লগইন রেজিস্ট্রেশন

দৈশিক জাতীয়তাবাদ ও বৈশ্বিক উম্মাহ-চেতনা 2

লিখেছেন: ' kawsartex' @ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৪, ২০১২ (১১:২৩ অপরাহ্ণ)

published by a-haque on Sat, 01/28/2012 – 08:08 (Islam.com.bd)

৬  কুরআনে মুসলিম জাতীয়তানীতি ও সম্পর্কসূত্র

আমাদের সার্বভৌম প্রভু মহান আল্লাহ্ একমাত্র ঈমানকেই আমাদের পারস্পরিক সামাজিক ও জাতীয় যাবতীয় সম্পর্কের সূত্র বলে আমাদেরকে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা এ সতর্কবার্তা ভুলে গিয়ে বংশ ও আঞ্চলিকতা ইত্যাদি মনগড়া সম্প্রীতি-নীতির অজুহাতে আল্লাহর দ্বীনের শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তারা যালিম বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহ্ বলছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতা যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে শ্রেয় জ্ঞান করে, তবে উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা উহাদেরকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে, তাহারাই যালিম।‍” (কুরআন, ৯:২৩)।

বিশ্বব্যাপী আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের জন্যেই মুসলিম উম্মাহর উদ্ভব। এই উম্মাহর লক্ষ্য যেমন বড়, তেমনি এর আদর্শ, অবস্থান ও কর্মনীতিও সকল দুর্বলতা, নেতিবাচকতা, সঙ্কীর্ণতা ও ক্ষুদ্রতার উর্ধে। ভাষার পার্থক্য তাদেরকে বিভক্ত করে না। অবস্থানের দূরত্ব তাদের ভালোবাসার কাছে পরাস্ত হয়। বর্ণের বৈচিত্র বা গঠনের তারতম্য তাদের ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বে কোনো খাদ তৈরি করতে পারে না। হাজার হাজার মাইল দূরের এক সাধারণ মুসলিম প্রজাকে সামান্য অপমান করায় মুসলিম খলীফা তাই সমগ্র খ্রিস্টসাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কেননা যে- মুসলিম, সে আমার ভাই; সে কোথায় থাকে, কোন্ ভাষায় কথা বলে, তাতে কিছুই যায় আসে না। সে আমার প্রাণের সুহৃদ, কারণ সে মুসলিম। যে- মুসলিম, নিগ্রো হোক স্প্যানিশ হোক আরবী হোক, সে আমার সহোদরের চে’ নিকটজন। সে আমার অনন্তকালের আত্মার আত্মীয়। এই তো ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। অথচ হে মুসলিম, হে আমার আত্মভোলা ভাই, হে শান্তি-সম্প্রীতির পথিকৃৎ, কোথায় তুমি আজ? আর কোথায় তোমার আত্মপরিচয়ের সোনালি ইতিহাস?

আল্লাহর চোখে আমাদের সবচে’ বড় পরিচয় তো এটাই যে আমরা তাঁর বান্দা। আল্লাহ্ আমাদের একমাত্র ইলাহ, মা’বূদ ও হুকুমকর্তা। হযরত মুহাম্মদ সা. আমাদের একমাত্র মৌলিক শিক্ষক। এসব কথা আন্তরিক ও কার্যকরভাবে নির্দ্বিধায় স্বচ্ছন্দে মেনে নিয়েই তো আমরা মুমিন ও মুসলিম হয়েছি। তাই ঈমানের দাবি হলো, আমাদের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান, সব প্রশ্নের উত্তর এবং সমস্ত চাহিদার সম্পূরক আমরা কুরআন এবং সুন্নাহ্ থেকেই গ্রহণ করবো। তা না করে নিজের খেয়ালখুশিমতো কিছু বিষয় শরীয়া থেকে আর কিছু নিজের বুদ্ধি ও রুচির সিদ্ধান্ত অথবা বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠির মতামত থেকে বেছে নেয়ার তো কোনো সুযোগ নেই। এমনটি করলে আমরা আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ ‘তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ কর’ (২:২০৭) এর অমান্যকারী, সুবিধাবাদী এবং আল্লাহর একক আনুগত্য ও সার্বভৌমত্বে অংশী সাব্যস্তকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পরিণামে নিগৃহীত হবো। অতএব আমাদের সামাজিক ভ্রাতৃবন্ধনের সূত্র কী, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের নির্ণায়ক কোন্ জিনিস, কীসের ভিত্তিতে আমরা পরস্পর প্রীতিবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি স্থাপন করে ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ হিসেবে শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে জীবনযাপন করতে সক্ষম হবো – এসব প্রশ্নের উত্তরও কুরআন-সুন্নাহ্ থেকেই খুঁজে নিতে হবে।

