লগইন রেজিস্ট্রেশন

সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধারদের নিকট দ্বীনের তাবলীগ

লিখেছেন: ' মাসরুর হাসান' @ মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৯, ২০১১ (৫:০৫ অপরাহ্ণ)

মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান দা:বা:এর বয়ান

দিলকে প্রস্তুত করা
দ্বীন বোঝার এবং আমল করার জন্য দিলকে প্রস্তুত করে রাখা দরকার। প্রস্তুত দিল যার রয়েছে তাকে সেই দিল সব ধরনের উপকার পৌঁছাতে পারে। একটি উদাহরণে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
কোন লোক একটি ঘর বানিয়েছেন তবে কাজ কমপ্লিট করেননি, এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি, খাট পালং কোন কিছুই নেই কিন্তু দরজায় তালা দেয়া। তাহলে কি এ ঘরে মিস্ত্রী প্রবেশ করতে পারবে? মিস্ত্রী যদি এ ঘরে প্রবেশ করতে না পারে তাহলে অবশিষ্ট কাজ সমাপ্ত করবে কিভাবে? এ ঘর কি কোন উপকারে আসবে? অবশ্যই না। ঘর থেকে উপকার নিতে হলে ঘরের দরজা খুলতে হবে, তারপর মিস্ত্রী প্রবেশ করে ঘরটাকে বসবাসের উপযোগী বানাবে। আবার মনে করুন, মিস্ত্রী ঘরে প্রবেশ করে মালিকের আরাম আয়েশের সকল ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে চলে গেছে। এখন মালিকের কাছে তালার চাবি না থাকার কারণে সে ঘরে প্রবেশ করতে পারে না, ফলে ঘরের ভেতর রাখা আসবাবপত্র ও আহারের বস্তু থেকে সে উপকৃত হতে পারছে না। তাহলে কাজ কমপ্লিট করা না করা সমান কথা হলো।
মানুষের দিল বা অন্তর ঠিক অনুরূপই একটি ঘর, এ ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ, ভেতরে খাট পালং ইয়ার কণ্ডিশন ফিট করা রয়েছে, এগুলো দ্বারা উপকৃত হতে হলে দরজা খোলা রাখতে হবে। ঘর ময়লাযুক্ত হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য ঝাড়–দারকে আসার সুযোগ দিতে হবে। এত সব কিছুর পর মালিক এ ঘরে প্রবেশ করে আরাম-আয়েশ করতে পারবে।
অন্তরে এসি ফিট করা
মানুষের দিলকে মনে করুন একটি ঘর। এ ঘরের মধ্যে এসি ফিট করতে হবে নেক আমল ও যিকিরের দ্বারা। আর নেক আমল ও যিকিরকারী হলো ঘরের মালিক। একেক প্রকারের নেক আমলের দ্বারা একেক ধরনের ফল পাওয়া যায়। যেমন নামায পড়লে দিল সাফ হয়। এ কথা আল্লাহই বলে দিয়েছেন-
ان الصلوة تنهى عن الفحشاء والمنكر
নামায মানুষের যাহেরী-বাতেনী আবর্জনা দূর করে। যখন যাহেরী আবর্জনা দূর হয়ে গেল তখন আপনি যে যিকির করবেন বা আমল করবেন এর দ্বারা নূর সৃষ্টি হবে। নূর সৃষ্টি তখনই হবে যখন দিল খোলা থাকবে। পাইপ দিয়ে পানি আসছে আর আপনি কলসী পাইপের নীচে ধরেছেন, কিন্তু কলসীর মুখ বন্ধ, তাহলে কলসী পানিতে ভরবে না। আর যদি খোলা রাখা যায়, তাহলে এর মধ্যে পানি প্রবেশ করবে। তেমনি দিল যদি খোলা থাকে তাহলে দিলের মধ্যে ঈমান আমল ও মারেফাতের পানি প্রবেশ করবে, আর দিল বন্ধ করে রাখলে আবর্জনা ও ময়লাযুক্ত হয়ে যাবে। তখন আল্লাহর প্রতি একীন ও বিশ্বাস আসবে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আকীদা ও মুহব্বত সুদৃঢ় হবে না। এজন্য দিল খোলা রাখতে হবে। দিল খোলা রাখার অনেক পদ্ধতি আছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
والذين جاهدو فينا لنهدينهم سبلنا والله لمع المحسنين
