লগইন রেজিস্ট্রেশন

শবে বরাত ও কিছু জরুরী কথা (প্রথম কিস্তি)

লিখেছেন: ' মাসরুর হাসান' @ রবিবার, জুলাই ১৭, ২০১১ (৩:২৭ অপরাহ্ণ)

মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান দা:বা: -এর বয়ান
(গুলশান সেন্ট্রাল জামে মসজিদে প্রদত্ত বয়ান, তাং ১৪ শা’বান ১৪১৯ হি.)

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্য সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আর আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাক। তোমর যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা সম্যক অবগত।
وقال رسول الله صلي الله عليه وسلم تركت فيكم امرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة رسوله
অর্থ ঃ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আমি তোমাদের মাঝে কুরআন এবং সুন্নাহ-এই দুটি জিনিস রেখে গেলাম, যতদিন তা আকড়ে ধরে থাকবে পথভ্রষ্ট হবে না।
আমি কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি আর একটি হাদীস পড়েছি। উদ্দেশ্য, ব্যাখ্যা করা নয়, কেবল বরকত হাসিল করা। কারণ পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের কারণে মজলিসে আল্লাহপাকের রহমত নাযিল হয় এবং আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন হয়। আর হাদীসের বরকতে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রূহানী ও নূরানী সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
শ্ববে ক্বদরে প্রথম পবিত্র কুরআন নাযিল হয়
কোন কোন লোক বলে থাকে যে, শবে বরাতে সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। পবিত্র কুরআনের এক স্থানে ‘লাইলাতুম মুবারাকাতুন’ দ্বারা অনেকে শবে বরাত উদ্দেশ্য করে থাকেন। আসলে এ মতটি সঠিক নয়, বরং পবিত্র কুরআন সর্বপ্রথম লাইলাতুল ক্বদরে পবিত্র রমযান মাসে নাযিল হয়েছে। সূরায়ে ক্বদরে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা বিদ্যমান রয়েছে।
শবে বরাত আমলের রাত
যদিও এ রাতে পবিত্র কুরআন নাযিল হয় নাই, তথাপিও এই রাতের বরকতের ব্যাপারে কোনরুপ সন্দেহের অবকাশ নেই। হাদীসে শবে বরাতের বিশেষ ফয়েজ ও বরকতের কথা উল্লেখ রয়েছে। এই বরকত হাসিল হয় আমলের মাধ্যমে। তাই এটি হল আমলের রাত, ইবাদতের রাত।
শবে বরাতে বর্জনীয় কাজ
অতীব পরিতাপের বিষয় যে, আমরা জযবার কারণে অনেক সময় উপকারের নিয়তে অপকার করে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হই। অনেক সময় শরীয়ত এবং সুন্নতের সীমারেখা অতিক্রম করে বসি। শবে বরাতের বেলায়ও তা প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন-
(ক) শবে বরাতের রাতে মসজিদে-মসজিদে, মহল্লায়-মহল্লায় ওয়াজ-নসীহতের নামে অনুষ্ঠান করা হয় এবং অসংখ্য লোকের সমাগম হয়। ওয়াজ করা এবং শোনার মাধ্যমে সময় শেষ হয়ে যায় ফলে বক্তা এবং শ্রোতা উভয়েই ইবাদত, রিয়াজত, নামায ও তেলাওয়াত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
(খ) বাসা-বাড়ীতে মহিলাগণ শবে বরাতের রুটি হালুয়া তৈরী এবং বণ্টনের মধ্যে সময় বিনষ্ট করে, ফলে তারাও বঞ্চিত হয়।
(গ) আর আলোকহসয্যা, আতশবাজী, বোমা, পটকা তো এখন শবে বরাতের আলামতে পরিণত হয়ে গেছে। এসবের কারণে এখন শান্তিমত ইবাদত করাও কঠিন। অর্থ ও সময় বিনষ্টের গোনাহ তো আছেই।
(ঘ) বাসা-বাড়ীর মুরব্বীগণ বাদ এশা থেকে ফজর পর্যন্ত মসজিদে শবে বরাত উদযাপন করে আর ঐ দিকে পরিবারের লোকেরা সিনেমা, ভিসিআর, নাচ, গান, বাদ্য-যন্ত্র এবং গোনাহে কবীরায় লিপ্ত থাকে।
(ঙ) রেডিও, টেলিভিশন এবং সিনেমা হলগুলোতে সেদিন অধিক আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম করে শবে বরাতের পবিত্র দিনে যুবক-যুবতীদেরকে বে-দ্বীনী কাজে মাতাল করে তোলে। ফলে বরকতের স্থলে এই রাত আমাদের জন্য আযাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ মুসলমানদেরকে ক্ষমা করুন এবং ঈমানী নূরে নূরান্বিত করুন!
