লগইন রেজিস্ট্রেশন

আমরা জানি কি? “নামায শুরু করার পূর্বে মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা বিদ’আত”

লিখেছেন: ' মামুন' @ বুধবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০০৯ (৯:৪০ পূর্বাহ্ণ)

আমরা হানাফী মাযহাবের লোকগণ সাধারণত নামাজ শুরু করার আগে মুখে নিয়্যত উচ্চরণ করে থাকি। সেই ছোট্ট বেলা থেকে হুজুরগণ পিটিয়ে পিটিয়ে সেই সকল নিয়্যত মুখস্ত করিয়েছেন। আজ জীবনের মাঝা মাঝি এসে জানতে পারলাম সেই তথাকথিত নিয়্যত মুখে উচ্চরন করা বিদা’আত। প্রথমে বিশ্বাস হয় নাই পরে ভাল করে পড়লাম বিষয়টা তারপর মানতে হল। আমি যাহা পড়ে জেনেছি নামাজে দাড়িয়ে মুখে নিয়্যত উচ্চরণ করা বিদা’আত তাহা আপনাদের সম্মুখে দলিল রূপে পেশ করছি। আশা করি আপনারাও আমার সাথে একমত হবেন।

নিয়্যত আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থঃ ইচ্ছা, অভিপ্রায়, দৃঢ়সংকল্প এবং নিরাপদ রাখা ইত্যাদি।
‘আলাকামুস আলমুহীত’, ‘লিসানুল আরব’, ‘আলমুনজিদ’, এবং আলমু’জাম আলওয়াসীত ইত্যাদি বিখ্যাত আরবী অভিধান সমূহে তাই উল্লেখ করা হয়েছে। একে নিয়্যত এবং নিয়্যত দুইভাবেই উচ্চারণ করা যায়।

নিয়্যত এর অর্থ ও সংজ্ঞা বর্ণনায় আল্লামা মানসূর ইবনে ইউসুফ বলেন-
‘নিয়্যত এর আবিধানিক অর্থঃ ইচ্ছা, অভিপ্রায় ও সংকল্প করা। যেমন বলা হয়, আল্লাহ তোমার কল্যানের নিয়্যত করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ তোমার কল্যানের ইচ্ছা করেছেন। আর শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তা’আলার নৈকট্য রাভের উদ্দেশ্যে কোন ইবাদতের জন্য আন্তরিকভাবে সুদৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করাকে বলা হয় নিয়্যত।” (কাশশাফুল কিনা আন মাতানিয় ইকনা ১/৬৬ শায়খ আল্লামা মানসূর ইবনে ইউনুস আলবা-হুতী)

এ সম্পর্কে ইমাম ইবনে কুদামা বলেন-
“নিয়্যত এর আভিধানিক অর্থ হলো, ইচ্ছা ও সংকল্প করা। যেমন বলা হয়, আল্লাহ তোমার কল্যাণের নিয়্যত করেছেন। যেমন বলা হয় আমি ভ্রমনের নিয়্যত করেছি, অর্থাৎ, আমি এর ইচ্ছা করেছি দ্বারা বুঝানো হয় যে, আমি ভ্রমনের ইচ্ছা করে এর সুদৃঢ়সংকল্প করেছি।” (আলমুগনী ১/৯১, আল্লামা ইমাম ইবনে কুদামা)

শুধু শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়। বরং পার্থিব দিক দিয়েও একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, ইচ্ছা এবং অভিপ্রায়ের স্থান হচ্ছে মানুষের অন্তর বা মন। এতে মৌখিক উচ্চারণের কোন দখল নেই। অন্তরই মানুষের যাবতীয় ইচ্ছা, ভাব ও বাসনার একমাত্র উৎস ও নিয়ন্ত্রক। পক্ষান্তরে মৌখিক উচ্চারণ মানুষের অন্তরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এ কারনেই নিয়্যতের মৌখিক উচ্চারণকারী কেউ যদি যুহরের নামায পড়াকালীন আসরের নিয়্যত উচ্চারণ করে তবে তার যুহরের নামাযই হবে।
এই কথাই লিখেছেন আল্লামা ইবনে কুদামা তাঁর বিখ্যাত আলমুগনী গ্রন্থে।
তিনি বলেন-
“নিয়্যতের স্থান হচ্ছে অন্তর। কেননা, নিয়্যতের অর্থই হলো ইচ্ছা এবং সংকল্প। আর ইচ্ছা ও সংকল্পের স্থান হচ্ছে অন্তর। অতএব যখনই কেউ অন্তর দ্বারা কোন কিছুর ইচ্ছা বা সংকল্প করে তখন তাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় এবং মৌখিক উচ্চরণের আর কোন প্রয়োজন থাকে না।
কিন্তু অন্তর দ্বারা ইচ্ছা পোষন না করে মৌখিক উচ্চারণ করলে তা মোটেই যথেষ্ট হয় না। অন্তর দ্বারা যে বিষয়ের দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করা হয়; মুখ যদি এর বিপরীত উচ্চারণ করে তবুও সেই ইবাদতের নিয়্যত এবং বিশুদ্ধতায় কোনরূপ ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয় না।” (আলমুগনী ১/৯২)

ইবাদত করা হয় শুধু আল্লাহর জন্য। কার অন্তরে কি ইচ্ছা আছে তা আল্লাহই ভালো জানেন। মুখে উচ্চারণ করে তা আল্লাহকে শোনানোর কোন প্রয়োজন হয় না। আল্লাহ সকলেরই অন্তর্যামী।

করো ইবাদত কবুল হওয়া না হওয়া নির্ভর করে তার অন্তরের ইখলাস, খুশূ, (ভয়) ও খুযূ, (বিনয় ও নম্রতা) এ উপর।
সতরাং, নিয়্যত ও ইখলাসের মৌখিক উচ্চারণ এক্ষেত্রে কার্যকর কিছুই নয়। এছাড়া ইসলামী শরীয়ায় এর কোন ভিত্তি নেই।

কিন্তু তা সত্ত্বেও হানাফী মাযহাবের পরবর্তী যুগে রচিত কোন কোন ফিকাহ ও ফতোয়া গ্রন্থে এর বৈধতা ও উত্তম হওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ইমাম আবু হানীফা, তাঁর শিষ্যগণ তথা ফুকাহা-ই-মুতাকাদ্দিমীন (পূর্ববর্তী) এবং অন্যকোন মুজতাহিদ -ই-মুতলাক্ব (স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষক) এর বৈধতা ও উত্তম হওয়ার ব্যাপারে কিছু লিখেন নি।

পরবর্তী যুগে কিছু সংখ্যক অমুজতাহিদ ফকীহ এর বৈধতা ও উত্তম হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাদের কেউই রাসূল (সঃ) এর সুন্নাহ, কোন সাহাবী তাবেয়ী কিংবা তাবা’তাবেয়ীর কথা বা আমল থেকে কোনরূপ দলীল পেশ করতে পারেন নি। তবে তাঁদের কেউ কেউ নামাযে নিয়্যতের উচ্চারণকে হজ্জের নিয়্যতের উপর কিয়াস করেছেন বলে হানাফী মাযহাবের ফিকহ ও ফতোয়া গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত হয়েছে। আবার তাঁদের কেউ কেউ ততটুকু দলীল উল্লেখ না করেই একে সরাসরি মুস্তাহাব বলেছেন। যেমন দুররুল মুখতার গ্রন্থকার আল্লমা মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মদ আল হিসকাফী- জন্ম ১০২৫ হিঃ একে মুস্তাহাব বলেছেন। পরবর্তীতে আল্লামা মুহাম্মদ আমীন ইবনে উমার আবেদীন- জন্ম ১১৯৮ হিঃ তাঁর বিখ্যাত ‘রাদ্দুল মুহতার’ যা হাশিয়ায়ে ইবনে আবিদীন বলে খ্যাত গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে-
“নামাযের ইচ্ছা পোষণ করার সময় (নিয়্যতের উচ্চারণ করা মুস্তাহাব) এটাই গৃহীত অভিমত। (একে সুন্নত ও বলা হয়েছে) অর্থাৎ, সলফ (পূর্ববর্তীগণ) নিয়্যতের উচ্চরণকে পছন্দ করেছেন কিংবা আমাদের হানাফী আলিমগণের সুন্নত (নিয়ম)। কারণ, নিয়্যতের উচ্চারণ নবী মুস্তফা (সঃ) তাঁর সাহাবী এমনকি তাবেয়ীগণ থেকেও বর্ণিত হয় নি। বরং একে বিদয়াত বলা হয়েছে।” (রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মখতার ১/৮৪)

