লগইন রেজিস্ট্রেশন

ফ্যাসিবাদে মুসলিম জাতি নেই

লিখেছেন: ' এম_আহমদ' @ সোমবার, এপ্রিল ১, ২০১৩ (১০:৫০ অপরাহ্ণ)

ভূমিকা

ইদানীং উগ্র জাতীয়তাবাদের নেশায় বিভ্রান্ত কিছু লোকদেরকে বলতে শুনা যাচ্ছে, ‘মুসলিম জাতি’ বলতে কিছুই নেই। কথাবার্তা থেকে লক্ষ্য করা যায় যে এই লোকগুলো নিম্ন পর্যায়ের প্রোপাগাণ্ডিস্ট। উগ্রদের চালিকা শক্তির পিছনে হয়ত মুসলিম বিশ্বের অবশিষ্ট ঐক্য ও ঐক্যের ধারণার বিপক্ষে যে সম্প্রদায় বিশ্ব-জুড়ে কাজ করছে, তাদের ইশারা-ইঙ্গিতও থাকতে পারে। এই উগ্রদের কাছে মুসলিম জাতির ধারণা নাকি গঠিত হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদ তাড়াতে। আর এটাই নাকি দেশ-মাতৃকা ভারত-জননীকে বিভক্ত করেছে। এই মুসলিম জাতীয়াতাবাদ দিয়ে নাকি পাকিস্তান বাঙালীদেরকে দুই দশক শোষণ করেছে। কিন্তু কথা হল ব্রিটিশ-খেদাও থেকে যদি এই ধারণা একান্ত এসেই থাকবে, তবে তা তো ভারতীয় ঐক্যের ধারণাই ছিল, এটাকে ভারত ভাঙ্গার জন্য দায়ী হবে করা হবে কেন? এর কারণ নিশ্চয় অন্য কিছু হতে হবে।

মুসলিম জাতি নেই -এই ধারণার স্থূলদর্শীতা বুঝাতে কোরান হাদিস ঘাটার দরকার নেই -কেননা সাধারণ মানুষই এর অসারতা বুঝতে সক্ষম মনে করি। কিন্তু বিষয়টির পিছনে যা লুকায়িত তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন এবং এই উদ্দেশ্যে কিছু হাল্কা আলোচনা করতে যাব। তবে আলোচনার পরিধি খানিক দীর্ঘ হবে।

যে কয়টি লোক ‘মুসলিম জাতি নাই’ বলে আওয়াজ তুলছে, তাদের উত্থাপিত বিষয়ের মানসিকতার সাথে ঐতিহাসিক অনেক সূত্র জড়িত। এই সূত্রগুলো তাদের বাহ্যিক কথাবার্তায় অনুপস্থিত। এই বিভ্রান্ত লোকদের কথাতে অপরাপর যেসব ধারণার জিঞ্জির-সূত্র রয়েছে তা হল ইসলাম নিয়ে, ধর্মীয় পরিচিতির একাংশকে ছুঁড়ে ফেলা নিয়ে, ইউরোপে উদ্ভূত ধারণার জের নিয়ে, ভারত বিভক্তি নিয়ে, বাংলায় ফ্যাসিবাদের উত্থান নিয়ে, পাকিস্তানী ঘৃণা নিয়ে ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোতে কখনো আছে তাদের প্রেক্ষিতগত বেমিল, কখনো ভুল সমঝ, কখনো জোড়াতালি, এবং বেশিভাগ প্রোপাগান্ডা।

প্রথমেই বলে রাখি, মুসলিম জাতির ধারণা ভারত-ভূখণ্ডের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটা আগ থেকেই ছিল -এটা প্রাচীন, চিরন্তন। আবার এর সাথে ১৮৭৯ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত সময়ে ইউরোপে নিজেদের পারস্পারিক রেষারেষি, অতীত যুদ্ধবিগ্রহ ও বিশেষ করে ঔপনিবেশবাদকে কেন্দ্র করে অর্থাৎ কোন ইউরোপীয় দেশ অপর কোন দেশের চেয়ে বেশি দখলদারি করবে, দখলকৃত দেশগুলোর কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক রিসোর্স আত্তীকরণ করবে এই দ্বন্দ্বে উদ্ভুত ‘জাতীয়তাবাদ’ থেকেও ভিন্ন। এই জাতীয়তাবাদ ঔপনিবেশবাদীদের একটি সহায়ক চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং প্রথম মহাযুদ্ধের পর মুসলিম ও জার্মান সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো করতে উড্রো উইলসনের Self-Determination থিওরির আওতায়ও ইহাকে ব্যবহার করা হয়। আমাদের মুসলিম জাতীয়তা নেশন-স্টেট এর সাথে ওতপ্রোত নয়, যদিও এই জাতীয়তার সংজ্ঞা, ক্ষেত্র বিশেষে, ইসলামেও প্রয়োগ করার অবকাশ রয়েছে।

বলেছি, মুসলিম জাতীয়তা হচ্ছে একটি সর্বজনীন ধারণা ও পরিচিতি। এই ধারণার আওতায় অসাংঘর্ষিকভাবে আরও অনেক পরিচিতি থাকতে পারে। জেদ করে কোনোটি তাড়ানোর প্রয়োজন নেই। মূলত মুসলিম জাতির পরিচিতি ও ধারণা আসে তার বিশ্বাস, কর্ম, মূল্যবোধ ও আদর্শ থেকে। এই পরিচিতির আওতায় যে জনগোষ্ঠী রয়েছেন তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করেন, রেসালাতে বিশ্বাস করেন এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাসের মূল কথা হচ্ছে মানুষ জবাব-দীহি জীবন যাপন করবে, আর পরকালে তাকে আল্লাহর সম্মুখীন হতে হবে। এই ধারণায় অনেক প্রশস্ততা ও ব্যাপকতা আছে। এটা স্থান ও কালকে অতিক্রম করে। এই পরিমণ্ডলে যে বা যারা ঢুকবে তারা এই জাতির লোক হবে। সে কালো হোক, সাদা হোক, ধনী হোক, গরীব হোক, অথবা কোনো গোত্রের, পরিবারের, অথবা কোনো ভিন্ন ভূখণ্ডের। এই বিশ্বাস ও ধারণার আওতায় সবাই মুসলিম জাতি, এক দেহ, এক প্রাণ। তাদের এক অঙ্গ ব্যথা পেলে গোটা অঙ্গে তা অনুভূত হবে। প্রাচ্যের অঙ্গে অনুভূত ব্যথা প্রতীচ্যের গায়ে বেদনার কান্না জাগাতে পারে। প্রতীকী অর্থে তারা এক বুনইয়ান (ইমারত)। এই বিশ্বজনীন ধারণাটি ইউরোপীয় শক্তির মানসিকতায় ভারি দাগ কাটে। এটাকে ভেঙ্গে দিতে তারা যুগপৎ-ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

মুসলিম জাতি আছে বলে যে কথাগুলো বলেছি সেগুলো কোরানে আছে, হাদিসে আছে, তফসীরে আছে, ইতিহাসে আছে। বর্তমানে আছে, অতীতে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, ইনশাল্লাহ। কিন্তু যারা ‘মুসলিম জাতি’ নাই বলে এখন আওয়াজ তুলছেন, তারা হচ্ছেন উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী সম্প্রদায়। এই উগ্ররা একাত্তরের যুদ্ধের কারণে গোটা পাকিস্তানীদেরকে ঘৃণা করে এবং যারা সেদিন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলেন (বিদেশি মুসলিম দেশগুলোসহ) সবার প্রতি তাদের ঘৃণার অনল সমভাবে প্রসারিত করে। এদের মধ্যে আছে ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক, ইসলাম বিদ্বেষী হিন্দু এবং কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী আল্ট্রা-সেক্যুলার মুসলিম। তাদের দৃষ্টিতে ‘মুসলিম জাতির’ ধারণাটি তাদেরই ভারত-মাতার বুক ভেঙ্গেছে -এই ভাঙ্গানটি ছিল ভুল। এই ‘মুসলিম জাতির’ ধারণার কারণে নাকি পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদেরকে শোষণ করেছিল। উগ্রদের এই কথাগুলো মিথ্যা। এগুলো প্রোপাগান্ডা-প্রসূত। তাই তাদেরকে নিয়ে আলোচনায় বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনাধীন রাখবে হবে। আমার আলোচনায় ধারণাগুলো আমি বিবেচনা করবো এবং যেগুলোর মিল-মিশ্রণে আলোচনা জুড়বো সেগুলো হবে নিম্নরূপ:

