লগইন রেজিস্ট্রেশন

শেষকৃত্যের সত্য

লিখেছেন: ' এম_আহমদ' @ বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৩ (৬:৩৬ অপরাহ্ণ)

-এক-

আমি যদি বলি বাংলাদেশে অনেক প্রতারক নাস্তিক বাস করেন এবং এই প্রতারকগণ অত্যন্ত কৌশলে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ বাংলাদেশ থেকে উঠিতে দিতে কাজ করেন, তবে আমার সাথে হয়ত অনেকেই এক মত হবেন। এই নাস্তিকদের প্রতারণামূলক কাজের কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ছদ্মবেশে তারা ইসলামের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে সুবিধা পায়। তাদের নাম মুসলিম, মুসলিম সমাজে বসবাস, কাজ কর্মও এই সমাজের আষ্টেপৃষ্ঠে। ছদ্মাবরণের বাইরে গেলে জগত সংকোচিত হয়ে পড়ে। তাই ‘নাস্তিক-পরিচয়ে’ যে কাজ করা যাবে না, সেই কাজ ‘আস্তিক-পরিচয়ে’ করে থাকেন। আরও কিছু ব্যাপার আছে। চলে আসা প্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ী ইসলাম বিসর্জনের সাথে সাথে বিবি তালাক হয়ে যায়, তাই নিজেকে জাহিরে-নাস্তিক দেখানোতে কোথাও কোথাও সামাজিক উপলব্ধিগত (social perception) সমস্যা দেখা পারে। তাই ‘ধর্মান্তরের’ বিষয়টি কৌশলে তা এড়িয়ে চলা হয়।

তবে কিছু প্রতারক উলটো মুসলিম সমাজকে দায়ী করে। বলে থাকে, ‘কেউ মেরে ফেলবে।’ কিন্তু কথা সেটা না। আহমদ শরীফকে কেউ মেরে ফেলে নি, মূর্খ-দার্শনিক আরজ আলীকেও কেউ মেরে ফেলে নি। জীবিত অনেক আছেন যাদেরকে কোটি কোটি লোক চেনে এবং কোনো মুসলমান তাদেরকে মারতে কখনো উদ্যোত হয়নি, তাদের বিপক্ষে নিছক নাস্তিকতার কারণে দ্বান্দ্বিকতা দেখায় নি। যে কয়জনকে জনতা ধাওয়া দিয়েছিল, তা হয়েছিল তাদের সামাজিক নিয়মনীতি ভঙ্গের কারণে, তাদেরই বেখাপ্পা কর্মকাণ্ডের কারণে।

এক ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম বা অন্য ধর্ম ত্যাগ করার পর, সে আর ঐ ধর্মের কেউ থাকেন না। পরিত্যক্ত ধর্ম হয়ে পড়ে তার ‘পর-ধর্ম’। কিন্তু তারা যখন পরধর্ম নিয়ে ব্যক্তি-স্বাধীনতার নামে আক্রমণ চালাতে থাকেন, তখন সমাজের সংহতি নষ্ট হয়। আপনার নিজ বিশ্বাসের স্বাধীনতা আছে বটে তবে অন্যের বিশ্বাসকে আক্রমণ করে, বিষোদগার করে নয়। এতে অন্যের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। ২০০৯ সালে দেখলাম শেখ হাসিনাকে সম্বোধন করে তসলিমা নাসরিনের একটা লেখা ‘আমাদের সময়ে’ প্রকাশ পেয়েছিল যেখানে তাসলিমা নিজেই বলেছিলেন যে ‘মৌলবাদীদের’ সাথে তার কোনো বিরোধ নেই, তাকে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক কারণে দেশান্তর করেছিল, তাই হাসিনা সরকার যেন তাকে ফিরিয়ে আনেন (হয়তবা তার মানি লাল-গালিচা বিচিয়ে)। যদিও ঐ লেখায় হাসিনা ও তার সরকারের প্রশংসা ছিল কিন্তু তাতে আবেগে কোন বরফ গলেনি। অবশেষে কিছু না হওয়ায় তিনি হাসিনা সরকারের বিষদগারও করেছেন। কিন্তু তার লেখায় একটা সত্য প্রতিভাত হয়েছে। আর তা হচ্ছে তার দেশান্তরের কারণ ছিল ‘রাজনৈতিক’। যে ‘রাজনৈতিক-চক্রের’ দাবার গুটি হয়ে তিনি অজ্ঞতাবশত: কোরানের বিপক্ষে এবং ইসলামী মূল্যবোধের বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছিলেন, যা মূলত অপরের নাগরিক অধিকার ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করছিল, তাই সেটা এক সময় বেক-ফায়ার করেছিল -এই যা। অন্যথায় তার চেয়ে জ্ঞানী, শিক্ষিত, সুচতুর নাস্তিকরা রাজধানীর বুক চিড়ে খাচ্ছে, কাউকে দেশান্তর হতে হচ্ছে না।