উল্লেখিত ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে আবিদীনের কথা সলফ নিয়্যতের উচ্চরণকে পছন্দ করেছেন।
হাদীস পরিভাষা শাস্ত্রে যাদের ‘সলফ’ বলা হয় এখানে অবশ্যই তিনি তাঁদের উদ্দেশ্য করেন নি। ফিকহ শাস্ত্রের পরিভাষায় যাঁদের ‘সলফ’ বলে আখ্যায়িত করা হয় এখানে এর দ্বারা তাঁদেরকেও উদ্দেশ্য করা যেতে পারে না। কেননা, ফিকহ শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘সলফ’ বলতে ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) থেকে ইমাম মুহাম্মদ (রঃ) পর্যন্ত পকীহদেরই বুঝানো হয়। অর্থাৎ ১৫০ হিঃ সন থেকে ১৮৯ হিঃ সনের মধ্যকার ফকীহগণই ‘সলফ’ এর অন্তর্ভুক্ত। অতএব এখানে ‘সলফ’ এর আভিধানিক অর্থই গ্রহণ করতে হবে।
আর তার আভিধানিক অর্থ হলো ‘পূর্ববর্তী আলিমগণ’। পূর্ববর্তী আলিমগণ বলতে আবার কিছুসংখ্যক আলিমই বুঝতে হবে। আল্লামা ইবনে আবিদীনের পরবর্তী কথা ‘আমাদের আলিমগণের সুন্নত’ বা নিয়ম বলতেও কিছু সংখ্যক আলিমের সুন্নতই বুঝতে হবে। তাঁর নিজের ভাষা থেকেই তা স্পষ্ট হয়েছে। কেননা, তাবেয়ীদের থেকেও তা বর্ণিত হয় নি বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। অতঃপর আল্লামা ইবনে আবিদীন শামীর পূত্র আল্লামা আলাউদ্দীন মুহাম্ম ইবনে মুহাম্ম আমীন (জন্ম ১২৪৪ হিঃ) ‘কুররাতু উয়ুনিল আখইয়ার’ স্বীয় পিতার রচিত হাশিয়ার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাতে ও নিয়্যত উচ্চারণের অভিমত যে খুবই দুর্বল তা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন-
“বাদাই উসসানই গ্রন্থকার (আলাউদ্দিন আবূ বকর ইবনে মাসউদ আলকাসানী মৃত্যু ৫৪৩ হিঃ) সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম মুহাম্মদ (রঃ) নামযে নিয়্যত উচ্চারণের কথা বলেন নি। তবে হজ্জে নিয়্যত উচ্চারণের কথা তিনি বলেছেন। পরবর্তীতে কিছুসংখ্যক আলিম হজ্জের নিয়্যত উচ্চারণের উপর কিয়াস করে তা নামাযের উপরও প্রয়োগ করেছেন। ‘হুলিয়াতুল মুহাল্লা’ গ্রন্থকার (মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমীর হাজ্জ আলহালাবী মৃত্যু ৮৭৯ হিঃ) তাঁদের এ কিয়াসের বৈধতায় আপত্তি করে বলেছেন যে, আমাদের একদল মাশাইখ উল্লেখ করেছেন যে, হ্জ্জ পালনে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়, বহু কষ্ট-ক্লেশ, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও কঠিন কার্যাবলীর মাধ্যমে তা সম্পন্ন করতে হয়। তাই তা সহজ-সাধ্য হওয়ার জন্য প্রার্থনা করা মুস্তাহাব। কিন্তু নামাযের ব্যাপারে তা শরীয়ত সম্মত নয়। কারণ নামায সম্পন্ন করতে সময় ব্যয় হয় খুবই কম। সুতরাং সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, হজ্জের নিয়্যত উচ্চারণের উপর নামাযের নিয়্যতের কিয়াস মোটেই সঠিক নয়। আলবাহর আযযাখির ও অন্যান্য গন্থে এ কথাই স্থির করা হয়েছে।” (রাদ্দুল মুহতার আলদ্দুর রিল মুখতার ১/৮৪)

আল্লামা ইবনে আবেদীনের উল্লেখিত ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে, নামাযে নিয়্যতের উচ্চারণকে হজ্জের নিয়্যত উচ্চারনের উপর কিয়াস করা মোটেই সঠিক হয়নি। এ কারনেই তা শরীয়ত সম্মত নয়। বরং তা বিদা’আত। যারা হজ্জের নিয়্যত উচ্চারণের উপর একে কিয়াস করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে; তাঁদের কিয়াস যে সঠিক হয় নি তাতো আল্লামা ইবনে আবিদীনের ব্যাখ্যায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু যারা হজ্জের নিয়্য উচ্চারণের উপর কিয়াস করে নামাযের নিয়্যত উচ্চারণের রায় দিয়েছেন সেই হজ্জের নিয়্যত উচ্চারণেরই তো কোন দীল বর্তমান নেই।

হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট ফকীহ আল্লামা শামসুল আয়েম্মা সারাখসী (মৃঃ ৪৮৩ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত ‘আলমাবসুত’ গ্রন্থে হজ্জের ইহরামের পূর্বক্ষণে শুধু নিম্নলিখিত দোয়াটি পড়তে বলেছেন-

“হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি হজ্জের ইচ্ছা করেছি। সুতরাং, আমার জন্য তুমি তা সহজ করে দাও এবং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করো।”

তিনি এটাকে নিয়্যত হিসাবে নয় বরং হজ্জের দোয়া হিসাবেই উল্লেখ করেছেন। হানাফী মাযহাবের অন্যান্য বহু গ্রন্থেই একে নিয়্যত হিসেবে উল্লেখ না করে দোয়া বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

নিয়্যত উচ্চারণের পক্ষের হানাফী ফকীহগণ হজ্জের যে দোয়াটিকে ভিত্তি করে নামাযে নিয়্যত উচ্চারণের বৈধতার দলীল পেশ করেছেন- আল্লামা সারাখসী তাঁর ‘মাবসুত’ গ্রনেথর হ্জ অধ্যায়ে সেই দোয়াটিকে উল্লেখ করে নামযে এ ধরনের দোয়ার বৈধতাকে তিনি অস্বীকার করেছেন।
তাঁর বক্তব্য হুবহু নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ
“হযরত জাবির (রাঃ) তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, নিঃসন্দেহে নবী (সঃ) হজ্জের ইহরাম বাঁধার সময় যুলহুলাইফা নামক স্থানে দু রাকাআত নামায পড়ার পর বললেন, তুমি বল, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি হজ্জ আদায় করার আচ্ছা করছি। অতএব তুমি তা আমার জন্য সহজ করে দাও এবং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল কর। কিন্তু যে ব্যক্তি নামায পড়ার ইচ্ছা করে তাকে এরূপ দোয়া পড়ার নির্দেশ দেয়া হয় নি। কারণ, নামায আদায় করতে সাধারণতঃ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না, বরং স্বল্প সময়েই তা সম্পন্ন করা যায়।” (আলমাবসুত ৪/৩, আল্লামা শামসুল আয়েম্মা সারাখসী)

আল্লামা সারাখসীর ভাষ্য অনুযায়ী উপরোল্লেখিত দোয়া কিংবা অনুরূপ অন্য কোন দোয়া নামাযের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয় নি। অথচ নামাযে নিয়্যত উচ্চারণের পক্ষের আলিমগণ এ দোয়াকেই তাঁদের দলীলের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

তবে নিয়্যত উচ্চারণের পক্ষে তারা একটি যুক্তি পেশ করেছেন। আর তাহলো, ‘আন্তরিক সংকল্পে দৃঢ়তা আনায়নের জন্য নিয়্যতের উচ্চারণ করা উত্তম।”

আল্লামা সারাখসী তাই বলেছেন-
“মুখে নিয়্যত বলার কোন গুরুত্ব নেই। আন্তরিক সংকল্পে দৃঢ়তা আনয়নের উদ্দেশ্যে যদি কেউ তা মুখে বলে তবে তা উত্তম।” (আলমাবসুত ১/১০-১১,)