* জাতীয় সত্তার অস্তিত্ব ও রোগ-ব্যাধি
* ইউরোপে ধর্ম-বিধ্বংসী আন্দোলন ও কালের আবর্তনে বাংলায় সেই আন্দোলন
* আধুনিকতাবাদ, মিলিট্যান্সি ও ন্যাশন স্টেট
* ভারত বিভক্তি –ধারণাগত পার্থক্য ও ভুল
* পরিচিতি ও পরিচিতির অধিক্রমন
* পাকিস্তান ভাঙ্গা
* শোষণের বক্তব্য
* দুই অসম আর্থ-সামাজিক দেশ এক হওয়া
* মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চাওয়ার ধারণা
* ফ্যাসিবাদ: পাকিস্তান/পাকিস্তানী ঘৃণা
* সারাংশ

জাতিয় সত্তার অস্তিত্ব ও রোগ-ব্যাধি

মুসলিম জাতির একটি সত্তা ও পরিচিতি আছে। এই সত্তা ও পরিচিতির অস্তিত্ব স্থান ও কালভেদি বিস্তৃত। সৃষ্টি জগতের সবকিছু কালের আবর্তনে যেমন ঘোরপাক খায় তেমনি একটি জাতি ও তার সত্তাগত জীবনও ঘোরপাক খেতে পারে। ব্যক্তি-দেহে যেমন রোগ দেখা দিতে পারে, তেমনি সামষ্টিক সত্তাতেও রোগ দেখা দিতে পারে। কোনো অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ রুগাগ্রস্থ হয়ে তার কার্যকারিতা হারাতে পারে। তবে একথা বলা যাবে না যে ঐ অঙ্গের অস্তিত্ব নেই বা ছিল না। অথবা রুগ্ন-ব্যক্তি যদি ধরাশায়ী হয়ে পড়ে, তবে বলা যাবে না যে তার কোন সুস্থ-অস্তিত্ব কোনো দিনই ছিল না। তার রুগ্ন অবস্থা তার অস্তিত্বের বিষয় উড়িয়ে দেয় না, অস্তিত্বকে অস্বীকার করার কারণ হয় না।

মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা খিলাফত ধ্বংসের পর থেকে মুসলিম বিশ্বে নানা সংক্রমণ দেখা দেয়। আবার কালের আবর্তনে স্থানে স্থানে তাকে সুস্থ অসুস্থ হিসেবে দেখা যায়। এটাই জীবন। জীবন সব সময়ই সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। এমনটি প্রকৃতির রূপও। আজ আকাশ মেঘলা, আজ সূর্যের আলো আটকা পড়েছে অথবা সূর্য শুধু উকি ঝুঁকি দিচ্ছে। কাল এটা হয়ত এভাবে থাকবে না। প্রকৃতিতে যেমন ঋতু আছে তেমনি জাতির জীবনে জয় পরাজয় আছে। কোনো আদর্শই বেশি দিন ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ব্যত্যয় ঘটে। আবার ব্যত্যয় ও পরাজয় হয় বলে বিজয়ের আশা চলে যায় না, প্রয়াস বর্জিত হয় না। আমাদের এই মুসলিম ‘উম্মাহ’ এভাবেই নানান ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে বেঁচে আছে।

ইউরোপে ধর্ম-ধ্বংসী আন্দোলন ও কালের আবর্তনে বাংলায় সেই আন্দোলন

১৭শো শতকের শেষাংশে এবং ১৮ শো শতক ব্যাপী ইউরোপে তাদের অতীত সামাজিক বিপর্যয় ও যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে এবং রাজকীয় অত্যাচার ও তার সাথে গীর্জীয় সংযোগের কারণে কিছু মানুষ ধর্ম বিশ্বাস হারিয়ে বিজ্ঞানবাদ ও যুক্তিবাদের একটি আন্দোলন পরিচালনা করে যা এনলাইটনম্যান্ট (যুক্তি/বিজ্ঞানে আলোকিত, ঐশী নির্দেশনার প্রতিকূলে) অ্নাআন্দোলন থেকে উৎসারিত হয়, এনলাইটনম্যান্ট আপনাতেই নাস্তিক্যবাদ নয়। এনলাইটনম্যান্টের দর্শনকে আধুনিকতাবাদের (modernism) একাংশ হিসেবেও ধরা হয়। ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে এই আন্দোলন অধিক জোরদার ও ব্যাপক হয়। এই আন্দোলন সমাজের পূর্ববর্তী অনেক ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিকতা ও ধ্যান-ধারণা পাল্টে দেয়। এক সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিপ্লবী নাস্তিকদের ও আলট্রা-সেক্যুলারদের হাতে এসে পড়ে এবং তারা ধর্মকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেয়। তারা ধীরে ধীরে নাস্তিক্যবাদী ধ্যান-ধারণা শিক্ষা থেকে শুরু করে সামাজিক যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিকতায় প্রবেশ করিয়ে দেয়। নাটক, উপন্যাস, ফিল্ম এবং বিশেষ করে মিডিয়ার মাধ্যমে ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় আচার আনুষ্ঠানিকতাকে তাচ্ছিল্য, তীর্যা, রঙ-তামাশা ইত্যাদির মাধ্যমে হেয় করে।

কিন্তু ১৯৫০ দশকের দিকে আধুনিকতাবাদের দর্শন তার চিন্তার ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। ‘যুক্তি’-এর ভিত্তিমূল নিয়ে অনুসন্ধানে দিব্যি দেখা দেয় যুক্তির দুর্বল ভীতসমূহ। বস্তুজগৎ নিয়ে আমাদের জ্ঞান দেখা যায় ‘ভাষা’ ও ‘সজ্ঞা’ -এর সাথে এমনিভাবে জড়িত যে এর ফলে আমাদের অনেক জ্ঞাত বিষয়ের অতি-নিশ্চয়তায় সমস্যা দেখা দেয়। ভাষা ও বস্তুর (বাস্তবতা/reality) সম্পর্ক ওতপ্রোত নয়। ভাষার ‘মাধ্যমে’ যে অর্থ গ্রহণ করা হয় তা সামাজিক প্রথার (convention-এর) সাথে জড়িত, এখানে বাক্য ও শব্দাদি রূপকতায় (through metaphoricity) কাজ করে অর্থ প্রকাশ করে -ভাষা একটি প্রতীকী ব্যবস্থা (symbolic system)। এখানে আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের দৃষ্ট, অনুভূত বিষয় সজ্ঞার ভাষিক ব্যাখ্যায় বিবৃত হয়। এখানে রয়েছে এক ব্যাখ্যার মোকাবেলায় অন্য ব্যাখ্যা, একই বস্তু (প্রতীক) ভিন্ন ব্যাখ্যায় ভিন্নভাবে দেখার পরিপ্রেক্ষিত। কোন এক পক্ষের ‘বাস্তবতা’-এর ব্যাখ্যা এমন নয় যে তা ফাইনাল। আমাদের চোখকে একটি ‘যন্ত্র’ হিসেবে ধরে তার আলোকে জগতের যে ব্যাখ্যা ও ধারণা পাওয়া যায়, সেই চোখ-যন্ত্রের সাথে মাইক্রোস্কোপ নামক আরেকটি যন্ত্র সংযোগ করলে আরেক ধরণের বাস্তবতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এক্সরে যন্ত্র দিয়ে দেখলে আরেক ধরণের বাস্তবতা ও ব্যাখ্যার স্থান পাওয়া যায়। প্রত্যেক নব নব যন্ত্র বস্তুর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারছে এবং সেই ব্যাখ্যার পিছনে রয়েছে আরেকটি ব্যাখ্যাদাতা, সজ্ঞা (consciousness)। বিজ্ঞান আমাদেরকে কেবল ‘যান্ত্রিক’ অবলোকনের মাধ্যমে একধরনের জাগতিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে। চোখের (পঞ্চেন্দ্রিয়ের) অবলোকন এবং ধ্যান ধারনায় লব্ধ জ্ঞান আরেক ধরণের ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ধর্মও দিচ্ছে আরেক ব্যাখ্যা। এই আপেক্ষিকতায় যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদের ব্যাখ্যা নিছক আরেক ধরনের ব্যাখ্যা, আরেক ধরনের ধর্ম। এই ধরনের ব্যাখ্যার হাত ধরে এসেছে আধুনিকতা-উত্তরবাদ (পোস্ট-মডার্নিজম)।