আগের আয়াতে আমরা দেখেছি যে, ঈমানী মিল ছাড়া আপন পিতা বা সহোদর ভাইকেও অন্তরঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করতে বারণ করা হয়েছে। এখন আমরা যা পাঠ করবো, তাতে ঈমান ও সদাচার ছাড়া বৃহৎ জাতিসত্তার সদস্য দূরের কথা, ক্ষুদ্র পরিবারেরও অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

প্রেক্ষাপট হযরত নূহ আ. এর সময়কার মহাপ্লাবন। দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে। চারদিকে ধ্বংসের ঢেউ। গুটিকয়েক ঈমানদারকে নিয়ে নূহ কিশতিতে উঠেছেন। সম্মুখে তাঁর ছেলে ডুবে যাচ্ছে। তিনি ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে ডাকছেন– “ইরকাব মাআনা, হে প্রিয় সন্তান! জলদি উঠে এসো আমাদের সঙ্গে..। তুমি তো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছো.. এসো… এসো….!” সেই সঙ্গে নিজের ছেলেকে বাঁচানোর জন্যে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আসুন, দৃশ্যটা সরাসরি দেখি:

“নূহ তাহার প্রতিপালককে সম্বোধন করিয়া বলিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার প্রতিশ্র“তি সত্য; আর আপনি তো বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।
তিনি বলিলেন, হে নূহ! সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎকর্মপরায়ন। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করিও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিতেছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও।” (কুরআন, ১১:৪৫-৪৬)।

হযরত নূহ বললেন তাঁর ছেলে তাঁর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। জবাবে আল্লাহ্ বললেন, তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এটা আল্লাহর ফায়সালা। এটাই ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সূত্র হিসেবে পরিবার, বংশ, গোত্র, বর্ণ, ভাষা, দৈহিক গঠন, সহাবস্থান ও ভৌগোলিক সীমারেখা ইত্যাদির কোনো মূল্য নেই। ইসলামে সম্পর্কের ভিত্তি ও ঐক্যের একমাত্র সূত্র হলো আদর্শ। শুধুই ঈমান ও তাক্বওয়া।

মুশরিক ও দুর্বৃত্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে কোনো মুসলিমের ভ্রাতৃসম্পর্ক হতে পারে না, কেননা তারা আল্লাহর দ্বীনের ও তার অনুসারীদের কল্যাণকামী নয়। ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ শ্লোগান অথবা এ গান ‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ নিছকই অজ্ঞতাপূর্ণ আবেগ। জ্ঞানীদের জন্যে আল্লাহ্ বিধান বিবৃত করেছেন যে, ভাই ভাই সম্পর্ক কেবল ঈমান ও সদাচারের ভিত্তিতেই হতে পারে:

“তাহারা কোন মুমিনের সঙ্গে আত্মীয়তা ও অঙ্গীকারের মর্যাদা রক্ষা করে না, তাহারাই সীমালঙ্ঘনকারী। অতঃপর তাহারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে তাহারা তোমাদের দ্বীনী ভাই; জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে আমি নিদর্শন স্পষ্টরূপে বিবৃত করি।” (কুরআন, ৯:১০-১১)
“তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদেরকে এমনি ছাড়িয়া দেওয়া হইবে যখন পর্যন্ত আল্লাহ্ না প্রকাশ করেন তোমাদের মধ্যে কাহারা মুজাহিদ এবং কাহারা আল্লাহ্, তাঁহার রাসূল ও মুমিনগণ ব্যতিত অন্য কাহাকেও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করে নাই?” (কুরআন, ৯:১৬)

ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ হিন্দু-খ্রিস্টান-ইহূদী-বৌদ্ধ-নাস্তিক সবার সঙ্গেই সৌহার্দপূর্ণ বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের প্রেরণা দেয়। ঔপনিবেশিক ভারতের জাতীয়তাবাদীরাও হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে স্বাধীনতা আন্দোলন না করলে মুসলিম জনগোষ্ঠির ভাগ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কাবার্তা উচ্চারণ করে মুসলিম স্বায়ত্তশাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ আল্লাহ্ বলছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না, তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেহ তাহাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলে সে তাহাদেরই একজন হইবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।”

“এবং যাহাদের অন্তঃকরণে ব্যাধি রহিয়াছে তুমি তাহাদেরকে সত্বর তাহাদের সঙ্গে মিলিত হইতে দেখিবে এই বলিয়া, ‘আমাদের আশঙ্কা হয় আমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটিবে।’ ” (কুরআন, ৫:৫১-৫২)

কংগ্রেসপন্থী মুসলিমরা পৌত্তলিকদের ঐক্য ও সম্প্রীতি-প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ আমাদেরকে আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম ও তাঁর উত্তরসূরীদের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন, যিনি পৌত্তলিকদেরকে বলেছিলেন, কাফারনা বিকুম– আমরা তোমাদেরকে মানি না।

“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাহার অনুসারীদের মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ। যখন তাহারা তাহাদের সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, ‘তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাহার ইবাদত কর তাহার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হইল শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য; যদি না তোমরা এক আল্লাহ্তে ঈমান আন।’ ” (কুরআন, ৬০:৪)

সর্বোপরি কাফির-মুশরিক-মূর্তিপূজকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন ইসলামের চেতনা ও ঈমানের দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী, জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের নিয়মেই যা করতে বাধ্য হয়:

“তুমি পাইবে না আল্লাহ্ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়, যাহারা ভালবাসে আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে– হউক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাহাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা ইহাদের জ্ঞাতি-গোত্র।” (কুরআন, ৫৮:২২)।

৭  হাদীসের ভাষায় জাতীয়তা মূর্খতা

বাংলাদেশের আধুনিক জাতীয়তাবাদীদের কাছে ধর্ম অরাজনৈতিক এবং একটি গৌণ বিষয়। তাই ধর্ম যদি কেউ মানতে চায়, তবে ব্যক্তিগতভাবে মানবে। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ধর্মের চে’ বড়। আর ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের সংগ্রামী জাতীয়তাবাদীরা জাতীয়তাবাদী চক্রান্তের গায়ে ধর্মীয় পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, মুসলিমদের ধর্ম ও তাহযীব রক্ষা করতে হলে ইংরেজকে বিতাড়িত করতে হবে; এবং ইংরেজকে বিতাড়িত করতে হলে হিন্দুদের সাহায্য নিতে হবে, তাদের সঙ্গে এক হয়ে সংগ্রাম করতে হবে, কেননা শুধু মুসলিমদের পক্ষে ইংরেজ খেদানো সম্ভব নয়।