اللهم اكرمنابنور الفهم واحفظنا من ظلمات الوهم
ইমামদের জন্য মুসল্লীদের দোয়া করা প্রয়োজন
আমি আপনাদের ইমাম, সমাজের লোকদেরকে ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকি। আমার কথাবার্তা ও মাসআলা-মাসায়েলের উপর আপনি আস্থাশীল হয়ে বিশ্বাস করেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করে থাকেন সাথে সাথে আরো দশ ভাইকে আমলের দাওয়াত দিয়ে থাকেন। যদি গাড়ীর চালক সতর্ক এবং উপযুক্ত না হয়, তাহলে ক্ষতি কেবল এতটুকুই হবে না যে, তার দ্বারা গন্তব্য স্থানে পৌঁছা কঠিন হবে, বরং এক্সিডেন্ট করে চরম ধ্বংসের সম্ভাবনাই বেশি। তেমনিভাবে ইমাম যদি আল্লাহর নিকট প্রিয় এবং মকবূল বান্দা না হয়, তাহলে তার দ্বারা মুসল্লীগণ তাদের গন্তব্য স্থলে পৌঁছবে কী করে? এ জন্যই মুসল্লীয়ানে কেরামগণের দায়িত্ব হল ইমামের জন্য বরং সকল ওলামায়ে কেরামের জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দোয়া করা। কিছু না পারলে অন্তত দুই রাকাত নফল নামায আদায় করে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করা।
ইমামের দায়িত্ব ও গুরুত্ব
বাস্তবে নামাযের ইমামতি অত্যন্ত জটিল দায়িত্ব। নামাযকে হাদীসে দ্বীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে। যে স্তম্ভের উপর দীন প্রতিষ্ঠিত। ঈমান এবং কুফরের মাঝে পার্থক্য স্থাপনকারী হলো নামায। হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহপাকের আদালতে সর্বপ্রথম নামাযেরই হিসাব হবে। প্রথম হিসাবেই যদি পার পাওয়া যায় তবে অন্যান্য হিসাব কঠিন হবে না। সুতরাং এ থেকেই ইমামতির গুরুত্বের বিষয়টি পরিষ্কার অনুধাবন করা যায়। ক্বেরাত শুদ্ধ-অশুদ্ধ হওয়ার সব দায়-দায়িত্বও ইমামেরই উপর। হাশরের ময়দানে আপনাদেরকে নামাযের কথা জিজ্ঞেস করা হলে ইমামের হাওয়ালা দেওয়ার সুযোগ আছে। আর ইমামকে ডাকা হবে এবং অসংখ্য নামাযের হিসাব চাওয়া হবে। মনে করুন, যে ইমামের পিছনে তিন শত মুসল্লী নামায আদায় করে এর সাথে জুমআ এবং ঈদের নামাযসমূহ ধরে নিন, যদি ঐ ইমাম দশ বছর ইমামতি করে থাকে, তাহলে তাকে কী পরিমাণ নামাযের হিসাব দিতে হবে? আপনার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, পরিবার-পরিজন যাদের জন্য অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন, যারা আপনার রক্তমাখা শ্রমের ধন-ভাণ্ডারের অধিকারী, তারাও সেদিন আপনার এক ওয়াক্ত নামাযের দায়িত্ব নিবে না। সকল দায়িত্ব বর্তাবে ইমামের উপর। সুতরাং ইমাম আপনার একান্ত মুহসিন। আর কিছু না হলে তার জন্য দোয়া করা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়।
ইমামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