মর্ডানিজম তার ব্যাখ্যার মনোপলি হারালে বিংশ শতাব্দীর মধ্য থেকে ধর্ম আবার নতুন শক্তিতে জেগে ওঠে। মার্ক্সিস্ট ধ্যান ধারণায় চরম ভাটা পড়ে। প্রগতিবাদের ধারণা (dialectic concepts on social progress) মিথ্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রকৃতিগতভাবে শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে সমাজতন্ত্রে (তারপর এক পর্যায়ে কমিউনিজমে) রূপান্তরিত হওয়ার পরিবর্তে সমাজতন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে রূপান্তরের বাস্তবতা দৃশ্যগত হয়। অনুসন্ধানাদি (studies) প্রমাণ করে যে সমাজ সভ্যতা বাদ (thesis), প্রতিবাদ (anti-thesis) ও সম্বাদ (synthesis): এই তিনের দ্বান্দিক, ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলছে না। একটি সভ্যতা কোন এক কালে গড়ে ওঠতে পারে কিন্তু সেখান থেকে আরও উন্নততর কিছু তৈরি না হয়ে, তা বিলীন হতে পারে। আবার এই সমাজ থেকে হাজারো মাইল দূরে, জগতের অপর প্রান্তে অসম্পর্কিত আরেকটি ভূখণ্ডে আরেকটি সভ্যতা গড়ে ওঠতে পারে এবং কালের আবর্তনে ধ্বংসও হতে পারে। ফিরাউনের সভ্যতা, মায়ান সভ্যতা, বেবিলনিয়ান সভ্যতা, হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো ইত্যাদি সভ্যতার উদাহরণ দেখা যেতে পারে। এতে প্রমাণিত হয় হেগেলের ঐতিহাসিক ডায়ালেক্টিক ধারনায় ভুল ছিল, তার ছাত্র কার্ল-মার্ক্সের ডায়ালেক্টিক মেটেরিয়েলিজমে ভুল ছিল। দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের অনেক থিয়োরিস্ট তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন।

আধুনিকতাবাদ, মিলিট্যান্সি ও ন্যাশন স্টেট

ঘটনা যাই হোক, আধুনিকতাবাদ থেকে উদ্ভূত নাস্তিক-ধর্ম অখণ্ড ভারতে প্রবেশ করেছিল এবং স্বাভাবিকভাবে পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গেও বিস্তার করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই নাস্তিকপক্ষের একটি অংশ বাঙ্গালী জাতীয়তাদের চরধর্মী ‘মুখোশ’ পরে। বিশেষ করে রাশিয়ার কমিনিজম ১৯৮০ দশকের শেষের দিকে ভেঙ্গে পড়লে কিন্তু উগ্র কমিউনিস্ট ‘বাঙালীত্বের’ মধ্যে নতুন কিবলার সুচনা করে। এদের মধ্যে সাধারণত বাম্পন্থি রাজনীতির লোক, উগ্র কমিউনিস্ট, এবং অল্ট্রা সেক্যুলারিষ্ট রয়েছেন। ওদের ইচ্ছা ইসলাম ধর্ম রাষ্ট্রের সকল পরিসর থেকে (যেমন শিক্ষা-ব্যবস্থা, আইন, রাষ্ট্রীয় ও সমাজ নীতি মালা প্রণয়ন-কর্ম কাণ্ড ইত্যাদি) দূরে থাকতে হবে। এদের মধ্যকার মুসলিম গ্রুপ বাদে, নাস্তিকদের একাংশের ইচ্ছা ইসলামকে ‘নির্মূল’ করা। ‘নির্মূল’ শব্দটি জরুরি। ওদের আক্রোশী কথাবার্তায় ‘ইসলাম’ ও ‘ইসলাম ধর্ম’ ব্যবহার না করে ‘সম্প্রদায়’ ও ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দ ব্যবহার করে, যাতে নিজেদের পরিচয় আড়াল করা যায়, (যদিও তারা নিজেরাই এক সম্প্রদায়)।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে ইউরোপে একদল লোক যেমন ইসলামের নাম শুনলেই জ্বলে ওঠে, মুসলমানরা কিন্তু সেভাবে হলে চলবে না। আমরা ইউরোপ বিদ্বেষী নই। ইউরোপেও যেমন ভাল জিনিস থাকতে পারে তেমনি এশিয়াতেই মন্দ জিনিস থাকতে পারে। ইউরোপে অনেক বস্তুর নাম ও ধারণা এক রকম হতে পারে, কিন্তু আমাদের কাছে সেই বস্তুর নাম ও ধারনা ভিন্ন হতে পারে। জাহেলী যুগে আল্লাহ শব্দ, দ্বীন শব্দ, তাওহীদ শব্দ যেভাবে ছিল, ইসলামের পরে সে সবের অনেক ধারনায় (meaning and thoughts) পরিবর্তন আসে। আজ ইউরোপে ধর্মীয়-ধারণাতে এবং আমাদের ধর্মীয়-ধারণাতে পার্থক্য দেখা যেতে পারে। ইউরোপে ১৮৭৯-১৯১০ পর্যন্ত যে ধরনের জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে, আমাদের জাতীয় ধারণা সেই সব অনেক বৈশিষ্ট্যমুক্ত। আমরা ইসলামি জাতীয়তাকে কোন এক ভূখণ্ডে, এক ভাষায়, (আরও কিছু কথা আছে, যা আলোচনার স্থান এখানে নয়), অথবা my nation right or wrong –এমন ধারণায় দেখি না। সিগারেট খাওয়া আমাদের দেশে ভাল নয়, কিন্তু আমাদের কোম্পেনীগুলো তৃতীয় বিশ্বে সিগারেট বিক্রি করাতে কোনো অসুবিধে নেই, আমাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনে অপরের দেশ ভাঙ্গতেও অসুবিধে নেই, নৈতিক হোক অথবা অনৈতিক, ভাল হোক অথবা মন্দ হোক, আমার ‘জাতির’ স্বার্থ যেখানে জড়িত আমি সেখানে থাকব, এখন ধারণা ইসলামের জাতীয়তায় নেই। আমরা যখন মুসলিম জাতীয়তার কথা বলি তখন তা ইউরোপের ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শেষে যে ধারণার সয়লাব ঘটে, আমরা সেগুলোর কথা বলি না। অথবা জাতির সাথে ‘বাদ’ (ism) সংযুক্ত করে কমিউনিস্ট জগতে যে উগ্র-নিষ্ঠুর বাস্তব-বিভীষিকার উদ্ভব হয়, আমরা সেগুলোর ধারণাও পোষণ করি না। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারেন লেনিনবাদ, স্ট্যালিনবাদ, মুজিববাদ ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজ যেসব বল প্রয়োগের দৃশ্য দেখেছে, সেগুলো।

