লগইন রেজিস্ট্রেশন

বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীতে অন্ধভাবে মাযহাব পালনের বাস্তব উদাহরণঃ পর্ব-০১

লিখেছেন: ' মামুন' @ বুধবার, জানুয়ারি ৬, ২০১০ (৭:৩২ পূর্বাহ্ণ)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

পর্ব-০১
সুধী মুসলমান এবং ঈমানদার পাঠকবৃন্দ আমরা আজ বিভিন্ন দল, মাযহাব, মতবাদ ও তরিকার মাঝে দিনাতিপাত করিতেছি। একথা স্বীকার করতে কোন দোষ নাই যে, শেষ জামানায় আমরা এক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয়ের পরিবর্তে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মাযহাবের অন্ধঅনুসারি হয়ে ইসলামকে বিভিন্ন ফিরকায় প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করছি। কোনটা সঠিক এবং কোনটা ভুল তা বিচার করার কথা একবার ভাবছিও না। এমনকি আমাদের অন্ধত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চোখের সামনে সহীহ হাদীস খুলে দেখালেও তাহা স্বীকার করা যেন কিছুতেই হয়ে ওঠে না। এভাবে মুসলমানদের একতায় ফাটল ধরেছে, বিভিন্ন মাযহাবের অন্ধ গোঁড়ামী শরীরে টিউমারের মত দানা বেঁধেছে। আমরা সেই টিউমারকে স্বাস্থ্যের অংশ মনে করে লালন পালন করছি। ধীরে ধীরে টিউমার বড় হচ্ছে, ঝুলে যাচ্ছে তার পরেও গর্ব করে বলছি এটা আমার সুস্বাস্থ্যের সিম্বল! আসুন আমরা টিউমারকে স্বাস্থ্য মনে না করে, এটিকে অপারেশন করে সরিয়ে ফেলি। যদিও কষ্ট হবে, তথাপিও আমরা সুস্থ জীবনে ফিরতে পারব।

আজ আমি আপনাদের খেদমতে, ড. মুহাম্মাদ মুযযাম্মিল আলী (প্রফেসর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া) রচিত অত্যন্ত তথ্য নির্ভর এবং নিরপেক্ষতার আলোকে লেখা “শিরক কী ও কেন?” বইটির ৩২৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখিত-
“বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীতে অন্ধভাবে মাযহাব পালনের বাস্তব উদাহরণ:’ নিয়ে একটু আলোচনা করিঃ

কোন বিষয়ে পরস্পর বিরোধী বিশুদ্ধ হাদীস থাকলে এ জাতীয় হাদীসের ব্যাপারে আমাদের করণীয় কি, সে ব্যাপারে হাদীসবিদগণ বলেনঃ

০১) যদি উক্ত ধরনের উভয় হাদীসের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা যায়, তা হলে তা করে উভয় হাদীসের উপর আমল করতে হবে।

০২) আর যদি উভয়ের মাঝে কোন সামঞ্জস্য বিধান করা না যায়, তা হলে দেখতে হবে যে, এর মধ্যকার কোন একটি অপরটির জন্য নাসিখ তথা রহিতকারী কি না। তা জানা গেলে রহিতকারী হাদীসকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেটির উপর আমল করতে হবে এবঙ মানসূখ তথা রহিতকৃত হাদীসকে বাদ দিতে হবে।

০৩) তা জানা সম্ভব না হলে একটিকে অপরটির উপর অগ্রাধিকার দানের নিয়মানুযায়ী একটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

০৪) তাও যদি সম্ভব না হয়, তা হলে কোন একটিকে অগ্রাধিকার দেয়ার মত কোন কারণ না পাওয়া পর্যন্ত উভয় হাদীসের উপর ‘আমল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। (সূত্রঃ ড. মাহমূদ ত্বহহান, তাইছীরু মুসত্বলাহিল হাদীস; (করাচী, ক্বদীমী কুতুবখানা, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন) পৃ. ৫৭)

কোন বিষয়ে যদি পরষ্পর বিপরীতমুখী বিশুদ্ধ হাদীস থাকে অথবা একটি হাদীস থেকে দু’রকমের অর্থ গ্রহণের সম্ভাব্যতা থাকে, আর সে কারণে যদি তা নিয়ে ইমামগণের ইজতেহাদের মাঝেও বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়, এবং পরবর্তী আলেমগণও যদি কোন ভাবেই সে ব্যপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে দু’রকম আমল করেন, আর তাঁদের অনুসরণে আমরাও সে রকম করি, তা হলে আশা করি এতে তাঁরা এবং আমরা সবাই আল্লাহর কাছে উপযুক্ত উজরাখাহী করতে পারবো। কিন্তু যে বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীতে অপর কোন বিশুদ্ধ হাদীস পাওয়া যায় না এবং এর বাহ্যিক অর্থেরও ভিন্ন কোন ব্যাখ্যা করা যায়না, এমন হাদীসের উপর আমল করার ক্ষেত্রে কারো ভিন্ন মত পোষণ করার কোন এখতিয়ার থাকে না। অনুরূপভাবে একটি কর্ম যদি সাহাবীদের যুগ থেকে দু’ভাবে করা জায়েয প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে একটিকে গ্রহণ করে অপরটিকে না জায়েয বা মাকরূহ বলারও কারো কোন অধিকার নেই। তবে আশ্চার্যজনক হলেও সত্য যে, মাযহাবের অন্ধ অনুসরণের কারনে আমাদের সমাজে এমনও কিছু আমলের প্রচলন রয়েছে যার মধ্যে বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আমলের বিরোধিতা রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। পাঠক সমাজের বুঝার সুবিধার্থে নিম্নে এর তিনটি উদাহরণ তুলে ধরা হলোঃ