দু’কুলের’ সম্মান

প্রতারক নাস্তিকদের আরেকটি বিষয় হচ্ছে এই যে তারা ‘দু’কুলের’ সম্মান নিয়ে বাঁচতে ও মরতে চায়। এটা হচ্ছে ধর্মীয় পরিভাষায় ‘মুনাফিকি’। এরা চাকুরী-বাকুরী করে, সভা-সমিতিতে উপস্থিত হয়, মঞ্চের প্রধান চেয়ার পায়, বক্তৃতা দেয়। ইসলাম ত্যাগ করেছে -এমন কথা প্রচারিত হলে ‘বাজার-মূল্য’ অনেকটা কমে যাবে, এই ভয়। তারপরের ভয় হচ্ছে মরে গেলে জানাজার কী হবে? হাজার হাজার লোকের সমারোহ ও সম্মানের কী হবে? তাই ঘাপটি মেরে মুসলিম সমাজে তাদের ছদ্মাবরণ। সালাম ও আলাইকুম, ইনশাল্লাহ, মাশাল্লাহ ইত্যাদি। কেউ কেউ আবার কয়েক বছর পর পর ঈদের নামাজে হাজিরা দেন। এগুলো হচ্ছে দুকূল বাঁচানো ও জানাজার নিশ্চয়তা বিধান।
আমি আজকের এই লেখায় সকল কথার কভার দিতে পারব না শুধু ঘাপটি মেরে থাকা নাস্তিকদের ইসলামী দাফন-কাফনের বিষয় নিয়ে কয়েকটি কথা বলব।

নাস্তিকের দাফন

অনেক নাস্তিকের মৃত্যুর পর দেখা যাবে স্থানীয় মসজিদের ইমাম ডেকে জানাজার আহবান করা হচ্ছে! কিন্তু নাস্তিকের জানাজা তো জায়েজ নয়। হয়তবা ইমাম এবং আশে-পাশের লোকজন মৃত ব্যক্তির পরিবারের দিকে তাকিয়ে সেটা করে ফেলেন। ভাবলাম, এটা সামাজিক উদারতা। কিন্তু এই উদারতা আপাতত এক পাশে থাক। কথা হবে যে যে ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে নাস্তিক বিশ্বাস গ্রহণ করল, সে তো ইসলামের বিশ্বাস, পথ ও প্রথাকে মানতে না পারায়ই ধর্মত্যাগী হল। কিন্তু এই ব্যক্তি যদি আবার চায় যে মৃত্যুত্তোর তার ‘শেষকৃত্য’ (দাফন বলছি না ইচ্ছে করে) ইসলামী উপায়ে হোক, তবে এখানে এক বিরাট প্রশ্ন এসে যায়।

আমাদের কথা হচ্ছে বিবেকের কথা। একজন নাস্তিক তার জীবিতাবস্থায় ভিন্ন বিশ্বাস নিয়ে বাস করবেন কিন্তু মৃত্যুর পর ইসলামী প্রথার রথে চড়ে গর্তে প্রবেশ করার আশা রাখবেন –এই বৈপরীত্য কেন? মরণের পরে ইসলামের রথে চড়ে যদি গর্তে ঢুকা ভাল দেখায়, অর্থাৎ যদি ইসলামী দোয়া ও জানাজার মাধ্যমে পরকালের পথ ধরে মুসলমানদের গোরস্থানে দাখিল হওয়া সুন্দর, কল্যাণকর ও সম্মানজনক অনুভূত হয়, তবে নিশ্চয় তাদের নাস্তিক্য বিশ্বাসে দুর্বলতা আছে –একথা বলতেই হবে। আর তা না হলে, তারা নিজেরাই যখন জানেন যে ইসলাম ত্যাগ করার পরে ইসলামী জানাযা, দোয়া, দাফন তাদের জন্য জায়েজ নয়, কিন্তু তবুও তারা কেন (অন্তত মানবতাবাদী হিসেবেও), মুসলমানদেরকে এই বিব্রতি থেকে বাঁচাতে কিছু বলবেন না, কিছু করবেন না? এখানে ইসলামী জানাযা, দোয়া, দাফনের ইজ্জত নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার পিছনে কোন ধরণের বিশ্বাস কাজ করছে বলে অনুমান করা হবে?

