও পূর্ণতা অর্জিত হবে এবং সব মানুষ আশ্রয় পাবে সামাজিক সুবিচারের শীতল ছায়াতলে৷ এ তিনটি চালিকাশক্তি অর্থাৎ ধর্ম, উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার মানব সমাজে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন বা সুষম অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ৷ আর এ তিনটি চালিকাশক্তি বা নীতিমালার যে কোনো একটি থেকে দূরে থাকলে সমাজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৷
ইসলামের বিধিবিধানগুলো সুস্পষ্ট এবং সব দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ বা পরিপূর্ণ এ ধর্ম মানুষের প্রকৃতি ও বিবেকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ৷ মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব চাহিদা সৃষ্টি হয় সেগুলো পূরণের জন্যে ইসলামে রয়েছে কাঙিক্ষত কর্মসূচি ও পরিকল্পনা৷ এ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বস্তুগত ক্ষেত্র ও মানুষের শারীরীক বা জৈবিক চাহিদার ক্ষেত্র৷ ইসলাম এ দুটি ক্ষেত্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে৷ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃতির জগত এবং এর বহিপ্রকাশগুলো তথা মানুষের পার্থিব জীবন মানুষের পূর্ণতা অর্জনের একটি উপয্‌ক্তু মাধ্যম৷ এ জন্যেই ইসলাম একদিকে পৃথিবীকে ধন ও ধান্যে সমৃদ্ধ বা আবাদ করতে বলে এবং অন্যদিকে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও নির্দেশ দিয়েছে৷ ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সমস্ত দিকের উন্নয়নের ওপর জোর দেয়া হয়৷ উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী চিন্তার একটি গরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো ইসলাম একইসাথে মানুষের ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে৷ উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক মতবাদের সাথে এ সম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর মূল পার্থক্য ঠিক এটাই৷
আপনারা নিশ্চই এটা জানেন যে, বর্তমান বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বা বিজয়ী সভ্যতা সব কিছুকেই বস্তুগত বা দুনিয়ার লাভ লোকসানের ভিত্তিতে বিচার করে থাকে৷ রুটি রুজির সমস্যা ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো দূর করা মানুষের জীবনের জন্যে খুবই জরুরী৷ কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবনের উন্নতি বা উন্নয়ন একমুখি হওয়া উচিত নয়৷ পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে উন্নয়ন বলতে কেবল ভোগ ও মুনাফা অর্জনকেই বোঝায়৷ পাশ্চাত্য সেখানকার তথাকথিত পুনর্জাগরণ বা রেনেসাঁর পর ভোগবাদী ও মুনাফাকামী নীতি গ্রহণ করে এবং মানুষকে চরম ভোগবাদী হতে উৎসাহ দেয়া হয়৷ এ বিষয়টি অর্থনৈতিক তৎপরতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে৷ পাশ্চাত্যের উন্নয়ন সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীতে মানুষের বৈষয়িক চাহিদাগুলো মেটানোর ক্ষেত্রে চরমপন্থা গৃহীত হওয়ায় ভোগবাদ লাগামহীনভাবে বেড়েছে৷ এর ফলে অনেক কৃত্রিম বা অপ্রয়োজনীয় চাহিদাও সৃষ্টি করা হয়েছে৷ আর এই চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে৷ এ প্রসঙ্গে একজন মার্কিন রাজনীতিবিদ খুবই যথার্থ মন্তব্য করেছেন৷ মার্কিন সমাজ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমান সভ্যতায় আমরা এমন এক কাল্পনিক ও মিথ্যা জগতে বসবাস করছি যা সাজানো হয়েছে শুস্ক বা নীরস কৃত্রিম ফুল ও বিনোদনের জন্যে বিভিন্ন কক্ষ নির্মানের মধ্য দিয়ে৷ অথচ আমাদের মনগুলো হয়ে গেছে অনুভূতিশূণ্য এবং আমাদের অন্তরগুলোকে ক্যাফেইন, কফি ও অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় বা মদ পানের মাধ্যমে মাদকাসক্ত করা হয়েছে৷
পাশ্চাত্যের উন্নয়ন মডেলে যান্ত্রিকতাবাদ বা মেশিনিজমের মোকাবেলায় মানুষের মর্যাদা ও ইচছাকে গুরুত্ব দেয়া হয় নি৷ এটাই উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রধান বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য৷ ইসলামে অর্থনীতি ও উন্নয়নকে নৈতিকতার সাথে সমন্বিত করা হয়েছে৷ ফলে ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক তৎপরতাগুলো হয় লক্ষ্যপূর্ণ ও যৌক্তিক৷ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ধনসম্পদ বা অর্থকড়ি কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য ও উৎপাদন-তৎপরতা যেন মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন না করে ৷ সূরা নূরের ৩৭ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ এরা সেইসব লোক যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং নামাজ কায়েম ও যাকাত দান হতে বিরত রাখতে পারে না ৷
এ আয়াতে এমন লোকদের ব্যাপারে ইঙ্গিত করা হয়েছে যাদের বৈধ বা ইতিবাচক অর্থনৈতিক তৎপরতা তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে না৷ এটা স্পষ্ট যে যারা মহান আল্লাহকে সব সময় স্মরণ রাখে তারা অর্থনৈতিক তৎপরতাসহ যে কোনো কাজেই জুলুম, প্রতারণা এবং দূর্নীতি থেকে দূরে থাকে৷ এ ধরনের লোকদের জন্যে সব সময় সৌভাগ্য বা সুফল অপেক্ষা করে৷
ইসলামের উন্নয়ন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গীর আরেকটি মূল কথা হলো ন্যায়বিচার৷ ইসলাম মনে করে, ন্যায়বিচারবোধ বা প্রকৃত ন্যায়বিচার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের অসঙ্গতি বা সমস্যাগুলোকে যত বেশি সংশোধন করতে পারে অন্য কোনো বিষয় বা চেতনা ততটা করতে সক্ষম নয়৷ ন্যায় বিচারের ধারণা না থাকার কারণেই সমাজে সব ধরনের দূর্নীতি ও সামাজিক সংকট দেখা দেয়৷ সহিংসতা, জুলুম, নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক অস্থিরতা ও বিশ্বাসঘাতকতার মতো সংকটগুলোর মূল উৎস হচ্ছে অবিচার বা অন্যায়৷ অবিচারের প্রভাবগুলো পশ্চিমা জড়বাদী সমাজেও খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যদিও পশ্চিমা জড়বাদী সভ্যতা নিজেকে জনকল্যাণ ও স্বাধীনতা বা মুক্তির ধবজাধারী বলে দাবী করে৷ বর্তমানে পাশ্চাত্যে ক্ষমতাসীন মহলের স্বার্থপূজা ও বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের বেদীতে ন্যায়বিচার বিসর্জিত হয়েছে৷ পশ্চিমা সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এতো বেশী প্রকট যে বর্তমানে তারা অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে এবং খোদ পশ্চিমা জনগণই এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জানাচেছ৷ পশ্চিমা সমাজের উন্নয়ন পদ্ধতির কারণে সেখানে বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে এবং সেখানকার সম্পদ বন্টণ পদ্ধতিতে ব্যবধান ও অবিচার খুব ভালোভাবেই স্পষ্ট৷ পুঁজিবাদী দেশগুলোতে অল্পসংখ্যক পুঁজিপতি রাষ্ট্রক্ষমতার মূল কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে৷ এসব দেশে কলকারখানার মালিকরা এবং অন্যান্য সম্পদশালী ব্যক্তিত্ব শুধু তাদের স্বার্থ হাসিল বা মুনাফা বৃদ্ধির চিন্তায় মশগুল থাকেন৷ এ প্রসঙ্গে ফরাসী অর্থনীতিবিদ জ্যাক্স বলেছেন,উত্তরাঞ্চলের ধনী দেশগুলো প্রাচুর্যের সময়ও বেকারত্ব, দারিদ্র দূর করতে এবং সামাজিক সেবার বিপুল ব্যায়ভার বহন করতে সক্ষম নয়৷ দুঃখজনকভাবে পশ্চিমা দেশগুলো উন্নয়ন প্রক্রিয়া প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর লুন্ঠন ঠেকাতে অক্ষম ৷ এই দেশগুলো উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষা বা দূষণ ঠেকানোর প্রতিও কোনো লক্ষ্য রাখছে না ৷ অন্যদিকে ইসলাম ন্যায়বিচারকে উন্নয়নের সহযোগী বলে মনে করে ৷ ইসলামের অর্থনৈতিক পদ্ধতিটাই এমন যে এ পদ্ধতির লক্ষ্য ও নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ হয় ৷ অন্য কথায় ইসলামের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলোর মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব৷ ইসলামের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতিমালার অন্যতম প্রধান এই বৈশিষ্ট্য তথা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আমরা আমাদের এ আলোচনার আগামী পর্বে কথা বলবো ৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৫ম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার গত কয়েকটি পর্বে আমরা ইসলামী অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে উন্নয়নের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছি৷ আমরা বলেছিলাম ইসলামে অর্থনৈতিক তৎপরতা ও কর্মসূচির লক্ষ্য হলো মানুষের মর্যাদা এবং নৈতিক মূল্যবোধগুলো রক্ষা করা ৷ ইসলামে উন্নয়নের বিষয়টি ব্যাপক অর্থবোধক ও বিস্তৃত এবং নৈতিক বিভিন্ন দিকসহ আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত দিকগুলোও এর সাথে য্‌ক্তু৷ ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন শুধু বস্তুগত বিষয় নয়, আর এটাই উন্নয়ন সম্পর্কে ইসলামের সবচেয়ে স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য যাকে পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে সহজেই পৃথক করা যায়৷ পুঁজিবাদী সমাজ শুধু মুনাফাকামিতা ও বস্তুগত চাহিদা পূরণকেই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য বলে মনে করে কিন্তু ইসলাম গঠনমূলক উৎপাদনের পাশাপাশি মানবীয় মূল্যবোধগুলো রক্ষা করাকেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করে৷
