লগইন রেজিস্ট্রেশন

শাবান রমযানের প্রস্তুতিপর্ব

লিখেছেন: ' আবু আব্দুল্লাহ' @ সোমবার, অগাষ্ট ২, ২০১০ (৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ)

শাবান শব্দটি আরবি শাব শব্দ থেকে উৎপন্ন। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যার অর্থ দল, গোত্র, বংশ, জাতি, শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত ইত্যাদি। শাবানকে এ নামে নামকরণের কারণ সম্পর্কে ইবনু হাজর আসকালানি উল্লেখ করেন, যেহেতু জাহেলি যুগে আরবরা এ মাসে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়ে পানি অন্বেষণ করত অথবা নিষিদ্ধ রজব মাস শেষ হওয়ার পর এ মাসে তারা যুদ্ধের ভয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিত এ জন্য একে শাবান বলা হয়। (ফতহুল বারি) আরো বলা হয়, যেহেতু এ মাসটি দু’টি সম্মানিত ‘রজব’ ও ‘রমযান’ মাসের মধ্যবর্তী সময়ে উদিত হয় সেহেতু একে শাবান বলা হয়।
বছরের সেরা মাস পবিত্র রমযানের আগের মাস ও রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার মাস হিসেবে শাবানের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবি, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈরা বিভিন্ন আমলে সালেহের মাধ্যমে এ মাসকে বরণ করে নিতেন। এটি মূলত পবিত্র রমযানে অধিক হারে কল্যাণকর্ম করার জন্য দৈহিক, মানসিক ও বস্তুতান্ত্রিক প্রস্তুতি গ্রহণের মাস। এ প্রস্তুতির ধরন বিভিন্ন হতে পারে।
প্রথমত, বেশি বেশি রোযা রাখা : আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিতন্ধ তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখতেন এমনকি আমরা বলতাম, মনে হয় তিনি রোযা থেকে বিরত হবেন না; তিনি রোযা থেকে বিরতি দিতেন এমনকি আমরা বলতাম তিনি আর রোযা রাখবেন না। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনো রমযান ছাড়া পুরো মাস রোযা রাখতে দেখিনি, আর শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে তাকে অধিক হারে রোযা রাখতে দেখিনি।’ (বুখারি ও মুসলিম)
ইবনু হাজের রঃ বলেন, এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য মাসের চেয়ে এ মাসেই অধিক হারে নফল রোযা করতেন; এ মাসের বেশির ভাগ দিন তিনি রোযাদার হিসেবে অতিবাহিত করতেন। আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিতন্ধ তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নফল রোযা রাখার জন্য অধিকতর প্রিয় মাস ছিল শাবান এবং তা রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া। (আবু দাউদ; আল্লামা আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)
উসামা বিন জায়েদ রাঃ থেকে বর্ণিতন্ধ তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রোযা রাখতেন তখন বিরামহীন রোযা রাখতেন, এমনকি বলা হতোন্ধ তিনি মনে হয় আর রোযা থেকে বিরতি নেবেন না। আবার যখন বিরতি দিতেন তখন সপ্তাহের দুই দিন ছাড়া রোযা রাখার কোনো সম্ভাবনা দেখা যেত না। শাবান মাসে যত রোযা রাখতেন অন্য কোনো মাসে এত রোযা রাখতেন না। এ জন্য আমি জিজ্ঞাস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যখন রোযা রাখা শুরু করেন তখন বিরতি দেয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না, আর যদি বিরতি দেয়া শুরু করেন তবে সপ্তাহে দুই দিন ছাড়া অন্য কোনো রোযা রাখার সম্ভাবনা থাকে না। তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘কোন দুই দিন?’ আমি বললাম, সোমবার ও বৃহ¯পতিবার। তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘ওই দুই দিন মানুষের আমল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে উপস্থাপিত হয়; আর আমি চাই আমার আমল এমন অবস্থায় উপস্থাপিত হোক, আমি একজন রোযাদার।’ আমি বললাম, শাবান মাসে আপনি যে পরিমাণ রোযা রাখেন অন্য কোনো মাসে আপনাকে এত রোযা রাখতে দেখি না! তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘রজব ও রমযান মাসের মধ্যবর্তী ওই শাবান মাস স¤পর্কে লোকজন গাফেল থাকে অথচ ওই মাসে মানুষের আমল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে উপস্থাপন করা হয়, আর আমি এটাই ভালোবাসি, আমার আমল এমন অবস্থায় উপস্থাপিত হোক যখন আমি রোযাদার।’ (আহমদ, নাসায়ি)
শাবান মাসের এক দিনের রোযা অন্য মাসের দুই দিনের রোযার সমান। ইমরান বিন হুসাইন রাঃ থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বা অন্য কাউকে বলেছেন, ‘তুমি কি শাবানের গোপনভাগে (শেষে) রোযা রেখেছ? তিনি বললেন, না; তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যখন তুমি (রমযানের রোযা থেকে) ইফতার করবে তখন দুই দিন রোযা রেখে দেবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। অন্য বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবানের শেষ দিকে (কোনো কোনো বর্ণনায় মধ্যভাগ থেকে শেষের দিনগুলো) রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। আলিমরা উভয় বর্ণনার সমন্বয় সাধন করেছেন এভাবে ১. রমযান শুরু হয়ে গেছে এমন সন্দেহে শাবানের শেষ দু’দিনে রোযা রাখা নিষিদ্ধ। ২. মানত, কাজা বা কাফফারার রোযা রাখা বেশির ভাগ ওলামায়ে কিরামের মতে বৈধ। ৩. যদি কেউ অভ্যাসগত কারণে মাসের শেষ দু’দিন রোযা রাখে তবে সেটি বৈধ।