অনেকে মরণের প্রাক্কালেও নিজের বিশ্বাসের ঘোষণাটি দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু কেন করেন না? এর একটি উত্তর হয়ত এই হতে পারে যে মরণ-মুহূর্তে দুনিয়াবি অনেক মূল্যবোধ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন সত্যকে ভিন্ন উপায়ে দেখার অবকাশ আসে। তখন যা সত্য ও ভাল অনুভূত হয় তার পিছনে যৌক্তিক কিছু কারণও থাকতে পারে। তারপর কথা হতে পারে যে, যা মরণকালে ভাল, তা তো জীবন কালেও ভাল হওয়ার কথা ছিল। জীবনে নাস্তিক আর মরণে আস্তিকের দাফন –এ যে কী বৈপরীত্য! তারা নাকি আবার যুক্তিবাদী, মুক্তমনা! বরং বলুন প্রতারক।

এই প্রতারকগণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রে, মিডিয়ায় এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানাদিতে। তাদের কেউ মরলে এই সংস্থাগুলো কৌশলে কভার দিয়ে যায়। নাস্তিককে আস্তিকের দাফন দিতে সত্যকে ঢেকে দেয়, রেডিও টিভি ও মিডিয়াতে মিথ্যাচার করে। কোনো কোনো ঘটনাকে মুসলমানদের বিপক্ষে চালাতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।কালোকে সাদা করে। মিডিয়া প্রধানণত তাদের কব্জায়। এর ঐতিহাসিকতা আধিপত্যবাদ, সেক্যুলার রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিদেশি এনজিও, সুদি-ব্যাঙ্কিং ইত্যাদির সাথে জড়িত।

-দুই-

ইসলাম ধর্মের মূল বিশ্বাস হচ্ছে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। এর কোনোটিকে অস্বীকার করে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। এই বিষয়গুলো নিয়ে ইসলাম তার নিজের সিস্টেমে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করে এবং এতে কোন আপোস করে না। আর এই আপোষ না করার কারণে ইসলাম আজ পর্যন্ত ঠিকে আছে। তাছাড়া কেউ বিশ্বাসের অবস্থান গোপন করে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও কর্মের উপর হামলা চালালে, নামাজ রোজা অস্বীকার ও এগুলো নিয়ে উপহাস করলে, কেউ মুসলমান থাকতে পারে না।

এ কথা হয়ত বলা যেতে পারে যে ভারতে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবে একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর কোন ধর্ম বা ধর্মীয় ব্যবস্থা আংশিক অথবা পূর্ণভাবে প্রভাবিত হওয়া ছাড়া ঠকে থাকতে পারেনি, উপায় ছিল না। ইসলামের এই কৃতিত্বের পিছনে রয়েছেন আমাদের আলেম সমাজ, যাদের বলিষ্ঠ অবস্থানের প্রশংসা করতে হয়। বাংলাদেশে এই আলেম সমাজকে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে একটি চক্র তাদের ইমেজকে টার্নিস করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে এবং আংশিক সাফল্যে তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই আলেম সমাজের কারণেই আজ আমরা আমাদের বিশ্বাস ঠিকিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছি। না হলে, ব্রাহ্মণ্য প্রভাবিত পৌত্তলিক মুসলমানেরা এই ধর্মকে কবে দ্বীনে-এলাহি করে ফেলত এবং এটাকে শিরকের আড্ডা করে ফেলত। ওরা যারে-তারে মুসলমান বানাত আর কোনো ব্যক্তি তাদের ‘পূজনীয়’ হলে উপায় নেই, ওর জন্য সাত খুন মাফ হয়ে যেত।