সবক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ইসলামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেলের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বা মূলনীতি৷ ইসলাম ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষকে উন্নত করা৷ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়৷ অর্থনীতি এ উচচতর লক্ষ্যে পৌঁছার একটি মাধ্যম৷ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এটাও বলেছেন যে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যেই নবী রাসূলগণকে পাঠানো হয়েছে৷ পবিত্র ধর্ম ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম৷ অবিচার বা জুলুম সমাজের শৃঙখলা ও ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে৷ অবিচার সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিরাজিত সুস্থ সম্পর্ক এবং নীতিমালাকে নড়বড়ে করে তোলে৷ আর এ কারণেই ইসলাম ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে বলে৷ একমাত্র ন্যায়বিচারের ক্ষেত্র বিস্তৃত করার মাধ্যমে সমাজে কাঙিক্ষত উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব৷ কাঙিক্ষত উন্নয়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জীবনের সব ক্ষেত্রে মানুষের পূর্ণতা অর্জিত হয়৷ অর্থাৎ এ পূর্ণতা মানুষের বস্তুগত, আধ্যাত্মিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রসহ তার জীবনের সব ক্ষেত্রেই অর্জিত হওয়া উচিত৷
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের বিশেষ অর্থ রয়েছে৷ সম্পদের সুষম বন্টন এবং উৎপাদন ও সেবার খাতে প্রাথমিক সুবিধাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রধান দ্রব্যগুলোর সমবন্টন এই ন্যায়বিচারের অন্তর্ভুক্ত৷ প্রাকৃতিক সম্পদ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সমানভাবে জনগণের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুস্থ থাকে৷ এ সম্পদগুলো বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তি বা কয়েকটি গোষ্ঠীর একচেটিয়া দখলে থাকলে সমাজে শ্রেণী বৈষম্য দেখা দেয়৷ ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল৷ প্রথমতঃ সম্পদের ভারসাম্য এবং দ্বিতীয়ত জনকল্যাণ৷ ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার সবারই প্রাপ্য, এমনকি অমুসলমানরাও এ ন্যায়বিচার পাবার অধিকার রাখে৷ ইসলাম মনে করে মানুষের জীবন যাপনের উপকরণগুলো এমনভাবে বন্টিত হওয়া উচিত যাতে সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, খাদ্য ও বাসস্থানসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট মাত্রায় সুযোগ সুবিধা পায়৷
ইসলামে জনকল্যাণ অর্থ সমাজের দারিদ্র দুর করা৷ মানব সমাজের অধিকাংশ দুর্গতি বা বিপর্যয়ের উৎস হলো দারিদ্র্য৷ দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতের কারণে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মতো বিভিন্ন অপরাধ দানা বাঁধতে থাকে৷ ইসলাম বাধ্যতামূলক দান ও স্বেচছায় দান করাকে জনকল্যাণের একটি পন্থা বলে মনে করে৷ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন৷ যেমন- সূরা যারিয়াতের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের ধনসম্পদে বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্তের যে হক রয়েছে তা তারা আদায় করতো৷” এ থেকে বোঝা যায় ধনী মানুষের ধন সম্পত্তিতে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে৷ এছাড়াও হাদীস ও বিভিন্ন ইসলামী বর্ণনায় দরিদ্র বা বঞ্চিতদের সাহায্য করার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ এসব বর্ণনায় দেখা যায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র বংশে জন্মগ্রহণকারী ইমামগণ দরিদ্র ও বঞ্চিতদের ব্যাপকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন৷ আর এ থেকে বোঝা যায় অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে জনকল্যাণ জরুরী৷ মহানবী (সাঃ)’র আহলে বাইত বা তাঁর পবিত্র বংশে জন্মগ্রহণকারী ষষ্ঠ ইমাম হযরত জাফর সাদেক (আঃ) বলেছেন, দরিদ্র ব্যক্তিকে এতোটা পরিমাণে দেয়া দরকার যাতে সে পানাহার ও পোশাক পরা ছাড়াও বিয়ে করতে পারে এমনকি সদকা দিতে পারে ও হজ্বেও যেতে পারে৷ উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীতে সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণর্ বিষয়৷ ইসলামী সমাজে জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় বস্তুগত সামগ্রীর অধিকারী হবার ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবধান বা বৈষম্য থাকা বৈধ নয়৷ যদিও সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে এবং তা অগ্রাহ্য করা যায় না৷ কারণ, সৃষ্টিশীলতা এবং শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার দিক থেকে অথবা কাজ করার দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে মানুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে৷ ইসলাম এ পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেয়৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলাম সমাজের মানুষের মধ্যে জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় বস্তুগত সামগ্রীর অধিকারী হবার ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবধান বা বৈষম্যকে স্বীকৃতি দেয় না ৷ বরং ইসলাম সম্পদের সমবন্টনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছে৷ ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজের অল্প সংখ্যক মানুষের কাছে অধিকাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হলে তারা খোদাদ্রোহী বা উদ্ধত প্রকৃতির হয়ে পড়বে এবং অন্যদিকে দরিদ্র লোকেরাও দারিদ্র্যের কারণে বিভিন্ন অপরাধ বা অনুপযোগী কাজে জড়িয়ে পড়বে৷ পবিত্র ইসলাম ধর্ম মানুষের অর্থনৈতিক তৎপরতাগুলোর বিরোধী নয়৷ কারণ ইসলাম উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়৷ আর তাই এ পবিত্র ধর্ম মানুষকে কাজ করতে ও চেষ্টা সাধনা করতে বলে যাতে মানুষ কাঙিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত হয়, একইসাথে ইসলাম ধনীদেরকে তাদের সম্পদ থেকে দরিদ্রদের দান করতে বলে৷ ইসলামী আইন অনুযায়ী এ দান বাধ্যতামূলক৷ আর এভাবে ইসলাম দান খয়রাতকে সমাজে সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের বা সম্পদে ভারসাম্য সৃষ্টির অন্যতম পন্থা বলে মনে করে৷ দান খয়রাত করতে উৎসাহ যুগিয়ে ইসলাম সমাজ থেকে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূর করতে চায় ৷ কারণ দানের অর্থ সম্পদ দিয়ে বঞ্চিত শ্রেণীর মানুষ অর্থনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ পায়৷ তবে এটাও স্পষ্ট যে, ইসলামী সমাজে কেউ দরিদ্র বলে বসে বসে দানের অর্থ সম্পদ ভোগ করবে ইসলাম এমন সুযোগ দেয়ারও পক্ষপাতি নয়৷ আমিরুল, মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করতেন৷ তাঁর