০১) এক মিছিলের পর দ্বিতীয় মিছিলের শুরু থেকেই আসর নামাযের ওয়াক্ত আরম্ভ হয়ঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা বর্ণিত হয়েছে যে, জিবরাঈল (আঃ) রাসূল (সঃ)-কে নামাযের সময় শিক্ষাদান উপলক্ষে দু’দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে ইমামত করেছিলেন। প্রথম দিনে আসরের নামায প্রত্যেক ব্স্তুর ছায়া এক মিছিল পূর্ণ হওয়ার সময় অথবা পূর্ণ হওয়ার পর অর্থাৎ দ্বিতীয় মিছিলের প্রারম্ভে আদায় করেছিলেন এবং দ্বিতীয় দিনে তা প্রত্যেক বস্তুর ছায়া দুই মিছিল হওয়ার পর অর্থাৎ তৃতীয় মিছিলের প্রারম্ভে আদায় করেছিলেন। এর পর তিনি বলেছিলেনঃ নামাযের ওয়াক্ত এ দুই ওয়াক্তের মধ্যে।
(ইমাম তিরমিজী, প্রাগুক্ত; কিতাবুস সালাত ‘আন রাসূলিল্লাহি (সঃ) বাব নং ১১৩, হাদীস নং ১৪৯, ১/২৭৯; ইবনে হিব্বাস, প্রগুক্ত; কিতাবুস সালাত, বাব নং ২, হাদীস নং ১৪৭২, ৪/৩৩৫)

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আসরের নামাযের ওয়াক্ত প্রত্যেক বস্তুর ছায়া দুই মিছিল হওয়ার পর তৃতীয় মিছিলের প্রারম্ভে আরম্ভ না হয়ে দ্বিতীয় মিছিলের প্রারম্ভ থেকেই হয়ে যায়। অথচ আমাদের মাযহাবে বিষয়টি এর সম্পূর্ন বিপরীত রয়েছে। দ্বিতীয় মিছিলের প্রারম্ভ থেকে আসরের নামাযের ওয়াক্ত আরম্ভ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা মাযহাবের কথানুযায়ী তা স্বীকার করি না।

ইমাম মুহাম্মদ (রাঃ) তাঁর মুওয়াত্বা গ্রন্থে আসরের নামাযের ওয়াক্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করেছেন। তাতে রয়েছে: ‘আব্দুল্লাহ ইবনে রাফে’ আবু হুরায়রা (রাঃ) কে নামাযের ওয়অক্ত সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করেন। এতে আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন: যখন তোমার নিজের ছায়া এক মিছিল হয় তখন তুমি জোহরের নামায পড়, এবং যখন তোমার ছায়া দু’মিছিল হয় তখন আসরের নামাজ পড়………। (আশ-শায়বানী, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান, মুওয়াত্ত্বা (দেওবন্দ: আশরাফী বুক ডিপো, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন) পৃ. ৪২)
এর পর ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) বলেন: এটিই হচ্ছে আসরের নামাজের ওয়াক্তের ব্যাপারে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর মত।

‘আসরের নামাযের ওয়াক্তের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর উপর্যুক্ত মহ হলেও তাঁর এ মতের সাথে তাঁর কোন শিষ্যই ঐকমত্য পোষণ করেন নি। সে জন্য ইমাম মুহাম্মদ ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মত বর্ণনা করার পর বলেন:

“আমরা বলি: যখন ছায়া এক মিছিলের চেয়ে একটু বেশী হয় তখন পশ্চিম দিকে সূর্য ঢলা থেকে যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া এক মিছিলের চেয়ে একটু বেশী হয়, তখনই ‘আসরের ওয়াক্ত এসে যায়’। (তদেব; পৃ. ৪৪)

ইমাম মুহাম্মদের উক্ত কথার উপর টীকা লিখতে যেয়ে মাওলানা আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী বলেন:
“আসরের ওয়াক্ত আগমন সম্পর্কে ইমাম মুহাম্মদ যা বলেছেন সে-কথাটি ইমাম আবু ইউসুফ, হাসান, যুফার, ইমাম শাফিঈ, আহমদ, ত্বহাবী ও অন্যান্যরাও বলেছেন। এমনকি সাধারণ কিতাবাদির বর্ণনানুযায়ী এটি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর দ্বিতীয় মত হিসেবে তাঁর শিষ্য হাসান কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। আল-মাবসূত্ব গ্রন্থের বর্ণনানুযায়ী ইমাম মুহাম্মদও ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) থেকে এ মতটি বর্ণনা করেছেন। এ-কথাগুলো মুহাম্মদ ইবমীর আল-হাজ্জ আল-হালাবী কর্তৃক রচিত ‘মুনইয়াতুল মুসল্লী’ নামক গ্রন্থের ব্যাখ্যা ‘হিলয়াতুল মুহাল্লা’ নামক গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে। হানাফী মাযহাবের বিভিন্ন ফিকহের কিতাব সমূহেও এ মতের অগ্রগণ্যতার স্বীকৃতি পাওয়া যায়। যেমন ‘গারারাতুল আযকার’ নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে:
‘আসরের ওয়াক্তের ব্যাপারে ইমাম মুহাম্মদ ও অন্যান্যরা যা বলেছেন সেটাই গৃহীত হয়েছে। ‘আল-বুরহান’ নামক গ্রন্থে রয়েছে:

জীবরাঈল (আঃ) এর বর্ণনার কারণে এটাই সবচেয়ে বেশী সুস্পষ্ট কথা। কীরকি কর্তৃক লিখিত ‘ফয়েয’ নামক গ্রন্থে রয়েছে:

“এ মতের উপরেই বর্তমান সময়ের লোকজনের ‘আমল রয়েছে, এ মতের দ্বারাই ফতোয়া প্রদান করা হয়ে থাকে। অনুরূপ কথা ‘দুররে মুখতার’ গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে”
(আবুল হাসানাত আব্দু হাই, আত-তা’লীকুল মুমাজ্জদ আলা মুওয়াত্ত্বা মুহাম্মদ; পৃ. ৪৪। টীকা নং (১); শরহুল বেক্বায়াঃ পৃ. ৩০)
এ-সব উদ্বৃতির দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অতীতে হানাফী মাযহাবের গণ্যমান্য মনীষীগণ আছরের নামায দুই মিছিলের পরে আদায় না করে এক মিছিলের পরেই আদায় করতেন।

আবু হুরায়রা (রাঃ) এর উপর্যুক্ত হাদীস নিয়ে একটু চিন্তা করলে দেখা যায় যে, তিনি তাঁর এ বক্তব্যের দ্বারা মূলত জোহর বা ‘আসরের নামাযের প্রারম্ভিক সময়ের কথা বলতে চাননি, বরং এর দ্বারা তিনি নামাযের মুস্তাহাব ওয়াক্তের শেষ সময়সীমার বর্ণনা দিতে চেয়েছিলেন। সে-জন্য ইমাম ত্বাহবী হানাফী বলেন:
“আবু হুরায়রা (রাঃ) এর কথা বলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবরাঈল (আঃ) তাঁর ইমামতে দ্বিতীয় দিনে নামাযের মুস্তাহাব ওয়াক্তের সর্বশেষ সীমা পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য যে যে সময়ে নামায আদায় করেছিলেন, তা বর্ণনা করা। কেননা, বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, জিব্রাঈল (আঃ) দু’দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নামাযের ইমামত করেছিলেন……..তখনন তিনি প্রথম দিনে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলার পর জোহরের নামায পড়েছিলেন, এবং প্রত্যেক বস্তুর ছায়া এক মিছিল হওয়ার পর ‘আসরের নামায আদায় করেছিলেন…….অতঃপর দ্বিতীয় দিনে তিনি তাঁর সাথে প্রত্যেক বস্তুর ছায়া এক মিছিল পূর্ণ হওয়ার সময়ে জোহরের নামায আদায় করেছিলেন এবং প্রত্যেক বস্তুর ছায়া দু’মিছিল হওয়ার সময় ‘আসরের নামায আদায় করেছিলেন। …আবু হুরায়রা (রাঃ) তাঁর উক্ত কথার দ্বারা এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।” (তদেব; পৃ. ৪২। ৭ নং টীকা দ্রষ্টাব্য)

আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী তাঁর টীকাতে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতের সহায়ক দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যার একটি সুনানে আবী দাউদ ও ইবনে মা-জাঃতে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে ‘আলী ইবনে শায়বান (রাঃ) বলেছেন: আমরা রাসূল (সঃ) এর নিকট মদীনায় আগমন করলাম এবং তাঁকে ‘আসরের নামায উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকা পর্যন্ত বিলম্ব করতে দেখলাম”। অপরটি মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাঃতে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে জাবির (রাঃ) বলেন: রাসূল (সঃ) আমাদেরকে নিয়ে দু’মিছিল হওয়ার পর নামায আদায় করেন”। এর পর বলেন: ইমাম ‘আইনী তাঁর ‘উমদাতুল ক্বারী’ গ্রন্থে এ’দুনি হাদীস প্রসঙ্গে বলেছেন: এ দু’টি হাদীস দু’মিছিলের সময় নামায আদায় করা জায়েয হওয়ার কথা প্রমাণ করে, এ-সময়ের পূর্বে ‘আসরের ওয়াক্ত হয়না-এ-কথাটি প্রমাণ করে না।” (তদেব; টীকা নং ২)

এর পর লক্ষ্ণৌভী বলেন: “এ-ক্ষেত্রে ইনসাফের কথা হচ্ছে: এক মিছিলের হাদীস সমূহ সুস্পষ্ট ও সহীহ, এবং দু’ মিছিলের হাদীস সমূহ দু’ মিছিল না হলে ‘আসরের ওয়াক্ত হয়না এ-কথা বর্ণনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নয়। যারাই দুই মিছিলের কথা গ্রহণ করেছেন তাদের অধিকাংশই তাদের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিছু হাদীস বর্ণনা করে তাত্থেকে দু’ মিছিলের বিষয়টি ইজতেহাদ করে বের করেছেন, অথচ ইজতেহাদ করে বের করা বিষয় সুস্পষ্ট বিষয়ের সাথে সাংঘার্ষিক হতে পারে না। ‘বাহরুর রা-ইক্ব” এর লেখক এ-বিষয়ে পৃথক একটি গ্রন্থে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, তবে এর দ্বারা তিনি তার দাবী প্রমাণিত হতে পারে এমন কিছু উপস্থাপন করতে পারেন নি। (তদেব; পৃ. ৪৪)