আল্লামা সারাখসীর উল্লেখিত কথার সপক্ষে রাসূল (সঃ) এর কোন হাদীস অথবা কোন একজন সাহাবীর কথা বা আমল ও বর্তমান নেই। এমনকি হানাফী মাযহাবের ফুকাহায়ে ‘সলফ’ এবং ‘খালাফ’ (পরবর্তীদের অগ্রবর্তী) থেকেও এমন কথা বর্ণিত হয় নি। তাই তা ইমাম সরাখসরীর একান্তই নিজস্ব কথা।

অতএব, বিষয়টি আমাদের ভাল করে অনুধাবন করতে হবে যে, ইসলামী শরীয়ার সকল ইবাদত এবং যাবতীয় নিয়মাবলী একমাত্র রাসূল (সঃ) এর কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। কেননা, যাবতীয় ইবাদত ও এর নিয়মাবলী রাসূল (সঃ) তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে উম্মতকে শিখিয়ে গিয়েছেন। এতে তিনি কোন ত্রুটি করেননি। এমন কি পশ্রাব-পায়খানা, জুতা-মোজা ইত্যাদি পরার নিয়ম শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। তাহলে নূন্যতম জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন কোন ব্যক্তি ও কি তা মেনে নিতে পারে যে, নামাযের মত গুরুত্বপূর্ণ মহান ইবাদতের একটি নিয়ম শিখিয়ে যেতে তিনি ত্রুটি করেছেন? বরং তিনি বলেছেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখো সেভাবেই নামায পড়।” (বুখারী)

সুতারং, আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর শেখানো নামায ও তার নিয়মের বাইরে অন্য কারো যুক্তি ও নিয়ম মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন শামীর পুত্র আল্লামা সাইযেদ আলাউদ্দীন নিয়্যতের উচ্চারণ বিদ’আত বলে উল্লেখ কেরেছেন। তিনি বলেন-
“‘আলবাহব’ গ্রন্থকার বলেছেন যে, মুদ্দা কথা এই যে, সকল আবাদতের নিয়্যতের মৌখিক উচ্চারণ নিঃশর্ত বিদ’আত। তবে রাহমাতী (জনৈক ফকীহ) সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস (রাঃ) এর বর্ণিত হাদীসের কারণে তাতে আপত্তি করেছেন। হযরত আনার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,” আমি লোকদেরকে একই সাথে উচ্চঃস্বরে হ্জ ও উমরার তালবিয়া বলতে শুনেছি। তিনি আরো বর্ণনা করেন, অতঃপর নবী (সঃ) হজ্জ ও উমরার তালবিয়া বললে লোকেরাও একই সাথে হজ্জ ও উমরার তালবিয়া বললো। তা মৌখিক নিয়্যত উচ্চারণের অর্থই বহন করে বলে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। আর নিয়্যত বিশেষ কোন শব্দের মধ্যেই নির্দিষ্ট; একথা কেউই বলেন না এবং তা ওয়াজিব অথবা মুস্তাহাব এ কথাও কেউ বলেন নি। সুতরাং কি করে বলা যেতে পারে যে, বর্ণনাকারীদের কারো কথায়ই নিয়্যত উচ্চারণের প্রমাণ পাওয়া যায় না? আমি (গ্রন্থকার আল্লামা সাইয়েদ আলাউদ্দীন) রাহমাতীর উল্লেখিত প্রশ্নের জবাবে বলছি, মেনে নিলাম যে “হজ্জের নিয়্যত করছি’ নিয়্যত শধু এ কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য শব্দ দ্বারাও ণিয়্যত করা যায়। কিন্তু উচ্চঃস্বরে তালবিয়া বলার দ্বারা এর প্রমাণ করা যায় না। কারন, তা আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া এবং তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জের কার্যাবলী আতায় করাকে সহজ করে দেয়ার প্রর্থনা মাত্র। আর আপনি অবশ্যই জানেন যে, কবুল ও সহজ করে দেয়ার প্রর্থনা অবশ্যই নিয়ত নয়। প্রর্থনা এবং নিয়্যত দুই ভিন্ন বিষয়। বরং নিয়্য তচ্ছে তালবিয়া বলার সময় হজ্জ অথবা উমরার আন্তরিক ইচ্ছা পোষণ করা। রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থকার ও অন্যান্য ফকীহগণ সে দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।” (রাদ্দুল মুহতার আলাদ্দুরিল মুখতার ৩/৪৩৩-৪৩৪)

আল্লামা সাইয়েদ আলাউদ্দীন নিয়্যত উচ্চারণ বিদ’আত না হওয়ার ব্যাপারে রাহমাতীর আপত্তি ও এর পক্ষে সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস (রাঃ) থেকে যে দুটি হাদীসের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এর প্রথমটি সহীহ বুখারীর ‘কিতাবূল হজ্জ’ এর উচ্চঃস্বরে তালবিয়া বলা অনুচ্ছেদের ১৫৪৮ ক্রমিক সংখ্যায় এবং দ্বিতীয় হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে একই অধ্যায়ের ১৫৫১ ক্রমিক সংখ্যায়। উক্ত হাদীস দুটি থেকে ঘূর্ণাক্ষরেও হজ্জ অথবা নামাযে নিয়্যত উচ্চরণের কোন ইঙ্গিত বর্তমান নেই। তাতে শুধু তালবিয়া তথা আল্লাহর দরবারে উপস্থিত ও ধর্ণা দেয়ার ঘোষণার কথাই রয়েছে। এছড়া উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় কোন মুহাদ্দিস ও একথা বলেন নি যে, তাতে নামায কিংবা হজ্জে নিয়্যত উচ্চারণের ইঙ্গিত রয়েছে।

তাই আল্লামা সাইয়েদ আলাউদ্দীনের কথাই সঠিক যে, উমরা ও হজ্জের কার্যাবলি সহজ করে দেয়া এবং তা কবুল করার প্রার্থনা অবশ্যই নিয়্যত নয়।
এ প্রসঙ্গে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদ শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন-
‘হজ্জের তালবিয়ার পূর্বে কারো জন্য কিছু বলা শরীয়ত সম্মত নয়। হে আল্লাহ! আমি উমরা ও হজ্জ কিংবা হজ্জ করার ইচ্ছা করছি, আমি উমরা করার ইচ্ছা করছি বলতে পারবে না। হে আল্লাহ! আমার জন্য তা সহজ সাধ্য করে দাও, আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করো, আমি হজ্জ ও উমরা দুটিরই নিয়্যত করেছি, আমি আল্লাহর জন্য উমরার ইহরাম বেঁধেছি ইত্যাদি কোন ইবাদতেই তা বলতে পারবে না। বরং তালবিয়ার আগে কিছু না বলে নামায শুরু করার আগে যেভাবে তাকবীর বলে তা শুরু করে অনুরূপ হজ্জকে ও তালবিয়া দিয়ে শুরু করবে।” (মাজমু ফাতাওয়া-ইবনে তাইমিয়া ২২/২২২)

ইমাম ইবনে আবিদীন শামীর পুত্র আল্লামা সাইয়েদ আলাউদ্দীন বলেন-
“আল্লামা কামাল উদ্দীন ইবনে আবদুল ওয়াহদি (মৃত্যু ৬৮১ হিঃ) এর রচিত “ফাতহুল কাদীর” গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিছু সংখ্যক মুহাদ্দিস থেকে বর্ণিত আছে যে, সহীহ কিংবা যয়ীফ কোন বর্ণনা দ্বারাও প্রমানিত হয় নি যে, রাসূল (সঃ) নামায শুরু করার সময় একথা বলতেন যে, আমি এই নামায পড়ার ইচ্ছা করছি। এমনকি কোন একজন সাহাবী এবং তাবেয়ী থেকেও তা বর্ণিত হয় নি।”
‘হুলিয়া’ গ্রন্থে অতিরিক্ত একথাও বলা হয়েছে যে, প্রধান চার ঈমামের কারো থেকেই নিয়্যত উচ্চারণের কথা বর্ণিত হয়নি। বরং এ কথাই বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সঃ) যখন নামাযের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতেন তখন কেবল আল্লাহু আকবার বলেই নামায শুরু করতেন।” (রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুরিরল মুখতার, ২/৮৪)