আগেই বলেছি, আমাদের জাতির ধারনা আসে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কলেমা থেকে। অর্থাৎ অপরাপর জাতির মোকাবেলায় আমাদের পরিচয় (তা’আরুফ) হচ্ছে আমরা স্থান, কাল ভেদে এমন এক জাতি যারা আল্লাহর দাসত্বে নিবেদিত (মুসলিম)।. এই নিবেদিত দাসত্বে ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষগণ। কেউ সেই পুরাতন দাসত্বের নাম (মুসলিম) নিয়ে এখনো বেঁচে আছে, আর কেউ তাদের জাতীয় রূপ অন্যভাবে পরিগ্রহ করেছে যেমন ইয়াহুদী, খৃষ্টান, সাবিঈ ইত্যাদি। কিন্তু সেই নামেও তারা জাতি।

ইউরোপে জাতীয় সত্তার রূপ একটি বিশেষভাবে রূপায়িত হয়েছিল বলে আমাদের ‘জাতীয়’ ধারণা বর্জন করার কথা আসে না। আবার ইউরোপে ‘বিশ্বাস’ ও ‘ধর্মকে’ অনেকাংশে আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা হয় বলে আমরা সেই শব্দগুলোর ব্যবহার বর্জনের কথা বলতে পারি না। আমাদের অর্থ আমাদের থাকবে, তাদের অর্থ তাদের থাকবে। সিরাজুদ্দৌলার এক মন্ত্রী মীর জাফর আলী গাদ্দারি করেছিল বলে ‘জাফর’ শব্দ বর্জন করার আহবান আসে না।

ভারত বিভক্তি –ধারণাগত পার্থক্য ও ভুল

ইদানীং ‘মুসলিম জাতি’ নাই বলে উগ্ররা যে সুর তুলছে তা নাকি ভারত বিভক্তির সময় উদ্ভূত। তাদের ভাষ্য এতই এলোমেলো যে তা দেখতে হাস্যকর ঠেকায়। ভারত বিভক্তিতে যেসব উপাদান রয়েছে সেগুলোর স্থান হচ্ছে হিন্দুদের ইংরেজদের মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের পতন ঘটানোতে এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তগুলো নিজেদের হাতে নিয়ে মুসলিমদের পদদলনে। সেটা হচ্ছে অন্য ধরণের ইতিহাস। দ্বিজাতিত্বের ভিত্তিতে ভূখণ্ড বিভক্তির ভিত্তি হলেও দ্বিজাতি বিভক্তির ‘কারণ’ ছিল না।

হিন্দু ও মুসলিম দুই জাতের ধারণা ব্রিটিশ আগমনের আগেও ছিল। দুই বা অধিক জাতির অস্তিত্ব একই ভূখণ্ডে থাকাতে আপনাতেই কোন সমস্যার ব্যাপার হয় না। জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্র ও পরিসর থাকতে পারে। এই পরিসরগুলো আপন আপন স্থানে কোন সমস্যার সৃষ্টি করে না। ভারত বিভক্তির পরও সমাজের নানান জাতীয় পরিচয় বিলুপ্ত হয় নি। আমাদের এই ভূখণ্ডে সবাই ‘বাঙালী’ জাতির লোক নন। এখানে আরও অনেক জাতির লোক রয়েছেন। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাষ্ট্র-ভিত্তিক (nation state) যে ধারণা প্রসার লাভ করে তারই ভিত্তিতে, আমরা সবাই “বাংলাদেশী”।

পরিচিতি ও পরিচিতির অধিক্রমন (overlapping)

আমার পরিচয় পৈতৃক, পারিবারিক, তারপর গোত্রীয়, তারপর গ্রামীণ, তারপর জেলা-কেন্দ্রিক, তারপর রাষ্ট্রীয়। এগুলোতে আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন সূত্রের সম্পর্কে স্থাপন করেছেন এবং পরিচিতির স্থান রেখেন। এগুলোতে রয়েছে ভৌগলিক স্থান, রক্ত ও সময়গত (temporal) ধারণা, (গর্ব-অহংকারের কিছু নেই, শ্রেষ্ঠত্ব/দাম্ভিকতা (superiority) প্রকাশের কিছু নয়)। লক্ষণীয়, এগুলোর প্রত্যেকটি অতিক্রম করেছে আরেকটি ধারণা যা সর্বজনীন, বিশ্বজনীন (universal)। আর সেটা হচ্ছে ‘মুসলিম’, (আল্লাহর আনুগত্যমূলক ধারনা ও তাকে পরহেজ করে চলার বা তাকওয়ার ধারণা)। আমি বিয়ানীবাজারী মুসলিম, সিলেটী মুসলিম, বাংলাদেশি মুসলিম, আমি ব্রিটিশ মুসলিম –একগুলোর সব লেভেলেই রয়েছে আমার মুসলিম পরিচিতি। এই সর্বজনীন পরিচিতির পরিপ্রেক্ষিতে অন্য পরিচি্তি সাংঘর্ষিক নয়। ভারত ভূখণ্ডে সবাই ভারতী। এই পরিচিতি হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টীয়ান বৌদ্ধ সকলের আপন আপন সর্বজনীন পরিচিতিকে ভেঙ্গে দেয়নি এবং এতটুকু পার্থক্যের কারণে ভারত বিভক্ত হয়নি। ভারত বিভক্ত হয়েছে হিন্দুরা বিগত দুই শতক ব্যাপী মুসলমানদেরকে একপেশে করে, ইংরেজের সাথে মিতালী করে, রাষ্ট্রশক্তিকে যেভাবে কব্জা করেছিল, সেই কব্জাকে সামান্য ঢিলা করে মুসলিমদেরকে ক্ষমতার প্রয়োগ ও কার্যনির্বাহনে অনুপাতের হারে সামান্য স্থান সংকুলান করে দিতে না মানার কারণে। হিন্দুদের আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গিমা ও যুগ যুগ ধরে চলে-আসা প্রতাপী আচরণ তা হতে দেয় নি। শেষ পর্যন্ত আলাদা হওয়ার ভিত্তি হিসেবে এসেছিল হিন্দু/মুসলিম দ্বিজাতীয় বিষয়। ১৯৪৬ সালের বঙ্গভঙ্গতেও ছিল সেই একই কারণ। মুসলমানরা পশ্চিম বঙ্গকে ভারতে ঠেলে দেয়নি। হিন্দুরাই সেটা ভেঙ্গেছিল এবং যারা সেদিন পাকিস্তান চায়নি, বরং চেয়েছিল পূর্ববাংলা ভারতের সাথে থাকুক, তাদের একাংশ প্রথম দিন থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে আত্মনিয়োগ করে। তৃতীয় আরেকটি পক্ষ, এত কিছুর পরও, বঙ্গকে আবার এক দেশ করার গোপন আন্দোলন চালায়।

[এ ক্ষেত্রের মূল কথা হল দ্বিজাতির ধারণার কারণে মুসলমানরা ভারত ভাঙ্গে নি এবং মুসলমানরা বাঙলাকেও বিভক্ত করে নি। (দেখুন, জয়া চ্যাটার্জী, (২০০৩). বাঙলা ভাগ হল. ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, অনুবাদে, আবু জাফর )]

পাকিস্তান ভাঙ্গা

একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গে শোষণের বক্তব্যে উত্তেজিত জনতার ক্ষোভ ও আক্রোশের মুখে। একাত্তরে যদি যুদ্ধ না হত তবুও শোষণের বক্তব্যে বিশ্বাসী উগ্র-চক্র অন্য সময়ে তা ভেঙ্গে দিত। এটা ছিল সময়ের ব্যাপার। ১৯৪৭ সালে বাংলার নেতারা পূর্ববঙ্গকে আলাদাভাবে স্বাধীন করলে সেই স্বাধীনতা ‘অর্থবহ’ হত বলে মনে করতেন না। তাই ইচ্ছে করেই পাকিস্তানের সাথে ‘সংযুক্তি’ করেন। কিন্তু যে কারণে তারা আলাদা স্বাধীনতা অর্থবহ মনে করেননি, সেই কারণের সূত্রগুলোই পরে শোষণের আওয়াজ তুলতে পাকিস্তান-ভঙ্গকারীদের সাহায্য করে এবং দুই দেশ বিভক্ত হয়।

