লগইন রেজিস্ট্রেশন

বিদায়ে পরিচয় পলাশী ও প্রধানমন্ত্রীর দেশপ্রেমের গল্প

লিখেছেন: ' এম এম নুর হোসেন' @ রবিবার, জুলাই ২৪, ২০১১ (৩:৪৩ অপরাহ্ণ)

গত ২৩ জুন ছিল ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আমবাগানে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ডুবে গিয়েছিল দেশীয় বিশ্বাস ঘাতকদের চক্রান্তে। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল জগৎশেঠ, মীর জাফর আলী খাঁ, উঁর্মি চাঁদ আর ঘসেটি বেগমদের সঙ্গে ইংরেজদের আঁতাত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে তাদের বংশধররা বাংলার জমিনে এখন সক্রিয়। তাই ঐতিহাসিক পলাশী দিবসকে মনে করে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে শপথ নিতে হবে দেশপ্রেমের, আর তার জন্য আমাদের সবাইকে অবতীর্ণ হতে হবে দেশপ্রেমের পরীক্ষায়। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে আজ মুখোমুখি হতে হ”েছ কঠিন জীবন-বাস্তবতার। ছোট বেলায় বাল্যশিক্ষায় পড়েছিলাম, ‘আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়’, কিš‘ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তাই দেশবাসী কৌতূহলী হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর দেশপ্রেম বিষয়ে।

গত ১৮ জুন কনোকো-ফিলিপসের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি স্বাক্ষর করার প্রেক্ষাপটেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার চেয়ে কে বেশি দেশপ্রেমিক?’ তাই তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি সত্যি সত্যি একজন দেশপ্রেমিক। একজন সরকার প্রধান হয়ে কনোকো-ফিলিপস নামক একটি আমেরিকান কোম্পানির কাছে গভীর সাগরের বুকে দেশের তেল-গ্যাস সম্পদের খনি তুলে দিয়ে তিনি কিভাবে প্রকাশ্যে নিজেকে দেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চা”েছন? এটা কি শুধু মুখের বুলি? আসলে ‘হরি ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না’ এমন একটা ভাবইতো এখানে প্রকাশ পা”েছ। তাই দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে তিনি আগাম জানিয়ে দিলেন যে দেশকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতেই তিনি দিন-রাত কাজ করে যা”েছন। তাছাড়া তিনি বারবারই বলছেন, গ্যাস রফতানি করতে চাননি বলেই ২০০১ সালে তাকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি। যদি এটা সত্যিই হয়ে থাকে, তবে কি তিনি দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়ে মীর জাফর আলী খাঁর মতো বাংলাদেশের মসনদে নিজের আসনকে পাকাপোক্ত করতে চান? যদি তা-ই হয়, তবে কি তিনি মীর জাফরের পরিণতি থেকে একটুও শিক্ষা নিতে চান না? একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। নিজের দেশের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী না করে আমেরিকার কোম্পানিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকার প্রদান, নিজ দেশের সীমান্তকে প্রতিবেশী দেশের কাছে অরক্ষিত করে রাখা, নিজ দেশের ভূমি পাশের দেশকে দিয়ে দেয়া, প্রতিবেশী দেশ থেকে সরকারি ও সামরিক গুর“ত্বপূর্ণ লোকজনদের ঘনঘন বাংলাদেশ সফর কি আমাদের নব্য দেশপ্রেমের আলামত নাকি আমাদের নব্য গোলামীর প্রথম পদক্ষেপ? আজকের এই দিনে মেজর আবদুল জলিলের ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইটি আমাদের সবার একবার পড়া দরকার। আর প্রয়োজন সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যাতে করে আমাদের রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতায় গিয়ে দেশের স্বার্থ-বিরোধী কোন কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করতে পারে। দেশের জনগণ যত সচেতন হবে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ততোই কমতে থাকবে। নতুবা জনগণকেই এর মূল্য দিতে হবে। বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী সব সময়ই ছিল জনবিচিছন্ন এবং বর্তমানেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটাই জনবি”িছন্ন। রবার্ট ক্লাইভের বিবরণ থেকে জানা যায়, তার বিজয়ী বাহিনীকে দেখার জন্য পলাশী থেকে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়েছিল শত-সহস্র সাধারণ মানুষ। আমরা যদি ইতিহাসের আরেকটু পেছনে ফিরে তাকাই, বাংলার শেষ হিন্দু রাজা লক্ষণ সেনকেও দেখি তার নদীয়ার বাসভবনের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে একজন কিশোর যোদ্ধা ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজীর ১৩ সদস্যের সেনাবাহিনীর ভয়ে। প্রকৃতপক্ষে রাজ্যের জনসাধারণের কাছ থেকে রাজা হিসেবে তার জনবি”িছন্নতাই ছিল প্রতিরোধহীন এ পলায়নের মূল কারণ। আর এই জনবি”িছন্নতাই আমাদেরকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অ¯ি’তিশীলতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কালানুক্রমে এই জনবি”িছন্নতার ধারা আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের মতই প্রবহমান। এই গণবি”িছন্নতা ও কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাহিত্যিক প্রতিরূপ লক্ষ্য করা যায় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের ভিক্ষুক নামক গল্পটিতে। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা প্রাক্-নির্বাচনকালীন সময়েই শুধু গণসংযোগ করে থাকে। তারা জনগণের দরজায় ধরনা দেয়, ভোটারদের হাতেপায়ে ধরে কিংবা কখনও কখনও হুমকী-ধমকী দিয়ে থাকে তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা জন্য। পরবর্তী নির্বাচন না আসা পর্যন্ত বাকি সময়টুকু তারা থাকে জনগণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাসÑ যারা নির্বাচনে জেতে তারা ভাবে জনগণের আর প্রয়োজন নেই। তারাইতো এখন সব দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। কারণ জনগণতো তাদেরকে নির্বাচিত করেছে, দিয়েছে স্বে”ছারিতার অবাধ অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুণ্ঠনের সুযোগ। নির্বাচন-উত্তর সময়ে সেই অধিকার আর সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তারা এতই মশগুল হয়ে পড়ে যে, দেশ ও জনগণের কথা ভাবার তাদের কোনই অবকাশ আর থাকে না। অপর দিকে যারা পরাজিত হয়, তারা ভাবেÑ জনগণ যেহেতু আমাদেরকে নির্বাচিত করেনি তাই তাদের আর খোঁজখবর নেয়ার দায়দায়িত্ব তাদের নেই।

