লগইন রেজিস্ট্রেশন

আল্লামা আহমদ শফীঃ একজন জাতীয় নেতার প্রতিকৃতি

লিখেছেন: ' এম এম নুর হোসেন' @ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৪, ২০১২ (৬:২৮ অপরাহ্ণ)

আবিদুর রহমান তালুকদার
 দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে আত্মনিবেদিত ও উৎসর্গিত কিছু নেতৃত্বের আবির্ভাবে এ জাতি গৌরবান্বিত। তাঁদের অনেকেই স্মৃতির মানসপটে অম্লান, চিরভাস্বর। মুসলমানদের প্রাণস্পন্দন হিসেবে যাঁদের অবদান চির স্মরণীয় তাঁদের সংখ্যায় তাঁরা হাতেগোনা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা-চেতনা ও কৃষ্টি-কালচারের যারা প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁরাই জাতীয় নেতার আসনে অভিষিক্ত হয়। কোনও জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের দ্বীনি জযবা আর চেতনার প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা প্রদর্শন, আবহমান কাল থেকে লালিত তাহযীব-তামাদ্দুনকে খর্ব ও খাটো জাতির পার্থিব উৎকর্ষ সাধনে যতই অবদান রাখা হোক, এসব কৃতিত্বের জন্য তারা জাতীয় নেতার আসন অলঙ্কৃত করতে পারেন না। জনকল্যাণে অভূতপূর্ব অবদানের কারণে এদেশের অনেক মনীষী জাতির শ্রদ্ধার মুকুট পরিধান করেছেন। তবে গণমানুষের হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতির মুখপাত্র ও প্রতিনিধি হিসেবে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ জনসাধারণের অন্তরে মুকুটবিহীন সম্রাট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অন্তরের দরদ, সাহসী পদক্ষেপ ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মাধ্যম জাতির কান্ডারী হবার গৌরব সবার ললাটে জুটেনি। এদেশের বহু জাতীয় জাতির জন্য জেল খেটেছেন, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন তবে ক্ষমতায় আরোহন করে তাঁরা জাতির কাছ থেকে সুদে-আসলে তার বহুগুণ উসূল করে নিয়েছেন।

ধর্মীয় নেতৃবর্গ জাতির জন্য উৎসর্গিত হয়েছেন। প্রাপ্তির হিসেব কষেননি। অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, গ্রহণ করেননি তেমন কিছুই। ত্যাগ স্বীকার করেছেন আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতা করেননি। বহু জাতীয় নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাবাবেগের প্রতিনিধিত্ব না করতে পারায় জাতির প্রতি তাদের অবদান অপূর্ণই থেকে গেছে। পক্ষান্তরে আলিম-ওলামা ও হক্কানী পীর-মাশায়েখদের অবদান জাতির জন্যে নিবেদিত ছিল পূর্ণাঙ্গরূপে। তাতে কোনো ধরনের খুঁত নেই। দ্বীন-দুনিয়া উভয় জাহানের উন্নতি ও সমৃদ্ধি একজন মুসলমানের পরম ও চরম কাম্য। তবে অপার্থিব ও পরকালীন সমৃদ্ধি মু’মিনজীবনের মুখ্য ও প্রতিপাদ্য বিষয়। পার্থিব উন্নতি একান্ত গৌণ। দ্বীন ও দুনিয়া মুমিনের কাছে যথাক্রমে আত্মা ও দেহের ন্যায়। মানুষের দেহের চেয়ে আত্মার গুরুত্ব অনেকগুণ বেশি।

তবে সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণার্থে সামাজিক কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় নেতৃত্বের সার্থক ও সরব অংশগ্রহণ জাতির একান্ত আকাঙ্ক্ষিত; পরম কাম্য। মহানবী (সা.) উভয় জাহানের সমন্বিত নেতৃত্বের আধার ছিলেন। হযরত খাদিজা (রা.) মহানবীর সামাজিক চরিত্রের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তা সম্পর্কের সুরা করেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন। নিঃস্বদের উপার্জনের ব্যবস্থা করেন। মেহমানদের আতিথেয়তা করেন এবং বিপদগ্রস্তের সাহায্যে এগিয়ে যান।

সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অবদান রাখার মাধ্যমেই সর্বস্তরের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করা সম্ভব। যারা এরূপ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন তাঁদেরকেই খিলাফতের উপযুক্ত বিবেচনা করা হয়। সম্প্রতি মিসর, তিউনিসিয়া ও মরক্কোতে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী মুসলিম নেতৃত্বের সাফল্যে এ বিষয়টির যথার্থতা প্রমাণ করে। তাদের যাবতীয় কর্মতৎপরতার ৪০% ধর্মীয় বিষয়ে আবর্তিত হলেও ৬০% সামাজিক উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে বিস্তৃত।

নিকট অতীতের বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ, মাওলানা আতহার আলী, সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, সাইয়্যেদ হোসাইন আহমদ মাদানী মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে এখনো চেতনার উৎস হিসেবে বিরাজ করছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম জাতিসত্তার রূপরেখা প্রণয়ন, আকাবির তথা পূর্বসুরীদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার ও আত্মসচেতনতায় দীতি করার মহাকবি ড. ইকবালকে মানুষ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। উপমহাদেশের শাহ ওয়ালিউল্লাহ, মুজাদ্দিদে আলফে সানী ও সাইয়েদ বেরেলভী উপযুক্ত নেতৃত্ব, বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনার মূল উৎস হিসেবে এতদঞ্চলের মুসলমানদের চেতনায় দেদীপ্যমান। যাঁদের নিরলস, কর্মতৎপরতা ও নিষ্ঠাপূর্ণ অবদান এখনো ঝংকার তোলে জাতির মানসপটে। উচ্ছ্বাসে আপ্লুত আবেগ-অনুভূতি।

মুসলমানদের সমকালীন দুর্দশা ও আপতিত দুর্যোগে যেসকল নেতা ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করতে পারে না, স্বজাতির দূরবস্থার চিত্র প্রত্যক্ষ করে যাদের নয়ন অশ্রুসিক্ত হয় না, বৈরী শক্তি কর্তৃক আক্রান্ত হতাশাগ্রস্ত মানুষের দ্বীন-ঈমানের মৌলিক দর্শন-চেতনার দৃর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধে যারা জাতির হাল ধরতে পারে না, প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবিলার বদলে যারা সুখনিদ্রায় বিভোর থাকে। আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয়, তাদের দেখে জাতি আশান্বিত হতে পারে না। অন্ন, বস্ত্র বাসস্থানের অভাবে ছন্নছাড়া পথশিশু ও ক্ষুধার্থ কিশোর আবর্জনার ভাগাড় থেকে আহার্য বস্তু কুড়িয়ে নিতে দেখে বাংলাদেশ ভ্রমণরত ব্রিটিশ অভিনেতা দম্পতি যেখানে অশ্রু সংবরণ করতে পারে না, তাদের কাছ থেকে তথাকথিত জাতীয় নেতাদের অনেক কিছুই শেখার আছে।

বাংলাদেশ নামক প্রাণপ্রিয় এ ক্ষুদ্র ভূখণ্ডটি আজ বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হারানোর উৎকণ্ঠা-আতঙ্কের পাশাপাশি ইহুদি-খ্রিস্টান ও ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রের দূরভিসন্ধিতে পুরো জাতি ঈমান-আকীদা হারা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জানমাল ইজ্জত-আব্রু হারানোর ঝুঁকিপূর্ণ পরিপ্রেক্ষিতে একজন মুসলমানের কাছে সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রাধিকার হল ঈমান সুরার শপথ গ্রহণ করা। জাতির এমন যুগসন্ধিক্ষণে গোটা দেশ দু’টি শিবিরে বিভক্ত। এক পক্ষ ক্ষমতায় অধিষ্ঠানে সর্বশক্তি নিয়োগ করে প্রতিপক্ষকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন শুরু করেছে জোরালোভাবে। সবকিছুর বিনিময়ে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ যেন ঈপ্সিত লক্ষ্যবস্তু। জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হলেও তাদের লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করতে হবে। ঈমান-আকীদা ও মুসলিম সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বব্যাপী আগ্রাসনের ব্যাপারে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতাগ্রহণ করলেও ধর্মহীনতার বিরুদ্ধে তাদের বাস্তবমুখী কোনও কর্মসূচি নেই। আরেকটি পক্ষ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য দেশকে বিকিয়ে দিতেও প্রস্তুত। এ পথে যারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তাদের কণ্ঠরোধ করে কোণঠাসা করে রাখার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। যুগযুগ ধরে লালিত ইসলামী ঐতিহ্যের স্বরূপ মুছে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করছে না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ইহুদী-খ্রিস্টানদের সব ধরনের গোপন সমঝোতার মাধ্যমে এদেশ থেকে ইসলামকে চিরতরে উৎখাত করার কৌশল গ্রহণ করেছে। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে সাংবিধানিকভাবে গোটা জাতিকে ধর্মহীন মুরতাদ বানাতে তাঁদের বিবেক কম্পিত হয় না।