শোষণের বক্তব্য

মানব সমাজে অবিচার হতে পারে, শোষণ হতে পারে, এই সম্ভাবনা কেউ উড়াতে পারে না। তবে কোথাও সত্যি তা হল, বা হল না, অথবা কিছু হল, ইত্যাদি দেখতে হলে নিরপেক্ষ বিচার/বিবেচনার প্রয়োজন হয়। পাকিস্তান আমলের ঐ দুই দশকের উপর যেসব তথ্য রয়েছে তা যদি কেউ প্রোগ্রেসিভলি (progressively) এবং পটভূমিসহ (with background) তুলে ধরেন তবে সেই ধারণা স্পষ্ট হতে পারে।

শোষণ ও অবিচার দেখতে হলে ১৯৪৭ সালের আগে উভয় অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার একটা ব্যাপক (comprehensive) লিস্ট তৈরি করার প্রয়োজন হবে। সেখানে উভয় অঞ্চলের শিল্প কারখানা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানাদি, আর্থিক অব-কাঠামো, রাস্তাঘাট, বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের উৎস ও প্রয়োজনাদি (demands) ইত্যাদির একটা পরিসংখ্যান তৈরি করতে হবে। তারপর এই পরিসংখ্যানের আলোকে দেখাতে হবে কারা কার কোন কোন জিনিস চুরি করে নিয়েছে, এবং মালামাল কি পরিমাণ শোষিত হয়েছে। সেই অঙ্কে না গিয়ে এখানে সেখানে অসম্পর্কিত পরিসংখ্যান তুললে তা ধোঁকাবাজি হতে পারে।

আবার এও দেখতে হবে যে বিদেশী পণ্য আমদানি/রপ্তানির শিল্পজাত অস্তিত্ব ও পরিপ্রেক্ষিত আগে কার কীরূপ ছিল এবং ক্রমান্বয়ে (successively) তা কিভাবে বর্ধিত বা কমতে থাকলো। উভয় এলাকার বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলের রূপ ও কেপাসিটি আগে কি ছিল এবং তুলনাকালে (at the time of comparison) উভয়ের পরিমণ্ডল ও কেপাসিটি কি ছিল। কিন্তু পটভূমি বিবর্জিত পরিসংখ্যান দিয়ে কেবল সাধারণ পাবলিককে ধোঁকা দেয়া যায়, কিন্তু ধোঁকার পরিণতি ভাল হয় না। এই ধোঁকাই এক সময় শোষণের পক্ষে এক দলের বক্তব্য, বিবৃতি, লেখা, প্রচারণার সয়লাব চালাতে সাহায্য করে।

আরেকটি কথা। এক এলাকার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানাদি, তার অবকাটামো এবং বাজারের চাহিদা অপর ভূখণ্ডের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে এবং সেই ভিন্নতার কারণে নানান পার্থক্য সূচিত হতে পারে। যেকোনো পার্থক্য দেখিয়ে শোষণের আওয়াজ তোলার আগে সেই পরিমণ্ডল চিহ্নিত করতে হবে, দেখতে হবে এবং সেই পার্থক্যের স্থানসমূহ নিরপেক্ষভাবে পরিসংখ্যান-ব্যাখ্যায় আনতে হবে। তারপরও একটা সাধারণ ধারণা এই মর্মে রাখতে হবে যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব-পাকিস্তানে এসে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানাদি ও শিল্প-কারখানা তৈরি করে পূর্ব-পাকিস্তানের আর্থিক উন্নয়নে সহায়তা করছিলেন যা পূর্ব-পাকিস্তানের বাৎসরিক উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল এবং অনুরূপভাবে পূর্ব থেকে বাঙালীরা গিয়ে যদি পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প-কারখানা পড়ে থাকেন, তাও।

যে মুহুর্ত্তে পূর্ব বাঙলা ভারত থেকে আলাদা হয় তখন বাংলায় তেমন কোন শিল্প-কারখানা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের খুব কম লোক ব্রিটিশের আর্মফোর্সে ছিল। খুব কম লোক সিভিল সার্ভিসে ছিল। স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির সংখ্যা কম ছিল। ধনী হিন্দু জমিদার ও মহাজনেরা নিজেদের টাকা-পয়সাসহ পশ্চিম বাংলায় হিজরত করেছিল। পূর্ববাংলায় উৎপাদিত পাটের কলকারখানা পশ্চিম-বাংলাতেই ছিল।

সবকিছু বিবেচনায় পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান থেকে উন্নত ছিল। তাদের বিপুল সংখ্যক লোক (পাঞ্জাবের) ব্রিটিশ আর্মফোর্সে ছিল। বিপুল সংখ্যক লোক সিভিল সার্ভিসে ছিল। এই দুই অসম পর্যায়ের দেশ এক হওয়াতে নানান সমস্যা ওঁত পেতে ছিল। প্রথম থেকেই সরকারী সকল সেক্টরে পশ্চিম পাকিস্তানের লোক অবস্থান নেয়ার পরিসর ছিল। এটাই ছিল natural disposition, সাধারণ বিন্যাস করণের অবস্থা। কিন্তু প্রথম দিনের উভয় দেশের সরকারী কর্মচারী সংখ্যা, মিলিটারি সংখ্যা, স্কুল কলেজ সংখ্যা ইত্যাদি দেখিয়ে শোষণের আওয়াজ তোলা যেতে পারতো, কিন্তু বিষয়টি চাক্ষুষ এবং নিত্য-বর্তমান থাকায় কেউ বিশ্বাস করতো না, তাই এই আওয়াজ তোলার জন্য কিছুকাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

পূর্ব-পাকিস্তানের শিল্প-কারখানা ও পাট-পণ্য নিয়ে মুনিম সিদ্দিকীর একটি লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি যা শোষণের বক্তব্য অনেকটা স্পষ্ট করবে:

[ভারত ভাঙ্গার আগে] ১৮৫৫ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯২ বছরের এই পাটের টাকা কোথায় যেত? এই পাট বিক্রির টাকায় তখন আমাদের কৃষক কি দুই বেলা খেতে পেরেছিল? এই পাটের টাকায় কি পূর্ব বাংলার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছিল, না স্কুল কলেজ, হাসপাতাল হয়েছিল?