দু’মিছিলের প্রারম্ভ থেকেই ‘আছরের নামাযের ওয়াক্ত এসে যাওয়ার কথা জিবরাঈল (আঃ) এর নামাযের মুস্তাহাব ওয়াক্ত শিক্ষাদান সংক্রান্ত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এবং ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর দ্বিতীয় মত ও হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট মনীষীদের মাতমতের দ্বারা তা স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও আমরা ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর প্রথম মতকেই ধরে রয়েছি। আর দু’মিছিল শেষে তৃতীয় মিছিল শুরু হওয়ার পূর্বে ‘আছরের নামাযের ওয়াক্ত হয়না-এ-কথা বলার কারণে আমরা সাধারণ ও আলেম নির্বিশেষে নিম্নে বর্ণিত অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছিঃ

০১) এতে আমরা বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বিষয়ের বিরোধিতা করছি।
০২) নিজ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ও মূল প্রচারকদের মতের অনুসরণ না করে মাযহাবের দ্বিতীয় পর্যায়ের কিছু আলেমদের অনুসরণ করছি।
০৩) জীবরাঈল (আঃ) কর্তৃক বর্ণিত “নামাযের ওয়াক্ত এ’ দুই ওয়াক্তের মাঝখানে” এ-কথার অনুসরণে রাসূলুল্লা (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ অধিকাংশ সময়ে দ্বিতীয় মিছিলের মাঝামাঝি সময়ে ‘আসরের নামায পড়ার কারণে আমরা তাঁদেরকে ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বে নামায আদায় করেছেন বলে অভিযুক্ত করছি।
০৪) বিশুদ্ধ হাদীসে আউয়াল ওয়াক্তে নামায আদায় করার অনেক গুরুত্ব ও ফযূলত থাকার কথা বর্ণিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা ‘আসরের নামায সর্বদা মুস্তাহাব ওয়াক্তের সর্বশেষ সময়ে আদায় করছি, যা আউয়াল ওয়াক্তে নামায আদায় করার ফজীলত সংক্রান্ত সহীহ হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত।
০৫) ‘আসরের ওয়াক্ত আগমনের ব্যাপারে নিজ মাযহাবের ফতোয়ার ও বিরোধিতা করছি।

কয়েকটি হাদীসঃ

০১) আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আসরের সালাত এমন সময় আদায় করতেন যখন সূর্য উঁচুতে উজ্জ্বল অবস্থায় থাকত। সালাতের পর লোকজন ‘আওয়ালী (মাদীনাহর পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম) পর্যন্ত যেত। অথচ সূর্য তখনো উঁচুতেই থাকত। (আবুদাউদ, মুসলিম, ইবনু মাজাহ, আহমাদ, নাসায়ী সকলেই লাইস সুত্রে)

০২) আয-যুহরী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আওয়ালীর দূরত্ব মাদীনাহ থেকে দুই অথবা নি মাইল। বর্ণনাকারী বলেন, সম্ভবত তিনি (যুহরী) চার মাইলের কথাও বলেছেন। (আবূদাউদ)

০৩) ‘উরওয়াহ (রহঃ) বলেন, “ইয়িশাহ (রাঃ) আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন রসূলুল্লাহ ‘আসরের সালাত এমন সময় আদায় করতেন যখন রোদ তার ঘরের মধ্যে থাকত এবং দেয়ালে রোদ প্রকাশ পাওযার র্পর্বেই এরূপ হত। (মুসলিম, বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা)

০৪) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূরূল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের সালাত এক রাক’আত আদায় করতে পারল সে (যেন ওয়াক্তের মধ্যেই পুরো) আসর সালাত পেল। আর যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের পূর্বে ফাজরের সালাতের এক রাক’আত আদায় করতে সক্ষম হল সে (যেন ওয়াক্তের মধ্যই পুরো ) ফাজর সালাত পেল। (বুখারী, মুসলিম)

আজকে একটা উদাহরণ দ্বারা পাঠক সমাজকে অবহিত করছি যে, আমরা নিজেদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত বলে পরিচয় দিতে হলে সকল ক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের অনুসরণ করা প্রয়োজন। যদি আমরা ফতোয়াকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে সহীহ হাদীসকে পরিত্যাগ করি, তাহলে মাযহাব নামের অন্ধ গোঁড়ামী থেকে আমরা কিছুতেই বের হতে পারব না। সেই সাথে আমরা আওয়াল ওয়াক্তে নামাজ পড়ার ‘উত্তম’ ফযীলত থেকে বঞ্চিত হব।

আশা করি পাঠকবৃন্দ আমার পরবর্তী ধারাবাহিক আলোচনায় সংঘ দিবেন।
আল্লাহ আমাদের আওয়াল ওয়াক্তে নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমীন….

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১,২০০ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ১.০০)

১৬ টি মন্তব্য

  1. মামুন, আপনি আসলে নিজেই যেটা বিশ্বাস করে বসে আছেন সেটা এতদিন আপনার বড় ভাইয়ের নামে বলে যাচ্ছিলেন ।

