লগইন রেজিস্ট্রেশন

“ফিকহে হানাফীঃ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য” এর পাঠ নির্যাস

লিখেছেন: ' সাদাত' @ শনিবার, এপ্রিল ১০, ২০১০ (১০:০৫ পূর্বাহ্ণ)

আহকাম বিষয়ক অধিকাংশ নির্দেশনা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বোঝার জন্য ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। তাই তা অনুসরণের শরীয়তসম্মত পন্থা হচ্ছে :
১. যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী তিনি ইজতিহাদের ভিত্তিতে আমল করবেন।
২. যার ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই তিনি মুজতাহিদের তাকলীদ করবেন।
এটিই হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের কুরআন-সুন্নাহসম্মত পন্থা।

পক্ষান্তরে তৃতীয় পদ্ধতি,
অর্থাৎ ইজতিহাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ইজতিহাদের প্রচেষ্টা
কিংবা
ইজতিহাদের যোগ্যতাহীন লোকের অনুসরণ, দু’টোই শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত।

শিরোনামে ‘ফিকহ’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ্‌য় উল্লেখিত হুকুম-আহকাম এবং পরবর্তীতে উদ্ভূত নানাবিধ সমস্যার কুরআন-সুন্নাহ্‌ভিত্তিক সমাধানের সুসংকলিত রূপকেই পরিভাষায় ফিকহ বলা হয়। যে ইমামগণ তা আহরণ করেছেন তাদের সঙ্গে সম্বন্ধ করে এর বিভিন্ন নাম হয়েছে। যেমন ফিকহে হানাফী, ফিকহে মালেকী, ফিকহে শাফেয়ী ও ফিকহে হাম্বলী। এই সব ফিকহের, বিশেষত ফিকহে হানাফীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।


প্রথম বৈশিষ্ট্য : কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার স্বীকৃত পদ্ধতি


ফিকহে হানাফী ও অন্যান্য ফিকহের প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের স্বীকৃত ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। আল্লামা ইবনুল উযীর (মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম) ইয়ামানী (মৃত্যু : ৮৪০ হি.) বলেন,

তাঁর (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর) মুজতাহিদ হওয়ার বিষয়ে (মুসলিম উম্মাহর) ইজমা রয়েছে। কেননা, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মতামতসমূহ তাবেয়ী যুগ থেকে আজ নবম হিজরী পর্যন্ত গোটা মুসলিম জাহানে সর্বজনবিদিত। যারা তা বর্ণনা করেন এবং যারা অনুসরণ করেন কারো উপরই আপত্তি করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে মুসলিম উম্মাহর (আলিমগণের) অবস্থান হল, তাঁরা হয়তো সরাসরি তার অনুসরণ করেছেন, কিংবা অনুসরণকারীদের উপর আপত্তি করা থেকে বিরত থেকেছেন। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এভাবেই ইজমা সম্পন্ন হয়ে থাকে।


দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য : কুরআন-সুন্নাহর আহকাম ও ফিকহুস সালাফের উত্তম সংকলন


ফিকহে হানাফীর সকল সিদ্ধান্ত কুরআন-সুন্নাহ ও আছারে সাহাবার ভিত্তিতে প্রমাণিত।

বিভিন্ন সহীহ সনদে ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে যে নীতিমালা উল্লেখিত হয়েছে তার সারকথা এই-

    ১. মাসআলার সমাধান যখন কিতাবুল্লাহ্‌য় পাই তখন সেখান থেকেই সমাধান গ্রহণ করি।

    ২. সেখানে না পেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ এবং সহীহ হাদীস থেকে গ্রহণ করি, যা নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সহীহ হাদীস আমাদের জন্য শিরোধার্য। একে পরিত্যাগ করে অন্য কিছুর শরণাপন্ন হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

    ৩. এখানেও যদি না পাই তবে সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্তের শরণাপন্ন হই।