মতে, সেই সরকারই সর্বোত্তম সরকার যে সরকার ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে৷ হযরত আলী (আঃ) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি বলে মনে করতেন৷ তিনি রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কাছে লেখা চিঠিতে উন্নয়ন ও অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরেছিলেন৷ হযরত আলী (আঃ) তার পক্ষ থেকে মিশরে নিয্‌ক্তু গভর্ণর মালেক আশতারের কাছে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি মানুষের ক্ষমতা বা যোগ্যতা এবং সহনশীলতা বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে দারিদ্র্যের কারণে জনপদগুলো ধবংস হয়ে যায়৷ হযরত আলী (আঃ)’র দৃষ্টিতে উন্নয়ন বলতে শুধু ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ বা উপার্জন বৃদ্ধিকে বোঝায় না, সম্পদের সমবন্টন, সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সম্পদ ভোগ বা ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করাও উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য৷ আমিরুল মোমেনিন আলী (আঃ)’র মতে সমাজে যদি কোনো দরিদ্র মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে এবং কোনো ধনী ব্যক্তির সম্পদ বাড়তে থাকে, তাহলে তা হলো দরিদ্রদের সম্পদ লুন্ঠিত হবার ও রাষ্ট্রের সম্পদ সমানভাবে বন্টিত না হবার লক্ষণ৷ মালেক আশতারের কাছে তিনি লিখেছেন, সমাজে বিভিন্ন পর্যায়ের ও শ্রেণীর মানুষ রয়েছে, এই গ্রুপ বা শ্রেণীগুলো যে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল তা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে৷ সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে অমুসলিম সম্প্রদায় এবং ব্যবসায়ীসহ দরিদ্র বা দূর্বল ও বঞ্চিত শ্রেণীর মানুষ-এ সব গ্রুপই এক পর্যায়ের নয়৷ মহানবী (সাঃ)র আহলে বাইতের সদস্য আমিরুল মোমেনিন আলী (আঃ)’র মতে, এ সব শ্রেণীরই নির্দিষ্ট কিছু অধিকার রয়েছে, আর এ অধিকারগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা শাসকদের কর্তব্য ৷

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৬ষ্ঠ পর্ব )

ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া ৷ ইসলাম উন্নয়নকে মানুষের বৈষয়িক বা বস্তুগত দিক ছাড়াও আধ্যাত্মিক দিক থেকেও বিবেচনা করে৷ এ কারণে উন্নয়ন সংক্রান্ত অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য রয়েছে৷ খোদামুখিতা ও মানুষের সত্ত্বাগত মূল্যের প্রতি গুরুত্ব উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী নীতিমালার প্রধান বা মৌলিক দিক৷ আর উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী মডেলের এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে অর্থনৈতিক তৎপরতা যে কোনো ধরনের দূর্নীতি, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে মুক্ত থাকতে পারে৷ এ ছাড়াও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ইসলামী উন্নয়ন মডেলের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য৷ মানুষের সম্পদ ও উপার্জন বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনাও উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ৷
পরিবেশ রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধ করা ইসলামী উন্নয়ন মডেলের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য৷ এছাড়া মানুষের জীবনের জন্যে প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর অস্তিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ প্রায় প্রতি বছর বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে জ্বালানী সম্পদের খনি বা উৎস আবিষ্কার করছে৷ বিশ্বের প্রচলিত উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয় না৷ তাই আজকাল টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে৷ গত শতকের খৃষ্টীয় ৬০ এবং ৭০’র দশককে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বের ব্যাপারে মানুষের জাগরণের যুগ বলা যায়৷ ঐ সময় থেকে এ পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা প্রাকৃতিক সম্পদগুলো ক্রমেই ফুরিয়ে আসার এবং এরইমধ্যে প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হবার বিষয়ে হুঁশিয়ারী উচচারণ করে আসছেন৷ অনেক চিন্তাবিদ বা বিশেষজ্ঞ শিল্পোন্নত দেশগুলোর বৈষম্যমূলক ও লাগামহীন উন্নয়নের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন৷
বিশ্বের দেশগুলো এখন এ বিষয়ে একমত যে, লাগসই প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশী ফলদায়ক এবং পরিবেশের জন্যও তা সবচেয়ে কম ক্ষতিকর৷ বর্তমানে উন্নত দেশগুলোও লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মুখাপেক্ষী৷ কারণ এ ধরনের প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করলে তেল-গ্যাস বা ফসিল জ্বালানীর মতো অনবায়নযোগ্য জ্বালানী ও সম্পদের উৎসগুলোর ওপর চাপ কম থাকবে কিংবা এসব ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়া যাবে৷
টেকসই প্রযুক্তির সমর্থকদের মতে, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অবিচেছদ্য অংশ এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এ বিষয়কে অবশ্যই গুরুত্ব দেয়া উচিত৷ পরিবেশের দিকে লক্ষ্য না রেখে উন্নয়ন তৎপরতা চালানো হলে সে উন্নয়ন টেকসই বা সুদৃঢ় হবে না৷ প্রকৃতি কি শুধুই মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হবার যোগ্য? প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক শুধুই লাগামহীনভাবে প্রকৃতির কাঁচামাল ব্যবহারের সম্পর্ক হতে পারে না৷ তাই এটা স্পষ্ট মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা দরকার৷ আমরা বর্তমানে দেখছি মানুষ তার নিজের পছন্দ অনুযায়ী তথ্য, প্রযুক্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো অর্জনের তাগিদে পরিবেশকে মানুষের জীবন যাপনের জন্যে সহজতর বা উপযোগী করার পরিবর্তে পরিবেশ ধবংসে মেতে উঠেছে৷ টেকসই উন্নয়নের সমর্থকরা মনে করেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় দুটির মধ্যে সব সময় একটিকে অপরটির জন্য কোরবানী বা বিসর্জন দিতে হবে- এমনটি মনে করার কোনো যুক্তি নেই৷ কারণ, পরিবেশের মান ভালো থাকলে তা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহায়ক হয়৷
আসলে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য একটি বড় ধরনের বিশ্ববিপ্লব ঘটানো জরুরী৷ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যেও পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরী৷ এভাবে দেখা যায় টেকসই উন্নয়নের ধারণায় প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর ব্যবহারকে যৌক্তিক সীমার মধ্যে সীমিত রাখা, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সকলের অংশগ্রহণ এবং জনগণের সহানুভূতি, ন্যায় বিচার ও ভারসাম্য- এসব বিষয় মৌলিক চাহিদা হিসেবে বিবেচিত হয়৷ ইসলামের অর্থনৈতিক শিক্ষায়ও এ ধরনের দিক বা বিষয়গুলো ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে এবং বিভিন্ন ইসলামী বর্ণনায় সেগুলো ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে৷ ইসলামী বর্ণনাগুলো বিশ্বের সাথে পরিচিত হবার ও বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ের পরিচিতির এক প্রধান উৎস৷ এসব বর্ণনা মানুষকে প্রকৃতির সাথে বন্ধুত্ব করিয়ে দেয়৷ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃতি মহান আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন বা প্রতিফলন এবং বিশ্বের সব কিছু তাঁরই প্রশংসা করে৷ মহান আল্লাহ তার অপার করুণার কারণে বিশ্বজগতকে মানুষের কল্যাণের জন্য প্রস্তুত করেছেন৷ প্রকৃতির বিস্ময়কর দিকগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা বা গবেষণা আল্লাহর মহত্ত্ব ও শক্তি উপলব্ধির অন্যতম পন্থা৷ মানুষ যাতে বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে উন্নতি এবং পূর্ণতা অর্জন করতে পারে সে লক্ষ্যে মহান আল্লাহ আকাশ ও জমিনে যা কিছু আছে তার সবই মানুষের অধীনস্ত বা আয়ত্ত্বাধীন করে দিয়েছেন৷ ইসলামী উন্নয়ন মডেল মানুষকে