মনে রাখতে হবে, মানুষের ঈমান-আকীদার সম্পর্ক সংবিধানের সাথে নয়, অন্তরের সঙ্গে। মুসলমানের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ঈমান অটুট থাকলে সংবিধানে তার উল্লেখ থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না। তবে সংবিধানে তা একবার সংযোজিত হয়ে গেলে বাতিল করা ঈমান বিচ্যুতির লক্ষণ। সাংবিধানিকভাবে পুরো জাতিকে নাস্তিক বানানো এবং উগ্রবাদী সেক্যুলার সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। এখানে সুবিধাবাদী কোনো ভূমিকার সুযোগ নেই। তুরস্কের কামাল আতার্তুকের আদলে পুরো জাতিকে সেক্যুলার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নিগড়ে আবদ্ধ করার জন্য সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের সুদূরপ্রসারী কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে। এর বিরুদ্ধে সঙ্গত কারণে যারা প্রতিবাদ করে তাদেরকে দেশদ্রোহী, জঙ্গি ও স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত করছে। তাদের সকল শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সভা-সমাবেশের উপর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। হক্কানী ওলামা-মাশায়েখ ও তাঁদের প্রতিষ্ঠিত কওমী মাদরাসামূহকে ‘জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র’ আখ্যায়িত করছে। পক্ষান্তরে ভ্রান্ত মতাদর্শী ও বিভ্রান্ত ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী আলিমের আলখেল্লাধারী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সকল প্রকার সাহায্য-সুবিধা দিয়ে আসছে।

ইসলামী শিক্ষাকে সেক্যুলার ধারায় রূপান্তর, হক্কানী ওলামা-মাশায়েখদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কওমী মাদরাসাসমূহকে ‘জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোপরি সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বাতিল করার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ রাজনীতি-নিরপেক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সবপ্রথম যিনি প্রতিবাদে মুখর হয়ে জাতীয় নেতাসুলভ ভূমিকা রেখেছেন তিনি হলেন, বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষানিকেতন দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম (হাটহাজারী) মাদরাসার প্রধান পরিচালক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ষিয়ান আলিম আল্লামা আহমদ শফী। যিনি অর্ধশতাব্দীকাল থেকে দ্বীনি শিক্ষাবিস্তারে জাতির মহান খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছেন। যার সাথে রয়েছেন সমগ্র বাংলাদেশের ঈমানী-রূহানী মজবুত নেটওয়ার্ক। আমল আখলাক ও আস্থা-বিশ্বাসের সম্পর্ক। দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের সুবাদে এর ছাত্র-শিক্ষকসমাজের গভীর সম্পর্কের শিকড় প্রোথিত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদিস-বিশারদ ও প্রথম সারির লড়াকু স্বাধীনতা সংগ্রামী আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানীর সুযোগ্য খলিফা হওয়ার কারণে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।