আমাদের দেশে সাধারণ মুসলমানতো বটেই বরং অনেক আলিম ও নামাযে নিয়্যত উচ্চারণে অভ্যস্ত।
নামাযে নিয়্যত উচ্চারণের এ গর্হিত প্রচলন বহুকাল থেকেই আমাদের দেশে চলে আসছে।
আমাদের দেশে সাধারনতঃ গ্রাম গঞ্জে মসজিদের সাথে সংযুক্ত সকাল বেলার মক্তবের প্রথম পাঠ্য কায়দায়ে বাগদাদী নামক কালিমা ও নামায শিক্ষার একমাত্র অবলম্বন। এ কায়দায় ফজর থেকে ইশা পর্যন্ত সকল নামাযের নিয়্যতই আরবী ভাষায় লিখিত আছে। বিদয়াতপূর্ন এ কায়দাটিতেই আমাদের কোমলমতি শিশুদের সর্বপ্রথমে শিক্ষা দেয়া হয়। নিয়্যত উচ্চারণের ব্যাপক প্রচলন আমাদের দেশে সম্ভবতঃ এভাবেই প্রথম শুরু হয়েছে।
আল্লামা সাইয়েদ সুহাম্মদ আলাউদ্দীন ‘আমি নিয়্যত করেছি’ ‘আমি নিয়্যত করতেছি’ এ বাক্যদ্বয় সম্পর্কে ‘হুলয়া’ গ্রন্থে বরাত দিয়ে বলেন-
“হুলইয়া’ গ্রন্থকার বলেন, যদি আপাততঃ মেনেও নেয়া হয় যে, নামাযে নিয়্যতের উচ্চারণ আমাদের কিছুসংখ্যক হানাফী আলিমদের সুন্নত। তবে তা হজ্জের দোয়ায় উল্লেখিত বাক্যের দ্বারাই উচ্চারণ করা ছিল কর্তব্য। এমন শব্দ ও বাক্য দ্বারা তা উচ্চারণ করা যুক্তিযুক্ত নয়; যেমনটি সাধারণ এবং বিশেষ লোকেরাও উচ্চরণ করে থাকেন। যথা “নোয়ায়তু” “আমি নিয়্যত করেছি” ‘আমি নিয়্যত করেতেছি’। এরূপ শব্দে ও বাক্যে নিয়্যত করা কিয়াসের পরিপন্থী।” (রাদদুল মুহতার আলাদ্দুরিল মুখতার ২/৮৪)

এতেও পরিষ্কার ভাবে প্রমানিত হয় যে প্রচলিত নিয়্যত উচ্চারণের কোন ভিত্তি নেই। এ পর্যায়ে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন-

“নামাযের তাকবীর, হজ্জের তালবিয়া এবং পবিত্রতা অর্জনসহ যাবতীয় ইবাদতের পূর্বে নিয়্যত উচ্চারণ ইত্যাদি যা কিছু লোকেরা আবিষ্কার করেছে এসবই বিদয়াত। রাসূল (সঃ) ইবাদতে কিছু সংযোজন করা থেকে সর্বাবস্থায় সতর্ক থাকতেন। নিয়্যত উচ্চারণসহ এ প্রকৃতির কিছু বর্ধিত করা দুদিক থেকে বিদয়াত ও পথভ্রষ্টতা।
১. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ বিশ্বাসপোষন করে যে, তার এ অতিরিক্ত কাজটি শরীয়ত সম্মত ও সুস্তাহাব। অর্থৎ, এ কাজ থেকে বিরত থাকার চেয়ে তা করা সে উত্তম বলে মনে করে। অথচ রাসূল (সঃ) তা কখনো করেন নি।
২. তার এ কাজের পরিণতি দাঁড়ায় এই যে, রাসূল (সঃ) এর কাজের চেয়ে তার কাজ খুবই উত্তম এবং পরিপূর্ন। এক ব্যক্তি ইমাম মালিক ইবনে আনাসকে মিকাতে পৌঁছার পূর্বেই ইহরাম বাঁধা সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করেছিল। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, তোমার ব্যাপারে আমি ফিতনার আশংকা করছি। এরপর লোকটি তাঁকে বললো, এতে আবার ফিতনা কিসের, তাতো আল্লাহর আনুগত্যে কয়েক মাইল অতিরিক্ত মাত্র। তার একতা শোনে ইমাম মালিক বললেন, এর চেয়ে বড় ফিতনা আর কি হতে পারে? যে সাওয়াবের কাজটি রাসূল (সঃ) করেন নি, অথচ তাই তুমি নিজের জন্য বিশেষিত করে নিয়েছ।” (ফাতাওয়া শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ২২/২২৩)

উক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, রাসূল (সঃ) যা করেননি অন্য কারো পক্ষে তা করা পথভ্রষ্টতা, বিদ’য়াত এবং বিপর্যয় ছাড়া কিছুই নয়।
এ প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম আরো বলেন-
“নিয়্যত উচ্চারণ করা মুস্তাহাব নয়, বরং তা’ বিদ’য়াত। কারণ, নবী (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ থেকে তা বর্ণিত হয় নি। তিনি তাঁর উম্মতের কাউকেই নিয়্যত উচ্চারণের নির্দেশ দেন নি। কোন একজন মুসলমানকেও তা শিখিয়ে যান নি। যদি তা প্রসিদ্ধ ও শরূয়তসম্মতই হতো তাহলে আল্লাহর রাসূল (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ তা থেকে অবশ্যই গাফিল থাকতেন না। অথচ মুসলিম উম্মাহ দিবা-রাত্রিই এর সম্মুখীন হয়ে থাকে। বরং নিয়্যত উচ্চারণ দ্বীন ও বুদ্ধিগত ত্রুটিরই প্রমাণ। দ্বীনের ত্রুটি এ করণে যে, তা বিদ’আত। বুদ্ধিগত ত্রুটি এ কারণে যে, মৌখিক উচ্চারণকারী যেন সেই বোকা মানুষটির মতই যে আহার গ্রহণের ইচ্ছা করে মুখে উচ্চারণ করে যে, আমি এই প্লেটে হাত রাখার নিয়্যত করছি, আমি তা থেকে লোকমা গ্রহণের ইচ্ছা করছি, অতঃপর তা আমার মুখে উঠাচ্ছি, এরপর আমি তা চর্বন করছি, তারপর তা গলাধঃকরণ করছি যাতে করে আমার উদর পূর্তি করে পরিতৃপ্ত হই। অতএব নামাযে নিয়্যত উচ্চারণকারীদের অবস্থাও উক্ত বোকা মানুষটির মতই। সেও নামাযে নিয়্যত উচ্চাণ করে যে, আমি আল্লাহর জন্য জামায়াত সহকারে উপস্থিত ওয়াক্তের চার রাকআত ফরয নামায আদায় করার নিয়্যত করছি। সুতরাং, এসবই নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতা। এছাড়া মানুষের মনে কোন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞা আসার সাথে সাথে মনের ভিতর স্বাভাবিকভাবেই এর নিয়্যত উপস্থিত হয়ে যায়। তাই বান্দা যখন তার করণীয় কোন কাজ সম্পর্কে অবহিত ও মনযোগী হয় তখনই সে সম্পর্কে তার নিয়ত ও মনের ভিতরে আপনাতেই সৃষ্টি হয়ে যায়। সুতরাং আসন্ন কাজের জ্ঞান অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও নিয়্যত ছাড়াই সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার কল্পনা করা বুদ্ধি ও যুক্তির পরিপন্থী।” (মাজমূ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ২২/২৩২-২৩৩)