    ৪. কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতু রাসূলিল্লাহ ও ইজমায়ে সাহাবার সামনে কিয়াস চলতে পারে না। তবে যে বিষয়ে সাহাবীগণের একাধিক মত রয়েছে সেখানে ইজতিহাদের মাধ্যমে যার মত কিতাব-সুন্নাহ্‌র অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয় তা-ই গ্রহণ করি।

    ৫. মাসআলার সমাধান এখানেও পাওয়া না গেলে ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছে থাকি। তবে এক্ষেত্রেও তাবেয়ীগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হই না।


তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : শূরাভিত্তিক সংকলন


১. ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর একটি বিশেষত্ব এই যে, তিনি ছিলেন সঙ্গী-সৌভাগ্যে অতি সৌভাগ্যবান। সমকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর সঙ্গে ছিল।

কুরআন-সুন্নাহ, হাদীস, আছার, ফিকহ, ইজতিহাদ, যুহদ ও আরাবিয়্যাতের দিকপাল মনীষীরা ছিলেন তাঁর শীষ্য। এঁদের সম্মিলিত আলোচনা ও পর্যালোচনার দ্বারা ফিকহে হানাফী সংকলিত হয়েছে।

২. কুফা নগরীর বিখ্যাত মনীষী ইমাম সুলায়মান ইবনে মিহরান আমাশ রাহ. (১৪৮ হি.) কে এক ব্যক্তি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মজলিসের দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এঁদের জিজ্ঞাসা করুন। কেননা, এঁদের নিকট যখন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন তারা সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন এবং (সর্বদিক পর্যালোচনার পর) সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন।’

৩.জনৈক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে বললেন, ‘আবু হানীফা এখানে ভুল করেছেন।’ ওকী বললেন, আবু হানীফা কীভাবে ভুল করতে পারেন,
তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আবু ইউসুফ, যুফার ইবনুল হুযাইল ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের মতো ফকীহ ও মুজতাহিদ,
হিব্বান ও মানদালের মতো হাফিযুল হাদীস,
কাসিম ইবনে মা’ন-এর মতো আরাবিয়্যাতের ইমাম এবং
দাউদ ইবনে নুছাইর ত্বয়ী ও ফুযাইল ইবনে ইয়াযের মতো আবিদ ও যাহিদ?
এই পর্যায়ের সঙ্গী যাঁর রয়েছে তিনি ভুল করবেন কীভাবে? কখনো যদি তাঁর ভুল হয় তবে তো এঁরাই তাকে ফিরিয়ে আনবেন।’

৪. ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত রাহ. (২১৩ হি.) বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর চল্লিশজন সঙ্গী গ্রন্থসমূহ (ফিকহে হানাফী) সংকলন করেছেন। তাঁদের শীর্ষ দশজনের মধ্যে ছিলেন আবু ইউসুফ, যুফার, দাউদ ত্বয়ী, আসাদ ইবনে আমর, ইউসুফ ইবনে খালিদ ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদা।
শেষোক্ত জন সিদ্ধান্ত-সমূহ লিপিবদ্ধ করতেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।


চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : অবিরাম আলোচনা ও পর্যালোচনা দ্বারা সুসংহত


আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রাহ. ‘ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন’ গ্রন্থে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন ভূখণ্ডের ফকীহ ও মুজতাহিদদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা ‘তবাকা’ অনুসারে উল্লেখ করেছেন। এতে কুফা, শাম, মিসর প্রভৃতি বিখ্যাত কেন্দ্রের আলোচনা এসেছে।

কুফা নগরীর আলোচনায় ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর সমসাময়িক সাতজন ফকীহর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা, আবদুল্লাহ ইবনে শুবরুমা, সায়ীদ ইবনে আশওয়া, শরীক ইবনে আবদুল্লাহ, কাসিম ইবনে মা’ন, সুফিয়ান ছাওরী ও হাসান ইবনে হাই।

পরবর্তী তবাকায় উল্লেখিত হয়েছেন সর্বমোট ১৪ জন। লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, এঁদের মধ্যে ৮ জনই ‘আসহাবু আবু হানীফা’ শিরোনামে।