ধর্মের কাহিনী অতি পুরানো। সেই পুরানো কাল থেকে বিশ্বাসের ভিন্নতা মানব সমাজে প্রবেশ করেছে এবং সাথে সাথে ধর্মান্তরের বাস্তবতাও দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ কেউ এই ধর্মে এসেছে, কেউ সেই ধর্মে গিয়েছে। অনেক জাতি ও গোষ্ঠীর লোক যেমন ইসলাম ধর্মে দাখিল হয়েছে তেমনি কিছু কিছু লোক ইসলাম থেকে খারিজও হয়েছে। আমরা এই বাস্তবতা অস্বীকার করি না। নবীর (সা.) যুগেও দুই একটি ঘটনা ঘটেছে। সুতরাং ইসলাম ও মুসলমানদের কাছে এটা নতুন কোন বিষয় নয়। যেহেতু বিশ্বাস মুসলমানদের কাছে অতি মূল্যবান, মৌলিক বিষয়, তাই এটাকে হিউম্যানিষ্ট নাস্তিক্যবাদের মূল্যবোধে মূল্যায়ন করার কোনো বিষয় নয়। এক ব্যক্তির মৃত্যুতে তার বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করলে হিউম্যানিষ্ট নাস্তিক্যবাদে যদি অসুবিধার কিছু থেকে থাকে তবে সেই অসুবিধা ইসলামে নেই। উল্লেখিত হিউম্যানিষ্ট মূল্যবোধ আর ইসলামের মূল্যবোধ আলাদা। কোনো তাত্ত্বিক আলোচনাতে কারো সম্মানের প্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার হওয়ার কথা নয় যদি না সেই প্রাসাদ কাচের তৈরি হয়, আর যদি না সেই আলোচনায় ব্যক্তির মানবতা কেড়ে নেয়া না হয়। অর্থাৎ যদি তাকে dehumanise করা না হয়। ব্যক্তি-পূজারীরা তাদের ব্যক্তি সত্তা নিয়ে ‘তাদের মত’ আলোচনা না করলে তাদের কাছে সব কথাই উক্ত ব্যক্তি-বিরোধী লাগতেই পারে, কেননা এটাই শিরকের অংশ, ব্যক্তিকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে অতিমানব করে দেখার প্রয়াস ও প্রচেষ্টা।

কোন মুসলমানের মৃত্যুতে যদি তার বিশ্বাস ও ধর্ম নিয়ে সন্দেহের অবকাশ দেখা দেয় তবে তা নিয়ে আলোচনা করা হবে, তার বিশ্বাসের স্থান বুঝার চেষ্টা করা হবে। আর এতে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে, অর্থাৎ কোন উপায়ে তাকে ইসলামের মূল বিশ্বাসের আওতায় বুঝে নিয়ে যদি ইসলামী দাফন/কাফনের ব্যবস্থা করে গোরস্থ করা যায়, তবে তাই সুন্দর হবে এবং বাদবাকি অবস্থা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়া হবে। তবে আলোচনা অবশ্যই হতেই হবে, না হলে এই ধর্মের মৌলিক অস্তিত্ব ঠিকে থাকবে না। যে মুসলমান নয়, তাকে কেন ইসলামী দাফন কাফন দেয়া হবে? কেন তার স্থান মুসলমানদের গোরস্থানে হবে? দুঃখের বিষয় হল যে কখনো দেখা যাবে যে পৌত্তলিক প্রভাবিত অথবা নাস্তিক্য প্রভাবিত ইসলামীজ্ঞানশুন্য অনেক লোক নিজেরাই ফতোয়া দিয়ে অনেক কাজ করে ফেলে, আলেম ওলামাদের ধারই ধারে না। আমাদেরকে এই প্রবণতা থেকে বেচে থাকতে হবে।