এ সম্পর্কে আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আলজাওযিয়া বলেন-
“রাসূল (সঃ) যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন শুধু ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন। এ বাক্যের আগে তিনি না নিয়্যত উচ্চারণ করতেন না অন্যকিছু বলতেন। ইমাম কিংবা মুক্তাদী হয়ে কিবলার দিকে মুখ করে অমুক ওয়াক্তের চার রাকআত নামায পড়ছি ইত্যাদি কিছু কখনই বলতেন না।
উপস্থিত ওয়াক্ত, কাজা,আদা, ফরয কিংবা নফল ইত্যাদি কখনো বলেন নি। এ প্রকৃতির অসংখ্য বিদয়াতপূর্ণ কথার একটা শব্দও কোন সহীহ, যয়ীফ, মুসনাদ, কিংবা মুরসাল হাদীস ও রাসূল (সঃ) থেকে কেউ বর্ণনা করেন নি। না তাঁর কোন সাহাবী থেকে এরূপ কোন বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনকি কোন তাবেয়ী অথবা চার ইমামের কেউ একে উত্তম মনে করেছেন বলেও কোন বর্ণনা পাওয়া যায় নি।
তবে পরবর্তী যুগের কোন এক আলিম ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এর কথা ‘নামায রোযার মত নয় যে, কোনরূপ যিকর ছাড়াই কেউ তা শুরু করে দিবে’ ভুল বুঝে প্রতারিত হয়েছেন। অতঃপর ঐ আলিম ধারণা করে বসেছেন যে, এর দ্বারা ইমাম শাফেয়ী নিয়্যত উচ্চারণের কথা বুঝিয়েছেন। অথচ এর দ্বারা ইমাম শাফেয়ী তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া অন্য কিছুই উদ্দেশ্য করেন নি। নবী (সঃ) যে কাজ তার জীবনে একটি বারের মতও করেন নি, খুলাফায়ে রাশিদা কিংবা তার সাহাবীগণও যা জীবনে একটি বারের মতও করেন নি, ইমাম শাফেয়ী কি করে তা ভালো মনে করতে পারেন? এমন কাজ না করাই ছিল খুলাফায়ে রাশিদা ও সাহাবীগণের আদর্শ পন্থা ও চরিত্র।
অতএব এ বিষয়ে কেউ যদি তাঁদের থেকে বর্ণিত একটা হরফ ও আমাদের দেখিয়ে দিতে পারে তাহলে তা নির্দ্বিধায় বিনা বাক্যে মেনে নিব।
সাহাবীগণের পথই পরিপূর্ণ হেদায়াতের পথ। শরীয়ত প্রণেতা রাসূল (সঃ) এর এমন কোন সুন্নত নেই যা তারা তাঁর কাছ থেকে গ্রহন করেন নি। নামাযের ইহরাম বাঁধার সময়ে রাসূল (সঃ) এর স্থায়ী নিয়ম ছিল যে, “আল্লাহু আকবার’ বলা। তিনি তখন অন্য কিছু বলতেন না এবং তাছাড়া অন্যকিছু তিনি বলতেন বলে কেউ বর্ণনা করেন নি। (যাদুল মায়াদ ১/১৯৪,)

অনেক নামাযীর জন্য নিয়্যত উচ্চারণ এক মুসিবতের কারণ হয়েও দাঁড়ায়। কেননা, তাদের করো অবস্থা এমনও দেখা যায় যে, ইমাম সাহেব তাকবীর তাহরীমা বলে সূরা ফাতিহা পড়তে শুরু করেছেন, তবুও তাদের নিয়্যত উচ্চারণ আর শেষ হয় না। আবার কারো কারো অবস্থা এমনো দেখা যায় যে, নিয়্যত একবার উচ্চারণ করে সন্দেহ বশতঃ তাহরীমা ভেঙ্গে আবার নিয়্যত উচ্চারণ করেন। অনেকে শয়তানের ওয়াসওয়াসার শিকার হয়ে বার বার নিয়্যত উচ্চারণ করতে থাকেন। কেননা শয়তান তাদের নামায নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদের মনের ভিতরে এ সন্দেহের উদ্রেক করে দেয় যে, ‘তুমি নিয়্যত বল নি’। অপরদিকে ইমাম সাহেব কিরাআত পড়া শেষ করে দিচ্ছেন।

এ সকল নামাযীর এ অবস্থাকে ইমাম ইবনূ জাওযী এভাবে চিত্রয়িত করেছেন-
“শয়তান ইবাদতকারীদের যে সকল ধোঁকা দিয়ে থাকে তন্মধ্যে এও একটা যে, সে নামাযের নিয়্যতের ব্যাপারে প্রবঞ্চিত করে। অতঃপর তাদের কেউ কেউ বলে যে, আমি অমুক ওয়াক্তের অমুক নামায পড়ার নিয়্যত করছি। অতঃপর তা আবার পুনরাবৃত্তি করে এ ধারণায় যে, তার নিয়্যত ভঙ্গ হয়ে গিয়েছে। অথচ নিয়্যত কখনো ভঙ্গ হয় না। এমনকি শব্দের পার্থক্যেও নষ্ট হয় না। নামাযীদের এমন লোকও আছে যে, প্রথমবার তাকবীর তাহরীমা বলার পর তা ভেঙ্গে আবার তাকবীর বলে, অতঃপর আবারও তা ভঙ্গ করে। এমনকি এমতাবস্থায় ইমাম যখন রুকূতে চলে যান তখনই শয়তানের প্রবঞ্চিত ঐ লোকটি তাবীরে তাহরীমা বলে ইমামের সাথে রুকূ করে। আমি আফসোস ও বিস্ময়ে হতবাক হই যে, ইমামের রুকূতে যাওয়ার সময়ে কিসে তাকে নিয়্যত উপস্থিত করে দিল? ইতোপূর্বে তার মনে নিয়্যতের উপস্থিতিতে কিসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল?
আমার জ্ঞানে এ কারণ এছাড়া আর কিছুই নয় যে, ইবলিশই তাকে সাওয়াব থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছে। ইবলিশ শয়তান কর্তৃক প্রতারিত কোন ব্যক্তির অবস্থা এমনও হয় যে, আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে আমি এখনই কেবল তাকবীরে তাহরীমা বলছি। অথচ ইতোপূর্বে কয়েকবারই সে কাতবীর বলেছে। এই প্রবঞ্চিতদের কেউ কেউ সম্পদ ও স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ও শপথ করে থাকে। অথচ আল্লাহ শরীয়ত অতি উদার, সহজ-সরল এবং সকল কাঠিন্য ও আপদ থেকে মুক্ত। আল্লাহর রাসূল এবং তার সাহাবীগণ থেকে এর কোন প্রমাণ বর্তমান নেই।
আমাদের কাছে আল্লামা হাযিমের ঘটনার সংবাদ পৌঁছেছে যে, একবার তিনি মসজিদে প্রবেশ করার পর ইবলিস তাকে এভাবে প্ররোচনা দেয় যে, ‘হে! তুমি বিনা অযুতেই নামায পড়ছো’ তখন তিনি বললেন, ‘এই ব্যক্তির কাছে তোমার এ উপদেশ এসে পৌছে নি।’
শয়তানের এহেন প্ররোচনা দূর করার নিয়ম হলো, প্ররোচনার শিকার ব্যক্তিটিকে একথা বলা যে, যদি তুমি অন্তরে নিয়্যত উপস্থিত করার ইচ্ছা করে থাকো, তবে নিয়্যত তোমার অন্তরেই বর্তমান আছে। কারণ তুমি তো নামায আদায় করার উদ্দেশ্যেই দাঁড়িয়েছ, আর এটাই তোমার নিয়্যত। কেননা নিয়্যতের স্থান হলো অন্তর শব্দ উচ্চারণের নাম নিয়্যত নয়। (তালবিসু ইবলিস ১৮০)
নিয়্যত উচ্চারণের বিধান সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াকে ফতোয়া জিজ্ঞেসা করলে তিনি বলেন-
“শব্দ করে নিয়্যত উচ্চারণ করা এবং পুনরাবৃত্তি করা নিকৃষ্ট বিদ’য়াত। মুসলমানদের ঐকমত্য অনুযায়ী তা মুস্তাহাব নয়। কেননা রাসূল (সঃ) এবং তাঁর খুলাফায়ে রাশিদা তা করেন নি।” (মাজমূ ফাতাওয়া শয়খুল ইসাম ইবনে তাইমিয়অ ২২/২৩৫)

এ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন-
“নামাযে শব্দ করে নিয়্যত উচ্চারণ করা নিকৃষ্ট বিদ’আত। তাকে অবশ্যই উত্তম বিদআত বলা যায় না। এ কথার উপর সকল মুসলমানের ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শব্দ করে নিয়্যত উচ্চারণকে কেউই মুস্তাহাব কিংবা বিদ’য়াতে হাসানা বলেননি। এতদসত্ত্বেও কেউ যদি একে উত্তম মনে করে তাহলে সে রাসূল (সঃ) এর সুন্নাহ, চার ইমাম ও অন্যান্য আলিমগণের বিরোধিতাই করলো। যে একে উত্তম অথবা মুস্তাহাব বলবে তাকে তাওবার নির্দেশ দিতে হবে। যদি তাওবা করে নেয় তাহলে ভালো। অন্যথায় তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।’ (মাজমূ ফাতাওয়া শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ২২/২৩৩)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে নামায শুরুর পূর্বেই বিদ’আত করা থেকে বিরত রাখুন। আমীন………..