পক্ষান্তরে সুফিয়ান ছাওরী ও হাসান ইবনে হাই রাহ. প্রত্যেকের ২ জন করে সঙ্গীর নাম উল্লেখিত হয়েছে। অবশিষ্ট দু’জন হলেন, হাফছ ইবন গিয়াছ ও ওকী ইবনুল জাররাহ। (ইলামুল মুয়াককিয়ীন ১/২৬) উল্লেখ্য, ইবনুল কাইয়িম রাহ. এ দু’জনকে আলাদাভাবে উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁরাও ‘আসহাবু আবী হানীফা’র অন্তর্ভুক্ত।

তদ্রূপ ইমাম আবু হানীফার সমসাময়িকদের মধ্যে কাসিম ইবনে মা’নকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তিনিও ইমাম আবু হানীফার সঙ্গী এবং ফিকহে হানাফীর অন্যতম ইমাম। অন্য ফকীহদের কোনো শাগরিদ এই তবাকায় উল্লেখিত হননি। এ থেকে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মনীষী শীষ্যদের প্রাচুর্য সম্পর্কে অনুমান করা যায়।

ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে যে মনীষীগণ তাঁর ফিকহ বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যা প্রায় চার হাজার।


পঞ্চম বৈশিষ্ট্য : মুসলিম জাহানে কুরআন-সুন্নাহর আইন হিসেবে গৃহীত


ফিকহে হানাফী ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজশক্তিগুলোর রাষ্ট্রীয় আইন। বিভিন্ন সালতানাতের সময় কুফা ও বাগদাদ থেকে শুরু করে পূর্ব দিকে কাশগর ও ফারগানা পর্যন্ত, উত্তরে হালাব, মালাত্‌ইয়া ও এশিয়া মাইনর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে মিসর ও কাইরাওয়ান পর্যন্ত ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালিত হয়েছে। তাই মুসলিম জাহানের এই সুবিস্তৃত অঞ্চলে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন এবং সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ফিকহে হানাফীর অবদান অনস্বীকার্য।


[এই লেখাটি মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ এর "ফিকহে হানাফীঃ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য" এর একটি পাঠ নির্যাস]

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৭৪৪ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

১০ টি মন্তব্য

  1. অনেক ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য। ইমাম আবু হানিফা যে কয়জন সাহাবীর দেখা পেয়েছিলেন, তাদের নামগুলি পোষ্টের শেষে সংযুক্ত করে দিতে পারেন। (Y)

    হাফিজ

    @তামীম, আপাতত: আমার হযরত আনাস (রা:) এর নাম মনে পড়ছে ।

    সাদাত

    @তামীম,

    দ্য মুসলিম ভাইয়ের পোস্ট হতে:

    ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাবেয়ী ছিলেন।

    এই উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন সাহাবায়ে-কেরাম। সাহাবীদের পরবর্তী মর্তবা হচ্ছে তাবেয়ীগণের। সর্বসম্মতভাবে সাহাবীর সংজ্ঞা হলোঃ যাঁরা ঈমানের সাথে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন এবং ঈমান নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তাবেয়ী হচ্ছেন, যাঁরা ঈমানের সাথে সাহবীগণের সাক্ষাত লাভ করেছেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন। (নাখবাতুল-ফেকার)
    সাহাবী এবং তবেয়ীগণের মর্যাদা নির্দেশ করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ঈমান আনার ব্যাপারে অগ্রবর্তিগণ, মুহাজের ও আনসারবৃন্দ এবং তাদের সৎকর্মের যারা অনুসরণ করেছেন তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
    হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, অত্যন্ত সৌভাগ্রবান সেই সমস্ত লোক যারা আমার সাক্ষাত লাভ করেছে এবং আমার সাক্ষাত যারা পেয়েছে, তাদেরকে পেয়েছে।
    অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে- সর্বাপেক্ষা বরকতময় হচ্ছে আমার সময়কাল এবং তার পরবর্তী যুগ আর তার পরবর্তী যুগ।
    ইমাম আবু হানীফার রহ. জন্ম ৮০ হিজরী সনে। সর্বাপেক্ষা বয়স্ক সাহাবী হযরত আবু তোফায়েল রা. ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরীতে। আবু হানীফার জন্মকাল থেকে নিয়ে একশত দশ হিজরী এই দীর্ঘ ত্রিশ বছর সময়কালের মধ্যে শতাধিক সাহাবী জীবিত ছিলেন। হাফেযুল হাদিস ইমাম মুযনীর রহ. বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন ৭২জন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছিলেন। (মুজামুল মুসান্নেফীন)

    হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. বলেন, তাবেয়ী হওয়ার জন্য সাহাবীগণের সাক্ষাত লাভই যথেষ্ট। কেননা, হাদীস শরীফে শুধুমাত্র দেখা’র কথা বলা হয়েছে। সে মতে যারা তাবেয়ী হওয়ার জন্য দীর্ঘ সাহচর্য এবং সাহাবীগণের নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করাকেও শর্ত নির্ধারণ করেন তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। (নুযহাতুননযর)
    শায়খ আবুল হাসান হাফেজ ইবনে হাজারের উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে বলেন- আল্লামা এরাক্বীর অভিমত অনুযায়ী এটাই অধিকসংখ্যক আলেমের অভিমত এবং এটাই সর্বাধীক গ্রহণযোগ্য তথ্য। কেননা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য থেকে তাই প্রমাণিত হয়। সুতরাং হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী ইমাম আবু হানীফা রহ. সন্দেহাতীত ভাবে তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত বলে প্রমাণিত হল। কেননা, তিনি আনাস ইবনে মালেক রা. এবং অন্য আরো কয়েকজন সাহাবীকে দেখেছেন। যেসব লোক ইমাম আবু হানীফকে রহ. তাবেয়ীদের মর্যাদা দিতে চান না, এরা নির্বোধ এবং বিদ্বষপরায়ন। (প্রাগুক্ত)

    হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. আরো লিখেছেন- ইমাম আবু হানীফা রহ. বহুসংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। কেননা, তিনি ৮০ হিজরী সনে কুফায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেসময় সেই শহরে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. জীবিত ছিলেন। তাঁর ইন্তেকাল ৮০ হিজরীর অনেক পরে হয়েছে। তেমনি বসরাতে আনাস ইবনে মালেক রা. ছিলেন। তাঁর ইন্তেকাল হিজরী নব্বই সনে পরে হয়েছে। সে মতে ইমাম আবু হানীফা রহ. নিঃসন্দেহে তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। (তানসীকুন-নেজাম)
    বুখারী শরীফের ব্যাখাগ্রন্হে ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. উপরোক্ত সিদ্ধান্তটি আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত বলে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ যাহাবী রহ. বলেন, ইমাম আবু হানীফা রহ. সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেককে রা. অনেকবার দেখেছেন। (খাইরাতুল-হেসান)
    আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী রহ. মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গন্হে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন।
    এঁরা হচ্ছেন-
    ১) হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. (ওফাত ৯৩ হিজরী)
    ২) আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. (ওফাত ৮৭ হিজরী)
    ৩) সহল ইবনে সাআদ রা. (ওফাত ৮৮ হিজরী)
    ৪) আবু তোফায়ল রা. (ওফাত ১১০ হিজরী)
    ৫) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রা. (ওফাত ৯৯ হিজরী)
    ৬) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. (ওফাত ৯৪ হিজরী)
    ৭) ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রা. (ওফাত ৮৫ হিজরী)