আমার কাছে পৌঁছার অনেক রাস্তা আছে। ‘সাবীল’ একবচন, অর্থ ‘পথ’। আর বহুবচন ‘সুবুলুন’ অর্থ ‘অসংখ্য পথ’। আল্লাহপাক বলেন, যারা আমার আপন হতে চায়, আমার নিকটে আসতে চায়, আমার দয়া মায়া চায়, তাদের জন্য আমার কাছে পৌঁছার অসংখ্য রাস্তা আছে, সেগুলো থেকে যে কোন রাস্তা দিয়ে আমার কাছে আসতে পারে। আমি ইতিপূর্বে দিলের তালা খোলার পদ্ধতি সম্পর্কে বলেছি যে, দিলের তালা খোলার জন্য কুরআন তেলাওয়াত বেশি বেশি করতে হবে। কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করলে দিলের তালা খোলে। হাদীসে বর্ণিত আছে, অযু করো, দিলের তালা খুলে যাবে, হজ্ব করো, দিলের তালা খুলে যাবে, তদরূপ তাওবা, দান খায়রাত, ছিয়াম সাধনা, আল্লাহর রাস্তায় যিকির-আযকার, দুরুদ শরীফ পাঠ ইত্যাদি নেক আমল হলো দিলের তালার চাবি। নেক আমল দ্বারা দিলের তালা খুলে যায়।
হাদীসের গল্প
বুখারী শরীফের হাদীসে বর্নিত হয়েছে, তুফানের সময় তিন লোক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয় । সেই গুহার মুখে বিরাট বড় পাথর পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এখন তাদের বাঁচার কোন পথ নেই। এ গুহায় হাজার বছর পড়ে থাকলেও কেউ টের পাবে না। কী বিপদেই না তারা পড়েছে! বিপদ খুব ভালো জিনিস, যদি মেনে নেওয়া যায়। বিপদের সময় মন আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনদিকে যায় না। এ দৃষ্টি কোণে বিপদাপদ, বালা-মুসিবত বড় লাভের জিনিস। যখন তারা বুঝতে পারল বাঁচার কোন পথ নেই, মৃত্যু অনিবার্য, তখন তাদের একেক জন মহান আল্লাহ পাকের দরবারে বিনয়ের সাথে বলতে লাগল, হে আল্লাহ! জীবনে অনেক গুনাহ করেছি তবে একটি নেক কাজও করেছি পিতা-মাতার যতœ। আমার জানা মতে এটা অনেক বড় নেক কাজ। কুরআন হাদীসে মাতা-পিতার খেদমতের ব্যাপারে নির্দেশ করা হয়েছে
وقضى ربك ان لا تعبدوا الا اياه وبالوالدين احسانا اما يبلغن عندك الكبر احدهما او كلاهما فلا تقل لهما اف ولا تنهر هما وقل لهما قولا كريما
জান্নাতে যেতে চাইলে মাতা পিতার খেদমত করতে হবে, তাদেরকে খুশি করতে হবে। তারা অসন্তুষ্ট থাকলে জান্নাত লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। চাই যে যত বড় শাইখুল হাদীস কিংবা যত বড় আমলদার বুযূর্গ হোক। যাহোক গুহায় আবদ্ধ এক লোক বলল, হে আল্লাহ! তুমি জানো, একদা পশু চরাতে অনেক দূরে চলে যাই, বাড়ীতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘরে এসে দেখি মাতা-পিতা উভয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ঘুম ভাংলে তাদের কষ্ট হবে বিধায় দুধ দোহন করে তাদের জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষায় দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে তাদের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকি। এদিকে আমার কঁচি-কাঁচা শিশুরা ক্ষুধার তাড়নায় আমার পায়ের উপর পড়ে কাঁন্নাকাটি করতে থাকে, কিন্তু মাতা-পিতাকে দুধ পান করানোর পূর্বে তাদেরকে দুধ পান করানো সমীচীন মনে করিনি। মাতা-পিতার ঘুম না ভাঙ্গার কারণে আমি দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে সারারাত তাদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। হে আল্লাহ! তুমি নিশ্চয়ই জান যে, লৌকিকতার জন্য সে কাজ আমি করিনি, করেছি শুধু তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। যদি এ আমল তোমার কাছে কবূল হয়ে থাকে তাহলে এর বিনিময়ে আজকের এ বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করো। গুহার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে দাও! তখন পাথর একটু সরে যায়। কিন্তু তখনো গুহা থেকে বের হওয়া সম্ভব হচ্ছিলো না, তবে গুহার ভেতরে বাইরের আলো-বাতাস প্রবেশ করলো।
আল্লাহর ভয়ে খাহেশাতকে