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
২,৮৯১ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ১.০০)

২২ টি মন্তব্য

  1. মুখে নিয়্যত উচ্চারণ করা বা মনে মনে বলা ও বিদ’আত”। মক্কাতে এই নিয়ে লিফলেট বিতরন করা হয়। (Y)

  2. ভাই এত বড় পোষ্ট মাথা ঘুরে গেল। সংক্ষেপ করতে পারতেন। যা হোক এটি একটি সিম্পুল সমস্যা এর জন্য এত কথা বলার কি আছে?

    বিদা মানে কি খারাপ?

    সব আমলের বিচার হবে তার নিয়তের উপর নয় কি?

    আল্লাহ সর্বজ্ঞ নয় কি?

    যখন আমি বাজারে যাবার জন্যে রাস্তায় বের হবো তখনইতো আল্লাহ তা বুঝে নিবেন। এর জন্য মুখে বলার কি আছে যে, আমি এখন বাজারে যাচ্ছি!!!!!
    শুধু তাই কি আমার দিলে বাজারে যাবার ভাবনা আসা মাত্র আল্লাহর জানা হয়ে যায়।
    শুধু কি তাই? আমি আজ বাজারে যামু কি যামুনা তা তো জানাই আছে।
    তাই মুখে উচ্চারণের দরকার কি?

    তাহলে বলেন তো ভাই মানুষ বায়ুকর্ম করলে ঐ জায়গা না ধুইয়া আবার অজু করে কেন? বায়ু তো তার সারা অঙ্গে লাগে নাই।
    আরও কয়েকটি বিদা,যা আমরা করি আরবরা করে না। নামাজকে নামাজ বলে না সালাত বলে, যেহেতু আল্লাহর রাসুল নামাজ বলেন নি এটিও একটি বিদা। নামাজের শেষে রাসুল সঃ মোনাজাত করতেন না আমরা করি,এটিও একটি বিদা। সেই ভাবে চল্লিশা, মরার ৭ দিনে ভোজ, ইত্যাদিও বিদা।
    তারপর জুমার ২য় খুতবায় যখন আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়া হয় তখন বাংলায় ৯৯ জন নামাজি আমিন আমিন না বলে কেঊ কেউ ঝিমান আর কেউ কেউ ছাগলের মত ড্যাব ড্যাব চোখে ইমাম সাহেবরে দেখতে থাকেন। এটিও একটি বিদা।
    এই ধরণের হাজারটি বিদা দেখালে দেখান যায়।

    সবই ইনটেনশন।

    মামুন

    @জ্ঞানান্ধ,ভাইজান আমি কম জানি তবে এতটুকু বুঝতে পারি যে, সালাত আরবী শব্দ আর নামাজ ফার্সি। এখানে বিদ’য়াতের কি দেখলেন? বায়ূ কোন তরল পদার্থ নয় যে তা বের হওয়ার সাথে সাথে ঐ জায়গায় লেগে যায়, সুতরাং কথাটা অপ্রাসঙ্গিক।
    বাকি যাহা বললেন তাহা যদি রাসূলের মাধ্যমে প্রমানিত না হয় তা হলে নিঃসন্দেহে বিদ’আত!
    আমি এতো কিছু জানি না, তবে যা একটু একটু করে জানছি তাহা আপনাদের মতামতের জন্য পেশ করছি। আপনারাই এর সঠিক ব্যখ্যা দিতে পারবেন।

    ইনটেনশনের গুরুত্ব ইসলামে অনেক। বিশেষ করে বেহেশতের চাবিকাঠির (সালাহ) ক্ষেত্রে।

  3. মামুন ভাই,

    এটা কি আপনার নিজস্ব লেখা নাকি কোনো সাইটের থেকে ইনফরমেশন নেয়া ? কোনো রেফারেন্স দেয়া যায় কি ?

    ধন্যবাদ

    শাহরিয়ার

    @হাফিজ, আমার বড়ভাই একটা বই দিলেন পড়তে, বইটা আমাদের হানাফী মাযহাবের এক ভাইয়ের লেখা।

    “নামাজে প্রচলিত ভুল মাসলা মাসায়েলের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা” লিখেছেন আব্দুল হাফিজ পাঠান
    বইটা পড়ে আমি ভীমরী খেয়ে পড়েছি। ওনার লেখা বেশ তথ্য নির্ভর এবং যুক্তিসংগত।

    হাফিজ ভাই, আপনিও বইটা সংগ্রহ করে পড়তে পারেন।

    হাফিজ

    @শাহরিয়ার ভাই, অবশ্যই পড়ব , প্রকাশনার নামটা কাইন্ডলি বলা যাবে ?

    হাফিজ

    @শাহরিয়ার ভাই, আর একটা কথা , সাথে সাথে আপনি হানাফীদের দলীল কি কি সেটাও পড়ে রাখবেন , তাহলে আমাদের আলোচনা করতে সুবিধা হবে ।

    মামুন

    @হাফিজ, শাহরিয়ার ভাই যে বইটি পড়েছে আমার হাতেও এমন একটি বই এসেছে। সেখান থেকেই লিখছি, আমার মাথায় এত কিছু কো’থেকে আসবে?
    শাহরিয়ার ভাই, বইটা কেমন লাগছে পড়তে? কাটাবনে গেছি ইসলামিক বই কিনতে আমাকে ওরা আব্দুল হাফিজ পাঠানের এই ব্যপক বিশ্লেষনার্তক বইটা ধরিয়ে দিল। বইটা পড়ে মনে হচ্ছে আমরা এতো দিন যেগুলো করে আসছি তার ভিত্তি কিছুটা দুর্বল। আমাকে আরো স্টাডি করতে হবে।
    হাফিজ ভাই, বইটা সম্ভব হলে কিনে পড়েন, তারপর ব্লগে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

    হাফিজ

    @মামুন ভাই , জ্বী আমি বইটি জোগাড় করেছি । ইনশাল্লাহ পড়া হলে তারপর আপনাদের সাথে আলোচনা করা যাবে ।

    মামুন

    @হাফিজ, আসসালামু আলাইকুম হাফিজ ভাই, অনেক দিন ঠিক মতো পড়তে পারছি না। শুধু লিখেই খালাস! বইটা বেশ তথ্যবহুল। আমি বেশ অবাক হচ্ছি!! আপনার কেমন লাগে জানাবেন।

    হাফিজ

    @মামুন ভাই, মনে হলো আপনাদের মধ্যে সহনশীলতা আছে , তাই আলোচনা করে নিশ্চয়ই আমিও উপকৃত হবো ।

  4. আপনি কিছু কিছু রেফারেন্স দিয়েছেন যাতে বোঝা যায় কেউ কেউ এটাকে মোস্তাহাব বলেছেন , আবার কিছু কিছু রেফারেন্স দিয়েছেন কেউ কেউ এটাকে বিদাআত বলেছেন ? এখন কি কারনে আপনি শুধুমাত্র যারা বিদআত বলেছেন তাদের পক্ষে মত দিচ্ছেন ?

    মামুন

    @হাফিজ, যখন সংঘর্ষ মোস্তাহাব এবং বিদ’য়াত এর মধ্যে তখন কাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত? আমি বিষয়টা ফয়সালা করতে পারছি না। তবে একটা কথা কি জানেন? যদি ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এই নিয়্যত পড়ে নামাজে দাড়াতে বলতেন আমি তাহা মেনে নিতাম এবং এই লেখার বিরূদ্ধে তর্ক করতাম। কিন্তু পারছি না কারন চার মাযহাবের কেহই নিয়্যতের ব্যপারে কোন মত দেন নাই।
    তাই বিষটা কি হতে পারে এবার আপনিই বলুন।

  5. জনাব মামুন, আমি জানতে চাই “বিদ’য়াত” শব্দের আর্থ কি?