শাবানের রোযার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আধুনিক বিজ্ঞান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক শাবান মাসে অধিক পরিমাণ রোযা রাখার নির্দেশনা প্রদানের মূল রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রোযার প্রথম দিনগুলোতে আকশ্মিক খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার ফলে তার শরীরে চর্বি, প্রোটিন জাতীয় রিজার্ভ ধ্বংস করতে পারে, যার ফলে শরীর তার উচ্ছিষ্ট বের করে দেয়ার আগে এটি রক্তে (এড্রিনালিন হরমোন) বায়ুর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলত রোযাদার তাৎক্ষণিকভাবে মাথা ধরা, ক্লান্তি-অবসন্নতা, খিটখিটে মেজাজ, হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, গালমন্দ করা ইত্যাদি বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্ত হতে পারেন। এ অবস্থা তাকে কোনো কোনো সময় রোযা ছেড়ে দেয়ার উপক্রম করে ফেলে। কিন্ত– যদি রক্তে হরমনের অবস্থান স্বাভাবিক থাকে তখন রোযাদার এ সব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকে। এ জন্য শাবানের রোযা অনুশীলন হিসেবে কাজ করে। যারা শাবানে কয়েকটি রোযা রাখে তাদের জন্য রমযানের রোযাগুলো বিশেষ করে প্রথমপর্বের রোযাগুলো সহজ হয়ে যায়। আল্লামা ইবনু রজবসহ বিভিন্ন ওলামায়ে কিরাম তাই শাবানের রোযাকে রমযানের রোযার প্রশিক্ষণ হিসেবে নামকরণ করেছেন।
দ্বিতীয়ত, কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী পুস্তক অধ্যয়নের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সালামাহ বিন কুহাইল শাবানকে বলতেন ক্বারিদের মাস। হাবিব বিন আবি সাবিত বলতেন, এটা ক্বারিদের মাস। আমর বিন কায়েস আল মালাবি শাবান মাস আগমন করার সাথে সাথে তার ব্যবসায়িক পণ্যশালাগুলো বন্ধ করে দিতেন এবং সারা দিন কুরআন তিলাওয়াতে নিয়োজিত হতেন।
তৃতীয়ত, বেশি বেশি ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা সহিহ হাদিসে আবু মুসা আশয়ারি রাঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ শাবানের মধ্যবর্তী রাতে তার সৃষ্টির মুখোমুখী হন এবং মোশরেক (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারী) ও ঝগড়া-ফাসাদকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনু মাজাহ, তিবরানি, ইবনু হাব্বান; আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।) অতএব নিজেকে এই দলভুক্ত করার জন্য বেশি বেশি ইস্তেগফার করা একান্ত কর্তব্য।
চতুর্থ, দরুদ ও জিকর এই শাবান মাসেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ ও সালাম আদায় ওয়াজিব হয়। এ জন্য এ মাসে বেশি বেশি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা প্রয়োজন, যাতে করে আমরা তার শাফায়াতের হকদার হতে পারি, ‘কিয়ামতের দিন আমার (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাথে থাকার সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়বে।” (তিরমিজি)
এ ছাড়া এ মাসে দৈনন্দিন দোয়ার সাথে সাথে বেশি বেশি ওই দোয়া পাঠ করা যেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজব ও শাবান ওয়া বাল্লিগনা রমযানা।’ (হে আল্লাহ! রজব ও শাবান আমাদের জন্য বরকতময় করো এবং রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দাও।)
অতএব আমাদের উচিত এ মাসকে পবিত্র রমযানের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে গ্রহণ করে এ মাসে ব্যক্তিগত আমল বৃদ্ধি করা, যাতে রমযানের মূল্যবান সময়গুলো অপচয় না হয়। এ জন্য আবু বকর বলখি রহঃ বলতেন, ‘রজব বীজ বপনের মাস, শাবান পানি সেচের মাস এবং রমযান ফসল ঘরে তোলার মাস।’ তিনি আরো বলতেন, ‘রজব, শাবান ও রমযানের দৃষ্টান্ত যথাক্রমে বাতাস, মেঘ ও বৃষ্টির মতো। অতএব যে ব্যক্তি রজবে বীজ বপন করল না, শাবানে ফসলে পানি সেচ করল না সে কী করে রমযানে ফসল ঘরে তোলার চিন্তা করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর আহলের ওপর আল্লাহর অসীম রহমত বর্ষিত হোক।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৩৯৬ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)

১ টি মন্তব্য

  1. চতুর্থ, দরুদ ও জিকর এই শাবান মাসেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ ও সালাম আদায় ওয়াজিব হয়। এ জন্য এ মাসে বেশি বেশি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা প্রয়োজন, যাতে করে আমরা তার শাফায়াতের হকদার হতে পারি, ‘কিয়ামতের দিন আমার (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাথে থাকার সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়বে।” (তিরমিজি)

    এই হাদিস শরীফের মাধ্যমে আমরা দরূদ শরীফের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি । জাজাকাল্লাহ ।