    মামুন

    @হাফিজ, আসসালামু আলাইকুম হাফিজ ভাই, আপনি ভুল বুঝছেন আমাকে। আমার নিজের কোন মন্তব্য বা লেখা এখানে নাই। শুধু কষ্ট করে টাইপ করেছি। সাকিব ভাই বাংলা টাইপ পারে না, আমি তার হয়েই বেশী লেখি। ওনার যুক্তি অত্যন্ত জোরাল বলে মনে হয়, তারপরেও মন মানে না। আপনাদের দিকে তাকিয়ে থাকি, যদি ভাল কোন উত্তর পাই তাহলে আমি ওনাকে দেখাতে পারি। কিন্তু আমার এখন মনে হয় সঠিক এবং যুক্তিসংগত কোন উত্তর আমাদের জানা নাই। আমরা একটা কথাই বলি, মাযহাবে যা আছে তাই মানতে হবে, অত যুক্তি তর্কের দরকার নাই। একথা আমি হাজারবার শুনেছি, এটা কোন উত্তর নয়। আমি দলিল দেখতে চাই সব কিছুর। সাকিব ভাই সব সময় আমার সাথেই থাকে, ওনার প্রচুর কালেকশন। সৌদি থেকে এসেই প্রায় ২০,০০০.০০ টাকার শুধু ধর্মীয় বই কিনেছেন। আমাকেও পড়তে দেন, আমি যুক্তিতে কুলাতে পারি না। তাই ওনার হয়ে লেখছি বলতে পারেন। অন্ধ বিশ্বাস করি আল্লাহকে না দেখে, অন্ধ বিশ্বাস করি হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) আমাদের শেষ নবী। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে এটা করা যুক্তিসংগত মনে হয় না।

    ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)- কে মানি দেখে ওনার একটা কথাকে প্রচন্ড গুরুত্ব দেই, “সহীহ হাদীসের বিপরীতে যদি আমার কোন ফতোয়া পাও তাহলে আমার ফতওয়াকে বাদ দিয়ে সহীহ হাদীসেক মানতে হবে, জেনে রেখ সহীহ হাদীসই হল আমার মাযহাব”

    আমি ধর্ম সম্পর্কে একজন অজ্ঞ ব্যক্তি, আমাকে পথ দেখাবেন হাফিজ ভাই ও সাকিব ভাই তাদের যুক্তি এবং সহীহ হাদীসের আলোকে। যদি দেখাযায় সহীহ হাদীসের সাথে মালেকী, শাফেয়ী বা হাম্বলী মাযহাবের মত মিলে যায় এবং হানাফী মাযহাবের সাথে না মেলে তা’হলে সেই আমলের ক্ষেত্রে অপর মাযহাবকে অনুসরণ করলে আমরা অবশ্যই মাযহাব মানার শতের্র ভিতরই থাকছি। কিছুতেই লা-মাযহাবী হব না। চার মাযহাবের একটাকে বেছেঁ নিলেই হল। আর যদি নিজেদের ভুলটা স্বীকার না করে, যেটাই করছি সেটাই ঠিক বলে বসে থাকি তাহলে নিজেদের কিছুতেই আহলে সুন্নাতওয়াল জামাত প্রমান করতে পারব না।

    আমি সাকিব ভাইয়ের কথাগুলো অত্যান্ত মনযোগ সহকারে শুনি, এর পনে যেটাকে যুক্তি সংগত মনে হয় তাহা টাইপ করে ব্লগে প্রকাশ করি। যদি কেহ তা খন্ডাতে পারে আমি তাহকে মেনে নেই, যদি খন্ডাতে না পারে সাকিব ভাইকেই অগ্রাধিকার দেই।

    সুতরাং আমাকে ভুল বুঝবেন না হাফিজ ভাই। আমি আপনাকে যোগ্য উত্তর দাতা হিসাবেই জানি, কিন্তু আপনিও যদি চুপ থাকেন ভাল লাগে না। আব্দুল হাফিজ পাঠানের বইটা কি পড়েছেন? কেমন মনে হচ্ছে?

    হাফিজ

    @মামুন ভাই, আমি তো কয়েকটি উত্তর দিলাম , আমি আব্দুল হাফিজ পাঠানের লেখা সম্বন্ধে কমেন্ট করেছি , আপনি কি দেখেন নি ?

    মামুন

    @হাফিজ,খেয়াল করিনি, কোথায় দিয়েছেন? আমি নেটে বেশ কিছুদিন লিখার কাজে ব্যস্ত থাকায় পড়তে পারছিনা।

    হাফিজ

    @মামুন ভাই,
    আবার এখানে লিখলাম ।

    জ্বী আব্দুল হাফিজ পাঠানের “নামাজে ভুল মাসলা মাসায়েলের তাত্বিক পর্যালোচনা” বইটি কিছুটা পড়েছি । বইটিতে প্রচুর ভুল আছে যেটা একমাত্র তারাই বুঝতে পারবেন যারা সঠিক মাসআলাটা জানে ।

    শুধুমাত্র একটি উল্লেখ করছি । আব্দুল হাফিজ পাঠান উল্লেখ করেছেন “কাবলাল জুমা” সম্বন্ধে কোনো হাদিসই নেই । এবং পরবর্তিতে আবার উল্লেখ করেছেন কয়েকটি হাদিস আছে তবে সেগুলো সহীহ নয় । তার মানে এখানে উনার স্ববিরোধীতা স্পষ্ট । একবার বলছেন কোনো হাদিস নেই আবার বলছেন সহীহ হাদিস নেই । যাহোক দুটোই ভুল । নীচের হাদিসটি দেখুন :

    আলী (রা:) বলেন “রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) জুমার পূর্বে এবং পরে চার রাকাআত নামাজ পড়তেন ” । ( তিবরানি, নসব আল রায়াহ , ইলাউস সুনান ) । হাদিসটি নির্ভরযোগ্য ।
    বিস্তারিত আরো হাদিস জানতে গেলে নীচরে লিংকটি দেখুন ।

    http://www.askimam.org/fatwa/fatwa.php?askid=65e553da70694579492adf5bac07650f

    লা মাজহাবিদের থেকে ইসলাম শেখার পরিবর্তে আগে মাজহাবীদের দলীলগুলো পড়ুন । তাহলে ইনশাল্লাহ এগুলো আপনার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে ।

    জবাব

    হাফিজ

    @মামুন ভাই ,
    আব্দুল হাফিজ পাঠানের বই এর আর কোনো টপিক্স আলোচনার আগে আমি শুধু কাবলাল জুমা নিয়ে আপনার ফয়সালা বা মতামত জানতে চাই । এই একটি বিষয় নিয়ে আগে চলুন আমরা ফয়সালা করি ।

    হাফিজ

    @মামুন ভাই, আপনি যদি নীচের বইগুলো পড়তেন তাহলে আমি বলার আগেই খুব সহজেই আপনি অনেক কিছু জানতে পারতেন ।

    ১। মাজহাব মানব কেনো – মাওলান তাকী ওসমানি

    ২। মাজহাব কি ও কেনো – মুফতি রফিকুল ইসলাম

    ৩। আহলে হাদিসদের আসল পরিচয় – মুফতি রফিকুল ইসলাম

    আপনি কি বাংলাদেশে থাকেন ? তাহলে বায়তুল মোকারমে এই বই এর সবগুলো পাবেন ।

    আমি ইনশাল্লাহ সিরিজ পোস্ট কয়েকদিনের মধ্যে লিখব মাজহাব নিয়ে । আশাকরি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর সেখানে পাবেন ।

    মালেক_০০১

    @হাফিজ, প্রথম দুটি বই আমি পড়েছি। বই দুটির আলোকে আমি বুঝেছি যে, একজন কোরআন-হাদিসে যথেষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন আলেমের মাজহাব অন্ধভাবে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। অপরদিকে যাদের যথেষ্ট এলেম নেই, তারা নফসের অনুসরণ যাতে না হয় সেজন্য যেকোন একজনকে অনুসরণ করবে।

    আমার একটি জানার বিষয় হল, যেসব বিষয়ে নফসের অনুসরণ হয় না, যেমনঃ নামাযের সময় বুকের উপরে বা নাভির নিচে হাত বাধা, এসব ক্ষেত্রে সাধারণ লোক যেকোনটাই মানলে হবে কি না?

    ধন্যবাদ।

    হাফিজ

    @মালেক_০০১ ভাই,

    শুনে খুশী হলাম আপনি উপরের বই দুটি পড়েছেন ।

    বই দুটির আলোকে আমি বুঝেছি যে, একজন কোরআন-হাদিসে যথেষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন আলেমের মাজহাব অন্ধভাবে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।

    বইটিতে ঠিক ওভাবে লেখা নেই, একজন মুজতাহিদের ক্ষেত্রে অন্য মাজহাব না অনুসরন করলেও চলবে । আর মুজতাহিদ হবার কি যোগ্যতা সেটা ওখানে ভালো করেই লেখা আছে । মুজতাহিদ হতে গেলে “কোরান” , উসুলে কোরান , হাদিস , উসুলে হাদিস , বালাগাত ইত্যাদি সহ আরো বহু বিষয় তাকে জানতে হবে । কোনো বিষয়ে ফতোয়া দেবার আগে সেই বিষয়ে যদি ৫ টি কোরানের আয়াত , ৫০০ টি হাদিস, সাহাবীদের আমল , কোন হাদিসের সাথে কোনটার কি সম্পর্ক বা কি বিরোধ এসব সব জানতে হবে । সুতরাং কোরান হাদিস যথেষ্ঠ জ্ঞান থাকা এক জিনিস আর মুজতাহিদ হবার মতো জ্ঞান থাকা ভিন্ন জিনিস ।

    আমার একটি জানার বিষয় হল, যেসব বিষয়ে নফসের অনুসরণ হয় না, যেমনঃ নামাযের সময় বুকের উপরে বা নাভির নিচে হাত বাধা, এসব ক্ষেত্রে সাধারণ লোক যেকোনটাই মানলে হবে কি না?

    সাহাবীদের আমল দ্বারা প্রমানিত ওনারা কোন বিষয় মতভেদ দেখা দিলে , যে যে বিষয় অনুসরন করতেন , সে সেটাই সবসময় অনুসরন করতেন । এমন নয় যে আজকে রফে ইয়াদাইন করছে , কালকে করছে না । সুতরাং এটা সাহাবীদের সুন্নত ।
    আর চার মাজহাব যেহেতু কোরান হাদিসের দলীল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সুতরাং যেকোন একটি অনুসরন করলেই সেটা কোরান হাদিসকে অনুসরন করাই হলো ।

    হাফিজ

    @মালেক_০০১ , ভাই ,

    আলেমের মাজহাব অন্ধভাবে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।

    মালেক ভাই, এখানে আমার একটি কথা আছে । ইদানিং মাঝে মাঝেই মাজহাবকে “অন্ধভাবে” অনুসরন করা বলা হয় । “অন্ধভাবে” র সংজ্ঞা হলো , যেটা ঠিক না সেটাও অনুসরন করা আবার যেটা ঠিক সেটাও অনুসরন করা । যেমন কাউকে তার পিতা বলল “নামাজ পড় না ” তখন সে এটা বলতে পারবে না যে আমি আমার পিতাকে অনুসরন করব , কেননা সে আমার পিতা । কিন্তু কেউ যদি জানেই যে তার পিতা তাকে সবসময় শরীয়ত অনুযায়ী ফয়সালা দিয়ে থাকে তখন কিন্তু সেটা অনুসরন করাকে কোনোমতেই অন্ধভাবে অনুসরন বলা যেতে পারে না ।