    মামুন

    @muaallim, ইসলামে নব আবিষ্কারই হল বিদ’আত। এটা দারুন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইসলামে এটাকে হারাম বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের কোন পরিবর্ধন বা সংক্ষেপন করা যাবে না। এ ব্যপারে আল্লাহর কঠোর হুশিয়ারী রয়েছে।

  6. @মামুন, বিদ’আত মুলত দুপ্রকার। আপনি কোন বিদ’আতের কথা বলেছেন। পরিস্কার করে জানালে খুশি হব।

  7. আসলে আমি বুঝতে চেয়েছিলাম যে, জনাব মামুন বিদ’আত সম্পর্কে কতটুকু জানেন। যা হোক একজন কে যে সব জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে বলার আগে জেনে নেয়াটা খুব দরকার।

    বিদ’আত শব্দের আর্থ হচ্ছে- “নতুন”। বিদ’আত দু’প্রকার। হাসানা ও সাইয়্যিয়াহ্‌। অর্থাৎ একটা সুন্দর আর একটা অসুন্দর। ইমাম-মুজতাহিদরা অনেক কিছুই করেছেন যা বিদ’আতে হাসানা রূপে গন্য। যেমন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই খাইরুল কুরান-এর পর আবিষ্কৃত সবকিছুই বিদ’আতে সাইয়্যিয়াহ্‌ নয়।

    নামাজে নিয়ত করা ফরজ। ফরজ নিয়ত হচ্ছে- অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর মৌখিক নিয়ত হচ্ছে- মুস্তাহাব ও মুস্তাহ্‌সান। প্রত্যকেই তার মাতৃভাষায় নিয়ত করতে পারবে, তাতে কোনো অসুবিধা নাই। নামাজ শুদ্ধ হবে। তবে আফজাল হল আরবীতে নিয়ত করা। কারন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
    “তিন কারনে আরবী ভাষাকে মুহব্বত কর। এই জন্য যে, আমি আরবী, বাহেশ্‌তের ভাষা আরবী, আর কোরআন শরীফের ভাষা আরবী।”

    আখেরী রাসূল হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়েকেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমগনের সময় মৌখিক নিয়ত ছিলনা। পরবর্তীতে ইমাম-মুজতাহিদগন সাধারন মানুষ যেন সমস্যায় না পরে সে জন্য মৌখিক নিয়তের প্রচলন করেছেন। এতে তারা নামাজের কয়েকটি ফরজ উল্লাখ করে দিয়েছেন সাধারন মুসল্লিদের সুবিধার জন্য। যেমন (১) কোন নামাজ পড়া হচ্ছে সে নামাজ ও তার নিয়ত, (২) কত রাকাত নামাজ পড়া হচ্ছে, (৩) কোন দিকে ফিরে নামাজ পরা উচিত, সর্বোপরি (৪) কার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়তে হবে ইত্যাদি।

    উল্লেখ্য যে ইমাম-মুজতাহিদগন কতৃক প্রবর্তিত ফতওয়া বা মাসলাহ্‌ মোতাবেক আমল করা সম্পুর্ন শরীয়ত তথা কোরআন-সুন্নাহ সম্মত। কারন আল্লাহপাক বলেনঃ “হে মু’মিনগন! তোমরা ইতায়াত কর আল্লাহ পাক-এর এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এবং উলিল আমর তথা ইমাম-মুজতাহিদগনদের।”

    মূলতঃ মাযহাবের ইমামগন মনগড়াভাবে কোনো মাসয়ালার অবতারনা করেননি, তাঁরা কোরআন-সুন্নাহ্‌কে পর্যালোচনা করে সর্বসাধারনের আমলের সহজতার জন্য মাসয়ালা প্রদান করেছেন। অন্যথায় সবার জন্য কোরআন-সুন্নাহ্‌র সেই ব্যাপক ইল্‌ম অর্জন এবং সেই আনুযায়ী আমল করা কখনোই সম্ভব ছিলনা। তাদের প্রবর্তিত কোরআন-সুন্নাহ্‌র সেই বিস্তারিত ও সহজতর ব্যাখ্যার নাম হচ্ছে ফিকাহ্‌ শাস্ত্র যা ইজ্বমা ও ক্বিয়াসের সমষ্টি। আর ইজ্বমা ও ক্বিয়াস শরীয়তের দলীল এর অন্তর্ভুক্ত।

    হাফিজ

    @muaallim,আপনার সাথে ১০০% সহমত । ঠিক বলেছেন ।

    মামুন

    @হাফিজ, আমিও সেই কথাই জানি। আমরা নতুন নতুন নিয়ম বানালে আল্লাহ নিশ্চয়ই খুশী হবেন। এই দুনিয়ায় কোন বিদ’আতই প্রতিষ্ঠিত হবে না। হলেও সেগুলো হবে বিদাতে হাসনা। কারন রাসূল (সঃ) দ্বীনের ক্ষেত্রে যতটুকু অপূর্ণ রেখে গেছেন বর্তমান যুগের আলেমগণ তাহা অবশ্যই ইজমা কিয়াস করে পরিশুদ্ধ করে নিবেন, এটাইতো আমাদের জন্য সুবিধা।

    হাফিজ ভাই, যুক্তির দিক থেকে এটা খুবই দুর্বল। আমি এ কথা বলে সাকিব ভাইয়ের কাছে টিকতে পারি নাই। বড় ভাইয়ের কথা; যাহা নবী (সঃ) করেন নাই, কোন সাহাবী, তাবেয়ী এমন কি চার ইমামও করেন নাই তাহা আপনি কেন করবেন? এভাবেই নাকি মনগড়া ইজ্বমা ক্বিয়াস দ্বারা ইসলাম খন্ড খন্ড হয়ে গেছে। ওনার কথা বিদআত ‘বিদআতই’ এর মধ্যে ভাল খারপ নাই। আল্লাকে খুশী করার জন্য ইসলামে নতুন কিছু আবিষ্কার করার দরকার নাই। আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে ১৪০০ বছর আগে। এজন্য আমাদের হানাফী মাযহাবের দলীলগুলো নাকি ইজমা-কেয়াস ভিত্তিক। সহীহ হাদীস ভিত্তিক নয়, তাই আমরা নাকি পথভ্রষ্ট ৭২ দলের একদল।
    বড় ভাইয়ের আরো কথা হেচ্ছ, ইসলামের পাঁচিট স্তম্ভ, ০১) কলেমা ০২) নামাজ ০৩) রোজা ০৪) হজ্জ্ব ০৫) যাকাত
    এর মধ্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নামায। নামাযকে বেহেশতের চাবিকাঠী বলা হয়। সেই নামাজের ক্ষেত্রে ইজমা কেয়াস করার অবকাশ কোথায়? তাহলে কি আমরা নবীর উপর আস্থা রাখতে পারছি না? নামাজের নিয়তটাকি উনি ভুল করে শিখান নাই যে আমাদের এটা করতে হবে; বড় ভাই আরো বললেনঃ উলিল অমর এর পরে একটা কথা আছে সেটা নাকি আমরা এড়িয়ে যাই,

    আল্লাহ বলেছেন “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা হুকুমদানের অধিকারী (উলিল আমর) তাদেরকে মেনে চল। যদি তোমাদের মধ্যে মতের অমিল হয় তাহলে ফিরে এসো আল্লাহ ও রাসূলের দিকে, যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখিরাতের দিনকে বিস্বাস কর। (সুরা, নিসা, ৪ঃ৫৯)

    বড় ভাই বলেন যে, আমাদের দেখতে হবে এই ইজ্বমা ও ক্বিয়াস কতটুকু সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। নিজেদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত পরিচয় দিতে হলে সহীহ হাদীস ভিত্তিক চলতে হবে, বিশেষ করে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের ব্যপারে। অন্য ব্যপারে ইজ্বমা ও ক্বিয়াস অনুসরণ করতে বাধাঁ নেই। আমরা চলব আমাদের মনগড়া হাদীস তৈরী করে আর পরিচয় দিব আহলে সুন্নাত বলে! রাসূল (সঃ) এই নিয়্যতের ব্যপারে কোন নির্দেশ দেন নাই তাহলে এটা ফরজ করল কে? উলিল অমর বলতে কি আমরা মাদ্রাসার হুজুরদের বুঝবো? চার ইমাম যেখানে এই ব্যপারে কিছুই বলেন নাই, তাহলে নতুন উলিল অমর কো’থেকে এল?
    বড় ভাই বতর্মান যুগের কয়েকজন বড় বড় উলিল অমরের কথা বলেছেনঃ ০১) নাসিরুদ্দীন আলবানী ০২) আব্দুল্লাহ ইবনে বায়ায ০৩) ঈমাম তাইমিয়াহ ০৪) হাফিজ ইবনু হাজার (রহঃ) ইত্যাদি ইত্যাদি এনারা বিখ্যাত মুহাদ্দিস।