    ইবনে সাআদ লিখেছেন- সার্বিক বিচারেই ইমাম আবু হানীফা রহ. একজন তাবেয়ী ছিলেন। তাঁর সতীর্থ ফেকাহর ইমামগণের মধ্যে আর কারো এই মর্যাদা লাভের সৌভাগ্য হয় নাই। (তানসীক্ব)
    আল্লামা খাওয়ারেজমী রহ. বলেন- ওলামাগণের এ বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণের পবিত্র মুখ থেকে হাদিস শ্রবণ করে তা বর্ণনা করেছেন। তবে এরূপ হাদিসের সংখ্যা কত ছিল, এ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। (তানসীক্ব)
    ইমাম আবু হানীফা রহ. কর্তৃক সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা কারো মতে ছয়, কারো মতে সাত এবং কারো মতে আটখানা। যেসব সাহাবী থেকে ইমাম সাহেব হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, তাঁদের নাম যথাক্রমে – আনাস ইবনে মালেক রা., আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা., সহল আবনে সাআদ রা., আবু তোফয়ল রা., আমের ইবনে ওয়াছেলা রা., ওয়াছেলা ইবনে আশক্বা রা., মা’কাল ইবনে ইয়াসার রা., এবং জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. প্রমুখগণ।
    হাদিস শাস্ত্রের ‘ আমিরুল মুমেনীন’ রূপে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক স্বরচিত কবিতার এক পংক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, নোমান ( আবু হানীফা ) এর পক্ষে গর্ব করার মতো এতটুকুই যথেষ্ট যা তিনি সরাসরি সাহাবীগণের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।
    ইমাম আবু হানীফা রহ. স্বয়ং একটি বর্ণনায় বলেন, আমার জন্ম হিজরী ৮০ সনে এবং ৯৬ সনে প্রথম হজে যাই। তখন আমার বয়স ষোল বছর। মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করে দেখলাম, একটি বড় হালকায় বহু লোক সমবেত হয়ে রয়েছেন। আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কিসের জমায়েত? তিনি বললেন, এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনুল হারেছের রা. পাঠদানের হালকা। এ কথা শুনে আমি সেদিকে অগ্রসর হলাম। তাঁকে বলতে শুনলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দীন সম্পর্কিত গভীর জ্ঞান অর্জনে আত্মনিয়োগ করে, তার সকল প্রয়োজনের জিম্মাদার স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হয়ে যান এবঙ তাকে এমন সব উৎস থেকে রিজিক পৌছাতে থাকেন, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। (মুসনাদে ইমাম আযম)
    উল্লেখ্য যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারেছের রা. ইন্তেকাল হয়েছে ৯৯ হিজরীতে। তখন ইমাম সাহেবের বয়স হয়েছিলো ১৯ বছর।

    ‘এলামুল-আখবার’ নামক গ্রন্হে বর্ণিত অন্য একখানা হাদিস ইমাম আবু হানীফা রহ. সরাসরি সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেকের রা. নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদিসে বলা হয়েছে যে, এলেম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ।
    একই সুত্রে হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে ইমাম আবু হানীফা রহ. কর্তৃক বর্ণিত অন্য আর একখানা হাদিস হচ্ছে- পাখীরা আল্লাহর উপর যতটুকু ভরসা করে জীবন ধারন করে কোন বান্দা যদি ততটুকু ভরসা করতে শেখে তবে আল্লাহ পাক তাকেও অনুরূপ রিজিক দান করবেন। পাখীরা সকাল বেলায় খালি পেটে বের হয়ে যায়, সন্ধায় পেট ভরে বাসায় ফিরে আসে।
    ইমাম সাহেব আর একখানা হাদিস সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিস খানা হচ্ছে- যে ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ পাক তার জন্য বেহেশতে গৃহ নির্মাণ করবেন।
    শেষোক্ত হাদিসখানাকে ইমাম জালালুদ্দিন সিয়ুতী রহ. মোতাওয়াতের হাদিস রূপে অভিহিত করেছেন।
    মোল্লা আলী কারী রহ. বরেন, এই হাদিসটির অন্যুন পঞ্চাশটি সনদ আমি সংগ্রহ করেছি। তম্মধ্যে ইমাম আবু হানীফার রহ. মাধ্যমে বর্ণিত সনদিই সর্বোত্তম।