… পৃথিবীর সব চেয়ে ভাল মানের পাট এই পূর্ব বাংলায় ফলন হত। অখণ্ড ভারতের ৮০ ভাগ পাট আমাদের কৃষক উৎপাদন করতেন। আর ২০ ভাগ পাট পশ্চিম বাংলায় উৎপাদন হত। কিন্তু সব কটি জুটমিল স্থাপন করা হয়েছিল পশ্চিম বাংলার কলকাতা নগরীর হুগলী নদীর দুই পাশে। জুট মিল থেকে যারা লাভবান হতেন তারা ছিলেন কলকাতার লোকজন। এই পূর্ব বাংলার জূটের টাকায় কলিকাতা নগরী রাস্তাঘাটের জৌলুষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯৩৯ সালের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ঐ সময় কলকাতাতে ৬৮৩৭৭টি লুমস পাটের পণ্য উৎপাদন করে চলছিল। কিন্তু তাঁর একটিও পূর্ব বাংলায় ছিলনা। আমরা ছিলাম শুধু পশ্চিম বাংলা কাচা পাটের যোগানদার, আবার সেই পাট তৈরি পণ্যের ক্রেতা! দেশ ভাগের পর এই পশ্চিম বাংলার হিন্দু ভাইয়েরা আমাদের প্রাপ্য আমাদের ভাগের একটি টাকাও ফেরত দেন নাই। আমাদের দেশের সরকারী কর্মচারীদের বেতন দেবার মত কোন টাকা আমাদের ব্যাংকে রেখে যায় নাই। দেশ ভাগের প্রথম কয়েক মাসের বেতন ইস্পাহানী কোম্পানী চালিয়ে নিয়েছিল।

… ভারত ভাগ হবার পর ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মাত্র ২০ বছরে পূর্ব পাকিস্তানে ৭৬টি পাটকল স্থাপিত হয়েছিল, যার ফলে এই দেশের হাজার হাজার মানুষের কৃষিখাতের বাইরে শিল্পখাতে কর্মের সংস্থান হতে পেরেছিল। … এই ৭৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠা করার মত তখন পূর্ব বাংলা কোন মুসলিম বাঙ্গালীর মূলধন যোগানোর মত ক্ষমতা ছিলনা। … পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু লোক যারা তাদের নিজেদের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এই ৭৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান।” [[১] মুনিম সিদ্দিকী (২০১২). অর্বাচীনের সংলাপ -১. সদালাপ [অনলাইন]. প্রাপ্তব্যস্থান http://www.shodalap.org/munim/17068 শেষ প্রবেশ ৫/০১/২০১৩ ]

দুই দশক পরে যখন শুরুর প্রাথমিক বিষয়াদি অনেকের দৃষ্টির অগোচর হয়, এবং কারো কাছে বিস্মৃত হয় এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজ প্রোপাগান্ডার মারপ্যাঁচ বুঝার অবস্থানে নেই তখন শোষণের আওয়াজ তোলা হয় এবং শোষণ-বিবৃতিতে বাস্তবতা যেন বীভৎস হয়ে ওঠে।

কিন্তু আসল কথা হচ্ছে প্রোপাগান্ডা সকল সমাজে কেবল অশান্তিই আনে। আপনি রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব দেখুন (১৯১৭), তার পরের লেনিনের প্রোপাগান্ডা দেখুন, নৃশংস মৃত্যু, অত্যাচার দেখুন, হাহাকার দেখুন। বাংলায় ১৯৭২-৭৫ এর আর্থ-সামাজিক দুর্যোগ, দুরবস্থা দেখুন, পরের শোষণ, ধর্ষণ, লুট, ডাকাতি, এসব দেখুন। মিথ্যা মিথ্যার জন্ম দেয়।

দুই একটি কথা বাকী রয়েছে। তাই এই অংশের সারাংশে নিয়ে আসি। বলেছি, শোষণের বিষয় বিবেচনা করতে হলে পাকিস্তানের তুলনায়, সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় কিছু, (আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা, শিল্প ইত্যাদি) বিবেচনায় আনতে হবে। আমরা মাত্র দুই দশক নিয়ে আলোচনা করছি। বলিনি, বাজেটের ব্যাপারে দেখতে হবে ১৯৪৭ সালের আগে পশ্চিম পাকিস্তানের ইনফ্রা-স্ট্রাকচার কিরূপ ছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানে কিরূপ ছিল। সেই অঞ্চলের স্ট্রাকচার ও ডিমান্ড মোতাবেক কি পরিমাণ বাজেটের প্রয়োজন ছিল এবং বাংলাদেশে কোন ধরণের স্ট্রাকচার ছিল এবং সেই স্ট্রাকচার ও ডিমান্ডের ভিত্তিতে কি পরিমাণ বাজেটের প্রয়োজন ছিল। কেবল জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেট নির্ণয়/নিরূপণ হয় না। এই বাংলাদেশেও কোন্ জেলায় লোক বেশি -এই ভিত্তিতে বাজেট তৈরি হয় না। উভয় পাকিস্তানের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের ডিমান্ড ইত্যাদি বিবেচনায় আনতে হয়। না হলে, অর্থাৎ এগুলোর প্রকৃত বিচার/বিবেচনা ছাড়া শুধু প্রোপাগান্ডাই করা যেতে পারে। আমাদের গ্রামে কোনো ডাক্তার নেই, আপনাদের গ্রামে ডাক্তার সংখ্যা ৫ জন –এটা শোষণের বক্তব্য হয় না। এভাবে দুই এলাকার জনসংখ্যা, ডাক্তার সংখ্যা, সেবাকেন্দ্র ইত্যাদি তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান ও পটভূমি ছাড়া শোষণের কথা প্রমাণ করে না। এগুলোতে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। আগ-পরের অবস্থা কাজ করে। মনে রাখতে এখানে শোষণের বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ নয়। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে প্রোপাগান্ডা হয় না।

প্রোপাগান্ডা করার জন্য নানান পার্থক্য দুই জেলায়, দুই উপজেলায় দেখানো যাতে পারে।। কিন্তু তাতে কি হবে? সিলেট জেলার অনেক লোক বঞ্চিত ভাবেন। তাহলে এখন কী হবে? বাঙ্গালী জাতীয়তা শোষণের বিষয় হবে?

দুই ‘অসম’ দেশের একত্রিভুত হওয়া

সেই মুহুর্ত্তের কথা স্মরণ করুন যখন দেশ ভারত থেকে আলাদা হয়। বাংলার নেতারা এই হতদরিদ্র, শক্তিহীন দেশের স্বাধীনতা অর্থবহ (meaningful) মনে করেন নি। তাই ‘অর্থ’ খুঁজতে পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত হতে হয়েছিল, কেউ কারো উপর জবরদস্তি করেনি। আজ একথা বলারও অবকাশ আছে যে সেদিন পাকিস্তানের সাথে মিলিত হওয়ার বেসিস (basis) ছিল না এবং যখন তা হয়েছিল তখন একত্রিভূত হওয়ার বেসিস (basis) নিয়ে সঠিক কোন আলাপ আলোচনাও হয় নি। এগুলো হঠাৎ করে হয়ে গিয়েছিল। দুই অসম অঞ্চল একতাবদ্ধ হওয়াতে ‘অসম’ আওয়াজ তোলার স্থান ও প্রেক্ষিত প্রথম থেকেই ওঁত পেতেছিল। মাত্র দুই দশকের মাথায় যারা পাকিস্তান চায়নি তারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে সেই বেসিসের (basis) স্থানকে উলোট পালোট করে একটি বক্তব্য দাঁড় করায়। আমি ১৯৭০/৭১ সালের কথা বলছি না। প্রোপাগান্ডার মোকাবেলায় পাকিস্তান কিছুতেই ঠিকে থাকতো বলে মনে হয় না।

আজ বাংলাদেশে একটি গ্রুপ ভারত বিভক্তির জন্য মুসলমানদের উপর দোষ চাপাচ্ছে। বাংলা ভাঙ্গার জন্যও দোষ মুসলমানদের দেখছে। ইসলামের জাতীয়তার ধারণাই নাকি সকল দুর্গতির মূল। পাকিস্তানীরা নাকি বোকা বাঙালী মুসলমানদের ‘মুসলিম জাতির’ ভাঁওতাবাজিতে শোষণ করে যাচ্ছিল। তাই ‘মুসলিম জাতির’ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। হায়রে বুদ্ধি! কিন্তু গত চার দশক ধরে কারা শোষণ করছে? কারা ধর্ষণ করছে? কাদের হাতে হত্যা হচ্ছে? গুম হচ্ছে? এদের বিচারের জন্য কি সঠিক বিচার ব্যবস্থা রয়েছে? এখানে কোন্ জাতীয়তার বিষয় আসবে? ধর্মের বিষয় আসবে?