অতীব দুঃখের বিষয় যে, আজকে ইমামের মতামত মূল্যায়ন করা হয় না, ইমামকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয় না, অথচ ইমাম হলেন বাদশাহ। তাকে আজ প্রজা বানানো হয়েছে। ইমাম হলেন মনিব, তাকে আজ গোলাম বানানো হয়েছে। ইমাম সকলকে ্উপদেশ দিবেন, পরিচালনা করবেন, অথচ আজকে ইমামকে আদেশ দেওয়া হয়, পরিচালনা করা হয়। ইমাম বর্তমানে নির্দেশের গোলাম। তবে এর কারণও রয়েছে। এর বিশেষ কারণ দুইটি ঃ
(ক) ইমামতির মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে মসজিদ কমিটি ও নামাযীগণ যথাযথভাবে অবগত নয় এবং অবগতির মন-মানিসকতাও তাদের মাঝে নেই।
(খ) মুসল্লী এবং কর্তৃপক্ষের হকসমূহ আদায়ে ইমামের চরম উদাসীনতা এবং গাফলতী। মোটকথা, উভয় পক্ষই একে অপরের অধিকার আদায়ে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে থাকে। এ কারণেই কারো প্রতি কারো সদিচ্ছা বা সদাচরণ প্রকাশ পায় না।
মুসল্লীদের দায়িত্ব হচ্ছে -
(ক) ইমামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, তার প্রতি শত্র“তা পোষণ না করা।
(খ) ইমামের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা করা। ইমামের ডিউটি হল অত্যন্ত কঠিন ডিউটি। তাই উত্তম হল ইমামের জন্য সুন্দর বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।
(গ) সচ্ছলতার সাথে চলতে পারে-এই পরিমাণ অযীফা (বেতন) প্রদান করা। কিন্তু এ সকল ব্যাপারে তথা ইমামের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা এবং কৃপণতার আশ্রয় নেওয়া হয়, ফলে ইমাম সাহেব বাধ্য হয়ে উপার্জনের এমন এমন পদক্ষেপ নেন, যার পরিণাম অনেক সময় লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়। ইমাম হয়ে মুসল্লীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরে, টিউশনী করে, যেখানে পর্দারও বালাই থাকে না। এই বাসা-সেই বাসায় খাওয়ার জন্য যাতায়াত করে, তাবীয-তদবীরের বাজার জমায় ইত্যাদি। এসব কিছুর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হলেন মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীলগণ।
মুসল্লীগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
ইমামের দায়িত্ব হচ্ছে-
(ক) কর্তৃপক্ষ এবং মুসল্লীগণের প্রতি বিনয়ী এবং শিষ্টাচারমূলক আচরণ করা।
(খ) ইমামতের দায়িত্ব পালনে কর্তব্যপরায়ণ হওয়া।
(গ) মুসল্লীগণের আযান, ইক্বামত, সূরা, ক্বেরাত এবং মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষা দেওয়া এবং মশকে আমলী করানো। তাদেরকে দ্বীনী কথাবার্তা শোনানো।
(ঘ) যারা বে-নামাযী, তাদের পিছনে মেহনত করা, তাদেরকে আদর্শ মুসল্লী হিসেবে গড়ে তোলা।
(ঙ) নিজের আমলী যিন্দেগীর পরিশুদ্ধির প্রতি গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখা।