এবারে মূল কথাতে যাই। যে ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগী, সে অমুসলমান। তার শেষকৃত্য তার মতো করাতেই তার প্রতি ও তার বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো হয়। তাকে ইসলামী জানাযা দেয়াতে বরং তার বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান দেখানো হবে। মৃত্যু-মুহুর্তে একজন হিন্দুর মুখে নাকি আগুনের পরশ দেয়া হয়। এতে তাদের ধর্মীয় পবিত্রতার ভাব ও ধারণা রয়েছে, (রবিন্দ্রনাথের ‘আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে, এ জীবন পূণ্য কর, এ জীবন পূণ্য কর দহন দানে’ গানটি শুনলে কিছুটা হলেও বিষয়টি হৃদঙ্গম করতে পারবেন)। যেহেতু এটা তাদের বিশ্বাসের সাথে জড়িত তাই এই কাজে তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রয়েছে। বিশ্বাস জীবন মৃত্যুতে কাজ করে।

ইসলামের বিশ্বাস অতি জরুরি বিধায় যখন কোনো ব্যক্তির বিশ্বাসের ব্যাপারে সন্দেহ এসেছে তখন আলোচনাও এসেছে। এমন ইতিহাস ইসলামে আছে। মহাকবি ওমর খাইয়ামের ব্যাপারে তার এই পঙতি, ‘নগদ যাহা পাও হাত পেতে নাও, বাকীর ঘরে শূন্য বসাও’ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। কেননা এতে পরকাল অস্বীকার করার কথা অনেকে উত্থাপন করেছিলেন এবং তার জানাযার ব্যাপারে সন্দেহ-প্রবণ হয়েছিলেন। তারপর আলোচনা শুরু হয়। তারপর, তার পরের লেখাদি বিবেচনা করে পরকালের প্রতি বিশ্বাস প্রমাণিত হলে জানাযা করা হয় এবং দাফনও করা হয়। আলোচনায় সমাধান আসে, সন্দেহ নিরসিত হয়। নিরসিত অবস্থায় ব্যক্তির মর্যাদা অধিক সমৃদ্ধ হয়।

যে ব্যক্তি তাওহীদ রেসালাত ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না, সে মুসলমান নয়। আর যে ব্যক্তি ইসলাম বিদ্বেষী কর্ম-কাণ্ড চালিয়েছে সেও মুসলমান নয়। কে কতটুকু সম্মানের অধিকারী, কাকে বেশি লোক পূজা করেছিল, এসব কথা দিয়ে কোনো নাস্তিকের জানাযা করা যাবে না। আর ফতোয়ার ব্যাপার আস্‌লে আলেম-ওলামারাই ফতোয়া দেবেন।

-তিন-

আল্লাহ মানুষের তকদীর সৃষ্টি করেছেন। যার তকদীরে ঈমান রেখেছেন, সে ঈমানদার হবে এবং যার তকদীরে ঈমান রাখেন নি তাকে সারা দুনিয়াবাসী চাইলেও ঈমান আনাতে পারবেন না। দেখা যায় যে কেউ ইউরোপ আমেরিকায় থাকেন, খৃষ্টীয়ান ধর্মের লোক, কিন্তু কোনো এক অজানা সূত্রের টানে কোথায় গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আবার এও দেখা যাবে যে মুসলিম সমাজে থেকেও কেউ ইসলাম ত্যাগ করেছেন বা ইসলামের বিশ্বাসাদি মানতে পারেনি।

কিন্তু কোনো ব্যক্তি ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হতে পারল না বলে তার প্রতি কেউ কোন বিদ্বেষ পোষণ, মন্দ কথা, ঘৃণা বাণী প্রকাশ ইত্যাদি আচরণ করা যাবে না। কারণ এগুলো ইসলামের আচরণ নয়। তবে এমন পরিণতিকে শিক্ষণীয় দৃষ্টিতে আলোচনা করা যেতে পারে, যাতে করে জীবিতরা ঈমানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন।

এই কাজটিও আবার সব স্থান ও কালে এককভাবে করা যাবে না। পৌত্তলিক মুসলিম সমাজে কোন সনামধন্য ব্যক্তি যদি ইসলাম বহির্ভূত জীবন যাপন করেন অথবা ইসলাম ধর্মের মূল বিশ্বাসকে অস্বীকার করেন এবং তার পক্ষে এক ভক্ত-শ্রেণী থেকে থাকে তবে সেই আলোচনা শিক্ষণীয় হলেও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হবে, কেননা ভক্তরা খুব শক্ত হয়। পৌত্তলিকতায় ব্যক্তি-ভক্তি ধর্মের ন্যায় কাজ করে। যে কোন কথা ভক্তের কাছে তার পূজ্য-দেবতার প্রতি ধর্মহীনতার (sacrilege) মত দেখা দিতে পারে। আর সে তার ধর্মানুভূতিতে আঘাত অনুভব করে ফিতনায় উলপাড় সৃষ্টি করতে পারে।