  2. কুফা নগরীর বিখ্যাত মনীষী ইমাম সুলায়মান ইবনে মিহরান আমাশ রাহ. (১৪৮ হি.) কে এক ব্যক্তি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মজলিসের দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এঁদের জিজ্ঞাসা করুন। কেননা, এঁদের নিকট যখন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন তারা সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন এবং (সর্বদিক পর্যালোচনার পর) সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন।’

    সাদাত, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি পয়েন্ট । যারা হঠাৎ হানাফী মাজহাবের নামাজের ভুল নিয়ে বই লিখে তারা কি কোনো গবেষনা প্রতিষ্ঠান ? তারা কি মজলিশে শুরাহ করে ফতোয়া বোর্ডের মাধ্যমে ফতোয়া প্রদান করে ?

    হাফিজ পাঠানের একটি বই বের হয়েছে , যেখানে সম্পূর্ন একক প্রচেষ্টায় সে প্রমান করার চেষ্টা করেছেন হানাফীদের অনেকে আমলের কোনো দলীল নেই ।
    সে কি বই বের করার আগে কয়েকশ আলেমের কাছে দেখিয়েছি তার গবেষনা লব্ধ মাসআলা সঠিক কিনা ?

    দ্য মুসলিম

    @হাফিজ,

    উনারা বেশী বেশী তাকওয়ার কথা বলে থাকেন। একজন তাবেয়ীর বিরুদ্ধে শুধু শুধু বিভ্রান্তি ছড়িয়ে উনারা কোন ধরণের তাকওয়া অবলম্বন করেন তা ভেবে দেখার বিষয়।

    দ্য মুসলিম

    আমি সবসময় চেষ্টা করছি মধ্যপন্হা অবলম্বন করতে। কিন্তু তাদের আলিমরা শুধু শুধু হানাফী মাজহাবের বিরুদ্ধে যে ধরণের বিভ্রান্তি মুলক বিবৃতি দিয়ে থাকেন, তাতে তাদেরকে আলিম বলতেও বাধে। নিজের নামের আগে মুফতি শাইখ ইত্যাদি টাইটেল লাগিয়ে উনারা কোন ধরণের ইসলাম চর্চা করেন তা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। বিবৃতি গুলো এমন ভাবে দেন যেন একমাত্র হানাফী-দেওবন্দী ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলার মধ্যেই উনাদের এলেমের সার্থকতা রয়েছে। হায়রে তাকওয়া!!!

    হাফিজ

    @দ্য মুসলিম,
    রাসূল ﷺ বলেন,
    “আমার উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম আমার প্রজন্ম। এরপর তৎসংলগ্ন প্রজন্ম(তাবেয়ীদের প্রজন্ম)। এরপর তৎসংলগ্ন প্রজন্ম (তাবে-তাবেয়ীদের প্রজন্ম)।” (বুখারী ও মুসলিম)

    হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমানিত তাবেয়ীনদের এবং তাবে-তাবেয়ীনদের যুগ শ্রেষ্ঠ । তাদের অনুসরন করলে হয় অন্ধ অনুসরন !!!

  3. সাদাত ভাই,

    দুটো বিষয় একসাথে এসে গেছে । “হানাফী” ফিকাহের বৈশিষ্ট এবং ভূমিকাতে ইজতিহাদ কি , মুজাতাহিদ কি এগুলো ।
    আমার মনে হয় এক পোস্টে সব না এসে , প্রতিটি বিষয় আলাদা আলাদা ভাবে আসলে ভালো হতো ।

    একজন “মুজতাহিদের” যোগ্যতা কি এটা নিয়ে আলাদা পোস্টের প্রয়োজন । কেননা আজকাল “মুহাদ্দিস” এবং “মুজতাহিদের” পার্থক্য অনেকের কাছে পরিস্কার না ।

    সাদাত

    @হাফিজ,

    ঠিক বলেছেন।
    কিন্তু পোস্টটা যেহেতু মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ এর “ফিকহে হানাফীঃ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য” এর একটি পাঠ নির্যাস। তাই মূল প্রবন্ধের সার অংশটুকু তুলে ধরতে চেয়েছি।