জীবন যাপন ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে অপচয় বা অপব্যয়ের এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে নষ্ট করারও অনুমতি দেয় না৷ পবিত্র কোরআন মুসলমানদেরকে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবন-উপকরণগুলো যৌক্তিক মাত্রায় এবং যথাযথভাবে ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে৷ যেমন, মহান আল্লাহ সূরা আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে বলেছেন, তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না৷” ইসলামের ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও ইমামগণ অপচয় করা নিষিদ্ধ ঘোষণা সম্পর্কে অনেক হাদিস বা রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন৷ যেমন, ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) অপব্যয় পরিহারের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, এমনকি খেজুরের বিচি ফেলে দেয়াটাও এক ধরনের অপব্যয়৷ আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, অর্থনৈতিক সহায়সম্পদ খোদাভীরু বা মোত্তাকী মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা থেকে বিচ্যুত করে না এবং সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সে অপব্যয়ী বা সীমালংঘনকারী হয় না৷
ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) তাঁর এক মূল্যবান বাণীতে বলেছেন, খনি ও মূল্যবান সম্পদ অর্জিত হলে মানুষকে সে বিষয়ে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বা সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে৷ চক, চুন, তামা, সীসা, রূপা, চুনি বা রুবি এবং পান্না ও অন্যান্য খনিজ পাথরের খনি পাওয়া গেলে তা সর্বসাধারণের জন্য ব্যবহার করতে হবে৷ মানুষের ব্যবহারের জন্য মাটির নীচে অনেক সম্পদ রয়েছে এবং প্রয়োজন মোতাবেক তা আবিষ্কার করতে হবে ও খনি থেকে উত্তোলন করতে হবে৷ ইসলাম কৃষিকাজ ও বৃক্ষ রোপনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে এবং কৃষকদেরকে ভূপৃষ্ঠের সম্পদ বলে মর্যাদা দিয়েছে৷ যেসব স্থান শুস্ক বা যে অঞ্চলে গাছ পালার সংখ্যা কম সেসব স্থানে গাছ কাটতেও এ পবিত্র ধর্ম নিষেধ করেছে৷ ইসলাম পরিবেশ দূষণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পরিস্কার পরিচছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রকৃতির সুরক্ষা বা প্রকৃতিকে সুস্থ রাখার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে৷ ইসলামী বর্ণনাগুলোতে এ সংক্রান্ত অনেক বাণী দেখা যায়৷ যেমন, আমিরুল মোমিনিন হযরত আলী ( আঃ ) পানিকে বিশেষ করে স্থির পানিকে ঘোলা বা দূষিত না করার উপদেশ দিয়েছেন৷ মানুষ ও বিশ্বসমাজের কাছে ইসলাম এ আহবান তুলে ধরে যে অর্থনৈতিক ও উৎপাদন-তৎপরতা এমনভাবে চালানো উচিত যাতে প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশও অটুট থাকে৷
এভাবে ইসলামের উন্নয়ন মডেল প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও এর গুরুত্ব তুলে ধরেছে৷ ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে৷ এ পবিত্র ধর্ম প্রাকৃতিক সম্পদকে সব যুগের মানুষের সম্পদ বলে মনে করে৷ ইসলামের নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী এসব সম্পদ সবচেয়ে ভালো পন্থায় ব্যবহার করতে হবে৷ প্রকৃতির সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি ইসলামের নীতিমালা মেনে চলা হয় তাহলে বিশ্বের উন্নয়ন তৎপরতার কারণে কখনোই পরিবেশ দুষণের মতো সংকট দেখা দিবে না৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৭ম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনার গত পর্বে আমরা ইসলামী উন্নয়ন মডেলে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছি৷ আজকের পর্বে আমরা ইসলামী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তিগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করবো৷
আজকাল উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তিগুলোর ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে৷ বিশেষ করে শক্তিশালী দেশগুলো বিভিন্ন শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পন্থা ব্যবহার করে অন্যান্য জাতির ওপর নিজ কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিচেছ৷ ৬০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে উন্নয়ন চিন্তাবিদরা দেশের উন্নয়নে সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করেন৷ তাদের মতে, প্রত্যেক জাতির উচিত তার নিজ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলোর সাথে সঙ্গতি রেখে নির্দিষ্ট উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করা৷ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে একটি গাছের প্রবৃদ্ধি বা বিকাশের সাথে তুলনা করেন৷ কোনো জাতির সংস্কৃতি হলো এই বৃক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অর্থাৎ সংস্কৃতি হলো উন্নয়ন নামক বৃক্ষের মূল শেঁকড়৷ উন্নয়নের বৃক্ষটি শিক্ষা ও যথাযথ পূঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে খাদ্য পেয়ে থাকে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সঠিক পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা এই বৃক্ষের কান্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে৷ অন্য কথায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গবিশিষ্ট একটি দেহের মতো এবং এর সমস্ত অঙ্গ সুস্থ ও সবল থাকলেই উন্নয়ন ঘটবে৷ আর যদি এর কোনো একটি অঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়ে তাহলে পুরো দেহ বা উন্নয়ন প্রক্রিয়া সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে, বিশেষ করে সমাজের সংস্কৃতি যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ তাই এটা বলা যায় প্রত্যেক জাতি বা দেশের সামাজিক ক্ষেত্রগুলো দেশটির উন্নয়নের জন্যে সহযোগী ও উপযোগী ক্ষেত্র সৃষ্টি করে৷
বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা প্রত্যেক জাতি বা দেশের সংস্কৃতি পর্যালোচনা করে এটা দেখার চেষ্টা করছেন যে কোন্‌ মূল্যবোধগুলো প্রতিরোধমূলক এবং কোন্‌ মূল্যবোধগুলো উন্নয়নের জন্য সহায়ক৷ ইসলামী উন্নয়ন মডেল অনুযায়ী সংস্কৃতির কিছু দিক বা চালিকাশক্তি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে৷ এবারে আমরা এসব দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো৷ গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রত্যেক সমাজে, বিশেষ করে সমাজের উৎপাদন-সেক্টরগুলোতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন শিক্ষিত কৃষক একজন অক্ষরজ্ঞানহীন কৃষকের চেয়ে বেশী ফসল উৎপাদন করে৷ পবিত্র কোরআন ও ইসলামী শিক্ষায় জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা প্রদানকে মানুষের জন্য মর্যাদার বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ পবিত্র কোরআন অজ্ঞতাকে বা জ্ঞানের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যকে অন্ধকারে পথ চলার সমতুল্য এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনকে আলোর পথে চলার সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে৷ ইসলামের বিশ্বদৃষ্টি অনুযায়ী জ্ঞান সব ধরনের ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপের ভিত্তি এবং জ্ঞানের মাধ্যমে সব ধরনের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব৷ অর্থাৎ মানুষ ও সমাজের জন্য জ্ঞান খুবই জরুরী বা অপরিহার্য বিষয়৷