কিন্তু এ সকল বিষয়ে ইমামদেরকে অত্যন্ত উদাসীন দেখা যায়। হাঁটে-বাজারে ঘোরা-ফেরা করা, দোকানে বসে গল্পগুজবে লিপ্ত হওয়া, বাসায়-বাসায় যাতায়াত, দাওয়াত-খতমের পিছনেই সময় কাটানো ইত্যাদি কাজেই বেশি মনোযোগী দেখা যায়। অনেকের মধ্যে সুন্নতের অবমূল্যায়ন দেখা যায়। মাথার চুল দাড়ী এবং লেবাস-পোশাক সুন্নতের খেলাফ। চাল-চলনে না আছে ভদ্রতা না আছে আখলাক-চরিত্র। এসব কারণে মুসল্লীদের ইমামের প্রতি না আছে শ্রদ্ধা-ভক্তি না আছে মুহাব্বত এবং দরদ।
একে অপরের জন্য দোয়া ঃ
অথচ উভয়ই উভয় থেকে যেমন দুনিয়াবী উপকার অর্জন করতে পারে তেমনি আখেরাতের ব্যাপারেও লাভবান হতে পারে। পরস্পর একজন আরেক জনের নাজাত ও হেদায়েতের ওসীলা হতে পারে। হাশরের ময়দানে কে কার ওসীলায় নাজাতের অধিকারী হবে তা কে জানে! হতে পারে ইমাম ধরা পড়ে যাবে অত:পর মুসল্লীদের বরকতে নাজাত পেয়ে যাবে। আবার হতে পারে ইমামের ওসীলায় মুসল্লীগণ নাজাত পেয়ে যাবে। যদি আপনারা সকলে মিলে আমার জন্য দোয়া করেন, তাহলে মহান আল্লাহ পাকের রহম ও করমে আমার নাজাতের পথ অবশ্যই সুগম হতে পারে। এই আশা ও কামনা নিয়েই আপনাদের সামনে বয়ান করছি। আমি অত্যন্ত গোনাহগার পাপী, আপনাদের দোয়া আমার জন্য বড় ওসীলা।
আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ঃ
তবে একটি কথা! শবে বরাতের এই ফযীলতের মুহূর্তে আমি বলতে চাই যে, আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া কবূলের জন্য কিছু আদব এবং শর্তাবলী রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম দুটি -
(ক) প্রথমটি হচ্ছে, আল্লাহপাকের উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকা যে, তিনি রাহমান এবং রহীম। তিনি কারীম এবং গাফফার। তিনি আমার সকল গুনাহ ক্ষমা করতে সক্ষম। তবে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ-অনুশোচনার সাথে অন্তরের ভয় থাকা, তার দরবার ব্যতীত কোথাও যাওয়ার নেই- এমন মনোভাব নিয়ে দীনতা-হীনতার সাথে মুনাজাত করা।
দোয়া কবুলের ঘটনা ঃ
হযরত থানবী রহ. লিখেছেন, এক মূর্খ ব্যক্তি ইবাদত করে উচ্চ মাকামের অধিকারী হন এবং সদা-সর্বদা আল্লাহপাকের দরবারে অশ্র“সিক্ত হয়ে নিজের জন্য অনবরত মাগফেরাত কামনা করতে থাকেন। এমতাবস্থায় গায়েবী আওয়াজের মাধ্যমে তাঁকে জানানো হয় যে, ‘কান্নাকাটি করে মুনাজাত করে কোন লাভ নেই, কারণ ক্ষমা করা হবে না।’ এ আওয়াজ শুনে সে আরো অধিরচিত্তে অশ্র“সিক্ত হয়ে মুনাজাতে লিপ্ত হয়। লোকেরা বললো, আপনাকে যখন ক্ষমা না করার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এরপরও এত কষ্ট স্বীকার ও কান্নাকাটি করে মুনাজাত করে কী লাভ হবে?
তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমার কাজ আমি করছি, আমার তো অন্য কোথাও যাওয়ার ঠাই নেই, তাই আমাকে বিরক্ত করো না। আমার কাজ আমাকে করতেই হবে।’ সেই মুহূর্তে গায়েবী আওয়াজ এলো, ‘যদিও তার মাঝে ক্ষমাযোগ্য কোন আমল নেই কিন্তু যেহেতু সে মনে করে আমি ব্যতীত তার কোন আশ্রয় নেই, সেহেতু অনুগ্রহ করে তাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।’
আল্লাহর আযাবের ভয়
বুখারী শরীফে আছে, এক ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সন্তানদেরকে ওসীয়ত করে যায় যে, মৃত্যুর পর আমাকে মাটিতে দাফন না করে আগুনে জ্বালিয়ে ছাই করে প্রবল বাতাসের মাঝে উড়িয়ে দিবে, কেননা আমার মত পাপী এবং অপরাধী এ দুনিয়ার আর কেউ নেই। আল্লাহপাকের সামনে আমাকে দাড়াতে হলে কোনো উত্তর আমি পাবো না।
ওছীয়ত অনুযায়ী মৃত্যুর পর তাই করা হল। কিন্তু আল্লাহর হুকুুমে সমস্ত ছাইগুলো যখন একত্রিত করে মানুষের আকৃতিতেত তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হল, তখন সে অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহপাক তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন তুমি তোমার সন্তানদেরকে তোমার দেহ জ্বালিয়ে ছাই করে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলে? আমি কি ছাই থেকে তোমার দেহ উপস্থিত করতে সক্ষম নই?
লোকটি উত্তর দিল, হে প্রভু আপনি জানেন আমি বড়ই অপরাধী, গোনাহগার। আমার এই অপরাধসহ কোন মুখে আমি আপনার সামনে হাজিরা দিব? আপনার আযাবের ভয়েই আমি এই ওসীয়ত করেছিলাম। তার জবাবে আল্লাহপাক বললেন, তোমার অন্তরে অনুতাপ এবং আমার ভীতি রয়েছে; যার অন্তরে আমার ভয় থাকে তাকে ক্ষমা করার কথা আমি ওয়াদা করেছি। তাই আজ আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।
এক হাদীসের দ্বারা বুঝা যায় যে, আজাবে আক্রান্ত এক ব্যক্তিকে আল্লাহপাক ক্ষমা করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার ব্যাপারে আজাবের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং সে সিজ্জীনে নিক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু হঠাৎ করে একদিন ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে ইল্লীনের শান্তি ও প্রশান্তিতে নিমগ্ন হয়ে যায়। আজাবের পর শান্তির অনুভিূতি অধিক হয়ে থাকে।
আসল শান্তির স্থান জান্নাত
মানুষের স্বভাব হলো, যতক্ষণ সে বিপদে কঠোর সমস্যায় জর্জরিত থাকে, ততক্ষণ কেবল বিপদ মুক্তিরই কামনা করে, আরাম আয়েশ অথবা অন্য কোন কামনা থাকে না। কিন্তু যখন বিপদ মুক্ত হয়ে যায় তখন আস্তে আস্তে বিভিন্ন ধরনের কামনা-বাসনা তার মনে জেগে ওঠে। তবে এই বস্তু জগতে মানুষের আশা-আকাঙ্খা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না, হতে পারে না। একজন পথচারীর সকল কামনা-বাসনা পথ চলার পথে পূর্ণ হয়না। মনের চাহদিা অনুযায়ী পানাহার, বস্ত্র, আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা হয় না। মানুষ তো দুনিয়ার জিন্দেগীতে একজন পথচারীই বটে। হাদীসেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে,
كن في الدنيا كانك غريب او عابر سبيل
“তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন একজন অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা পথের পথিক।”
তোমার আসল বাড়ী ও বাসস্থান তো হচ্ছে জান্নাত, সেখানে রয়েছে তোমার জন্য অকল্পনীয় ভোগ সামগ্রী।
কুরআনের বাণী-
فيها ما تشتهيه الانفس وتلذ الاعين
“সেখানে মন যা চাইবে ও চক্ষুশীতল করবে তাই দেওয়া হবে।”
اعدت لعبادي الصالحين
“যা প্রস্তুত করা হয়েছে আমার নেক বান্দাদের জন্য।”
সেখানে মানুষ প্রাণপ্রিয় রাসূলের সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হবে, মহান আল্লাহপাকের দীদার লাভে সৌভাগ্যবান হবে।
বস্তুজগত কামনা-বাসনা পূরণ হওয়ার স্থান নয়, অতীতে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। আযাব থেকে মুক্তি প্রাপ্ত ঐ লোকটি বলবে, হে মহান আল্লাহ! আমার ন্যায় কোন অপরাধী নেই। তোমার দয়া ও অনুগ্রহে আজকে আমি জান্নাতি। তবে মনে একটা কৌতুহল জেগেছে যে, হঠাৎ করে আমার প্রতি এই করুণার কারণ কি?