দ্বিতীয় ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ! তুমি জানো, আমি আমার চাচাত বোনের আশেক ছিলাম। তার অভাবের সুযোগ নিয়ে আমি তাকে যিনার প্রস্তাব করলে সে বলেছিল, একশত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) দিতে হবে। আমি তাতে সম্মত হই এবং দুবছরে মেহনত করে একশত দিনার সংগ্রহ করে তাকে দেই। এরপর তাকে বলি যে, তুমি আমাকে যে শর্ত দিয়েছিলে আমি পূরণ করেছি; সুতরাং এখন তোমার ওয়াদা তুমি পূরণ করো।
উভয়ে পূর্ণ প্রস্তুত। যিনায় লিপ্ত হতে আর কোন বাধা নেই। তখন চাচাত বোন হঠাৎ বললো, তুমি আমার ভাই, আল্লাহকে ভয় কর। দুনিয়ার কেউ দেখছে না, কিন্তু আল্লাহ পাক দেখছেন। তোমার মাতা পিতা দেখলে কি তুমি এ কাজ করতে পারতে? দুনিয়ার কোন মানুষ যেন না দেখে সে ব্যবস্থা করেছ অথচ দুনিয়ার মানুষ কোন ক্ষতি করতে পারে না পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা যেন না দেখে সে ব্যবস্থা করোনি। আর করতেও পারবে না কখনো। অথচ তিনি কঠোর শাস্তি দিতে পারেন, ঈমানহারা করে কাফের বানিয়ে আজীবন জাহান্নামে রাখতে পারেন। তাই আল্লাহকে ভয় করো। তবে তুমি যদি চাহিদা মেটাতেই চাও তাহলে সহজ ও বৈধ পথ অবলম্বন করো। আর তা হলো তুমি আমাকে বিয়ে করে নাও।
চাচাত, মামাত খালাত, ও ফুফাত বোনকে বিবাহ করা জায়েয। তাই মেয়েটি বলতে চাচ্ছে, তুমি আমার সতীত্ব নষ্ট করতে চাচ্ছ, আমি গরীব, অসহায় তাই টাকা দিয়ে আমাকে বাধ্য করেছ। শুনে রাখো, আল্লাহর আদালতে তোমাকে যেতে হবে, আমাকেও যেতে হবে। তাই আল্লাহকে ভয় করো।
ছেলেটি দু বছর অনেক পরিশ্রম করে একশত দিরহাম সংগ্রহ করেছে। এ দুবছরেও তার অন্তর থেকে আগ্রহ দূর হয়নি। কেমন মজবুত আগ্রহ ছিল ন্ঠ অন্যের বাড়ীতে দু’বছর কাজ করে টাকা সংগ্রহ করে যিনা করতে প্রস্তুত, এমন সময় বাহ্যিক কোন প্রতিবন্ধকতা ব্যতীত তা বর্জন করা বড়ই কঠিন কাজ। কিন্তু ছেলেটি সেই কঠিন কাজটিই করতে সক্ষম হলো। চাচাত বোনের পূর্বোক্ত বাক্য শুনে পিছনে সরে আসলো (আমার রচিত, জান্নাতী দশ যুবক নামক বাইয়ের মধ্যে এ যুবকের ঘটনাও লেখা হয়েছে)
আল্লাহর তাওফীকই সবকিছুর ভিত্তি
ইতিহাসের কিতাবে এ ধরনের অনেক যুবকের কথা উল্লেখ আছে। হযরত ইউসুফ আ. এ ধরনের বিপদে পড়েছিলেন, তিনিও নিজেকে গোনাহ মুক্ত করেছেন। কিন্তু উল্লেখিত যুবকের ঘটনা বেশি মারাত্মক, ইউসুফ আ. তো যিনার প্রস্তাব করেননি, প্রস্তাব করেছিল যুলাইখা। ইউসুফ আ. যিনার প্রস্তাব করতে পারেন না। কারণ তিনি অদূর ভবিষ্যতে নবী হবেন, আর একজন নবীর জন্য গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা স্বাভাবিক। এ যুবক তো নবী নয় বরং একজন সাধারণ উম্মত। অন্যদিকে মেয়েও রাজি ছিলো। মেয়ে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েছে মাত্র, কোনো বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। এমতাবস্থায় কামপ্রবৃত্তির শক্ত চাহিদাকে দমন করা অত্যন্ত কঠিন, তবে আল্লাহ যাকে তাওফীক দান করেন তার জন্য কঠিন নয়।
আরশের ছায়াতলে স্থান
হাদীস শরীফে বর্নিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণীর লোকদেরকে হাশরের মাঠে আরশের ছায়াতলে স্থান দেয়া হবে এবং তাদেরকে বিনা হিসেবে জান্নাত দান করা হবে। তন্মধ্যে এক শ্রেণী হলো,
যে যুবককে সে দেশের বাদশা, প্রধানমন্ত্রী কিংবা বড় বংশের অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে যিনার জন্য আহবান করে। হাদীসে দুটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ১. সম্ভ্রান্ত বংশের কিংবা সমাজ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের মেয়ে ২. অপূর্ব সুন্দরী। দেশের ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীর সুন্দরী মেয়েকে কে না কামনা করে! কিন্তু তার কাছে অবৈধভাবে গেলে তো নিজের জীবনই বিপন্ন হবে। যাহোক যে যুবক এমন যুবতীর যিনার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করবে এবং গোনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে আল্লাহ পাক তাকে আরশের ছায়তলে স্থান দিবেন এবং বিনা হিসেবে জান্নাত দান করবেন।