টুপিওয়ালা/দাড়িওয়াদেরে ভারত বিদ্বেষী, পাকিস্তানী, রাজাকার, বিশেষ করে জামাতি ইত্যাদি শব্দে তাদের মনের তীর্যা ও আক্রোশ প্রকাশে দেশে শান্তি আসবে না, বরং অশান্তিই সৃষ্টি করবে।

মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়

শোষণের সাথে উগ্রপন্থিরা ভাষার ব্যাপার জড়িত করে। বরং বলি মিথ্যাচার করে। আগেই হয়ত বলে থাকতে পারি, প্রোপাগান্ডায় মূর্খতাও কাজ করে। পাকিস্তানিরা নাকি বাঙালীর মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাচ্ছিল! গায়কী কথাও তাদের প্রোপাগান্ডার বিষয় হয়।

আমরা ১৯৪০ দশকের মধ্য থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র-ভাষা নিয়ে যেসব আলোচনা ও আন্দোলন দেখি তাতে অমনিতেই বুঝা যায় যে উর্দু ও বাংলা উভয়ই রাষ্ট্র-ভাষা হতেই যাচ্ছে। তাছাড়া ১৯৪৮ সালে রেসকোর্সের ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ভাষণে বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কোন বিশেষ অঞ্চলের ভাষা হওয়া উচিত হবে না। তাই রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে কিন্তু প্রদেশের ভাষা নির্ধারণ করবে ঐ প্রদেশের জনগণ। ফলে পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক সরকার ১৯৪৮ সালের ৮ই এপ্রিল প্রদেশের সরকারি ভাষা, আদালতের ভাষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাষা বাংলা হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকরি করার পর, ১৯৪৮ সাল হতে ১৯৫২ পর্যন্ত, ভাষা নিয়ে আর ব্যাপক কোন আন্দোলন সৃষ্টি করা যায়নি। কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি আবার ফিরে আসে খাজা নাজিমুদ্দিনের পল্টনের ঘোষণার মাধ্যমে। তিনি পুনরায় পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর স্বপক্ষে একটি বক্তব্য দেন। এরই প্রেক্ষিতে তমদ্দুন মাজলিসের অবস্থান ও কার্যক্রমের দিকে তাকালে আপনাতেই বুঝা যায় যে নাজিমুদ্দিনের উস্কানিপূর্ণ বক্তব্যের মোকাবেলায় ২১শে ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রক্তারক্তি ছাড়াও সেই বক্ত্যব্যের মোকাবেলা করা যেত, এবং এই ব্যবস্থা গৃহীত ছিল।

সেদিন উর্দুকে নিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল তা ১৯৩০ এর দশক থেকে হিন্দির মোকাবেলায় চলে আসছিল। এর প্রেক্ষিত ছিল অখণ্ড ভারতে রাষ্ট্রভাষা কোনটি হবে। কিন্তু দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ায়, হঠাৎ-সৃষ্ট নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রে সেই আলোচনা দ্রুতই হাজির হইয়ে পড়ে। রাষ্ট্র-যন্ত্রের সাথে জড়িত শ্রেণীর অধিকের ভাষা উর্দু ছিল। এটা অতি মানবিক ও মানবিক বিষয় যে আপনার এলাকার লোক যদি সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে থাকে তবে আপনার এলাকার কিছু প্রয়োজনাদি তাদের কাছে প্রাধান্য পাবে। এভাবে মূল থেকে রাষ্ট্র-যন্ত্রে জড়িত উর্দুভাষীদের চিন্তার প্রাধান্য উর্দুতে পড়ে এবং সাথে সাথে বাংলা উর্দুর তাত্ত্বিক আলোচনাও তাৎপর্যের বিভিন্ন উন্মোচন করে। একটি দেশে এমন সাংঘর্ষিক বিষয় উঠতে পারে এবং বিশেষ করে তাও দেখতে হবে, দেশটি ছিল নতুন, অনেক সমস্যাও ছিল নতুন।

ভাষার বিকাশ ও উন্নয়ন রাষ্ট্রের সাথে থাকলেও ভাষিক-সত্তা ও বাস্তবতার (reality of language) তকদীর কেবল রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে না। বাংলাভাষা আরেকটি রাষ্ট্র ভাষার অধীনেই জন্ম লাভ করেছিল অর্থাৎ রাষ্ট্র বাংলা ভাষার জন্ম দেয় নি, এবং যে বস্তু রাষ্ট্র জন্ম দেয় নি সে বস্তুকে রাষ্ট্র তুলে নিতেও পারতো না। বাংলার বিকাশলগ্নে ফারসি ছিল, তার পর ইংরেজি ছিল। এগুলো রাষ্ট্রভাষা থাকাতেও বাংলা বিলীন হয় নি, বরং এগুলোর এক পাশে অবস্থান করে বিকশিত হতে পেরেছে। উর্দু যদি একান্ত রাষ্ট্র ভাষা হয়েই যেত, তাহলেই কি বাংলা ভাষা বিলীন হয়ে যেত? আমি মনে করি না, (তবে আগেই বলেছি, বাংলাকে মোটেই সরানো যেন না)।. আজ বাংলা ভাষার উপর যারা ২১ ফ্রেব্রুয়ারিতে মুজিবি-কায়দায় বক্তৃতা দেন তাদের অনেকের ছেলে মেয়েরা শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলতেই পারে না, ইংরেজি এক্সেন্ট লক্ষ্য করা যায়। এক বিরাট সংখ্যক লোক টাই-প্যান্টে ইংরেজ ফুলবাবু, তাদের প্রত্যেক বাক্যে দেখা যাবে ইংরেজির ব্যবহার। নাটক ফিল্ম, মিডিয়া সর্বত্র আজ ইংরেজির সয়লাব। হিন্দি ফিল্মের বন্যা চলছে দেশে। বাচ্চারাও হিন্দি নাটকের ডায়ালগ মারতে পারে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি আসলে সেকি বাঙালীপনা! টেবিলে থাপ্পড়! সিরাজুদ্দৌলা নাটকের ডায়ালগ!

আজ পশ্চিম বঙ্গের মায়ায় যাদের বক্ষ বিদীর্ণ সেই বাঙলার লোকজন তাদের নিজ ইচ্ছাতেই ভারতের সাথে মিশেছে; তারা সেখানে কোনো দিন বাংলাভাষার স্বাধীকার আন্দোলন চাইনি, হিন্দিকেই রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছে -রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং আরও বড় বড় ‘বাঙালী’ লেখকদের জন্মভুমি এই পশ্চিমবঙ্গ।

ফ্যাসিবাদ: পাকিস্তান/পাকিস্তানী ঘৃণা

যারা ‘মুসলিম জাতি’ নাই বলে, তারা তাদের কথার ফাঁকে ফাঁকে পাকিস্তানীদের প্রতি ঘৃণা ও শোষণের বক্তব্য ঢালে। এদের উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ‘ধর্ম-সম’ হয়ে পড়েছে। সব কথাতেই ত্রিশ-লাখ, আড়াই লাখ, শোষণ, নির্যাতন। আলবেত্তা সকল পাকিস্তানীদের ঘৃণা করতে হবে। এই ঘৃণা-চাষী ফ্যাসিস্টদের ব্যাপারে প্রায় দুই বৎসর আগে আমু-ব্লগে একটা লেখা দিয়েছিলাম। প্রসঙ্গের সাথে মিল দেখে আমি সেখান থেকে নিচে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