    আমাদের মাযহাব নাকি ফেকহার উপর এবং ফেকাহ নাকি ইজ্বমা ও ক্বিয়াসের উপর প্রতিষ্ঠিত। সহীহ হাদীস এখানে খুবই কম অনুসরণ করা হয়। পূর্বে মহিলাদের নামাজ নিয়ে আমরা কোন সহীহ দলিল পেশ করতে পারি নাই। হাফিজ ভাইও সাহায্য করল না। আমি বড় ভাইয়ের কাছে হেয় প্রতিপন্ন।

    হাফিজ

    @মামুন,
    জন্য আমাদের হানাফী মাযহাবের দলীলগুলো নাকি ইজমা-কেয়াস ভিত্তিক। সহীহ হাদীস ভিত্তিক নয়, তাই আমরা নাকি পথভ্রষ্ট

    মামুন ভাই, আপনার প্রথমে জেনে নেয়া উচিত “ইজমা” , “কিয়াস” কি ? এবং আরো জানা উচিত “তাকলিদ” , “মাজহাব” কি ? এগুলো বিস্তারিত আলোচনার বিষয় যেটার জন্য আপনি তাকী ওসামানীর “মাজহাব কি ও কেনো ? ” বইটি পড়ে দেখতে পারেন । কারন এগুলো বুঝাতে গেলে অনেক গুলো টার্ম ব্যাখ্যা করতে হবে যেটা আমার পক্ষে সম্ভব না সময়ের অভাব ।

    উনি উপরের যে কমেন্ট করেছে এতে বোঝা যায় , হানাফী মাজহাবে কেনো , কোনো মাজহাব সম্বন্ধে উনার কোনো ধারনা নেই । যেকোন একটি মাসআলা বের করতে হলে তার “কোরান শরীফ” , উসুল কোরান , হাদিস শরীফ , উসুলে হাদিস , বালাগাত (আরবী সাহিত্য ও ব্যাকরন ) ইত্যাদি সম্বন্ধে বিস্তারিত এবং পান্ডিত্যপূর্ন দখল থাকতে হয় । ইমাম আবু হানিফা (রহ:) ছিলেন তাবেয়ীন । উনি কোরান এবং হাদিস সম্বন্ধে যে জ্ঞান রাখতেন সেরকম জ্ঞান তো দূরের কথা , উনি কতটুকু জ্ঞান রাখতেন সেটা বোঝার মতো আলেমও আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে । উনি আনাস (রা:) ও এবং আরো কিছু সাহাবীর সংস্পর্শে এসেছিলেন যে কারনে উনাকে তাবেয়ী বলা হয় । উনি ইসলামের ফেকাহ শাস্ত্র সংকলন করার পর তৎকালীন সমস্ত তাবেয়ীন , তাবে তাবেয়ীন এবং অন্যান মুসলিমরা মেনে নিয়েছিলেন । রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) এর হাদিস শরীফ অনুযায়ী সর্বোত্তম যুগ সাহাবীর যুগ , তারপর তাবেয়ীনদের যুগ , তারপর তাবেয়ীনদের যুগ । এখন আপনি বলেন ইমাম আবু হানিফা যে ফেকাহ শাস্ত্র সংকলন করেন ( যেটা অবশ্যই কোরান এবং হাদিসের দলীলের ওপর প্রতিষ্ঠিত ) এবং যার সমর্থন উনি পান সমসাময়িক তাবেয়ীন , তাবে তাবেয়ীন সহ আর সকল মুসলমান থেকে যারা তাদের সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন কোরান হাদিস গবেষনার জন্য , এমনকি একটি হাদিস সংগ্রহের জন্য যারা ৬ মাসের পথ সফর করেছেন … এটা কিভাবে সম্ভব তারা কেউ এই বিভ্রান্তিটা বুঝতে পারল না ?

    রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) যে যুগকে বলেছেন উত্তম যুগ সেই যুগের কেউ বুঝল না যে ইমাম আবু হানিফা (রহ:) এর হানাফী মাজহাব “কোরান” এবং “হাদিস” এর উপর প্রতিষ্ঠিত না ?

    এমন মুর্খতা আর কাকে বলে ?

    পরে মাজহাব নিয়ে পোস্ট লেখার ইচ্ছে আছে , মাজহাব সম্বন্ধে যেসকল অভিযোগের জবাব দেয়া হবে , ইনশাল্লাহ ।

    মামুন

    @muaallim, যিনি একথাটা বলেছেন তিনি একজন ইসলামিক চিন্তাবিধ। আমি ভাই বেশী জানিনা, বই থেকে দেখে দেখে টাইপ করেছি মাত্র। আপনাদের যুক্তির সাহায্য না নিলে আমিও অসহায় ভাবে মেনে নিব।

    হাফিজ ভাই আব্দুল হাফিজ পাঠানের “নামাজে ভুল মাসলা মাসায়েলের তাত্বিক পর্যালোচনা” বইটি সংগ্রহ করেছেন। আপনিও পড়ে দেখতে পারেন আশা করি ভাল লাগবে। আমি পড়লাম তাই লিখলাম যাতে করে এর স্বপক্ষে কতগুলি সহীহ হাদীস ভিত্তিক যুক্তি আছে। আমি পড়ব তার পর বিচার করব “কোনটি ঠিক আর কোনটি বেঠিক”

    মাযহাব মানে এই নয় যে, সবই মানতে হবে। আমরা মুসলমান এক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, এখানে যার যার মত নিয়ে অটল থাকলে সেটা অন্ধ গোঁড়ামি বই কিছুই না। আমাদের মাযহাবের ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) বলেছেন, “সহীহ হাদীস হচ্ছে আমার মাযহাব” আমি ওনার এই কথাটাকে বেশ মূল্য দেই। সহীহ হাদীস ছাড়া ইজমা কেয়াস মানা যাবে কখন? যখন হাদীসে তাহা থাকবে না তখন। আমার মনে হয়না নবী (সঃ) নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন কিছু বাদ দিয়ে গেছেন, আমাদের জামানায় প্রয়োজন হতে পারে এটা আল্লাহ ভাবেন নি?
    যুক্তি এবং দলিল ছাড়া কোন কথাই গ্রহণ যোগ্য নয়।

    হাফিজ

    @মামুন ভাই,

    জ্বী আব্দুল হাফিজ পাঠানের “নামাজে ভুল মাসলা মাসায়েলের তাত্বিক পর্যালোচনা” বইটি কিছুটা পড়েছি । বইটিতে প্রচুর ভুল আছে যেটা একমাত্র তারাই বুঝতে পারবেন যারা সঠিক মাসআলাটা জানে ।

    শুধুমাত্র একটি উল্লেখ করছি । আব্দুল হাফিজ পাঠান উল্লেখ করেছেন “কাবলাল জুমা” বলে কোনো কিছু নেই । এবং কয়েকটি হাদিস উল্লেখ
    করে বলেছেন যেগুলো কোনটাই গ্রহনযোগ্য নয় । নীচের হাদিসটি দেখুন :

    আলী (রা:) বলেন “রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) জুমার পূর্বে এবং পরে চার রাকাআত নামাজ পড়তেন ” । ( তিবরানি, নসব আল রায়াহ , ইলাউস সুনান ) । হাদিসটি নির্ভরযোগ্য ।
    বিস্তারিত আরো হাদিস জানতে গেলে নীচরে লিংকটি দেখুন ।

    http://www.askimam.org/fatwa/fatwa.php?askid=65e553da70694579492adf5bac07650f

    লা মাজহাবিদের থেকে ইসলাম শেখার পরিবর্তে আগে মাজহাবীদের দলীলগুলো পড়ুন । তাহলে ইনশাল্লাহ এগুলো আপনার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে ।