লগইন রেজিস্ট্রেশন

সরকারের পলিসি : আমাদের করণীয় (পর্ব২)

লিখেছেন: ' মাসরুর হাসান' @ মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৩, ২০১২ (১:৪২ অপরাহ্ণ)

মহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমুদুল হাসান
ইসলামে নারী
নারীদের অধিকার আদায় ও নারীদের মর্যাদা রক্ষায় আজ থেকে ১৪ শত বৎসর পূর্বেই ইসলাম যথাযথ ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অবশ্য এই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইসলাম নারীদেরকে ফ্রি ভোগ এবং অবৈধ যৌন তৃপ্তিকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করে যথাযথ মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছে। নারীদের সতীত্ব রক্ষার প্রয়োজনে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে আজ নারী সমাজ স্বীয় অধিকার, সতিত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষার খাতিরে ঝাঁকে ঝাঁকে ইসলামের শীতল ছায়া তলে আশ্রয় গ্রহণ করছে। তবে এতে যৌনবাদীরা সন্তুষ্ট নয়। তারা চায় নারীদেরকে স্বাধীনভাবে ভোগ করতে। চায় ফ্রি ভাবে বিনোদন অনুষ্ঠানে, অবাধে মেলা-মেশার স্বাদ আস্বাদন করতে। তাই নারী সমঅধিকার, মানবাধীকার ইত্যাদি শ্লোগানে নারীদেরকে মাঠে-ময়দানে, রাজ পথে, হোটেলে, ক্লাবে এক কথায় সহাবস্থানে নামাতে চায়। আন্তর্জাতিক নারী নীতিমালা ‘সিডও’ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে এদের গোপন পরিকল্পনা এবং পরিনাম দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার হয়ে উঠে। এর মাধ্যমে সে পশ্চিমা বিশ্ব তো বটেই, সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বেও তাদের গোপন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে চায়।
বোরকা নিষিদ্ধকরণ
তারা তাদের এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লোভে অমুসলিম দেশের মুসলিম নারীদের হিজাব ও পর্দার ধর্মীয় অধিকারে অনায়েশে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। বরং স্বীয় ক্ষমতার দাপটে এবং জাতীয় দালাল চক্রের সাহায্যে মুসলিম দেশগুলোতেও পর্দা এবং হিজাবের বিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করে চলেছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে হিজাবের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অজুহাতে হিজাব ও বোরকার বাধ্যবাধকতাকে বেআইনী ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে যে,
(ক) পর্দার বিধান ও বোরকা পরা পবিত্র কুরআন ও হাদীস তথা ইসলামে মুসলিম নারীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিধান। সুতরাং বোরকার উপর নিষেধাজ্ঞা মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার এবং মুসলিম নারীদের মানবাধিকার লংঘনের অশত্রুর্ভুক্ত কি না?
(খ) এই নিষেধাজ্ঞা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ তথা ইসলাম বিরোধী কি না? যদি ইসলাম বিরোধী হয় এবং অবশ্যই তা ইসলাম বিরোধী- ”তাহলে ইসলাম ও কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন পাশ করা হবে না” সরকারের এ ধরনের এশতেহার এবং বারবার সুষ্পষ্ট ঘোষণা মুসলামানদের জন্য সন্দেহ এবং আতংকের কারণ হতে পারে কি না? মনে রাখতে হবে, এ ব্যাপারে ধর্মীয় ব্যাখ্যা জনগণের নিকট সেটাই গ্রহণযোগ্য বিবোচিত হবে যে ব্যাখ্যা জনগণের আস্থাভাজন হক্কানী উলামা-মাশায়েখগণ চূড়াশত্রু করবেন। অন্যকারো ব্যাখ্যা মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না। সে যেই হোক না কেন।
(গ) ইতিমধ্যে মানবাধিকারের অজুহাতে সরকারিভাবে বোরকা ব্যবহারের ধর্মীয় তথা ইসলামের অত্যাবশ্যকীয় বিধান পালন করতে নিজের স্ত্রী-কন্যাকে বাধ্য করলেও সেটাকে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।এটা তো পবিত্র করআন-সুন্নাহ এবং মুসলমানদের প্রতি চ্যালেঞ্জের শামিল। অপরদিকে বিভিন্ন স্কুল,কলেজ, ভার্সিটি এবং অন্যান্য কর্মশালায় যে সমস্ত মুসলিম নারী, যুবতীগণ
সেচ্ছায় বোরকা ব্যবহার করে তাদেরকে তিরষ্কার, ভর্ৎসনা, অপমান ও অপদস্ত করা হচ্ছে। বরং বোরকা খোলার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। অন্যথায় কর্মশালায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ, সরকার এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরব ভূমিকায় রয়েছে। এমতাবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের সন্দেহ কি অবাশত্রুর হবে? সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের সন্দেহ এবং অনাস্থা সরকারের জন্য সুফল বয়ে আনবে কি?
পবিত্র কুরআনের বিরোধিতা
পবিত্র কুরআন মহান কিতাব। ইসলামের উৎস, মুসলমানদের একমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থ। পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে অমুসলিদের আতংক এবং মাথা ব্যাথা নতুন কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সময় মক্কার মুশরিকদের নয়নমণি ছিলেন । তারা তাকে সর্বাধিক মর্যাদার আসনে সমাসীন বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই কুরআনই তাদের জন্য আতংক এবং মাথা ব্যাথ্যার কারন হয়ে দাড়ায়। পক্ষান্তরে, তারা কেবল তাঁকে গালি-গালাজ করেই ক্ষ্যান্ত হয় নাই, বরং তাঁর চরম শত্র“ হয়ে উঠে।
(ক) পবিত্র কুরআন বর্জন করার শর্তে তাঁকে আজীবন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্টিত করার লোভনীয় প্রস্তাব করে সম্পূর্ণ ব্যার্থ হয়।
(খ) প্রচুর অর্থ-কড়ি, স্বর্ণ-রৌপ্য, হীরা-কাঞ্চন, মণি-মুক্তার বিনিময়ে পবিত্র কুরআন এবং কুরআনের আদর্শ শিক্ষার আহবান থেকে সরে দাড়ানোর প্রস্তাব করেও বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মত করতে পারে নাই।
(গ) আরবের সেরা সুন্দরী নারীদের প্রলোভন দিয়েও বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কণ্ঠ রোধ করার ন্যাক্কারজনক প্রয়াস চালাতেও লজ্জাবোধ করে নাই। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রেও তারা সফলকাম হতে পারে নাই।
(ঘ) পবিত্র কুরআনের কতিপয় ধারায় সংশোধনী এনে তাদের কিছু প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে সমজোতার প্রচেষ্টা করতেও তারা কণ্ঠাবোধ করে নাই। কিন্তু তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলে সফলকাম হতে পারে নাই।
(ঙ) পবিত্র কুরআন আসমানী কিতাব নয়, বরং ইয়াহুদী, খৃস্টান ধর্মগ্রন্থ থেকে গৃহীত এবং মানব রচিত গ্রন্থ, এ কথা সাব্যস্ত করার জন্য বড় ষড়যন্ত্র করে।
(চ) বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাগল, জাদুকর বলে প্রপাগাণ্ডা করে। কিন্তু তাদের বহুবিধ তদবীরের কোনটিই কাজে লাগে নাই।
(ছ) বরং পবিত্র কুরআনের ছোট একটি সূরার মত সূরা অথবা একটি মাত্র আয়াত তৈরী করে দেওয়ার খোদায়ী চ্যালেঞ্জের মেকাবেলায় নেহায়াত অসহায় এবং ব্যার্থ হয়। তাই ক্ষুব্ধ এবং পরশ্রীকাতর হয়ে পবিত্র কুরআনকে চিরতরে খতম করে দেওয়া এবং বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর অনুসারী সাহাবায়েকেরামকে ধক্ষংস করে দেওয়ার অমানবিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
বৃটিশ বেনিয়াদের চক্রান্ত
একই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বৃটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষে হাজার হাজার মাদ্রাসা, মসজিদ, খানকাহ ধক্ষংস করে। যার বাস্তব প্রমাণাদী এখনও ভারতবর্ষে বিদ্যমান রয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম বিনষ্ট করে তাদেরকে শহীদ করে দেয়। কেবল বালাকোটের ময়দানেই ১০ হাজার উলামা-মাশায়েখদেরকে শহীদ করে দেয়। তাদের নির্যাতন-নিপীড়ন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমানবিক, মানব সভ্যতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড করেছে তা আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। তাদের এই নগ্ন ও বর্বরতার আচরণ কখনও থেমে থাকে নি বরং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে অব্যাহত রয়েছে।
মা কালির রক্ত
“আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ।” জাতির জনকের এই প্রাণ ভরা ঘোষণা এবং আশা-ভরসায় ছাই দিয়ে বাংলাদেশের বুকে দাড়িয়ে শুধাংশু শেখর হালদার বুক ফুলিয়ে ঘোষণাও দেয়,“মা কালির রক্ত দিয়ে (মুসলমান) দেরকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র করতে হবে।” তার এই ধৃষ্টতার কোন সুরাহা এখনও হয় নাই এবং এর কোন রহস্য আজ পর্যন্ত উদঘাটিত হয় নাই। এধরনের উক্তির অন্তরালে জনগণ মারাত্মক অশনি সংকেত অনুভব করে আতংকিত রয়েছে।
বিধর্মীদের আহবান
ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রশাসনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
(ক) সংবিধান থেকে বিস্মিল্লাহির রহমানির রহীম,
(খ) সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা এবং বিশ্বাস
(গ) রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার জোর প্রয়াস চলছে,
(ঘ) ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করণ,
(ঙ) ফাতওয়ার আইনে কিছুটা সংশোধন আনা হলেও বোরকা নিষেধের আইন বহাল রয়েছে, বিসমিল্লাহর অনুবাদ বিকৃত অনুবাদ করা হয়েছে। আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস তুলে দেয়া হয়েছে।
(চ) জাতীয় শিক্ষানীতি থেকে ইসলামী শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক ধারাসমূহ বাতিল করণের সমস্ত দাবী এবং প্রস্তাবাবলী চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।
(ছ) জাতীয় নারীনীতিমালার অনিসলামিক ধারা সমূহের সংশোধনী জোরালো দাবী প্রত্যাখিত হচ্ছে,
(জ) ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের সহায়তায় এদেশে কিছু শক্তি অতিতের যে কোন সময়ের তুলনায় অধিক তৎপর রয়েছে,
(ঝ) সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদেরকে অধিকারসহ সব বিষয়ে কোনঠাসা করা হচ্ছে,
(ঞ) হক্কানী আলেম সমাজ এবং পীর মাশায়েখদের উপর থেকে জনগণের আস্থা এবং শ্রদ্ধা-ভক্তি বিনষ্ট করার কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। ঠিক এমন সুগম মূহূর্তে চরম হিংসুক নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডঃ অর্মত্য সেন তার “আরগুমেন্টটিভ ইণ্ডিয়া” বইয়ে কুরআন ও হাদীস নির্দেশিত ইসলাম (ইসলাম ধর্ম হাজার হাজার বছরেরও পুরোনো হওয়ায়) পরিত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম থেকে উদ্ভব সম্রাট আকবরের দ্বীনে এলাহীকে মূলণীতি হিসেবে গ্রহণ করতে পরামর্শ দেন। ডঃ অমর্ত্য সেনের মতে সম্রাট আকবরের দ্বীনে এলাহী এবং সেক্যুলারিজম ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ মূলত হিন্দু ধর্ম থেকেই উদ্ভূত। ডঃ অর্মত্য সেন আরও বলেন, সমাজের অবশ্যই উচিৎ এই দানবীয় ঐতিহ্যের বিরোদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও প্রত্যাখ্যাণ করা। ডঃ অমর্ত্য সেন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। ইসলাম সর্ম্পকে তার ন্যূনতম জ্ঞানও নেই এই কথা সহজেই বলা চলে। ইসলাম সম্পর্কে মিস্টার গান্ধি যে অবিস্মরনীয় নিরপেক্ষ মনোভাব ব্যক্ত করেছেন তা ডঃ অমর্ত্য সেনের অজানা থাকার কথা নয়। মিস্টার গান্ধি বলেন,
১। ইসলাম তার পরম উৎকর্ষের যুগেও প্রতি হিংসা এবং হঠকারিতা মুক্ত ছিল।
২। ইসলাম সমগ্র পৃথিবীর নিকট নন্দিত।
৩। যখন পশ্চিমা বিশ্ব মূর্খতা এবং অসভ্যতার অন্ধকারে আচ্ছাদিত ছিল তখন পূর্ব থেকে এক আলোকময় নক্ষত্র উদিত হয়। যার উজ্জল আলোতে মূর্খতা এবং অসভ্যতার অন্ধকার দূরীভূত হয়।
৪। ইসলাম মোটেই বাতিল এবং মনগড়া ধর্ম নয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উচিত তারা যেন ইসলাম ধর্ম গভীর ভাবে মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করে। যাতে অন্যান্যদের মত তারাও ইসলাম ধর্মকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে বাধিত হয়।
৫। আমি অত্যান্ত দৃঢ়তার সাথে বলছি, ইসলাম কখনই তলোয়ারের জোরে প্রসারিত হয় নাই। বরং ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বাস, দৃঢ়তা, ত্যাগ-তিতীক্ষা, তার নিপূণ ও মধুর চরিত্রগত গুণাবলিই মূলত ইসলামের প্রচার-প্রসার ও সমাদৃত হওয়ার মূলশক্তি। তার উন্নত চরিত্র এবং গুণাবলি মানুষের হৃদয়কে জয় করতে সক্ষম হয়েছে।
৬। ইউরেপিয়ানরা দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলামের প্রভাব অনুধাবন করে আতংকগ্রস্থ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। স্পেনের উন্নতি মূলত ইসলামি শিক্ষা দর্শনেরই প্রকৃত অবদান। মরক্কো সভ্যতার বিজয় ইসলামি শিক্ষারই সুফল।
৭। ইসলাম। ঐক্যের প্রতিক। ইসলাম মানুষকে ভাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে। ইউরোপিয়ানরা ভালোভাবেই অনুধাবনে সক্ষম হয় যে, যদি ইউরেপিয়ানরা ইসলাম ধর্ম অনায়াসে গ্রহণ করে ফেলে তাহলে নওমুসলিমদের মধ্যে সমানাধিকারের দাবি কঠোর হয়ে উঠবে এবং অধিকার আদায়ের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরতে পারে। যদি ভ্রাতৃত্ববোধ কোন অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে ইউরেপিয়ানদের এই আতংক সত্যিই যথার্থ।
৮। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা এই যে, যারা ধর্মান্তরিন হয়ে খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে তারা ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে নাই। পারে নাই তারা তাদের ন্যূনতম অধিকার টুকু হাসিল করতে। অথচ যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে ঐক্য বন্ধন সুদৃঢ় হয়েছে। তারা পরস্পরে ভ্রাতৃত্ববোধ সুসংহত রয়েছে।
৯। ইউরেপিয়ানরা কেবল মুসলিম ঐক্য শক্তিকেই অধিক ভয় করে থাকে। ডঃ অর্মত্য সেন অমুসলিম মনিসীদের প্রাণ খোলা এধরণের সুস্পষ্ট বিশ্বাস এবং অনুভুতির বিষয়ে অনভিজ্ঞ রয়েছে (তা বলা মুশকিল) অথবা ডঃ অমর্ত্য সেন হয়তো বা ইসলাম এবং মুসলিম বিদ্বেষীদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য ইসলাম এবং মুসলমানদের ব্যাপারে পাগলের প্রলাপ করেছেন। তা মেনে নেওয়ার কোন যুক্তিকতা নাই। বাস্তবে তিনি যা বলেছেন এবং লিখেছেন তা মূলত সিণ্ডিকেটেড বক্তব্য। বিগত বছরগুলোতে ইয়াহুদিরা পবিত্র কুরআনের ১৬০০ আয়াত পবিত্র কুরআন থেকে বাদ দেওয়া অথবা বাধ্যতামূলক ভাবে নিষিদ্ধকরণের জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে তৎপরতা চালিয়ে আসছে এবং প্রচুর পরিমাণ বিকৃত কুরআন ছাপিয়ে আরব এবং মুসলিম দেশসমূহেও বিলি করে ধরা পরেছে। ভারতীয় হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় হাইকোর্ট তা গ্রহণ করে নাই। কিছু দিন পূর্বে বাংলাদেশ আদালতে কুরবাণী সংক্রান্ত রিট পিটিশন দায়ের করা হলে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। খৃস্টান ধর্ম গুরুরা পবিত্র কুরআন পুড়িয়ে টুইনটাওয়ার ডে পালনের মত ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ডঃ অমর্ত্য সেনগংদের এধরণের সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টিকারী উক্তিগুলো আন্তর্জাতিক ইসলাম মুসলিম বিরোধী চক্রান্তের ধারাবাহিকতারই নামান্তর। এতে কি সন্দেহের অবকাশ আছে?
ডঃ হাসানুজ্জামানকে ধন্যবাদ
ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডঃ হাসানুজ্জামানকে জানাই আন্তরিক ধন্যাবাদ। তিনি ডঃ অর্মত্য সেন সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন যে, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ডঃ অমর্ত্য সেনের মতামত দৈশিক দোষে দুষ্ট… ইসলাম ধর্ম নিয়ে তিনি যে মতামত দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। ডঃ অমর্ত্য সেনের মতে সেক্যুলারিজম মূলত হিন্দু ধর্ম থেকে উদ্ভব হয়েছে- এ ব্যাপরে ডঃ হাসানুজ্জামান বলেন, সেক্যুলারিজম যদি হিন্দু ধর্ম থেকে হয় তাহলে তা প্রকৃত ধর্মমতবাদ দিয়ে মুসলমানরা গ্রহণ করতে পারে না। ডঃ অর্মত্য সেন একজন সম্মানিত ও জ্ঞানী ব্যক্তি হলেও তিনি ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তি করেছেন। পৃথিবীর যে কোন ধর্ম প্রাণ মুসলমান এর বিরোদ্ধে প্রতিবাদ করবেন। সম্রাট আকবরের দ্বীনে এলাহী হিন্দু ধর্ম থেকেই উদ্ভূত ডঃ অমর্ত্য সেন এই মর্মে মুসলমানদেরকে পুরোনো ইসলামী ঐতিহ্য পরিহার করে যুক্তির আলোকে বিবর্তিত দ্বীনে এলাহী গ্রহণের প্রতিও আহবান করেছেন এবং ইসলামী বিধি অনুযায়ী শ্বাসন পরিচালনা করায় সম্রাট আওরঙ্গজেবের কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু ডঃ অমর্ত্য সেন স্বীয় গবেষণার সময় স্বীয় নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে সচেষ্ট হন নাই। তার কঠোর সমালোচনা করে ডঃ হাসানুজ্জামান লিখেন, ডঃ অমর্ত্য সেন মনে করেন মুসলিম আর ইসলাম হলো সাম্প্রদায়িক। নিজেকে অজ্ঞেয়বাদী হিসেবে পরিচয় দিলে ও তার বইয়ে তিনি হিন্দুদের ৩৩ কোটি ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গীতা ও স্মৃক বেদে তর্ক প্রিয় ঐতিহ্যের প্রাধান্য রয়েছে। যুক্তি-তর্ক গণতান্ত্রিক ধারা হিন্দু ধর্মের আদর্শ। আর এথেকেই ভারতের আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বলে ডঃ অমর্ত্য সেনের ধারণা। কিন্তু হিন্দু ধর্মে প্রচলিত বহু দেবতার অস্তিত্ব এবং নিজেদের হাতে বানানো দেবতাকে পূজা করার পিছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি উপস্থাপন করা যায় না। একজন নোবেল বিজয়ী জ্ঞানী ব্যক্তি হয়েও অমর্ত্যসেন হিন্দু ধর্মের এই অসারতার বিষয়টি অনুধাবন করেননি। বরং সেক্যুলারিজমসহ অন্য ধর্মগুলোকেও তিনি হিন্দু ধর্মের মধ্যে গুলিয়ে ফেলার অভিপ্রায়ে লিপ্ত হন। সুতরাং অমর্ত্যসেন গংদের অবিবেচনা-প্রসূত উক্তি ও যুক্তি প্রবণতা কেবল প্রচলিত গণতন্ত্র এবং মৌলিক মানবাধিকারেরই পরিপন্থী নয় বরং বিশ্বের ৬০টি স্বাধীন দেশের দেড়শতাধিক কোটি মানুষ যে ধর্মে বিশ্বাসী তার উপর প্রত্যক্ষ আঘাত হানা এবং তাদেরকে উত্তেজিত করা ও উস্কে দেয়ার শামিল।
সংবিধান প্রসঙ্গ
বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবিধান কোন আসমানী ওহী বা কিতাব নয় যে যার সংশোধন অথবা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন চলে না। এটা মানব রচিত সংবিধানের ধারাসমূহে যুগের চাহিদানুসারে সংশোধনী আনাই স্বাভাবিক। রোগীর চিকিৎসার সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজনে ডাক্তার যেমন প্রেসক্রিপশনের মধ্যে রদবদল করে থাকে তেমনিভাবে দেশ ও জাতির শান্তি-নিরাপত্তা ও সার্বিক শৃংখলা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে সংবিধানে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন অনেক সময় অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। স্বয়ং সংবিধানেও সংশোধনী আনার ধারা, এবং শর্ত-শরায়েত সংযুক্ত থাকে। এ নিয়ে কোন ধরনের মতবিরোধ এবং বাকবিতণ্ডা হওয়ার কথা নয়। এই পর্যন্ত যারা বাংলাদেশের সরকার পরিচালনা করে আসছেন। তারা প্রত্যেকেই এই কাজটি করে আসছেন। কিন্তু বর্তমান সরকার এবার পুনরায় সংবিধান সংশোধন করার কাজটি সেরে ফেলেছেন। তবে সরকারকে অন্যান্য সময়ের তুলনায় অধিক বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অবশ্য কোন বিরোধিতাই সরকার আমলে আনছে না। সরকার তার নির্ধারিত পরিকল্পনার বাইরে কোন পরামর্শ কিংবা সমঝোতার প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজী নয় বলে মনে হচ্ছে। অতএব এই এক পেশে সংশোধনীর পরিণাম কী দাঁড়ায় সে ব্যাপারে চূড়ান্ত মন্তব্যের জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
জনগণের দোহাই
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, যে ধারাসমূহের সংশোধনী নিয়ে চরম বিরোধিতা দেখা দিয়েছে, এ ব্যাপারে প্রত্যেকেই জনগণকে নিজের দাবীর সমর্থক বলে প্রচার করছে। প্রত্যেকেই স্বীয় দাবীকে দেশের নাগরিকদের দাবী আখ্যায়িত করে চলেছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে তাদের মতবিরোধের মূলকারণ দুটি প্রতীয়মান হয়। জনগণের দাবী বলাটা মূলত রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মূলত দুই মেরুতে বিভক্ত। উভয়ের চিন্তা-ধারার মধ্যে আবার যথেষ্ট পার্থক্যও বিদ্যমান। বামধারা কিংবা ডানধারা, যে যাই করুক তাদের অন্তর স্বচ্ছ বলে মনে হয় না। বরং অভিজ্ঞতা তো এই যে,
(ক) তারা চায় নিজস্ব চিন্তাধারা বিস্তার হোক। তাই তারা আপন চিন্তাধারা দেশের নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দেয়ার সবরকম কলাকৌশল প্রয়োগ করে।
(খ) যে কোন মূল্যে ক্ষমতা অর্জন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা। এর জন্য যখন যা করার দরকার তা করতে তারা কসুর করে না। সুতরাং জনগণের দোহাই দেয়া এটা তাদের একটি কৌশল মাত্র। আসলে জনগণের কোন মূল্যায়ন তাদের নিকট নেই। প্রত্যেক দলই স্বীয় লক্ষ্য অর্জনের তাগিদে সংবিধানে সংশোধনী আনার চেষ্টা করে। এক সময় যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে দুর্বার আন্দোলন করেছে এবং দাবী আদায় করে ছেড়েছে, তারাই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয় বরং মর্যাদাহানীকর এবং বেআইনী বলে মন্তব্য করছে। অপরপক্ষে যারা সরকারের বাইরে রয়েছে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে অটল থেকে সরকারকে ষড়যন্ত্রকারী বলে আখ্যায়িত করছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার জন্য আন্দোলন করছে। মজার ব্যাপার হলো, উভয়েরই দাবী হচ্ছে জনগণ তাদের সাথে রয়েছে। অথচ জনগণ একথা বুঝতে মোটেই অক্ষম নয় যে, এখানে মূলত প্রত্যেকেই নিজের স্বার্থেই যা করার করে যাচ্ছে। বস্তুত জনগণ তাদের আচরণে ক্ষুব্ধ এবং আতংকিত বোধ করছে।
উস্কানিমূলক বক্তব্য
যে সমস্ত কারণে জনমনে আতংক এবং আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয় অথবা উত্তেজনা এবং সাম্প্রদায়িকতার পথ উন্মুক্ত হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভিত্তিহীন প্রোপাগাণ্ডা, প্রতিপক্ষকে তিরস্কারের সুরে ভর্ৎসনা করা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানা। এরূপ বল্গাহীন কথাবার্তা যদি উচ্চপদস্ত লোকদের মাধ্যমে হয় যাদের অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, তাহলে তা হয় আরো অধিক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ। যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করতে চায়, দেশের শান্তি শৃংখলা ভঙ্গ করতে প্রয়াসী, কেবল তারাই এ ধরনের উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে থাকে। শান্তিকামীদের কথাবার্তা আদৌ এরূপ হতে পারে না।
যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক মুসলমান। স্বাধীনতা আন্দোলনের মুক্তিযোদ্ধাদের ৯৭% আল্লাহ রাসূলে বিশ্বাসী ছিল। যারা জান-মাল ও ইযযতের চেয়ে ইসলামকে অগ্রাধিকার দেয়। যে দেশ সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ, যে দেশের ৯৯% পার্লামেন্ট সদস্য, মন্ত্রী-মিনিষ্টার এবং রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত মুসলিম এবং তারা ইসলামকে শান্তির ধর্ম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে বিশ্বাস করে বক্তৃতা ও বিবৃতিতে বুক ফুলিয়ে ইসলামের কথা বলেন, যে দেশের সংবিধানে আল্লাহ সর্বশক্তিমান, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিদ্যমান রয়েছে, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী বারবার কুরআন-সুন্নাহর ভাবধারা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অধিকার সংবিধানে অবশ্যই থাকবে এবং ইসলাম বিরোধী কোন আইন পাশ করা হবে না বলে জনগণের সাথে ওয়াদাবদ্ধ, কেউ দেশের সংবিধান সংশোধনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে পরামর্শের জন্য গঠিত কমিটির প্রধান পদে তো দূরের কথা একটিমাত্র সদস্য পদেও সর্বজন-স্বীকৃত ইসলাম ও কুরআন সুন্নাহ বিশেষজ্ঞ কেউ স্থান পায়নি। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস’ বাদ দেয়া হলো। বিসমিল্লাহর অনুবাদ বিকৃত করা হলো।
অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে সংবিধান সংশোধনের নামে মূলত তাদের ইসলাম এবং মুসলমানের মূল উৎপাটন করাই উদ্দেশ্য। এই কাজের পেছনে মূল হোতা কারা? মুসলমানের এদেশে এত সাহস ও ধৃষ্টতার অন্তরালে কারা? এটাই কি শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠার সংবিধান সংশোধনী, নাকি দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতার পথ সুগম করার তৎপরতা? সময় থাকতে সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।
ইসলাম এবং রাজনীতি
এক শ্রেণীর ধর্মদ্রোহী ইসলাম বিদ্বেষীদেরকে একথা বলতেও শোনা যায় যে, ইসলাম ধর্মে রাজনীতি ও প্রশাসনিক কোন দিক-নির্দেশনা নেই। ইসলাম অরাজনৈতিক এবং নিছক ব্যক্তিগত বিষয়। রাষ্ট্র এবং প্রশাসন চালানোর কর্মপন্থা ইসলামে নেই। অনেকে এও বলে বেড়ায় যে, বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের ব্যক্তিজীবন গড়ার নবী ছিলেন। সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্র কায়েম করা ইসলামের কোন মৌলিক বিষয় নয়। যদি তাদের কথা সত্য হয় তাহলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম এবং সম্প্রসারণের জন্য কেন যুদ্ধ-জেহাদ করেছিলেন? এর উত্তরে তারা বলে থাকে যে, তখন মদীনার অবস্থা নেতৃত্বশূন্য ছিল, তাই প্রকৃতির বিধানই কেবল কার্যকর হয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় আইনগতভাবে ইসলামী রাষ্ট্র অথবা সরকার কায়েম হয়নি। তারা এক পর্যায় একথাও বলে যে, এজন্যেই মদীনার সনদে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ’ এ ধরনের বিষয়াদি মৌলিক বিষয় হিসেবে মর্যাদা লাভ করে নাই। এর জবাবে বলা যায় যে, এ ধরনের উক্তি অজ্ঞতার পরিচায়ক, ইসলামের মতো একটি সামগ্রিক জীবন-বিধান সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানের অধিকারীর পক্ষেও এ ধরনের উক্তি অসম্ভব। এ ধরনের উক্তি উস্কানিমূলক, মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। কেবল ইসলাম এবং মুসলিম বিদ্বেষী ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষেই এরূপ উক্তির অবতারণা করা সম্ভব।
বস্তুত ইসলামের মূল উৎস পবিত্র কুরআন-সুন্নায় ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের প্রতি সুস্পষ্ট এবং বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং বিস্তারিত বিধি বিধান বর্ণিত রয়েছে। ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাষ্ট্র কায়েম করেছেন। তাঁর উত্তরসূরীদেরও খেলাফত পরিচালনায় রয়েছে দীর্ঘ চৌদ্দশ বছরের সোনালী ইতিহাস, অদ্যাবধি পৃথিবীতে মুসলমানদের ৬০টির মতো রাষ্ট্র রয়েছে।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান। ইসলামী বিধানের ব্যাপকতাই এর জলন্ত প্রমাণ। যদি ইসলাম মানুষের সামাজিক, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানে অক্ষম হয়, জীবনের সমস্যাসমূহের সঠিক-সুন্দর সমাধান না করতে পারে, তাহলে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান বলা যাবে কী করে? অথচ পবিত্র কুরআন-সুন্নাহয় ও ইসলামকে সার্বিক এবং পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ঘোষণা করা হয়েছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মানুষ যে সমস্ত বিষয়ে দিকনির্দেশনার মুখাপেক্ষী হয়, অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে সে সমস্ত সমস্যার সমাধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তা কয়েকটি বিষয়ে বিভক্ত। (১) বিশ্বাসগত বিষয়ে। কারণ মানুষ প্রফুল্ল মনে তাই করে যা তার অন্তরে বিশ্বাস হয়। (২) ইবাদত-উপাসনার বিষয়াদি। মানুষমাত্রই স্বভাবগত ও সৃষ্টিগতভাবে আপন স্রষ্টার আনুগত্যে ও এবাদতে আত্মতৃপ্তি বোধ করে থাকে। (৩) মানুষ বস্তু জীবনে সফলতা অর্জনের প্রয়োজনে অর্থসম্পদ, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে বাধ্য। এর জন্য বিধি-বিধানের আবশ্যকতা সর্বজন-স্বীকৃত। কারণ মানুষ সামাজিকতার শুদ্ধতার প্রয়োজনে, তদরুপ শান্তি-শৃংখলা, সভ্যতা-শিষ্টাচারিতার প্রয়োজনে পরস্পর মধুর ব্যবহার ও পরিমার্জিত আচরণের আবশ্যকতা অনুভব করে। ভাল ব্যবহারই মানুষের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্য।
মানুষের চরিত্রের পবিত্রতাই তাকে সর্বশ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করে। চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষ সমস্ত সৃষ্টির তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ। যার চরিত্রগত মধুরতা ও পবিত্রতা নেই সে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট। ইসলামে এসমস্ত বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা রয়েছে এবং যারা মুসলমান তাদেরকে এ ব্যাপারে প্রদত্ত বিধি-বিধান পালনে এবং অনুশীলনে বাধ্য করেছে। এখান থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত নয় বরং সামাজিক, প্রশাসনিক সব বিষয়ের পরিপূর্ণ জীবন-বিধান। সুতরাং যারা ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত জীবনের পথ ও পাথেয় বলে মনে করে থাকে, তারা মোটেই সঠিক চিন্তা এবং জ্ঞানের অধিকারী নয়।
কুরবানীর মাসআলা
যারা উস্কানীমূলক বক্তব্য দেয় অথবা উলামা-মাশায়েখ ও মাদরাসা-মসজিদের সমালোচনা করে, তারা এমন এমন উদ্ভট কথাবার্তা ও যুক্তির অবতারণা করে যা শুনলে অন্তরে খুব কষ্ট অনুভূত হয়। যদি উক্তিকারী ব্যক্তি মুসলমান হয় এবং শিক্ষিতও হয়, তাহলে আরো অধিক কষ্টের কারণ হয়। বিষয়টি সুস্পষ্ট করার প্রয়োজনে ৫ এপ্রিল ২০১১ দৈনিক ইত্তেফাকের “কেন এই হৈ চৈ” শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধের কিছু বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা যাক।
প্রবন্ধটি রচনা করেছেন একজন নামাযী মুসলমান। তিনি কে? তার ভাষায় “তখন আমি লাল মাটিয়ায় থাকতাম। কয়েক মাস আগে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছি এবং অল্প দিনের মধ্যে সরকারী বাসভবনে চলে যাবো।” অর্থাৎ প্রবন্ধ লেখক একজন অতিরিক্ত বটে, তবে তিনি একজন বিচারপতি এবং সরকারী বাসভনে অবস্থান লাভের অধিকারী। বিচারপতিগণ অন্যদের তুলনায় অধিক বিবেচক হয়ে থাকে। জনগণের ন্যায় বিচার লাভের তারাই সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। তাই তাদের কথাবার্তা বলায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে যেমন হতে হয় স্বচ্ছ ও সততাপরায়ণ তেমনি হতে হয় নিরপেক্ষ। কোন মত, পথ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত হওয়া বিচারকদের যোগ্যতার প্রথম শর্ত। তিনি ঈদের দিন পারিবারিক সিদ্ধান্ত মুতাবিক বাইতুল মুকাররম মসজিদে প্রথম জামাতে ঈদের নামায আদায় করে গরু কুরবানী দেয়ার কাজ শেষ করেন। পরবর্তী শুক্রবারে স্বীয় বাসভবনের পাশের মসজিদে জুমার নামায পড়তে গিয়ে খুতবার পূর্ব-বক্তৃতায় তিনি খতীব সাহেবকে বলতে শোনেন যে, পাড়ার মসজিদে ঈদের নামাযের আগে কুরবানী দিলে সেটা জায়েয হবে না, আবার কুরবানী দিতে হবে। খতীব সাহেবের বক্তব্য বিচারপতি সাহেবের নিকট সম্পূর্ণ ভুল হিসেবে ধরা পড়ে। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, যে কয়দিন এখানে আছি কিছু দূরে অন্য অন্য মসজিদে জুমার নামায পড়বেন। কারণ কী? খতীব সাহেবের পেছনে কি নামায হবে না? মনে হয় কারণ এটা নয়। নচেৎ অবশ্যই অন্যদের নামাযের শুদ্ধতার বিষয়টি বিচারপতি সাহেবের বিবেচনার বিষয় হতো এবং তিনি অবশ্যই খতীব সাহেবকে বলতেন। মূল কারণ হলো, নামায তো হবে কিন্তু ভুল মাসআলা বর্ণনাকারীর পেছনে জেনেশুনে নামায পড়লে নামাযে তেমন তৃপ্তি আসে না, তাই দূরের অন্য মসজিদে গিয়ে জুমার নামায আদায় করার এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু মাননীয় বিচারপতি সাহেব যদি সেই দূরের মসজিদে গিয়ে ইমামের একই বক্তব্য শ্রবণ করতেন, কিংবা সব মসজিদে গিয়ে একই বক্তব্য শ্রবণ করতেন তাহলে শেষে তার কোন ইমামের পেছনেই নামায পড়া সম্ভব হতো না। নিজেই ইমামতি করে জামাত কায়েম করতে হতো অথবা জামাত তরক করে সর্বদা একাকী নামায পড়তে হতো। কিংবা অভিজ্ঞ আলেমের নিকট সঠিক মাসআলা জেনে নিজের ভুল স্বীকার করতে হতো। কেননা বুখারী শরীফের বিশুদ্ধ হাদীসেও মাসআলা এভাবেই বর্ণিত আছে এবং হাদীসের আলোকেই সমস্ত ফকীহগণ ও হাদীস বিশারদগণ ঐকমত্য পোষণ করে বলেছেন যে, যে এলাকায় ঈদের নামায হয় সেই এলাকায় ঈদের নামাযে শরীক না হয়ে নামায আদায়ের পূর্বে কুরবানী দিয়ে নামায আদায় করলে ওয়াজিব কুরবানী আদায় হবে না। তাকে পুনরায় কুরবানী করতে হবে। বুখারী শরীফসহ অন্যান্য হাদীস, তাফসীর এবং সমস্ত ফাতওয়ার কিতাবে মাসআলা এরূপই লেখা রয়েছে। কিন্তু জনাব বিচারপতিসাহেব মাসআলাটি যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজন মনে করেন নাই। অথচ সর্বজন স্বীকৃত নিয়ম হচ্ছে ঐ বিষয়ে অভিজ্ঞদের শরণাপন্ন হওয়া। এজন্যেই বিচারকদের কোন বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজনে অথবা বিচার-সম্পর্কীয় কোন বিষয়ে চূড়ান্ত অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে অভিজ্ঞ বিচারকদেরই শরণাপন্ন হতে দেখা যায়। নিজের চিন্তা-ভাবনার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না। কিন্তু প্রবন্ধ রচনাকারী স্বীয় ভুল ধারণাকে চূড়ান্ত সঠিক মনে করে কোন অভিজ্ঞ আলেমের নিকট মাসআলাটি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন নাই। অথবা আলেম-উলামা এবং খতীব-ইমামদের প্রতি কেন জানি তার অন্তরে চরম ক্ষোভ রয়েছে; যে কারণে তাদের স্মরণাপন্ন হতে বিবেকে সায় দেয়নি। যদি তিনি নিজেই দ্বীনী মাসআলা-মাসায়েলের বই-পুস্তক থেকে মাসলাটি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভে উদ্যোগী হতেন তাহলেও এ ধরনের পদস্খলনের ঘটনা হয়তো ঘটতো না। এটা শেখার জন্য আরবী সাহিত্যের পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন হয় না। কেননা এ ধরনের জরুরী মাসআলা-মাসায়েলের অনেক বই-পুস্তক আলেমগণ বাংলাভাষায় রচনা করেছন।
অনভিজ্ঞতার পরিণাম
প্রচলিত আছে যে, ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকর’ “নীম (সাধারণ) মুল্লা খাতরায়ে ঈমান” “নীমে তীব (চিকিৎসা জ্ঞান) খাতরায়ে জান।” কারণ ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু ঘটে। মাননীয় বিচারপতি সাহেব চুপচাপ থেকে দূরের মসজিদে জুমা আদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আপাতত ঝগড়া এড়ানোর মতো শিষ্টাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন নাই। বরং একটি মাত্র মাসআলায় স্বীয় ভুলকে চূড়ান্ত সঠিক মনে করে পুরো আলেম সমাজকে প্রতিপক্ষ মনে করে একটি অভাবনীয় প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এই প্রবন্ধের পরিণামে আর কোন কিছু হোক না হোক ইসলাম সম্পর্কে তার এবং তার মতো মত ও পথ অবলম্বনকারী জ্ঞানী-গুণীদের চিন্তাধারার ব্যাপারে জনগণের ধারণার বাস্তবতা প্রমাণিত হয়েছে।
নিজের ভুলের উপর অটল থেকে আলেম-উলামাদের দুর্বল মনে করে তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন প্রোপাগাণ্ডা চালানো হয়েছে। ইসলাম এবং ইসলামের ধারক-বাহক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওয়ারিশ, প্রতিনিধি ওলামা মাশায়েখদের প্রতি তার আন্তরিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
ভুল শিক্ষা গ্রহণের পরিণাম
মূর্খতার কারণে জাতির দুর্ভোগ হয় ঠিক, কিন্তু ভুল শিক্ষার পরিণামে জাতিকে অনেক সময় চরম মাশুল দিতে হয়। এজন্যেই শিক্ষার জন্য আদর্শ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের গুরুত্ব অপরিসীম। বিচারপতি সাহেব মাসআলার সঠিক জ্ঞান লাভের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন নাই। অথচ উপলব্ধি করার যথেষ্ট যুক্তি ছিল। কেননা আর যাই হোক একজন খতীব মাসলাটি বলেছেন। মাসলাটিতে সন্দেহ হেতু একটু যাচাই বাছাই করাই ছিল যুক্তিযুক্ত। অথবা যেভাবে চুপচাপ ছিলেন, এভাবে নিরব ভূƒমিকাই ছিল অতীব শ্রেয়। কিন্তু কেন তিনি প্রবন্ধ আকারে বিষোদগারে প্রয়াসী হন? তার ভাষায়ই শোনা যাক।” “সেদিনও … এর ছেলে ঐ মসজিদে জুমার নামায পড়তে গিয়েছিলেন। তিনি আমার অজান্তে এই মতামতের যথার্থতা নিয়ে ইমামকে প্রশ্ন করেন, এবং যে উত্তরটি পান সেটা তার ভগ্নীপতি আরবী অধ্যাপক ড. …-এর কাছে গিয়ে যাচাই করে সঠিক জানেন। অতঃপর ড. সাহেব আমার বাসায় আসেন। কিন্তু আমি ঘটনাটি এগুতে দেইনি।”
উক্ত ড. সাহেব খতীব সাহেবকে প্রশ্ন করে যে উত্তর পেয়েছিলেন, যদি তা প্রবন্ধ উল্লেখ করা হতো তাহলে পাঠকবৃন্দের নিকট সুস্পষ্ট হতো যে খতীব সাহেবের উত্তর যথার্থ কি না। ড. সাহেব ভালই করেছেন যে, তিনি ভগ্নীপতির শরণাপন্ন হয়েছেন। আর ভগ্নীপতি যেহেতু আরবী অধ্যাপক, তাই তার দেয়া মতামতের উপর ড. সাহেবের অবিশ্বাসের কোন কারণ হতে পারে না। কিন্তু আরবী সাহিত্যিক হওয়া এবং শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েলের জ্ঞানী হওয়া যে এক নয় হয়তো এ বিষয়টি ড. সাহেবের গোচরিভূত হয়নি। ড. সাহেব যদি একটু চিন্তা-ভাবনা করে কোন ফাতওয়া বিভাগের শরণাপণœ হতেন। যদি কষ্ট করে লালমাটিয়া মাদাসারও শরণাপন্ন হতেন তাহলেও হয়তো এত বিড়ম্ভনা হতো না। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, ড. সাহেবও ভগ্নীপতির কাছ থেকে ভুল মাসআলাই আহরণ করে ক্ষ্যান্ত হয়েছেন। ফলে একের পর এক ভুলের ধারাবাহিকতায় বিচারপতি সাহেব প্রবন্ধ লিখে সমাজে আলেমদের মনগড়া ফাতওয়া দেয়া এবং ভুল মাসআলা-মাসায়েল ছড়ানোর প্রোপাগাণ্ডায় লিপ্ত হয়েছে। তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে আমার কোন প্রতিক্রিয়া না হলেও পরবর্তীতে এক সময়ে ঘটনাটি আমার চিন্তার খোরাক হয় এবং আমার উদ্দেশ্য খুৎবার পূর্ব ঐ বক্তব্যের তাৎপর্য উপলব্ধি করে আমি অবাক হই।” কী তাৎপর্য? অবাক হওয়ার কারণ কী এবং তিনি চিন্তার কী খোরাক পেলেন? বিচারপতির বিশোদগারের ভাষায় “প্রকৃতপক্ষে ঐ মসজিদের ইমাম তার মসজিদ-কেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় এলাকার অস্তিত্বের এবং সেখানে তার ধর্মীয় আধিপত্বের দাবি করেছিলেন।” প্রশ্ন হচ্ছে যে, যে ভুল মাসআলা-মাসায়েল দেয়ায় অভ্যস্ত সে কি কোন দিন মানুষের মন জয় করতে পারে? পারে কি ভুলের উপর দীর্ঘ দিন টিকে থাকতে? সঠিক মাসআলা-মাসায়েল বর্ণনা এবং আমল আখলাক ও মধুর চরিত্র সদাচরণে পরিক্ষিতভাবে সাব্যস্ত হলে জনগণের মনে যে ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং আস্থার সৃষ্টি হয়, সেটাকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিলাষ বলা হলে যে ভুল তথ্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, তাকে কী বলা হবে? যদি আলোচ্য মাসআলাটি খতীব সাহেব সঠিক বলে থাকেন, যদি প্রবন্ধকারের বর্ণনা সঠিক না হয়ে থাকে (এবং অবশ্যই সঠিক নয়) তাহলে প্রবন্ধকারের নিম্ন বক্তব্য থেকে পাঠকবৃন্ধ যদি তাকে উলামা-মাশায়েখ এবং দ্বীনী শিক্ষা-কেন্দ্র বিদ্বেষী বলে ধারণা পোষণ করে তাহলে তা অস্বীকার করা কোন উপায় আছে কি? প্রবন্ধকারের মতে, “এখন সহজেই বলা যায়, যারা মসজিদ ও মাদরাসার কতৃত্বে আছেন, তাদের অনেকেই একই মনোভাবের একটি দল। উক্ত ঘটনাটি তার উদাহরণ।”
প্রবন্ধকার কুরবানীর একটা মাসআলা এবং একজন খতীবের বক্তব্য থেকে ধর্ম ব্যবসায়ী এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিলাষী একটি দল আবিস্কার এবং চি‎িহ্ন‎ত করে জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য একটি প্রবন্ধ উপহার দেয়ার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু পাশ্চাত্য আধিপত্য ও সামরাজ্যবাদি এবং তাদের পোষ্য গোলাম ও সেবাদাসদের ইসলাম ও মুসলমানদের কুরআন পুরোনো বলে মত ব্যক্ত করণ, তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদরাসা-মসজিদ ধক্ষংসকরণ, ওলামা-মাশায়েখদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অভিযান, মুসলমান নর-নারীদেরক উপর বিরামহীন নির্যাতন-অত্যাচার, আফগানিস্তান ইরাকসহ মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে ধারাবাহিকভাবে আধিপত্ব কায়েমের নগ্ন ষড়যন্ত্র, হত্যা লুটতরাজ, নারী ভোগ, নারী ব্যবসা, বেহায়াপনা, বেলাল্লাপনা, সংস্কৃতি চর্চার নামে বিদেশী সভ্যতার প্রচার-প্রসার, সামাজিকভাবে চারিত্রিক চরম অধঃপতন, রাজনীতির নামে স্বার্থের খেলায় মাতালদের কোটি কোটি অর্থপাচারসহ অসহনীয় নির্লজ্জ অপরাধের খনি থেকে চিন্তার কোন খোরাক আহরিত হয়নি। সম্ভব হয়নি এই দুষ্ট চক্রের সম্পর্কে নূন্যতম কলমী জেহাদের!! এর পিছনে কোন তাৎপর্য-রহস্য, কোন গোপন-গভীর উদ্দেশ্য লুকায়িত আছে কি না তা প্রবন্ধকারের পরবর্তী লিখনি থেকে পরিষ্কার হয়ে উঠবে। প্রবন্ধকারের মতে, “অথচ ইসলাম একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সম্পূর্ণ জীবন পদ্ধতি, যা আল্লাহকে দেয়া প্রত্যেক নরনারীর ব্যক্তিগত মুচলেকা। এ জন্য ইসলামে কোন পুরোহিত নেই এবং আল্লাহর প্রভুত্বের প্রতি অঙ্গিকারের কারণে ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি প্রতিদিন পাঁচবার নামায পড়তে হয়।”
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, প্রবন্ধকার নিজেকে কেবল মুসলমান বলে মনে করেন তা নয় বরং একজন মহা ইসলামী পণ্ডিতও মনে করন। অথচ সমস্ত মুসলিম মনীষী, সর্বযুগের মুসলিম বিশেষজ্ঞ এবং মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীনদের ঐক্যমতের বিপরীতে ইসলামকে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন-বিধান হিসেবে দেখেছেন এবং অন্যদেরকে এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে আহবান করেছেন এমন লোক বিগত চৌদ্দশত বৎসরে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