অথচ কাফিরদের সাহায্য গ্রহণ হারাম। সারা দুনিয়ার প্রাজ্ঞ ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে এমনকী অন্য কোনো শত্রুর মুকাবিলায় শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যেও কাফিরদের সাহায্য নেয়া বৈধ নয়। শায়খ আবদুল আযীয বিন আবদুল্লাহ বিন বায তাঁর “নাক্বদুল ক্বাউমিয়্যাতিল আরাবিয়্যাতি আলা যূ-ইল ইসলামি ওয়াল ওয়াক্বি” গ্রন্থে (পিডিএফ, পৃষ্ঠা ৬৩) লিখেছেন:

“মুসলিমদের জন্যে কাফিরদের বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুর বিরুদ্ধে ওদের সাহায্য গ্রহণ অবৈধ। কেননা ওরাও শত্রু এবং সুযোগ পেলে ওরাও বড় রকমের ক্ষতি করতে পারে। আল্লাহ্ কাফিরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হারাম করেছেন এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, যারা ওদের বন্ধুজ্ঞান করবে তারা ওদেরই অন্তর্ভুক্ত এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, এরা সবাই যালিম। ইতোপূর্বে বর্ণিত স্পষ্ট আয়াতসমূহে এর উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া মুসলিম শরীফে আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের দিকে রওনা হলেন। তিনি যখন ‘হাররা আল-ওয়াবরা’তে ছিলেন তখন একটি লোক সেখানে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়। লোকটির সাহস ও বীরত্বের কথা সবাই বলাবলি করতো। রাসূলের সঙ্গীরা তাই লোকটিকে দেখে অত্যন্ত খুশি। কিন্তু সে রাসূলের সঙ্গে মিলিত হয়ে যখন তাঁকে বলল, “আমি আপনার সহযাত্রী হয়ে আপনার কষ্টের অংশীদার হতে এসেছি।” তখন তিনি তাকে বললেন : “তুমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছো?” লোকটি বললো, “না”। তিনি বললেন: “তাহলে তুমি ফিরে যেতে পারো, আমি কোনো মুশরিকের সাহায্য নেবো না।” লোকটি চলে গেলো। তারপর আমরা যখন ‘আশ-শাজারা’তে পৌঁছি, তখন লোকটি আবার এসে পূর্বের ন্যায় একই কথা বললো। রাসূল সা.-ও তাকে একই জবাব দিলেন। অর্থাৎ তিনি ‘না’ বলে দিলেন। তিনি বললেন, “তুমি ফিরে যাও, আমি কোনো মুশরিকের সাহায্য নেবো না।’ লোকটি ফিরে গেলো। কিন্তু ‘আল-বীরা’ নামক স্থানে সে আবার এলো। রাসূল সা. তাকে এবারও প্রথমবারের মতোই বললেন: “তুমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছো?” লোকটি এবার বললো, ‘হ্যাঁ’। তখন আল্লাহর রাসূল সা. তাকে বললেন: “তাহলে চলো।” এই মহান হাদীস আমাদেরকে মুশরিকদের সাহায্য বর্জন এবং কেবল মুমিনদের সাহায্য গ্রহণ করার পথনির্দেশ দেয়।”

শায়খ বিন বায উক্ত গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায় জাতীয়তাবাদকে ‘প্রতারণা’ আখ্যায়িত করে লিখেছেন:
“ইসলামের নীতি অনুযায়ী আরব কিংবা অন্য যে- কোনো জাতীয়তাবাদ প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মহাপাপ। এই প্রচার মূলত ইসলাম ও মুসলিমদের জন্যে একটি সুস্পষ্ট প্রতারণা।”

শাইখুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়া (র) একটি বিশুদ্ধ হাদীসের বরাত দিয়ে জাতীয়তাবাদকে “জাহিলিয়্যাত” বলেছেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “মাজমূ’ আল-ফাতাওয়া” (২৮:৩২৮)-তে লিখেছেন:
“ইসলাম ও কুরআনের আহ্বান-বহির্ভূত সবকিছুই- যেমন বংশ, দেশ, জাতি, মাযহাব, তরীকা ইত্যাদি জাহিলিয়্যাতেরই এক-একটি নিদর্শন। একবার এক আনসার ও এক মুহাজিরের মধ্যে বিবাদ লেগে গেলে উভয়ে “হে আনসারগণ ও হে মুহাজিরগণ” সম্বোধনে যার যার সম্প্রদায়কে সাহায্যের জন্যে ডাক দেয়। তখন রাসূল সা. ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন:

‘‘আ-বিদা’ওয়াল জাহিলিয়্যাহ্, ওয়া আনা বাইনা আযহারিকুম?’– “জাহিলিয়্যাতের দিকে আহ্বান জানানো হচ্ছে! অথচ আমি তোমাদের মাঝেই রয়েছি।’’ এই ঘটনায় তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।”

আবূ দাঊদ ও ইবন মাজা শরীফে হযরত হারিস আশ্’আরী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল সা. বলেছেন:
“আমি তোমাদেরকে পাঁচটি কাজ করতে বলছি, আল্লাহ্ আমাকে সেগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। কাজগুলো হলো: শ্রবণ ও আনুগত্য, জিহাদ, হিযরত ও জামায়াত তথা সংঘবদ্ধভাবে থাকা (পৃথক না হওয়া)। যে- ব্যক্তি সংঘবদ্ধ জীবন থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে সে তার গলা থেকে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলবে, যতক্ষণ যতক্ষণ না আবার ফিরে আসে। আর যে- ব্যক্তি জাহিলিয়্যাতের মতাদর্শ গ্রহণের আহবান জানাবে সে জাহান্নামের জ্বালানিতে পরিণত হবে।” একজন প্রশ্ন করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! যদি সে নামায-রোযা করে তবুও?” তিনি বললেন: ‘ওয়া ইন সাল্লা ওয়া সামা ওয়া যায়িমা আন্নাহু মুসলিম’ – “হ্যাঁ, যদিও সে নামায-রোযা করে এবং মনে করে যে, সে মুসলিম।”

৮  উম্মাহর ঐক্যে ভাঙন গুরুতর শাস্তিযোগ্য

মুসলিম জাতির প্রবর্তক ইবরাহীম আ. ও প্রতিষ্ঠাতা মহানবী মুহাম্মদ সা. ছিলেন ইনসানিয়্যাত ও উবূদিয়্যাতের সার্বিক ও সার্বক্ষণিক শিক্ষক। বিশেষত আমাদের মহানবী কী গভীর যত্ন, প্রচণ্ড শ্রম ও প্রগাঢ় মমতায় তিল তিল করে একটি জাতিকে আল্লাহর ইচ্ছার রঙে রঙিন করে গড়ে তুলেছিলেন, হাদীস ও ইতিহাসের হাজার হাজার পাতায় তা সবিস্তারে বিধৃত আছে। এ উম্মাহর ঐক্য রক্ষার্থে কুরআনে যেমন আল্লাহর রজ্জুকে মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, রাসূলও তেমনি যে-কোনো উপায়ে জাতীয় ঐক্যে অনৈক্য ও ভাঙন সৃষ্টিকে গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ সাব্যস্ত করে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আল্লাহ্ বলছেন:

“তোমরা তাহাদের মত হইও না, যাহারা তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসিবার পর বিচ্ছিন্ন হইয়াছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করিয়াছে। তাহাদের জন্য মহাশাস্তি রহিয়াছে।” (কুরআন, ৩:১০৫)।

সহীহ মুসলিমে উদ্ধৃত, রাসূল সা. বলেছেন: “মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে যদি কেউ ভাঙন সৃষ্টি করতে চায়, তবে তাকে তরবারি দ্বারা শায়েস্তা করো।”