… ফ্যাসিবাদীদের মূল কথায় আসি। কথাটি হল এই যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় কিছু জার্মান ইয়াহুদীদের উপর যে জেনোসাইড চালিয়েছিল তার জন্য বিশ্ববাসী সকল জার্মান, ও তাদের পরবর্তী সব জেনারেশনকে সর্বকালীনভাবে কোন দোষের জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে নাই, যদিও ঘটনাটি অমানবিক। ইরাকে আমেরিকানরা জগন্যভাবে হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও ধর্ষণ কার্য করেছে। ইসরাইলীরাও করেছে প্যালেস্টাইনে। কিন্তু এ জন্য গোটা আমেরিকান এবং গোটা ইসরাইলীরা কী দোষী হয়ে পড়ে? মানব জাতীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে এসব কাণ্ড সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে। এই ধরণের অনৈতিক, অমানবিক কারণগুলির মূল স্থান হচ্ছে মানবপ্রকৃতি, দৃষ্টিকে সবসময় সেখানেই নিবদ্ধ রাখতে হয়। এতে কোন জাতিকে stigmatise করে লাভ নেই। আমরা বাঙ্গালীরা কী এই নেতিবাচক গুণের ঊর্ধ্বে? প্রতি বৎসর বাঙালীরা তাদের নিজ মহিলাদের কত সংখ্যককে ধর্ষণ করে? কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে, হোটেলে সর্বত্র কী এসবের খবর দেখি না? বৎসরে কতলোক নির্যাতনের শিকার হয়? রাজনৈতিক হত্যা কত হয়? বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সর্বমোট সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে? এ ফিরিস্তি কী লম্বা করা যাবে না? এখানকার (আমু ব্লগের) ফ্যাসিবাদীরা কোন জাতির মহাপুরুষ? সমস্যা হচ্ছে ‘চাচারা নিজ মুখের কাল তিল দেখতে পান না’। তারা নিজেরাই তো পাকিস্তানী মেয়েদের ধর্ষণ করতে বলছে, পাকিস্তানীদের হত্যার কথা বলছে, তাদের প্রতি indiscriminate ঘৃণার ঘোষণা দিচ্ছে। সুযোগ পেলে তারা তা’ই করবে। তবে যে অন্যায় তারা নিজেরা করতে সমর্থ সে অন্যায়ের জন্য আরেক জাতির প্রতি ঘৃণার বাণী শুনাচ্ছে কোন মুখে!

হ্যাঁ, এটা সম্ভব যে ওদের কারও কারও মা-বোন হয়ত একাত্তরে ধর্ষিতা হয়ে থাকতে পারেন যে কারণে হয়ত তাদের মানসিক অবস্থা এখন এরূপ। তবে তারা এখানে না এসে বরং psychiatrist-দের কাছে যাওয়া উচিৎ -কারণ তারা মানসিকভাবে অসুস্থ বলেই প্রমাণ দিচ্ছে। ইউরোপে এমন ভিকটিমদের psychiatric support দেয়া হয়, চিকিৎসাও করা হয়।

আমি বাংলাদেশ থেকে আসার পর সেই ছোট বেলায় এদেশে বর্ণবাদী হামলার শিকার হই। এটা দু/তিন দফা ঘটেছে। আমার চোখের উপরের অংশে এখনও একটা দাগ নিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার বাচ্চারাও এধরনের হামলার শিকার হয়েছে স্কুলে। কিন্তু আমরা কী এজন্য সারা জাতিকে জড়াতে যাবো? আমার অনেক ফ্রেন্ড-বন্ধু অনেক জাতিতে আছে, আমার বাচ্চাদেরও তাই।

মূল কথা হচ্ছে জাতীয়তাবাদের নামে যে jingoism ও ফ্যাসিবাদ প্রচার করা হচ্ছে তা মানবতা বিরোধী। আর যারা মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়ায় তারাই হয়ত ঘৃণার উপযুক্ত। কেবল শয়তানই মানুষকে ঘৃণা ও দুশমনির পরামর্শ দেয়। যারা অন্যান্য জাতিকে নিয়ে উপহাস করে, মন্দ নামে ডাকে তারা মন্দ লোক।” [এম_আহমদ (২০১০), 'অসারের তর্জন গর্জন ফ্যাসিবাদেই সার - বাকরুদ্বকে লিখা', আমার ব্লগ [অনলাইন]

শেষ কথা

আমরা এখানে বলতে চেয়েছি ‘মুসলিম জাতি নাই’ –এ বিষয়টি উগ্রপন্থীদের নিম্ন পর্যায়ের প্রোপাগান্ডিস্টদের। উপরের মহল হয়ত সেটাই চাচ্ছে যেটা যুগপৎভাবে ইউরোপ আমেরিকা চাচ্ছে। আর তা হল মুসলমানরা তাদের জাতি সত্তার ধারণা হারিয়ে ভৌগলিক নেশন স্টেট নিয়ে বাঁচুক। আর যেন কখনও বৃহত্তর ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর না হয়। রাষ্ট্রে যেন কখনও শরিয়া না দেখে। এখান থেকেই প্রোপাগান্ডা, জুজুর ভয়। একাত্তরের হত্যা-ধর্ষণ ইসলাম অনুপ্রাণিত দেখানো, মিথ্যাচার করা। যেসব সেনারা সেই অমানবিক কাজগুলো করেছিল তারা ইসলামী মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সেনা ছিল না, তাই ইসলাম টানার প্রশ্নই ওঠে না। পাকিস্তান ছিল সেক্যুলার রাষ্ট্র, সেক্যুলার মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সেনারা সেক্যুলার শিক্ষা-ব্যবস্থা থেকে আসা এবং শিক্ষাপ্রাপ্ত। কথা বলতে হলে সেই সেক্যুলার আদর্শ ও বিশ্বাস নিয়ে বলতে হবে। এখানে আমেরিকান, পাকিস্তানী সবাই সমান। সুযোগ পেলে এই আদর্শের লোকজন সবখানেই তা করে। এর জন্যই চাই নৈতিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, নৈতিক বিচার প্রতিষ্ঠান। যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইসলামী নয়, যে ব্যবস্থায় নিয়োগ-প্রাপ্ত সেনারা ইসলামী আচার আচরণ ও শিক্ষা-দীক্ষায় দীক্ষিত হয় নি, তাদের সাথে হঠাৎ ইসলাম টানার কুমতলব হয় ইসলামকে হেয় করা এবং ইসলামকে যাতে রাষ্ট্র, শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখা যায় তার প্রোপাগান্ডার উদাহরণ করা। এটা কোন মুসলমানের কাজ হতে পারে না।

উগ্র বাংগালী জাতীয়তাবাদকে আমরা ‘বঙ্গাল-ধর্ম’ বলতে পারি। এই ধর্মের ঘৃণার বিস্তার করতেই এখন ‘মুসলিম জাতির’ ধারণা তাড়াতে হবে। সর্বজনীন ধারণা থাকলে বিদ্বেষ ও ঘৃণার চাষ কীভাবে হবে? তাই বঙ্গালের ঘৃণার জন্য ‘মুসলিম জাতি’ থাকতে পারবে না। তারা যাদেরকে ঘৃণা করবে, সেই মানুষগুলোতে বিশ্বজনীন মুসলিম ধারণা থাকবে না। এরা নিছক ভৌগলিক পাকিস্তানী জাতি। সৌদির প্রতি তাদের আক্রোশ এজন্য যে তারা একাত্তরে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল। তাই সেই ঘৃণা ওদের প্রতিও পরিব্যাপ্ত। ফ্যাসিস্ট উগ্র নাস্তিকদের কোন সমাধান নেই। তবে বঙ্গাল মুসলিম ফ্যাসিস্টদের একটা সমাধান আছে, তারা মু’মীনরা যেভাবে ঈমান এনেছে সেভাবে ঈমান আনলেই হয়। তখন ঘৃণা চলে যাবে এবং ঘৃণিত-পাত্র তার ‘মুসলিম ভাই’ হয়ে যাবে।

১৯৯০ দশকের প্রথমাংশ থেকে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তা তীব্র হয়ে ওঠে। এই ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সংকট হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে বাংলার জনগণ অনেক সমস্যার কেশারত দিতে হয়েছে। এদের কারণেই দেশে এক নতুন বিপর্যয় এসে হাজির হয়েছে এবং আরও আসার পথে। বাংলাদেশের জনগণ এদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার দরকার আছে।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১৩৪ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)