প্রত্যেক যুগে প্রাপ্ত তথ্য ও জ্ঞাতব্য বিষয় জানা এবং অজানা বিষয়গুলো সম্পর্কে আরো বেশী করে জানা জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর এক বাণীতে বলেছেন, সে ব্যক্তিই জ্ঞানগত ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী যে অতীত ও বর্তমানে অর্জিত মানুষের জ্ঞানকে নিজের জ্ঞানের সাথে যুক্ত করতে পারে৷ যে সমাজ নতুন জ্ঞান বা জ্ঞানগত অগ্রগতি থেকে দূরে থাকবে কিংবা যে জাতির মধ্যে জ্ঞান-তৃষ্ণা থাকবে না সে জাতি প্রকৃত কল্যাণ ও সৌভাগ্যের অধিকারী হবে না৷ ইমাম সাদেক (আঃ) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বা সমাজ যদি জ্ঞান অর্জনের জন্য তৃষ্ণার্ত না হয় তাহলে সে জাতি বা সমাজ সৌভাগ্য বা কল্যাণ লাভের যোগ্যতা অর্জন করে না৷ অন্যদিকে যে সমাজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেয় সে সমাজ বা জাতির লোকদের প্রতিভা বেশী বিকশিত হয়৷ হযরত আলী (আঃ) তাঁর এক বাণীতে বলেছেন, জ্ঞানের মাধ্যমে জীবন যাপন সহজতর হয়৷ ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী নতুন জ্ঞানগত বিষয় পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে সবচেয়ে ভালো উপহার৷ ইসলাম জ্ঞান বিস্তার বা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়াকে এবং জ্ঞান থেকে সব মানুষের উপকৃত হওয়াকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে৷ ধর্মীয় বর্ণনায় বলা হয়েছে, জ্ঞানের প্রচার ও বিস্তার এর যাকাতস্বরূপ৷ উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী নীতিমালায় উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তি হলো শ্রম ও প্রচেষ্টা৷ উন্নয়নের জন্য সমাজের প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কল্যাণকর কাজও করতে হবে৷
পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে সৎ ও কল্যাণকর কাজে লিপ্ত হবার জন্য এবং পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী হতে মানুষের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে৷ আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, জ্ঞান অনুযায়ী কাজ কর তাহলে সম্পদ অর্জন করতে পারবে৷ ধর্মীয় সংস্কৃতি উদ্দীপনা ও উৎসাহের সংস্কৃতি এবং শ্রম ও প্রচেষ্টা ধর্মীয় সংস্কৃতিতে অপরিহার্য একটি বিষয়৷ মহান আল্লাহ বেকার মানুষকে পছন্দ করেন না৷ নিঃসন্দেহে অলসতা ও নির্জীব বা নিস্তেজ অবস্থা এবং বেকারত্ব সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর ফলে সমাজে বিভিন্ন ধরনের দূর্নীতি প্রচলিত হয়৷ হযরত ইমাম সাদেক (আঃ) বলেছেন, মানুষ কাজ বা শ্রম ও প্রচেষ্টা ত্যাগ করলে বিলাসিতা ও অর্থহীন কাজে লিপ্ত হয় এবং এ অবস্থায় সে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে৷ প্রকৃতপক্ষে কর্ম ও শ্রম জাতিগুলোর ক্ষমতা বা শক্তি তুলে ধরার ক্ষেত্র৷ যে জাতি যত বেশী কাজ করবে ও পরিশ্রমী হবে সেই জাতি তত বেশী কাঙিখত পূর্ণতা বা অগ্রগতি অর্জন করবে৷ তাই ইসলাম ধর্ম সুযোগকে কাজে লাগানোর এবং শ্রম ও প্রচেষ্টার ব্যাপারে উদাসীন না থাকার আহবান জানায়৷ কারণ, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি শ্রম ও প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে৷
আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) তাঁর এক সুন্দর বাণীতে বলেছেন, পরিশ্রমীরাই প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতি অর্জন করে, বেকার-জ্ঞানী ব্যক্তিরা নয়৷ অর্থাৎ সে সমাজই উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন করে যে সমাজের চিন্তাবিদ ও জ্ঞানীরা পরিশ্রম করেন৷ কারণ উদাসীন থেকে ও সুযোগ-সুবিধা নষ্ট করে উন্নতি করা যায় না৷ ইসলামের শিক্ষা ও সংস্কৃতি কাজে-কর্মে সকল জনগণের অংশগ্রহণ ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে৷ ইসলামী সংস্কৃতি মানুষকে অন্যদের প্রতি সহায়তা করতে বলে এবং তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে অন্যদের উৎসাহ দেয়৷ ইসলাম মানুষকে নিজ স্বার্থের ব্যাপারে চিন্তার পাশাপাশি সমাজের অন্যদের স্বার্থের ব্যাপারেও চিন্তা করতে বলে৷ আর এ দৃষ্টিভঙ্গী মুসলিম সমাজে ঐক্য বা সংহতির চেতনা সৃষ্টিতে সহায়তা করে৷ ইসলামের দৃষ্টিতে জাতীয় উন্নয়নের জন্য গঠনমূলক কাজে জনগণের অংশগ্রহণ এবং সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা জরুরী৷ উন্নয়নের জন্য সরকারকে সঠিক পরিকল্পনা পেশ করতে হবে ও দিক নির্দেশনা দিতে হবে, অন্যদিকে জনগণকেও কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট হতে হবে৷
আসলে জনগণই উন্নয়নের মূলস্তম্ভ বা শক্তি৷ কারণ, প্রত্যেক মানুষেরই রয়েছে চিন্তাশক্তি, প্রতিভা এবং বিভিন্ন ধরনের যোগ্যতা৷ আর এসব ক্ষমতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো অর্জনে সহায়তা করে৷ যাই হোক্‌, উন্নয়ন প্রক্রিয়া তখনই সফল হবে যখন জনগণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে বেশী গুরুত্ব দিবে৷ স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা উন্নয়নের আরেকটি বড় চালিকাশক্তি৷ ইসলাম মানুষকে কর্তৃত্বপনা, পরনির্ভরতা ও আধিপত্য মেনে না নেয়ার আহবান জানায়৷ এ পবিত্র ধর্মের দৃষ্টিতে প্রকৃত উন্নয়নের সাথে স্বনির্ভরতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে৷ প্রত্যেক জাতি বা সমাজের সম্মান ও গৌরব পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত থাকার ওপর নির্ভর করে৷ এ প্রসঙ্গে আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, বুদ্ধিমান ব্যক্তি ও সমাজ স্বাবলম্বী হবার বিষয়টিকে পরিত্যাগ করে না৷ তিনি আরো বলেছেন, তৃপ্তিদায়ক ও আনন্দদায়ক জীবন তারাই ভোগ করে যারা স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৮ম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনার গত পর্বে আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তিগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছি৷ আজ আমরা উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরকারের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করবো৷ এ প্রসঙ্গে আমরা প্রথমেই দেখবো যে, কোনো দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা ও তত্ত্বাবধানের স্বরূপ বা ধরণটি কেমন হয়ে থাকে৷
পাশ্চাত্যে ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক মহামন্দা দেখা দিয়েছিল তার আগে অর্থনৈতিক তৎপরতায় সরকারের ভূমিকার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হতো না৷ সেযুগে ক্লাসিকেল মতবাদগুলো অর্থনীতি বিষয়ে কর্তৃত্ব করছিল এবং এসব মতবাদই ছিল দিক নির্দেশক৷ এই মতবাদগুলোই সরকারকে অর্থনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখতো৷ ক্লাসিকেল অর্থনীতিবিদদের মতে অর্থনৈতিক তৎপরতাগুলোর পথ প্রশস্ত করাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব৷ কিন্তু ১৯২৯ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দা ক্লাসিকেল অর্থনীতিবিদদের চিন্তাধারা নড়বড়ে করে দেয়৷ বৃটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস তার চাকরী বা কর্মসংস্থান শীর্ষক গ্রন্থে নতুন চিন্তাধারা তুলে ধরার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় বিপ্লব ঘটান৷ তিনি অর্থনৈতিক তৎপরতায় সরকারের হস্তক্ষেপকে বৈধ বলে ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবনতি প্রতিরোধের জন্যে এ ধরনের হস্তক্ষেপকে জরুরী বলেও ঘোষণা দেন৷ তার মতে সরকার কিছু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট প্রতিরোধ করতে পারে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে৷
বর্তমানে পুনরায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক তৎপরতায় সরকারের হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনার প্রবণতা জোরদার হচ্ছে৷ কিন্তু কোনো কোনো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো বিভিন্ন কারণে অর্থনৈতিক বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ অতীতের চেয়েও বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে৷ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতাকে এর সফল দৃষ্টান্ত বলা যায়৷ এই দেশগুলোর দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সরকারকে অবশ্যই অর্থনৈতিক কর্মসূচীর বিষয়ে নীতি নির্ধারণ করতে হবে৷ শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে সরকারকেও সক্রিয়ভাবে কাজে নামতে হবে৷ এজন্যে দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো জোরদার করা এবং এ অবকাঠামোকে উৎপাদন তৎপরতার সাথে সমন্বিত ও সম্পর্কিত করাও সরকারের অন্যতম প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব৷ সুস্থ অর্থনৈতিক তৎপরতার জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখাও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব৷ বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নেই৷ এসব দেশে উৎপাদন তৎপরতায় লাভ বা মুনাফার পরিমাণও খুবই কম৷ আর এ বিষয়গুলো বেসরকারী খাতের উৎপাদন ও লাভজনক তৎপরতার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে আছে৷ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ ও উন্নয়ন জোরদারের লক্ষ্যে জনগণের পুঁজি বা মূলধন আকৃষ্ট করার জন্যে সরকারের উচিত সর্বসাধারণের এবং সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা৷ এ ছাড়াও উন্নয়ন প্রক্রিয়া জোরদারের লক্ষ্যে সামাজিক খাতে বিনিয়োগ, কৃষি খাতের উন্নয়ন, বৈদেশিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ, প্রাশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব৷