৯  উপসংহার

মানুষ একই সঙ্গে অনেক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। মানুষকে যদি জাতিতে জাতিতে ভাগ করতে হয়, তবে তা করা উচিত তার প্রধান স্বকীয়তার ভিত্তিতেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের প্রধান স্বকীয়তা তার ঈমান, অতএব আল্লাহর বান্দাদের জন্যে ঈমানই তাদের আত্মপরিচয়ের মূল উৎস। পূর্ণ ঈমানই তাদের মানবজন্মের ইহ-পরকালীন সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি। ঈমান ও ঈমানী চরিত্রের উৎকর্ষই তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড। মূলত ঈমানই তার পারিবারিক বন্ধনের স্থাপক, সামাজিক সম্পর্কের নির্দেশক এবং তার জাতীয় পরিচয়ের নির্ণায়ক। তার ভালোবাসা ও বিরাগ, তার বন্ধন ও বিচ্ছেদ, তার সংহতি ও সংগ্রাম সবই হয়ে থাকে তার পালনকর্তার সন্তুষ্টির ভিত্তিতে। তার অস্তিত্ব ও চেতনার সকল উদ্দেশ্য, তার জীবন-মরণের সমস্ত আকুতি একমাত্র তার পালনকর্তার জন্যেই নিবেদিত। তাই সে বলে: “আমার সালাত, আমার ইবাদাত, আমার জীবন ও মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।” (কুরআন, ৭:১৬২)।

এই মহান তাওহীদী চেতনার আলোকে একজন মুসলিমকে যদি ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে কিছু মানতে হয়, তবে সেই জাতীয়তার একমাত্র সংজ্ঞা হলো: “কালেমার ছায়ার নিচে যারা আছে তারা এক জাতি, আর যারা এর বাইরে তারা অন্য জাতি।”

প্রচলিত দেশ-ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ইতিহাস সম্পর্কে যিনি প্রায় কিছুই জানেন না, তিনিও এটুকু ধারণা করতে পারেন যে, মুসলিম বিশ্বে এ মতবাদের জন্ম হয় নি। কেউ একটু অনুসন্ধান করলেই জানতে পারবে যে, মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করে তাদেরকে বিভক্ত ও দুর্বল করা, অতঃপর তাদের পরস্পরের মধ্যে গোত্রীয় ও আঞ্চলিক জাত্যভিমান সঞ্চার করে ইসলামী খিলাফাতকে তছনছ করে দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে উপনিবেশ স্থাপন করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন ও তাদেরকে অধীনস্থ করে রাখার উদ্দেশ্যেই ইসলামের পশ্চিমা দুশমনরা এ বিষাক্ত জাতীয়তাবাদ তথা আঞ্চলিকতাবাদের জন্ম দিয়েছে। জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এ অস্ত্রের আঘাতে তারা ইসলামী খিলাফা ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে এবং আজও একের পর এক মুসলিম রাষ্ট্রে আগ্রাসন ও লুণ্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে। ভাষাগত ও আঞ্চলিক চেতনা স্বভাবতই সঙ্কীর্ণ ও পরবিদ্বেষী হয়ে থাকে, এর ভিত্তিতে গঠিত জাতি সর্বদাই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও অপরাপর জাতিকে তুচ্ছ ভাবে। এ অহমিকার বশে নিজের আধিপত্যের নেশায় অন্যান্য জাতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয় এবং সবসময়ই আগ্রাসন ও যুদ্ধের জন্যে তৈরি থাকে। এ জাতীয়তাবাদই পরপর দু’টি বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, যার পরিণাম সাত কোটি মানুষের প্রাণহানি।

পক্ষান্তরে মুসলিম উম্মাহর চেতনা হলো আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে সকলের কল্যাণকামনা, সবার জন্যে শান্তি ও ভালোবাসা। তাই সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়, সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তির জন্যে প্রয়োজন মুসলিম উম্মাহ্-চেতনা।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক। শিক্ষক, শাহবাগ জামিয়া মাদানিয়া জকিগঞ্জ, সিলেট, বাঙলাদেশ। a-haque@live.com

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৮৪ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)