আমাদের দেশ এখন দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসছে। সেই দেশপ্রেমের জোয়ারে ভেসে যাক আমাদের সব সংকীর্ণতা। প্রকৃতপক্ষে আমাদের জাগরণের মাধ্যমেই আমাদের মুক্তির পথকে অবারিত করতে হবে। তাই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে আত্ম-বিশ্বাস নিয়ে, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে সকল অন্যায় অত্যাচার অবিচারের বির“দ্ধে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আমাদেরকে দলীয় ও মতাদর্শগত সংকীর্ণতা পরিহার করে উদার এবং আন্তরিকভাবে কর্মে ব্রতী হতে হবে। তবেই দেশ ও জাতির কল্যাণের পথ প্রশস্ত হবে। আমরা যদি পলাশী দিবসের চেতনাকে ধারণ করে এই দিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারি, তবে আমাদের ভবিষ্যত আমরা গড়ে তুলতে পারব, আমাদের প্রত্যাশার আলোকে। হতাশা আর ব্যর্থতা নিয়ে হাপিত্যেস নয়, কর্ম ও ত্যাগের মাধ্যমে জাতীয় কল্যাণের পথ হোক প্রশস্ত। জাতীয় প্রয়োজনে আমাদের পলাশী দিবস পালন তখনই অর্থময় ও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে, যখন আমরা দেশ ও জাতিসত্তার পরিচয় নিয়ে গর্বিত হতে পারব। পলাশী দিবসকে স্মরণ করে আমাদের সবার অঙ্গীকার হোক কাজের মাধ্যমে দেশপ্রেম প্রমাণের, ফাঁকা বুলি আওড়ানোর মাধ্যমে নয়। আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে দলমত নির্বিশেষে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আমরা আমাদের দেশপ্রেমের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই এবং জাতির সোনালী ভবিষ্যত নির্মাণ নিশ্চিত করি। আমরা যেনো আমাদের সব চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে দেশ ও জাতির স্বার্থকে বড় করে দেখি, পলাশী দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

আমিন আশরাফ

কিশোরগঞ্জ

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৮২ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

২ টি মন্তব্য

  1. একজন সরকার প্রধান হয়ে কনোকো-ফিলিপস নামক একটি আমেরিকান কোম্পানির কাছে গভীর সাগরের বুকে দেশের তেল-গ্যাস সম্পদের খনি তুলে দিয়ে তিনি কিভাবে প্রকাশ্যে নিজেকে দেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন? :( :( :(

  2. ভাইজান, দেশপ্রেমিকের সংগা একেক জনের কাছে একেকরকম।