এভাবে দেখা যায় সরকারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক তৎপরতা সুসংগঠিত করাটা একটি বহুল প্রচলিত বা গ্রহণযোগ্য বিষয়৷ কিন্তু কিভাবে বা কোন্‌ পন্থায় সরকার এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে সেটাই বিতর্কের বিষয়৷ পবিত্র ধর্ম ইসলামও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা থাকা উচিত বলে মনে করে৷ অবশ্য ইসলাম ব্যক্তির অধিকারগুলোকেও সম্মান করে৷ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং বাইরের আক্রমণ থেকে দেশের সীমানা রক্ষা করাই সরকারের দায়িত্ব নয়৷ জনসেবা করাও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব৷ জাতি বা সমাজকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেয়া সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব৷ ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার যোগ্য লোকদের জন্যে উপযুক্ত চাকরীর সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক ও শিল্প প্রকল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতির পথ সুগম করতে পারে৷ আর এ লক্ষ্যে সরকারের উচিত পুঁজি-বিনিয়োগের প্রক্রিয়াকে সহজ করা অথবা ঋণদেয়া ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ কোনো কোনো বিধান পরিবর্তন করে কৃষক, শিল্প-উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদেরকে উৎসাহিত করা৷ নিঃসন্দেহে এ ধরনের উৎসাহ কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য-খাতগুলোকে চাঙ্গা বা সমৃদ্ধ করবে৷
ইসলামের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী সরকারের সর্বপ্রধান কাজ হলো উপযুক্ত পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে সমন্বয়হীনতা, ঘুষ-দূর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রভৃতি দূর হয়৷ একইসাথে দক্ষ, সৎ, বিশ্বস্ত ও যোগ্য অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতির উপযুক্ত ক্ষেত্র বা ভিত গড়ে তোলাও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব৷ ইসলামী বর্ণনাগুলোতে এ বিষয়টিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ যেমন, আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (আঃ) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর সহযোগীদের বলেছেন, রাষ্ট্রের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ব্যাপারে সঠিক নীতি অনুসরণ কর৷ তাদেরকে পরীক্ষা নীরিক্ষার পর নিয়োগ কর৷ ব্যক্তিগত ইচছা ও স্বেচছাচারের ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ করো না৷ কারণ, ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি বা স্বেচছাচার অত্যাচার অবিচার ও বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর মাত্র৷
উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে সুসংগঠিত বা জোরদার করা৷ আর এ বিষয়টি মৌলিক ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে করা সম্ভব৷ এ ধরনের পুুঁজি বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে থাকে৷ যেমন, রাস্তা-ঘাট, নৌ ও বিমানবন্দর, হাসপাতাল প্রভৃতি নির্মাণ এবং মানব-সম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উন্নত করাও সরকারের অন্যতম দায়িত্ব৷ মোটকথা, বিভিন্ন পন্থা বা মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের জীবন-মানকে প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নত করা ইসলামী সরকারের দায়িত্ব৷ এভাবে সরকারের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অর্থনৈতিক তৎপরতাকে বিকশিত করে এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, তার শানে আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি যে আমার পরে আমার উম্মতের অভিভাবক ও শাসক হবে, তিনি যেন মানুষের ক্ষতি না করেন, জনগণের ক্ষতি করলে তিনি অপমানিত হবেন এবং তিনি যেন জনগণকে দারিদ্র্যকবলিত না করেন, যদি তা করেন তাহলে তিনি কাফের বা অবিশ্বাসী হয়ে যাবেন৷
দক্ষ সরকারের বৈশিষ্ট্য হলো, এ ধরনের সরকার মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদসহ সবধরনের সুযোগ-সুবিধাকে কাঙিক্ষতভাবে ব্যবহার করতে পারে এবং এভাবে ঐ সরকার জাতির বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে উন্নয়নের কাজে লাগায়৷ উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলামী সরকারের এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো জনগণের আত্মিক চাহিদা ও মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং এমন সব নীতি গ্রহণ করা যাতে ব্যক্তি ও সমাজের চাহিদাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি হয়৷ অথচ আমরা দেখছি পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী সরকারগুলো বৈষয়িক উন্নয়নের বেদীতে আত্মিক নিরাপত্তাকে বিসর্জন দেয় এবং বৈষয়িক উন্নতি সাধনের জন্যে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যকে পদদলিত করে৷
উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের আরেকটি প্রধান কর্তব্য হলো কর ব্যবস্থাকে নিখুঁত ও সমন্বিত করা৷ কর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ও জনগণের পক্ষ থেকে কর দেয়ার প্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সরকারের আয় বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম৷ আর এভাবে উন্নয়নের কাজে জনগণের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব৷ কিন্তু এসব কিছুর আগে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের দায়িত্ব যাতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করার শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হয়৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন, যে দেশে জনগণের নিরাপত্তা নেই সেদেশে কোনো কল্যাণ নেই৷ তাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক তৎপরতায় জনগণকে শরীক করা সরকারের দায়িত্ব৷ এছাড়াও ইসলামী সরকারকে ব্যক্তিমালিকানার প্রতি সম্মান বজায় রেখে ন্যায়সঙ্গত পন্থায় কর আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে৷ কর আদায় প্রসঙ্গে আমিরুল মোমেনিনি হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, খারাজ বা কর আদায়ের আগে কৃষিজমিকে সমৃদ্ধ করার কথা ভাবতে হবে৷ কারণ, ভূমি আবাদ বা সমৃদ্ধ না হলে খারাজ আদায় করতে পারবে না৷ (অর্থাৎ ফলন বা ফসল ভালো না হলে কৃষকরা কর দিতে পারবে না৷ ) যারা ভূমি বা কৃষিজমিকে আবাদ না করেই কর চেয়েছে তারাই জনবসতি ও জনগণকে ধবংস করেছে৷ #

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ৯ম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনার গত পর্বে আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরকারের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছি৷ আজকের পর্বে আমরা মুসলিম দেশগুলোসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব বাধা বা সমস্যা দেখা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করবো৷
আপনারা জানেন উন্নয়নশীল বিশ্বে গত কয়েক দশক ধরে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি বিষয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে৷ উন্নয়ন কিভাবে অর্জন করা যায় তা নিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ গবেষণা বা বিতর্কে মশগুল রয়েছেন৷ শিল্প বিপ্লব শুরু হবার পর থেকে কেন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিশ্বের ক্ষুদ্র একটি অংশে ও গুটিকয়েক জাতির মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে? যদি আমরা ইতিহাসের দিকে ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখবো যে, শিল্প বিপ্লবের পর বিপুল পণ্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় পুঁজিবাদী বিশ্ব সব সময়ই বেশী মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করেছে৷ আর এ লক্ষ্য পূরণের জন্যে পুঁজিবাদীরা জাতিগুলোর মধ্যে ভোগের মাত্রা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে৷ কারণ, ভোগের পরিমাণ বা ভোক্তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদকদের হাতে বেশী মুনাফা আসে৷ আর এভাবে প্রবৃদ্ধির গতিও বৃদ্ধি পায়৷ শিল্পোন্নত দেশগুলোর সমস্ত পণ্য অভ্যন্তরীন বাজারে ব্যবহৃত হবার সুযোগ না থাকায় শিল্পোন্নত বিশ্ব তার উদ্বৃত্ত বা অবশিষ্ট পণ্যসামগ্রী উন্নয়নশীল বিশ্বে রপ্তানীর নীতি গ্রহণ করে৷ শিল্পোন্নত বিশ্বের নীতি নির্ধারকরা এ লক্ষ্য পূরণের জন্যে বিশ্বব্যাপী এমনভাবে শ্রম-বিভাজন করে যে শিল্পোন্নত বিশ্ব মৌলিক বা অতি জরুরী পণ্যগুলো উৎপাদন করতে থাকে এবং অনুন্নত বিশ্ব শুধু কাঁচামাল উৎপাদন করতে বাধ্য হয়৷ এরিমধ্যে উন্নত বিশ্বে উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদিত হতে থাকে৷ ফলে শ্রমবিভাজনের ঐ নীতি আরো বেগবান হয় এবং এভাবে অনুন্নত বিশ্ব উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷
পুরনো ঔপনিবেশিক যুগ শেষ হবার পর শিল্পোন্নত দেশগুলো ভিন্ন পন্থায় কর্তৃত্বকামিতা শুরু করে৷ কর্তৃত্বকামী দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বকে এটা বোঝায় যে ভোগপ্রবণতার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করলে তা তৃতীয় বিশ্বের জন্যে লাভজনক হবে এবং এভাবে তৃতীয় বিশ্বে উন্নয়নের গাছ ফলবতী হবে বা উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হবে৷ পুঁজিবাদী বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা অনুন্নত দেশগুলোর অবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন না৷ আর এ অবস্থায় তারা ভোগের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে এ দেশগুলোকে পরামর্শ দেন৷ তৃতীয় বিশ্বের এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী পশ্চিমা পণ্য বিক্রি করার মধ্যে অঢেল মুনাফা দেখতে পায়৷ এ ধরনের ব্যবসায়ীসহ পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি বা কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল শিল্প কারখানার মালিক ও পশ্চিমাপন্থী এক শ্রেণীর শিক্ষিত মানুষ নিজ নিজ দেশে পশ্চিমা ভোগ্যপণ্যের প্রচলন ঘটায়৷ এভাবে সময়ের পরিক্রমায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জনগণ এমনভাবে পরিচালিত হতে থাকে যে এর ফলে তাদের তৎপরতা কার্যতঃ সৃষ্টিশীলতা বা উদ্ভাবন-ভিত্তিক হয়ে ওঠে না৷ অথচ আমরা দেখতে পাই, উন্নত বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও নতুন প্রযুক্তি-ভিত্তিক৷
উন্নয়নশীল দেশগুলো কাঠামোগত দিক থেকে এমন কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যে এ বৈশিষ্ট্যগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সমস্যা বা বাধার সম্মুখীন করেছে৷ যেমন, প্রযুক্তির দিক থেকে উন্নয়নশীল বিশ্ব উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তিগত কর্তৃত্বের আওতাধীন৷ এছাড়াও দূর্বল ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কর্মীর অভাব এবং আমদানী-নির্ভর প্রযুক্তির মতো কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে৷ উন্নয়নশীল বিশ্বের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন দিক হলো, এ বিশ্বে যোগানের তুলনায় চাহিদার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে৷ এ অবস্থার অন্যতম কারণ হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধি৷ অন্যদিকে পাশ্চাত্যের ভোগ-প্রবণতার মডেল অনুকরণের ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বে যোগানের তুলনায় চাহিদার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকছে না বা মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে৷ সীমিত মাত্রায় পুঁজিবিনিয়োগ এবং এর ফলে কর্মী বা শ্রমিকের চাহিদা খুব কম থাকা, বাণিজ্য ও সেবাখাতে তুলনামূলকভাবে বেশী পুঁজিবিনিয়োগ উন্নয়নশীল বিশ্বের আরো কিছু অভিন্ন সমস্যা৷
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর আরো কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট হলো বিপুল বেকারত্ব ও ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি৷ তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অর্থ উপার্জনের উৎস কেবল একটি মাত্র পণ্যের ওপর নির্ভরশীল বলে এ দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়৷ আর এ সমস্যাগুলো উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে বিরাজ করছে৷ উন্নয়নশীল দেশগুলো উৎপাদান ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে পুঁজি বিনিয়োগ করতেও সক্ষম নয়৷ ফলে এ দেশগুলোর জাতীয় আয়ও খুব কম৷ আর জাতীয় আয় কম থাকায় ব্যক্তির আয়ও খুব কম হচ্ছে৷ এ বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব রাখছে৷ অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতীয় আয়ের একটা বড় অংশ কাঁচামাল রপ্তানী থেকে অর্জিত হয়৷ তাই এ দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূলতঃ কাঁচামালের বাজার-পরিস্থিতি অথবা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে৷
উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কলকারখানাগুলোর মালিক হলো বিদেশী কোম্পানী৷ এ দেশগুলো শুধু রপ্তানী বা বাণিজ্য পণ্যের কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানী করে থাকে৷ উন্নত দেশগুলো এসব কাঁচামাল কেনা বন্ধ করে দিতে পারে এমন বিপদের আশঙ্কা সব সময়ই রয়েছে৷ আর এ বিষয়টিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকাকে ধীর বা স্থবির করে দিতে পারে৷ অধিকাংশ মুসলিম দেশের সমস্যা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা অনেকটা একই ধরনের৷ অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যার মূল বা শেকড় রাজনৈতিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত৷ ইতিহাস থেকে জানা যায় অতীতে মুসলমানরাই ছিল বিজ্ঞান ও সভ্যতায় অগ্রগামী৷ এমনকি পাশ্চাত্যের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে মুসলমানরাই ছিল ইউরোপীয় জাতিগুলোর শিক্ষক৷ কিন্তু মুসলিম দেশগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণে এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে নিজ আত্মসত্ত্বা বিকিয়ে দেয়ার কারণে আভ্যন্তরীণ সংহতি হারিয়ে ফেলে৷ দীর্ঘকাল ধরে উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো তার অনুগত ও স্বৈরাচারি মুসলিম শাসকদের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর ওপর নিজ কর্তৃত্ব বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়৷