আলোচনা করছিলাম এক যুবকের কথা, সে তার চাচাত বোনের মুখের কথা
“আল্লাহকে ভয় করো আমর সতীত্বের সিলমোহর খুলে ফেলোনা” শুনে তৎক্ষণাৎ পেছনে সরে আসে। প্রত্যেক যুবকেরই স্বীয় প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমন শক্তিশালী হওয়া উচিত।
মেয়েটির কথা শুনে যুবকের পুরো অন্তরে আল্লাহর ভয় ছেয়ে গেল। বারবার চোখের পানি ফেলে আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করতে লাগলো। কুরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে,
اذا مسهم ظائف من الشيطان تذكروا فاذاهم مبصرون
এমন কঠিন মুহূর্তেও যারা গোনাহ ছেড়ে দেয় তার বরকতে আল্লাহপাক তাদের দিলের চক্ষু খুলে দেন, দিলের তালা খুলে দেন। প্রবল কামোত্তেজনা অবস্থায়ও আল্লাহর ভয়ে ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করায় আল্লাহ পাক তাকে বুযূর্গী ও মারেফাত প্রদান করে যুগশ্রেষ্ঠ ওলী বানিয়েছেন।
একটি লক্ষণীয় বিষয়
এখানে এসে একটি বিষয় আমার অন্তরে উদিত হলো, এটা সবারই জানা থাকা দরকার। বিষয়টি হলো, কোনো গুনাহ থেকে তওবা করার সময় সেই গুনাহ মুখে উচ্চারণ না করে শুধু মনে মনে স্মরণ করা উচিত। কারণ অতীতের গুনাহের কথা মুখে উল্লেখ করলে ফেরেশতারা সেগুলোও লেখে। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
ما يلفظ من قول الا لديه رقيب عتيد
তোমার মুখ থেকে যে কথাই বের হচ্ছে ফেরেশতারা সেটা লিখে ফেলছে। মুখে বলার পূর্বে ফেরেশতারা জানতে পারে না। কারণ তারা আলিমুল গায়েব নয়। অন্তরে লুকায়িত বিষয় ফেরেশতারা অবগত হতে পারে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের উপর নির্দেশ আছে যে, বান্দা তার মুখে যা বলবে তোমরা তাই লিখবে। এজন্য অতীতের গোনাহের কথা উচ্চারণ করে আলোচনা করতে নেই। আল্লাহপাক বলেছেন, তোমরা আমার কাছে আস্তে আস্তে দোয়া করো। তাই দোয়ার সময় এভাবে বলতে হবে যে, “হে আল্লাহ! যত গোনাহ করেছি সবই তুমি জান, সে সকল গোনাহর জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাই।” ফলে ফেরেশতারা কিছুই বুঝতে পারবে না। তারা বলবে, হে আল্লাহ! তোমার এক বান্দা হাত তুলে রেখেছে। আল্লাহ পাক জিজ্ঞেস করবেন সে কী চায়? ফেরেশতারা বলবে, সে নাকি কী গোনাহ করেছে সেজন্য তোমার কাছে ক্ষমা চায়। আল্লাহ পাক বলবেন, ‘ঠিক আছে তাকে ক্ষমা করে দিলাম’। সুবহানাল্লাহ!
আর যদি ফেরেশতারা বলত, হে আল্লাহ! তোমার এক বান্দা যিনা করেছে, কিংবা চুরি করেছে কিংবা হত্যা করেছে তাই সে উক্ত পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করছে তোমার কাছে। আর এরপরও অসীম দয়ালু, করুণার আধার মহান প্রতিপালক আল্লাহ জাল্লা শানুহু যদি বলেন “আচ্ছা ঠিক আছে ওকে ক্ষমা করে দিলাম”, তাহলে যার সতীত্ব সে নষ্ট করেছে, কিংবা যার সম্পদ সে চুরি করেছে অথবা যার প্রিয়জনকে সে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে সে আল্লাহকে বলবে, হে আল্লাহ! তুমি এটা কী করলে! সেম আমার এত বড় ক্ষতি করলো আর তুমি কিনা তাকে মাফ করে দিলে! এটা কি ইনসাফ করা হলো। তুমি তো তার দিকে এক পেশে টান টানলে, আর আমার প্রতি অবিচার করলে!
তাই আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়ার সময় গোনাহের নাম উচ্চারণ না করা উচিত। নতুবা ফেরেশতারা লিখে ফেলবে।
দিলের তালা কিভাবে খুলবে?