ব্যক্তিগত আমল-আখলাক, যুহদ-তাকওয়া, প্রজ্ঞা ও যুগসচেতনতায় তার জুড়ি মেলা ভার। সমাজের সর্বস্তরে ইসলামবিদ্বেষী নীতি বাস্তবায়নের প্রতিবাদে তাঁর সক্রিয় আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণের তৃণমূল পর্যায়ে এ আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটেছে। আস্থা অর্জন করেছে সর্বস্তরের মানুষের। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ধর্মপ্রাণ তাওহীদি জনতার ভাবাবেগ জড়িত থাকার কারণে এ আন্দোলন সর্বব্যাপী রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু সামান্য এ ধর্মীয় আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে তৈরি করা হয়েছে শত বাধার প্রাচীর। হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে সম্পূর্ণ সামাজিক আবহে, অরাজনৈতিক আদলে এ আন্দোলনের সূচনা। শুরু হয় ষড়যন্ত্র ও নির্যাতনের পালা। ইহুদী-খ্রিস্টান-পৌত্তলিকশক্তি ও তাদের এদেশীয় উচ্ছিষ্টভোগীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সমন্বিত উদ্যোগে এ আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একীভূত করার অপপ্রচার শুরু হয়। দেশের কয়েকটি ধর্মবিরোধী সংবাদপত্রের সম্মিলিত তৎপরতায় আল্লামা আহমদ শফী ও প্রথিতযশা আলিমদের শুভ্রবদনে কালিমা লেপনের ঘৃণ্য চক্রান্ত চলে সমান্তরালে। দ্বীন রক্ষা ও হেফাজতে ইসলামের এ দুর্বার আন্দোলন যখনই গণভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে তখনই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবিরাম অপপ্রচারে শামিল হয় দেশের নাস্তিক্যবাদী অশ্লীলতা ও পৌত্তলিকতা সমর্থিত মিডিয়া জগতের বিশেষ অংশটি। হাটহাজারী মাদরাসা ও ইসলামের মূল ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমগ্র দেশে ব্যাপৃত এর শাখাসমূহ সেক্যুলার রাষ্ট্র্রপ্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দ্বীনের ওপর নিরলস, অটল বিশ্বাস, পারস্পরিক আন্তরিকতায় পূর্বসূরীদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় তাঁদের মহতি স্বপ্নের প্রধান প্রতীকরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

দেশব্যাপী নিররতা দূরীকরণ, দুর্নীতিমুক্ত জনগোষ্ঠী তৈরি, সৎ ও আদর্শ নাগরিক সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের মত কার্যক্রম কওমী মাদরাসাসমূহের বাস্তবমুখী কর্মসূচি। যার সুফল ভোগ করছে পুরো দেশ ও জাতি। এসব অবদানকে অস্বীকার করে পাল্টা জঙ্গিবাদের একতরফা ও একপেশে অপপ্রচারের জবাবে বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ প্রকাশিত বা গণমানুষের কাছে মুদ্রিতভাবে পৌঁছানোর তেমন কোনো সুযোগ নেই। পত্রিকায় কিংবা অন্যান্য মিডিয়াজগতে এ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অত্যন্ত নিঃস্ব ও পাথেয়হীন অবস্থায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সবল, সুদ ও রণসজ্জায় সুসজ্জিত শত্রুর সাথে এই অসমযুদ্ধের অনুমোদন ইসলামি শরীয়াহ দেয় কিনা- তা বিশেষজ্ঞরাই সম্যক অবগত। বর্তমান আধুনিক ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এ রণপ্রস্তুতি হল মিডিয়া জগতে এই জনগোষ্ঠীর শক্তপোক্ত অবস্থান। দেশ ও জাতির স্বার্থে আজ তা শুধু মামুলী প্রয়োজন নয় বরং অবশ্যম্ভাবীও বটে। তার বাস্তব রূপায়ন অলীক স্বপ্ন নয় সময়ের অনিবার্য দাবিও। সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামি আন্দোলন বর্তমানে যে পর্যায়ে অবস্থান করছে তাকে মনযিলে মকসূদের পানে এগিয়ে নিতে হলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে বিষয়টি বিবেচ্য তা হল অত্যাধুনিক তথ্য-প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শক্তিশালী একটি জাতীয় সংবাদপত্র ও সত্যের পতাকাবাহী জনগোষ্ঠীর বলিষ্ঠ মুখপত্র। যা এখন শুধু কল্পনা নয় শতভাগ সম্ভাবনাময় একটি বিষয়। দ্বীনি আন্দোলনের সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাতীয় নেতা আল্লামা আহমদ শফীর একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