অন্যদিকে পুঁজিবাদী দেশগুলো বিজ্ঞান, শিল্প ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করার পর অন্য দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক দূর্বলের সাথে শক্তিমানের সম্পর্কে পরিণত হয়৷ উপনিবেশ-কবলিত দেশগুলো ও বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো যখন দূর্বল হয়ে পড়ে তখনই সম্পর্কের এ নতুন সমীকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ উপনিবেশবাদী দেশগুলো দূর্বল দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে এ দেশগুলোর অগ্রগতি ও উন্নয়নকে ঠেকিয়ে রাখতে চায়৷ উপনিবেশবাদীরা তাদের এ অশুভ লক্ষ্য পূরণের জন্যে বিভিন্ন পন্থা ব্যবহার করে থাকে৷ যেমন, তারা উন্নয়নশীল বিশ্বের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয় এবং এভাবে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোর উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল শক্তি ধবংস করে৷ আর আমরা সবাই এটা জানি কোনো জাতি যদি নিজেকে বিশ্ব-সমাজের মধ্যে হীন বা ছোট ভাবে তাহলে সে জাতির মনোবল ভেঙ্গে যায় এবং সে জাতি বিদেশীদের যে কোনো ধরনের আগ্রাসনের সহজ শিকারে পরিণত হয়৷ যখন কোনো জাতি তার উচচতর মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে তখন সে জাতি বিভ্রান্তি ও পতনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে৷ আর এ অবস্থায় বিজাতীয়দের অধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়৷ মূলতঃ এভাবেই উন্নত বা উপনিবেশবাদী দেশগুলো বিশ্বের জাতিগুলোর ওপর তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা করে থাকে৷

ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
( ১০ম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, ইসলাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনার গত পর্বে আমরা মুসলিম দেশগুলোসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব বাধা বা সমস্যা দেখা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেছি৷ আমরা বলেছিলাম কাঠামোগত দিক থেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের কতগুলো অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷ এসব বৈশিষ্ট্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা বা সমস্যা সৃষ্টি করছে৷ যেমন, উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, দূর্বল ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কর্মীর অভাব, আমদানী-নির্ভর প্রযুক্তি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাশ্চাত্যের ভোগ-প্রবণতার মডেল অনুকরণ ও এর ফলে যোগানের তুলনায় চাহিদা বেশী থাকা, বিপুল বেকারত্ব ও ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং একটি মাত্র পণ্য রপ্তানীভিত্তিক অর্থনীতি প্রভৃতি ৷ এ ছাড়াও বর্তমান যুগে কোনো কোনো মুসলিম দেশ রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর কারণে এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে নিজেকে বিকিয়ে দেয়ার কারণে আভ্যন্তরীণ সংহতি হারিয়ে ফেলেছে৷ আর এ বিষয়টি তাদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রক্রিয়াকে মৌলিক সমস্যার সম্মুখীন করেছে৷
অন্যদিকে উপনিবেশবাদী দেশগুলোও যুগ যুগ ধরে দূর্বল দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাস, সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিনাশের চেষ্টা করেছে এবং এভাবে দূর্বল দেশগুলোর ওপর তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বিস্তারের পথ সুগম করেছে৷ দুঃখজনকভাবে বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে খুবই দূর্বল ও হীন ভাবছে৷ এসব দেশের নেতারা মনে করছেন, পশ্চিমাদের রেডিমেড প্রযুক্তি অর্জন করতে পারলেই তৃতীয় বিশ্বের সমস্যাগুলো মিটে যাবে৷ অথচ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রযুক্তি একটি কর্মসূচী বা পদ্ধতি মাত্র এবং যন্ত্রপাতি, শিল্প ও শিল্পের যন্ত্রাংশগুলো প্রযুক্তির ফসল৷ মিশরের চিন্তাবিদ ডক্টর ইউসুফ ইব্রাহীম ইউসুফ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, উন্নত দেশগুলোর কাছে থাকা প্রযুক্তিকে ঘোড়সাওয়ারের হাতের এক মুঠো ঘাসের সাথে তুলনা করা যায়৷ ঘোড়সাওয়ার বা অশ্বারোহী ঐ ঘাসটুকু একটা দীর্ঘ লাঠির মাধ্যমে ঘোড়ার মুখের একটু সামনে ঝুলিয়ে রাখে এবং ঘোড়া ঐ ঘাসের মুঠো খাওয়ার লোভে দ্রুত দৌড়াতে থাকে, কিন্তু কখোনোই তার নাগাল পায় না৷ ঠিক এভাবেই উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের প্রযুক্তির ফসল তথা শিল্প-পণ্য বিক্রির বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা তৃতীয় বিশ্বকে এ ধারণা দিচেছ যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যদি উন্নত বিশ্বের আধুনিকতম শিল্প-পণ্য বা যন্ত্রপাতি ক্রয় করে, তাহলে তারা ঐ প্রযুক্তির অধিকারী হবে৷ কিন্তু বাস্তবে তারা ঐ ঘোড়ার মতোই সব সময়ই শিল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকে৷”
ডক্টর ইউসুফ ইব্রাহীম ইউসুফের মতে, যে বিজ্ঞান বা বিদ্যা ও গবেষণা প্রযুক্তি সৃষ্টি করে সে জ্ঞান-বিজ্ঞান বা গবেষণাকে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলোর কাছে হস্তান্তর করতে হবে৷ অবশ্য এ বিদ্যা বা জ্ঞান অর্জনের জন্যে কিছু যন্ত্রপাতি বা যন্ত্রাংশ আমদানী করা দোষণীয় কাজ নয়৷ আর এরই আলোকে বলা যায়, একটি কারখানার সমস্ত যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে কিনে এনে শিল্প-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কখোনোই উন্নত বিশ্বের সমপর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব নয়৷ অনুরূপভাবে যে দেশ পারমাণবিক-জ্বালানী উৎপাদনের লক্ষ্যে পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণ করবে না, সেদেশ পারমাণবিক প্রযুক্তির যুগেও পিছিয়ে থাকবে৷
যে দেশ শুধু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আমদানী করে, কিন্তু গবেষণা করে না সে দেশ প্রকৃত অগ্রগতি বা উন্নতির দিকে অগ্রসর হতে পারবে না৷ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আমদানীর ফলে যে পরিবর্তনটুকু ঘটবে তা হলো বাহ্যিকভাবে দেশটির শহরগুলোর চেহারা পাল্টে যাবে এবং আমদানী-নির্ভর পণ্যের সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে৷ আসলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে পাশ্চাত্য থেকে প্রযুক্তি কিনে কোনো কোনো উন্নয়নশীল দেশ জাতীয় পুঁজি বিনষ্ট করছে মাত্র, এবং এ দেশগুলো কখোনোই সঠিকভাবে আধুনিক প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ পাবে না৷ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন কোনো জাতির উন্নয়ন সে জাতির বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার অবকাঠামো থেকে উৎসারিত হতে হবে৷ প্রকৃত উন্নয়ন একমাত্র আভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা ও জাতীয় সম্পদের ভিত্তিতে সম্ভব৷ এক্ষেত্রে মানব সম্পদের ভূমিকাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ মানুষ যদি উন্নতি ও পরিবর্তনের জন্যে খুবই আগ্রহী হয় তাহলে সে তার কাজের গুণগত ও পরিমাণগত অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে এবং এ জন্যে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে পারে৷ আর এভাবে মানুষ উদ্ভাবনী প্রতিভা বা সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে উন্মোচন করতে পারে নিত্য-নতুন দিগন্তের ৷ তাই উন্নয়ন সাধনের জন্যে মানব সম্পদের গুণগত ও পরিমাণগত উন্নতির লক্ষ্যে পুঁজি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে৷ উন্নয়ন-কৌশল ও এ সংক্রান্ত কর্মসূচির ব্যাপারে তৃতীয় বিশ্ব ও মুসলিম বিশ্বকে অবশ্যই নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে৷
মুসলিম ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উচিত নিজ পরিবেশ ও পরিস্থিতির আলোকে উন্নয়নের নীতি নির্ধারণ করা৷ এর পাশাপাশি বিশ্বের সর্বসাম্প্রতিক বা আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে কাজে লাগানোর জন্যেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে৷ মুসলিম ও তৃতীয় বিশ্বের এটা জানা উচিত যে উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো আত্মবিশ্বাস, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও সঠিক পরিকল্পনা৷ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মান-উন্নয়ন, সামাজিক সংস্কার, শ্রমের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং জাতির অন্যান্য পুঁজি বা গঠনমূলক দিকের বিকাশ সাধন করা উন্নয়নের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ৷ #

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৬০৮ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)

২ টি মন্তব্য

  1. কমেন্টের রিপ্লাই দিলে পান কিনা , জানান ।