    হযরত ওমর (রা:) যখন কুফাতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) কে পাঠালেন তখন কুফাবাসীকে বলে পাঠালেন “তোমরা কোরান হাদিসের বা মাসআলার ব্যাপারে সবসময় ইবনে মাসউদ (রা:) কে অনুসরন করে চলবে” । যেহেতু ইবনে মাসউদ (রা:) এর বিশ্বস্হতা এবং যোগ্যতা নি:সন্দেহ ছিল তাই কেউ কিন্তু সবসময় খুজত না উনি ঠিক বলছেন নাকি ভুল বলছেন । এবং ওমর (রা:) কিন্তু এটাও বলেননি যে ইবনে মাসউদ (রা:) এর প্রতিটি কথাই তোমরা যাচাই বাছাই করে নিবে। কেননা এটা সবাই জানত যে উনার সে যোগ্যতা রয়েছে । এখন যে কুফাবাসী ইবনে মাসউদ (রা:) কে নির্দিদ্বায় অনুসরন করত , তাদের আপনি বলবেন “অন্ধভাবে অনুসরন” ?

    আমরা সবাই জানি , মাজহাবের ইমামরা কি তাকওয়া , কি ইলম , কি আমল , Sacrifice, Dedication সমস্ত দিক থেকে বহু বহু গুন আমাদের চেয়ে উত্তম এবং যোগ্যতা সম্পন্ন ছিলেন । বর্তমানে যারা এবিষয়ে ভুল ধরে তাদের না আছে আমল , না আছে ইলম , না আছে তাকওয়া । তাদেরকে আমি যদি জিজ্ঞেস করি “মাগরেবের নামাজ যদি আমি এক ওয়াক্ত মিস করি তাহলে কিভাবে পড়ব” এই ফতোয়াটা তারা দিতে কয়েক মাস লাগিয়ে দিবে । আমি যদি বলি হজ্ব কিভাবে করব তার সহীহ হাদিসের আলোকে একটি সংক্ষিপ্ত গাইডলাইন দিন , তাহলে তারা সবাই চেষ্টা করেও পারবে না । তাদের আছে শুধু কয়েকটি বই নামাজ নিয়ে , যার একটির সাথে আর একটির মিল নেই ।
    তাহলে তাদের বই এর কোনটি আপনি অনুসরন করবেন ?

    মামুন

    @হাফিজ, ভাই আমি আসলে দলাদলি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার টেনশন সহীহ আর যঈফ, সবল আর দুবর্ল হাদীস নিয়ে।
    হাদীসের বিপরীতে ফতোয়াগুলো নিয়ে। মনে করেন কিছু কিছু ফতোয়া সহীহ হাদীসের বিপক্ষে যায় আবার কিছু কিছু মিলে যায়। আবার যেগুলো সহীহ হাদীসের বিপক্ষে যায় তাহা আবার হাম্বলী বা শাফেঈ মাযহাবের সাথে মিলে যায়। এখন প্রশ্ন হলো সহীহ হাদীসের সাথে মিল রেখে আমি যদি মুক্ত তাকলীদ করি অর্থাৎ অন্য মাযহাবকে অনুসরণ করি তাহলে কি গোনাহগার হব?

    হাফিজ

    @মামুন , আমরা যেটাকে মনে করছি সহীহ হাদিসের বিপক্ষে , সেটা কিভাবে আমরা শিওর হলাম যে সহীহ হাদিসের বিপক্ষে । এটাই তো আমাদের মারাত্নক ভুল । যেমন একটি উদাহরন দিচ্ছি যেটা অনেকে করে থাকে :

    বুখারী শরীফের একটি হাদিস দেখল যেটাতে একটি আমলের বিষয়ে বলা আছে , অথচ হানাফী মাজহাবে ঠিক তার বিপরীত । তখনই সে ধরে ন্যায় যে এটা সহীহ হাদিসের বিপরীত । অথচা এখানেই সে ভুল করলো । কেননা এই হাদিস বুখারী শরীফে না থাকতে পারে , কিন্তু পৃথিবীর আরো অনেক হাদিসের কিতাব আছে যেটাতে অবশ্যই আছে। এবং সেই দলীলটা মাজহাবের ইমামদের কাছে ছিল ।

    শুধুমাত্র একটি হাদিস শরীফে দেখে কেউ বলতে পারবে না যে , এর বিপরীতে অন্য আমল সম্বন্ধে কোনো হাদিস নেই । যেমন ধরুন “রফে ইয়াদাইন” । বুখরী শরীফে যেমন এর পক্ষের হাদিস আছে আবার এটা না করার যে প্রমান সেটার হাদিস শরীফ আপনি পাবেন “তিরমিজী” শরীফ সহ আরো অন্যান্য হাদিস শরীফের কিতাবে। কেউ যদি শুধু “বোখারী শরীফ” ঘেটে বলে এর বিপরীতটা হাদিস সম্মত না , তাহলে নির্দিদ্বায় বলা যায় সে একটা কবীরা গোনাহ করল । কেননা দুটো আমলই রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) করেছেন এবং দুটোর পক্ষেই হাদিস শরীফ আছে ।

    কোনো একটি বিষয়ে “ফতোয়া” দেবার আগে এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত পৃথিবীর সমস্ত হাদিস শরীফ সম্বন্ধে একজনের জানতে হবে । তারপর সে বলতে পারে এ বিষয়ে সঠিক ফয়সালা কি । সেটা কি বর্তমানের প্রচলিত “আহলে হাদিস” বা “লা মাজহাবী” দের আছে ?
    তারা কি পৃথিবীর সমস্ত হাদিস যাচাই বাছাই করেছে ? তাহলে কিভাবে তারা হানাফী বা যেকোন মাজহাবের কোনো একটি আমলে দেখেই কমেন্ট করে যে এটা সহীহ হাদিস বিরুদ্ধ ?