যাহোক আজকের আলোচনার শুরুতে দিলের তালা খোলা সম্পর্কে কথা বলছিলাম। তো সেই প্রসঙ্গকে সামনে রেখে একটি বিষয় জানার রয়েছে, তা হলো কতক লোক আছে যারা নামায পড়ে না, রোযা রাখে না, হজ্ব করে না, যাকাত দেয় না, কোন নেক আমলই করে না, এসব লোকদের দিলের তালা কিভাবে খুলবে? সেও তো আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ চান, তার দিলের তালাও খুলে যাক। আল্লাহর এই চাওয়াটা কোন-পর্যায়ের এটা বোঝানোর জন্য ছোট্ট একটি উদাহরণ মনে পড়লো। কোন বাপের যদি দুটি সন্তান থাকে তাদের একজন ধনী আরেকজন গরীব, তাহলে বাপের দৃষ্টি কার দিকে বেশি থাকবে? সবাই এই উত্তরই দেবে যে, মা-বাপের দৃষ্টি গরীবটির প্রতি বেশি থাকবে। আল্লাহর বান্দাও দু’প্রকার ১। যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে, হজ্ব করে, যাকাত আদায় করে, নেক আমল করে, তাদের দিলের তালা এমনিতে খোলা থাকে, না থাকলে সহজেই খুলে যায়, তারা সবাই হৃষ্টপুষ্ট। আর দ্বিতীয়টি হলো এমন বান্দা যারা মদ পান করে, জুয়া খেলে, চুরি-ডাকাতি করে, ভালো কাজ বলতে কোন কিছুই করে না। এদের দিকে আল্লাহর লক্ষ্য বেশি থাকে। এরাই দ্বিতীয় প্রকারের বান্দা যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ও কর্ণধার। তাদের দিলের তালা খুলার জন্য অর্থাৎ তাদের হেদায়েেেতর জন্য আল্লাহ পাক যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন সে প্রসঙ্গ কুরআনের অনেক আয়াতে আলোচিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি আয়াত হলো,
আল্লাহ পাক বলেছেন-
ولقد ارسلنا موسى بايتنا وسلطان مبين الى فرعون وهامان وقارون
“আমি মূসাকে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি নিদর্শনাবলি ও সুস্পষ্ট প্রমাণসহ ফেরাউন, হামান ও কারুনের কাছে।” এর আগের কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, তিনি সব জানেন, ময়দানে হাশরে সব বিষয়ে বিচার হবে। তিনি মহা শক্তিশালী। অপরাধীদেরকে শাস্তি দিবেন। তার নিদর্শন দেখার জন্য তোমরা সারা দুনিয়ায় বিচরণ করো। তাহলে দেখতে পাবে, তোমাদের চেয়ে শক্তিধর লোকেরা আমার নাফরমানী করেছে। যেমন ফেরআউন, হামান, কিন্তু তাদের শক্তি আমার মোকাবেলায় টিকতে পারেনি। আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়ে নীল নদকে নিদর্শন বানিয়ে রেখেছি। মৃত সাগরে আমি কওমে লূতকে আযাব দিয়েছি। তার পানি পান করলে মানুষ মরে যায়। সে সাগরে মাছ কিংবা কোন প্রাণী নেই। এটা নিদর্শন হয়ে আছে। সুতরাং পৃথিবীতে বিচরণ করো তাহলে তোমরা আমার শক্তি ও ক্ষমতার নিদর্শন দেখতে পারবে। আল্লাহ বলেছেন, নবী হিসেবে বিশ্বাস করার জন্য যে ধরনের নিদর্শন ও দলীল প্রমাণ প্রয়োজন সে সব কিছুই আমি মুসাকে দিয়ে পাঠালাম রাজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক ও কর্ণধারদেরকে হেদায়েতের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ ফেরআউনের কাছে, ফেরআউনের প্রধানমন্ত্রী হামানের কাছে এবং কারুনের কাছে। এর মধ্যে ফেরাউন ও হামান ছিলো রাস্ট্রীয় শক্তির অধিকরিী আর কারুন ছিলো অর্থশক্তির অধিকারী।
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত
এতে বুঝা যায়,মজলিসে বসে বসে আলোচনা ও ওয়াজ নসীহতই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শক্তির অধিকারী যারা তাদের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। যারা অর্থসম্পদের পাহাড় গড়েছে এবং এগুলোর হিসাব রাখতে গিয়ে আখেরাত থেকে গাফেল হয়েছে তাদের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। আমাদের দেশে একাজটি যথাযথভাবে হচ্ছে না। যার কারণে এ দুটি শেণীর অধিকাংশই ইসলাম ধর্ম থেকে বিমুখ হয়েছে। এদেশে দ্বীন কায়েম না হওয়ার বড় একটা কারণ এটা।
এই যাত্রাবাড়ীর মানুষ আমাকে খুব ভালো করে চেনে। মনে করুন, তারা আমাকে এলাকার জন্য এমপি বানালো, এরপর আমি যখন পর্লামেন্টে বলবো, ইসলামী শাসন চাই, তখন বাকী সব এমপি বলবে, ইসলামী শাসন চাই না। এদিকে এলাকার মানুষ বলবে হুযুরকে এমপি বানিয়ে কী লাভ হলো? তিনি ইসলাম কায়েম করতে পারলেন না। ফলে এমপি হওয়ার পূর্বে আমার যে মর্যাদা ছিল সেটাও শেষ হয়ে গেল। পার্লামেন্ট মেম্বরের মধ্যে ৪০ জন যদি ইসলামী হুকুমতের পক্ষে হয় আর ২৬০জন বিপক্ষে তাহলে সেখানেও কি ইসলাম কায়েম করা সম্ভব? ৪০ জনে যে কাজ করতে না পারে সে কাজ হুযুর একা পারবেন কি করে? এভাবে হবে না।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে
রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সারা দেশে তিনশো আলেমকে তাদের জীবনের সাধনার লক্ষ্যবস্তু আল্লাহকে বানাতে হবে এবং রাতদিন ২৪ ঘণ্টা দাওয়াতী মেহনত করে এলাকার সকল মানুষকে আল্লাহ ওয়ালা বানাতে হবে। পর্লামেন্টের ৩০০ আসনের মধ্যে যে দলের ১৫১টি আসন লাভ হবে সে দল সরকার গঠন করবে। তাই বর্তমান পর্লামেন্টে কমপক্ষে ১৫১ জন আলেম লাগবে। তখন আলেমগণ যে রায় দিবেন তা কার্যকর হবে। তাই বাস্তবতা হলো, এখন আমি নির্বাচনে দাঁড়ালে হয়তো বেশির বেশি বিশ হাজার ভোট পাব। আমার প্রতিদন্দ্বী প্রার্থী পাবে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার। এরপর যদি দ্বিতীয়বার পুনরায় নির্বাচনে দাঁড়াই তাহলে দশহাজার ভোটও পাব না। তখন মানুষ আমার বদনাম করবে। এভাবে আমার দ্বীনী বন্ধুদের মাঝে আমি বিতর্কিত হয়ে যাবো। এলাকায় নির্বাচন করে যদি আমি ফেল করি তাহলে আমার কাছে যারা আসত তারা বলবে, হুযুরের কাছে এখন না যাওয়াই ভালো। গেলে মানুষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, তেতো কথা শুনতে হবে। ফলে অল্প কিছু সংখ্যক লোক যারা আমার কাছে আসতো, বয়ান শুনতো তাদের দ্বীনী উপকার গ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে।
আর এর বিপরীতে আমি যদি এই অঞ্চলে দাওয়াতের কাজ করে, মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে শতকরা আশিভাগ লোককে আমার ভক্ত বানাতে পারি, যারা আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝবে না। তারা মনে করবে যে, আমাদের দুনিয়া কিছু না, আখেরাতই আসল ঠিকানা, তাই দ্বীনের খেদমতের জন্য ও আখেরাতের কামিয়াবীর জন্য হুযুরকে পার্লামেন্ট মেম্বার বানাতে হবে। এরপর তারা পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ ব্যয় করে আমাকে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে। শতকরা ৮০ভাগ লোককে যদি আমি এমন বানাতে পারি তাহলে ষাট ভাগ ভোট অন্তত আমি পাব। ফলে আমি পার্লামেন্ট মেম্বার হতে পারব। প্রত্যেক আলেম যদি নিজ এলাকায় লোকদের অন্তরে আল্লাহ ও তার রাসূলের মুহাব্বতের বিজ বপন করতে পারে তাহলে নির্বাচনে বিজয়ী হতে বেগ পেতে হবে না। যদি তিনশো আসনের ১৫১ টি আসনে আলেম এমপি নির্বাচিত হতে পারে তাহলে এদেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ইসলামের কল্যাণকর বিধান প্রতিটি অঙ্গনে খুব সহজেই জারি হবে।
আমি যদি পার্লামেন্টে বলি যে, সুদ হারাম করতে হবে, তাহলে তো বাকী সকলে মিলে আমাকে মারতে আসবে। কারণ, দেশের অর্থনীতির সকল ইমারতের মূল মেরুদণ্ডই হলো সুদ। ওকথা বললেই আমাকে মহা বিপদে পড়ে যেতে হবে। কিন্তু যদি পার্লামেন্টে ১৫১ জন আলেম থাকত তাহলে আমার দাবীর পক্ষে রায় হত।
খতমে নবুওতের বিল
অনেক পূর্বে একবার কিছু লোক আমাকে বলল, হুযুর! আমরা খতমে নবুওয়াতের বিল পর্লামেন্টে পেশ করতে চাই, আপনি স্বাক্ষর করুন। তখন আমি বলেছি যে, আমি এমন স্বাক্ষর করতে রাজী নই, যে স্বাক্ষরকে মূল্যায়ন করা হবে না। যদি এমন হতো যে, আমার স্বাক্ষর পার্লামেন্টে পৌঁছলে পর্লামেন্টের লোকদের আত্মা ভয়ে কেঁপে উঠবে এই ভেবে যে, সর্বনাশ! হুযূরের স্বাক্ষর দেখা যায়! যদি উপেক্ষা হয় তাহলে পর্লামেন্ট উল্টে যাবে! তাহলে আমার স্বাক্ষর দেয়াটা শুধু যুক্তিযুক্তই হত না বরং অপরিহার্য হত। পক্ষান্তরে আমি স্বাক্ষর করলাম আর পর্লামেন্টের লোকেরা তা ফেলে দিল, তাহলে তো আমাকে অবমূল্যায়ন করা হলো, আমি অবহেলিত হলাম। তারপরও আমার যদি আন্দোলন করার ক্ষমতা থাকত তাহলে ঠিক ছিল, কিন্তু আমার তো আন্দোলন করার ক্ষমতাও নেই। সুতরাং আমি স্বাক্ষর করার কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি জানি এ দেশের পর্লামেন্ট এ বিষয়টি মঞ্জুর করবে না। তার চেয়ে আমি চেষ্টা করছি আমার এলাকার মাঝে যে সব লোক আছে তারা যেন জানতে পারে ‘কে সর্বশেষ নবী।’ আর এ কথাও সবাইকে বোঝাচ্ছি যে, যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী হিসেবে না মানে তারা কাফের। আমি তাদের মাঝে তাক্বওয়া ভরে দিতে চাই। তাছাড়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খতমে নবুওয়াত প্রমাণের জন্য সরকার বা এমপিদের স্বীকৃতি বা ঘোষণা প্রদানের আবেদন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে কেমন হবে তা ভেবে দেখা দরকার। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহী বুঝ দান করুন।
অভিজ্ঞতা
পূর্বে উল্লেখিত আয়াত থেকে আমি যে কথা আপনাদেরকে বোঝাতে চাচ্ছিলাম তা হলো, রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় লোকদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে হবে এবং তাদের উপর প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ দেশে যখন মাদরাসার ছাত্রদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছিলো তখন আমি গুলশান আযাদ মসজিদে বলেছিলাম, এক মাসের মধ্যে চল্লিশ বছরের হিসাব দিতে হবে যে, গত চিল্লশ বছরে কয় জন আলেম যিনা করেছে, কয় জন আলেম চুরি-ডাকাতি করেছে, অন্যের বুকে অস্ত্র ধরেছে। আমার বক্তব্য শুনে প্রশাসন কেঁপে উঠেছিল। আমার কাছে এক এমপির পক্ষ থেকে লোক পাঠানো হলো, হুযুরকে গিয়ে বলো, আমি পর্লামেন্টে বলে দিচ্ছি যে, মাদরাসার ছাত্র আর ধরা হবে না। আমি বললাম, এতটুকু যথেষ্ট নয়। কারণ আপনার ঘোষণায় আশ্বস্ত হতে পারছি না। তারপর পুলিশের আইজি ফোন করে একই কথা বললো। আমিও পূর্বের মতো ফিরিয়ে দিলাম। তারপর শিক্ষামন্ত্রী বললো, হুযূর! মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে ধরা হবে না। তখন আমি বললাম ঠিক আছে। এটা আমার ইলমী-আমলী যোগ্যতা নয় বরং এটা “গুলশান আযাদ মসজিদের খেতাবতের যোগ্যতা।” গুলশান আযাদ মসজিদের খতীব হওয়ার সুবাদে এটা করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে সাধারণ থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণীর লোক বসে থাকে। ত্রিশ বছর ধরে তারা আমার বয়ান শোনে। তাদের বিশ্বাস যে, হুযুর নিরপেক্ষ, হুযূর ভালো লোক। তারা এ চিন্তা করে না যে, হুযূর আন্দোলন করবেন। তারা চিন্তা করে যে, হুযূর যদি বদ দোয়া করেন, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাব। এভাবে যদি এক দেড়শ আলেম ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ের লোকদেরকে ধমক দেয়ার মত ক্ষমতা অর্জন করতো তাহলে হয়তো আহলে ইলমদের বর্তমান এই দুর্বল অবস্থা হতো না, সমাজে এমন দ্বীনী দুর্ভিক্ষ বিরাজ করতো না। জনৈক লোক আমাকে লক্ষ ডলার দিতে চেয়েছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কেন আমকে এগুলো দিতে চান”? তিনি বললেন, “হুযূর! খরচের জন্য আপনাকে এগুলো দেব”। আমি তাকে জবাব দিয়েছি, “এগুলোর প্রয়োজন আমার নেই।” আমার টাকার প্রয়োজন হলে আমার এলাকার লোকদের কাছেই তো বলি না। এই যে এখন যারা বসে আছেন, আপনারা তো আমার এলাকার মানুষ, আপনাদের কাছে কি কোন দিন আমার মুখ দিয়ে বলেছি যে, যাত্রাবাড়ী মাদরাসার জন্য চার পয়সা দান করুন? আমি তো আমার আপনজনদের কাছেই চাই না, তাহলে দূরের লোকদের কাছে চাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। গুলশানের লোকজন তো এজন্য পেরেশান যে, ‘তিনি আশ্চর্য ধরনের হুযূর! ত্রিশ বছর ধরে এখানের খতীব, এত বড় একটি মাদরাসার প্রিন্সিপাল তিনি, অথচ একদিনও তার মাদ্রাসার জন্য একটি পয়সা চাননি! কখনো টাকা দিতে চাইলে ধমক দিয়ে ফেরত দিয়েছি। আমার সামনে রমযানের আবেদনও বিতরণ করতে দেই না।