আবার, স্থান ও কালের প্রেক্ষিতে আলোচনার মূল স্থান পূজ্য-ব্যক্তির পরিবর্তে ভক্তের বিশ্বাসের স্থান হয়ে পড়তে পারে। প্রকৃতপক্ষে পূজ্য-ব্যক্তি ভক্তের অতি-ভক্তির প্রত্যাশিত নাও হতে পারেন। ভক্তরাই হয়ত তাকে অবমাননার স্থানে নামাতে পারেন। তাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত ভেবে তাদের পূজারী-শ্রেণীর মোকাবেলায় সবাই অপর পক্ষ ‘দুশমন’বানিয়ে দিতে পারে। অথচ যারা তাদের মত পৌত্তলিক নয় তারা যে তাদের পূজ্য-ব্যক্তিকে আকাশে তোলা অথবা মাটিতে নামানোর কোনটিতেই নেই, তা তাদের ধারণা বহির্ভূত থেকে যেতে পারে। কেননা তাদের আবেগ ধর্মে, পৌত্তলিকতায়। তারা দেখতেই পাবে না যে বাকিরা হয়ত তাদের ‘দেবতার’ বিভিন্ন গুণের মূল্যায়ন করছে, তবে পূজারীদের মত নয়। কিন্তু এতটুকু তাদের কাছে গ্রহণীয় হবে না। তাদের চাই সেই পূজনীয় ভাষা, চাটুকারি প্রশংসা। আর তা যে ব্যক্তি দিতে ব্যর্থ হবে, সেই আখ্যায়িত হবে ‘বিরোধী’ হিসেবে অথবা ‘মৌলবাদী’ হিসেবে। মূলত এই অতিভক্তদের কারণে সমাজে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়, কুন্দল হয়, ভ্রাতৃত্ব ভাঙ্গে –এটাই শিরকের কুফল।

মৃত্যু এক চরম সত্যের নাম। এ জিনিসটি অনেকের বিশ্বাস-চক্ষু খুলে দিতে পারে। কিন্তু অতিভক্তরা বাকিদের জন্য বিশ্বাসের পথ রোধ করে দেয়। যে ব্যক্তি ইসলামের বিশ্বাসকে বর্জন করে অন্য বিশ্বাসে দাখিল হয়েছে (তা নাস্তিক্যবাদও হতে পারে), এমন ব্যক্তির পূজায় ইসলামী রঙ ঢালতে গেলে তার জীবন ও বিশ্বাসকে যেন ইসলামী আঙিনায় আনা হয়ে যায়, অথচ এখান থেকে মুসলমানরা যে শিক্ষা পাওয়ার কথা ছিল তার উলটো শিক্ষাই যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ঐ ব্যক্তির পরিবার ও আশে পাশের লোকদের সঠিক পথে আসার পথও রোধ করা হয়। অর্থাৎ এখানে এই বাস্তবতা প্রমাণিত হয়ে পড়ে যে বিশ্বাস ও কর্মে ইসলাম বিরোধী হলেও তা সর্বাবস্থায় পূজনীয় থাকতে পারে। সুতরাং এই সংস্কৃতি যারা প্রবর্তন করবে এবং ঠিকিয়ে রাখবে তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে মুসলমানদের দূরে থাকা উচিৎ।

মৃত-ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার শেষকৃত্য কীভাবে হল সেটা শেষ কথা নয়। কেউ কারো শেষকৃত্য করে স্বর্গেও পাঠাতে পারবে না আবার নরকেও দিতে পারবে না। শেষকৃত্য মৃতের কোন আমল নয়। এটা জীবিতদের ব্যাপার, তাদের বিশ্বাসের ব্যাপার, আমলের ব্যাপার।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
২৭৬ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)