    সরাসরি কোনো হাদিস শরীফ দেখে কোনো কমেন্ট করা বা সিদ্ধান্তে আসা … এই পদ্ধতিই তো ভুল । এটা আমাদের সকলের ভালো করে বুঝতে হবে ।

    আবার ধরুন কোনো একটি আমল যেটা রসুলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) প্রথমে করেছেন , কিন্তু শেষের দিকে করেন নি । প্রথম আমলটা হয়ত মনসুখ হয়ে গেছে । এখন মাজহাবের ইমামরা সবদিক বিচার করে শেষের আমলটাকে প্রাধান্য দিল । এখন আপনি হয়তো হাদিস শরীফের কিতাব পড়ে প্রথম দিককার যে আমল সেই হাদিস পেলেন । আপনি কিন্তু জানলেন না যে এটা শেষের দিকে রসুলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) করেনি , এবং এর বিপরীতে অন্য আমল করেছেন । এখন আপনি বলেন এই একটি হাদিস শরীফ পড়ে সাথে সাথে আপনি যদি ফতোয়া দ্যান মাজহাবের যে আমল প্রচলিত আছে সেটা সহীহ হাদিস বিরুদ্ধ , তাহলে কি সেটা ঠিক ? ???

    মাজহাবের মুজতাহিদরা শুধু তাই না , তার সমস্ত হাদিস সম্বন্ধে জানতে, গবেষনা করতেন , কোনো বিষয়ে যদি পরস্পরবিরোধী সহীহ হাদিস থাকত , তাহলে তারা সেটাও গবেষনা করে দেখতেন কেনো এটা পরস্পরবিরোধী । এমনকি তারা তখন সাহাবীদের আমলও দেখতেন । এমনও তারা দেখতেন যে দুই রকম আমলই সাহাবীদের মধ্যে প্রচলিত আছেন । তার মানে বোঝা যায় রসুলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) দুই আমলই করেছেন ।

    তাই সংক্ষেপে যেটা বলা যায় “কোনো একটি হাদিস শরীফ পড়ে সাথে সাথেই কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না , বা ফতোয়া দেয়া যাবে না” ।

  2. @হাফিজ ভাই, আপনার সাথে সহমত। ধন্যবাদ আপনাকে।
    আল্লাহ আমাদের কোরআন-সুন্নাহর আলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার তৌফিক দান করুন । আমীন।

  3. আসসালামু আলাইকুম,
    হাফিজ ভাই, সৌদি আরবে নাকি তিনটা সোয়া তিনটার মধ্যে আসরের নামাজ পড়ে ফেলে। তাহলে ঠিক কোনটা যে অনুসরণ করব বুঝতেছি না। অন্য তিন মাযহাবও নাকি সকাল সকাল আসরের নামাজ আদায় করে ফেলে।

    আল্লাহই ভালো জানেন, এ ব্যপারে আমাদের ব্যাখ্যা কি একটু জানাবেন? এক মিছিল এবং দু’ই মিছিল বিষয়টা একটু পরিষ্কার হতে চাই।
    একটার মধ্যে আরেকটা ঢুকালে জগা খিচুড়ি হবে। আগে এইটার সমাধান করি ।

    Areef

    @মামুন ভাই,
    “সৌদি আরবে নাকি তিনটা সোয়া তিনটার মধ্যে আসরের নামাজ পড়ে ফেলে। তাহলে ঠিক কোনটা যে অনুসরণ করব বুঝতেছি না। অন্য তিন মাযহাবও নাকি সকাল সকাল আসরের নামাজ আদায় করে ফেলে।”
    আমার কাছে এর একটা উত্তর আছে। আসরের নামাজের ওয়াক্ত শুরুর ব্যপারে চার মাজহাবে মতভেদ থাকলেও শেষ হওয়ার ব্যপারে কিন্তু কোন মতভেদ নাই; অর্থাৎ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আসরের ওয়াক্ত থাকে। ধরুন হানাফি মাজহাবে আসরের ওয়াক্ত শুরু হয় ৫টায় আর অন্য তিন মাজহাবে ৩টায় কিন্তু সকল মাজহাবেই শেষ হয় ৬:৩০টায়। সুতরাং আপনি যদি ৫টা থেকে ৬:৩০টার মধ্যে আসরের নামাজ পড়েন তাহলে সকল মাজহাব অনুযায়ীই আপনার নামাজ শুদ্ধ হবে।
    একইভাবে ধরুন জোহরের নামাজ সকল মাজহাবে শুরু হয় ১২টায় কিন্তু হানাফি মাজহাবে শেষ হয় ৫টায় আর অন্য তিন মাজহাবে শেষ হয় ৩টায়। সুতরাং আপনি যদি ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে জোহরের নামাজ পড়েন তাহলে সকল মাজহাব অনুযায়ীই আপনার নামাজ শুদ্ধ হবে।
    লক্ষ্য করুন, হানাফি মাজহাবের অনুসারীরা এইক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে।
    আল্লাহ পাক আমাদের সকলের নেক মনোবাসনাকে কবুল করে নেন।

    দ্য মুসলিম

    @Areef,

    আমিন।