পোষ্টার লাগালে মানুষের বাসা বাড়ীর দেয়াল নষ্ট হয়। সে জন্য পোস্টার ছাপাতে নিষেধ করে দিয়েছি। আমার মাদ্রাসার পক্ষ থেকে কোন ক্যালেণ্ডার ছাপা হয় না। তারপরও কি আল্লাহ পাক আমাদেরকে চালাচ্ছেন না? হ্যাঁ, অনেক ভালো চালাচ্ছেন। শুধু যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা চালাচ্ছেন তা নয় বরং আরো অর্ধশতাধিক শাখা মাদ্রাসাও চালাচ্ছেন এবং খুব ভালো চালাচ্ছেন। এ আমার অহংকার ও বড়ত্ব প্রকাশ নয় বরং আমি বলতে চাচ্ছি যে, আল্লাহ পাকের ইচ্ছা অনুযায়ীই সব কিছু হবে, তবে আপনাকে আল্লাহ ওয়ালা হতে হবে।
মুসা আ.-কে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ
আলোচনা করছিলাম যে, আল্লাহ পাক হযরত মুসা আ. কে রাজ্যের ক্ষমতাশীনদের কাছে তথা ফেরাউন, হামান ও কারুনের কাছে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। ফেরাউন ও হামান কিবতী বংশের ছিল আর কারুন ছিল মূসা আ. এর বংশের। অনেকের মতে কারুন মুসা আ. এর ভাই ছিল কিন্তু নীতিগতভাবে ফেরাউনের সাথে তার মিল ছিল। ফেরাআউন ছিল প্রতাপশালী আর কারুন ছিল অর্থশালী। তার অর্থ-সম্পদের সংরক্ষণের স্বার্থেই সে সরকারের সাথে মিল দিয়ে চলত। মুসা আ. এর কাছে এসে বলত, ভাই! আমি তোমার সাথে আছি ওদিকে আবার ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলত, আমি আপনার সাথে আছি। এজন্য আল্লাহ পাক তার নাম ফেরাউনের সাথে উল্লেখ করেছেন। মুসা আ. তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। তারা মুসা আ. এর দাওয়াত তো কবুল করেইনি, উপরন্তু মুসা আ.কে ‘জাদুকর মিথ্যুক’ বলেছে। কারুন ঈমান আনা সত্ত্বেও আল্লাহপাক তাকে ফেরাউন ও হামানের সাথে উল্লেখ করার দুটি কারণ হতে পারে (১) তারা তিনজন বন্ধু। মনে করুন, তিনজন লোক একসাথে চলে। তাদের মধ্যে দুইজন অসৎ আর তৃতীয়জন সৎ। তা সত্ত্বেও উক্ত অসৎ দুইজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে এলে তৃতীয়জনকেও তাদেরকে সাথে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। অসৎ সঙ্গের পরিণতি এরকম হওয়াই স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি ফেরাউন ও হামান তারা দুজন হযরত মূসা আ. কে মিথ্যুক বলেছে, কারুন তাদের বন্ধু থাকার কারনে আল্লাহ পাক তাকে তাদের মাঝে গণ্য করেছেন।
(২) কিংবা হযরত মূসা আ. এর উপর কারুনের মুখে মুখে ঈমান ছিল, দিলে ঈমান ছিল না, তাই আল্লাহ পাক কারুনকেও ফেরাউন ও হামানের সঙ্গে মিলিয়ে একত্রে উল্লেখ করে বলেছেন যে, তারা বলেছিলো “হে মূসা! তুমি জাদুকর মিথ্যুক!
শক্তির পরম ভাব
সরকারী শক্তির একটি গরম ভাব আছে। এটা যেমন ফেরাউন, হামানের ছিলো বর্তমান বিশ্বের সব দেশের সরকারী লোকেরও সেটা আছে। এই যে আলেমগণ বলছে, সুদ-ঘুষ হারাম। নামায পড়ো রোযা রাখো, নতুবা আল্লাহর আযাব আসবে। আলেম- ওলামাদের এসব কথা মধ্যম ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই শোনে ও মানে। যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে আসে তাদের অধিকাংশই দু চার হাজার, পাচ হাজার, দশ হাজর টাকা বেতনে চাকরি করে। বেশির থেকে বেশি দশ লক্ষ টাকার মালিক। কোটিপতিরা নিয়মিত মসজিদে আসে না। আমি জানি যাত্রবাড়ী এলাকায় কয়েকশ কোটিপতি রয়েছে, কিন্তু তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে আসে না। যারা সামাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে তারাও দ্বীনী সমঝ অর্জন করতে আসে না। গরীব-ফকীর মধ্যম শ্রেণীর লোকেরাই শুধু আসে। আল্লাহ পাকের নেজামও এমনই। এদের দ্বারাই দুনিয়াতে ইসলাম টিকিয়ে রাখবেন এবং এদেরকেই সর্বপ্রথম জান্নাত দান করবেন। আল্লাহর মরজীর বাইরে কিছুই হবে না, তবে আমরা সবশ্রেণীর জন্য দোয়া করবো। আল্লাহপাক কবূল করুন!

www.dawatul-haq.com

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১১৯ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)