আল্লাহপাক বলেন, তুমি বিয়ে করেছিলে এবং বিয়ের পর তোমার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছিলে। মিলনের সময় তুমি সহী নিয়ত করেছিলে। কেবল পশুর ন্যায় যৌনকামিতাই তোমার উদ্দেশ্য ছিল না। অত:পর আমার রহমতে তোমার স্ত্রী গর্ভধারণ করে। ইতিমধ্যে তোমার মৃত্যু হয়ে যায়। এরপর তোমার স্ত্রীর গর্ভ থেকে একটি ছেলে সন্তান ভুমিষ্ট হয়। আত্মীয়-স্বজন এবং পরিবারের অন্য সকলেই তোমার স্ত্রীকে পরামর্শ দেয় যে, সন্তান এতীম, তুমি বিধবা তাই তাকে জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত কর। সে একদিন বড় অফিসার হবে। অনেক টাকা-পয়সার মালিক হবে। তোমার দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে। সমাজে তোমার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে।
আদর্শ স্ত্রী
কিন্তু তোমার স্ত্রী এই বলে অসম্মতি প্রকাশ করে যে, যার সন্তান সে তো দেখে যেতেও পারেনি, উপকৃত হওয়া তো দূরের কথা। সুতরাং আমি আর কী উপকৃত হবো। আর ছেলেই যে অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকবে কী নিশ্চয়তা আছে? যেখানে বাড়ী থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় ফিরে আসারই তো কোন গ্যারান্টি নেই। তাছাড়া শিক্ষিত হলেই চাকরি পাবে তার কি সিউরিটি আছে? আর যদি চাকরি পায় কিংবা অর্থ উপার্জনের কোন উপায় হয়, তারপর যদি শাশুড়ী এবং স্ত্রীর পরামর্শে আমাকে ছেড়ে চলে যায়, তাহলেই বা করার কি থাকবে? অপরদিকে আমাকেও মৃত্যুবরণ করতে হবে, তাকেও মৃত্যুবরণ করতে হবে। ইহকাল অস্থায়ী। আজ হোক কাল হোক জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবেই। এরপর আসছে চিরস্থায়ী জীবন। যে জীবনের কোন শেষ নেই। তাই এমন কিছু করা প্রয়োজন যা আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে কাজে আসে। মানুষ কি বলবে না বলবে সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। তারা আমার সাথে কবরে যাবে না। সন্তান আমার নিকট আমানত, সুতরাং আমানতের খেয়ানত করা যাবে না। সন্তান বিপথগামী হলে সন্তানের কাছে এবং আল্লাহর কাছে দায়ী হতে হবে।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৪৯০ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

২ টি মন্তব্য

  1. আল্লাহ তায়ালা হযরতের হায়াতের মাঝে খুব বরকত দান করুন। আপনাকে ধন্যবাদ

  2. পড়ে উপকৃত হলাম। আপনাকে ধন্যবাদ।