জাতি আজ এই মহান নেতার দিকে তাকিয়ে আছে, তিনি ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন? শতাব্দীর বেশি সময়কালের মধ্যে শিক্ষাসমাপনকারী লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী এই মহান ব্যক্তিত্বের একনিষ্ঠ ভক্ত-অনুরক্তগণ তাঁর নির্দেশ পাওয়ামাত্র এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে পুরো প্রস্তুত। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাওহীদি জনতার আন্তরিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি তাওহীদি জনতার মুখপত্র প্রকাশ যা হবে ওলামা-মাশায়েখ মান-মর্যাদার রক্ষাকবচ ও ধর্মবিরোধী অপপ্রচারের জবাবে সত্যের প্রতিরাব্যুহ। যা হবে অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের মশালবাহী ও অন্যান্যের বিপরীতে ন্যায়ের লালনকারী। মিথ্যা, অর্ধসত্য ও হলুদ সাংবাদিকতার বিপরীত মেরুতে সৎ সাংবাদিকতার ঝান্ডাবহনকারী। সময় ও বাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টির প্রতি গভীর মনোনিবেশ ও এ পদক্ষেপটি বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত রয়েছে হাটহাজারী মাদরাসার যুগসচেতন, তেজোদ্দীপ্ত অনেক আসাতিযায়ে কেরাম। যাদের সুপরামর্শ, সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা তাঁর বর্তমান সংগ্রামের পথে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে কাজ করবে, সাহস যোগাবে সম্মুখে এগিয়ে যাবার। এরূপ পরিকল্পনার সঙ্গে কওমী মাদরাসাশিক্ষিত অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষকের আবেগঘন সমর্থন থাকবে সংগত কারণেই। জাতীয় নেতার প্রতি এই বিশেষ নিবেদন ও প্রস্তাবনাকে তিনি মা, স্নেহ উদার দৃষ্টিতে নেবার প্রত্যাশায় জাতি প্রতীক্ষারত। হাজার হাজার দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত রেখেছেন, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ধর্মীয় মর্যাদা, অবস্থান ও ইজ্জত-আব্রুর সুরার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারেও কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়।

উপযাচক হয়ে হিতাকাঙ্ক্ষি হিসেবে জাতির দরদভরা অন্তরের এ আকুল আবেদন মহোদয়ের কাছে কখনো অগ্রাহ্য হবে না এমন বিশ্বাস আন্তরিকভাবে পোষণ করি। দৃঢ়ভাবে মনে করি অনাদরের শিকার বা আশাটি নিরাশায় পর্যবসিত হবে না। জাতির আশার পুনর্গঠনে রক্তিম সুর্যের কিরণ মরীচিকায় পরিণত হবে না। আমজনতার পক্ষ থেকে এ আবেদনটি সবিনয়ে পেশ করছি। এ জাতি দীর্ঘদিন যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দিকনির্দেশনাহীন অবস্থায় নেতৃত্বশূন্যতার গহ্বরে হাবুডুবু খাচ্ছিল, পিপাসার্তের মত উদাস নয়নে অপেমান ছিল একজন দুঃসাহসী, দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্বের জন্যে। আল্লামা আহমদ শফী সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন। জাতিকে ধন্য ও গৌরবান্বিত করেছেন তিনি। আশার বাগানে আজ প্রস্ফুটিত হয়েছেন নতুন পুষ্পমালা। প্রত্যাশার চারাগাছ পত্র পল্লবিত হয়েছে। আজ একজন যোগ্য মাল্লা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল মহাসাগরে টলটলায়মান তরণীর হাল ধরেছেন। জাতির জন্য এ এক মহানিয়ামত। সমুপস্থিত আজ মহাঐক্যের সন্ধিক্ষণ। তিনি সেই ঐক্যের একক প্রতীক। যার মূল্যায়ন, সমাদর ও যথাযথ পরিচর্যা জাতির নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাকে সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও বরকতময় হায়াত দান করুন। তাঁর সকল কর্মসূচি সফল হোক। ড. কবি ইকবালের ভাষায় বলি-
‘পাথরকে স্বর্ণে পরিণত করার মত যোগ্য ও বহুমুখী প্রতিভাধর স্বর্ণকার কদাচিত সৃষ্টি হয়। অবশ্য চামচিকার সুর্যকিরণ অসহ্য হলেও সুর্য আলো ও তাপ বিকিরণে কোনো কার্পণ্য করে না।
আর মহাত্মাদের কাছে কাজ দুষ্কর নয়।

লেখকঃ উপাধ্যক্ষ, হাছনদন্ডী এম. রহমান সিনিয়র মাদরাসা
সহ-সভাপতি, জাগৃতি লেখক ফোরাম

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৮৯ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ১.০০)