প্রবন্ধকার একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে কী বুঝাতে চেয়েছেন তা অবোধগম্য। পবিত্র কুরআনের অগণিত আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা বর্ণিত রয়েছে। অসংখ্য হাদীসে পাকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তারিত বিধিবিধান ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বিদ্যমান রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বটেই, তাঁর পরবর্তী সময়ে খুলাফায়ে রাশেদীনের রাষ্ট্র-পরিচালনাও অমুসলিমদের নিকটে মাইলফলক হয়ে আছে। তারা বর্তমান বিশ্বের বিধক্ষংস পরিস্থিতির পরিশুদ্ধি এবং আইন শৃংখলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ন্যায় নিঃস্বার্থ, নিবেদিতপ্রাণ ও ন্যায় বিচারক রাষ্ট্র-পরিচালকের প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করে আসছে, কিন্তু এর কোনটিই প্রবন্ধকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি, তার চিন্তার খোরাক হতে পারেনি। যে আয়াতের তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার সাথে ‘ইসলাম একটি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ধর্ম’ হওয়ার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। বরং প্রভুত্বের অঙ্গীকার এবং ওয়াদাবদ্ধতার ব্যাপকতার মধ্যে বস্তু জগতের সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পৃক্ত রয়েছে। কেবল ব্যক্তি জীবনের অুশীলন প্রভুর আনুগত্যের জন্য যথেষ্ট হলে সামাজিক জীবনের এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বাধ্যগত বিধান কার্যকর করার কঠোর নির্দেশ এবং শাস্তির বিধান বিধিবদ্ধ করা হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। এজন্যই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, “দ্বীন এবং রাজনীতি একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।” প্রবন্ধকার আলোচ্য আয়াতের দ্বারা নামায পড়াকে একমাত্র ধর্মকর্ম হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন এবং এর দ্বারা ব্যক্তি জীবনে ইসলামের স্বীমাবদ্ধতা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। অথচ বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের মূল স্তম্ভ পাঁচটি নির্ধারণ করেছেন। তার মধ্যে কেবল দ্বিতীয়টি হচ্ছে নামায। বাস্তবে নামাযের অন্তর্নিহীত রহস্য এবং তাৎর্যের পর্যালোচনা করলে প্রবন্ধকারের দাবীর অসারতা পরিষ্কারভাবে ভেসে ওঠে। কেননা নামাযের জন্য আযান দেয়া, একস্থানে মসজিদে একত্রিত হয়ে জামাতের সাথে নামায আদায় করা, গরীব, ধনী, রাজা-প্রজা নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়ানো, ইমামের অনুসরণ অনুকরণ করা, নামাযের শেষে সালামের মাধ্যমে পরস্পর শান্তির প্রতিশ্র“তি দেয়া, এসব কিছুর অন্তরালে সামাজিকতার অতুলনীয় শিক্ষার দিক-নির্দেশনা রয়েছে। নামায দীনতা-হীনতা শিক্ষা দেয়, অহংকারের স্থলে আনুগত্য শিক্ষা দেয়। কেবল আন্তরিকভাবেই নয় বরং শারিরীকভাবেই আল্লাহপাকের গোলামীতে অভ্যস্ত করায়। পরকালই নয় বরং বস্তুজগতেও সর্ববিষয়ে মহান আল্লাহর গোলামীর অনুশীলন করানো হয়। বস্তুত নামাযের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহপাকের একচ্ছত্র মালিকানা এবং প্রভুত্বের স্বীকার করা হয়। যারা নামাযী হয় কেবল তাদের মধ্যে সঠিক আনুগত্যের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। কেবল তাদের মাধ্যমেই কোন রাষ্ট্রের প্রশাসন সুশৃংখলিত হতে পারে, শুধু তারাই প্রশাসনের শুভাকাক্সক্ষী হয়। আর যারা নামাযের মাধ্যমে মহান আল্লাহপাকের আনুগত্য করে না, তারা কেবল স্বার্থপর ও অসৎই হয় না বরং তারা ন্যায়-নিষ্ঠাবান কোন সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আনুগত্যশীল হয় না। উপরন্তু বক্রপথের অনুসারী হয়। মূলত নামায সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুসংহত করণের অতুলনীয় একটি উপায়।
খেলাফত প্রসঙ্গ
প্রবন্ধকার কুরবানীর একটি মাসআলা থেকে চিন্তার খোরাক আহরণের কথা বলে শিষ্টাচারিতার পরিচয় দিলেও সাথে সাথে ইসলাম সম্পর্কে তার বিস্তারিত জানা শোনা আছে এবং জাতিকে তিনি দিক-নির্দেশনা দিতে সক্ষম এক কৌশল গ্রহণ করেছেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় উক্তি করেন, “ইসলামের নবী আরব অনারব সবার নবী। এই কারণে তিনি উত্তরসূরী মনোনীত করে যাননি। কিংবা সঠিক বলতে উত্তরসূরী মনোনয়ন করা তার ক্ষমতার বাইরে ছিল এবং একই কারণে তিনি আরবদের জাতি হিসেবে শাসনতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি তাদের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।” অথচ গবেষণার জগতে এ বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.কে সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে প্রথম খলীফা নিযুক্ত করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাহিদার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। কেননা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর রা.কে সমগ্র উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মন্তব্য করেছেন বারবার। সাহাবায়ে কেরামগণও তাকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং মুরবক্ষী বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত মধ্যেও অদ্যাবধি এই বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অগণিত বাণীতে হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খলীফা হওয়ার প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন, বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার সমস্ত উম্মতের পুরুষদের মধ্যে আবু বকর আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় এবং আস্থাভাজন। আমার মৃত্যুরপর সেই আমার স্থলাভিষিক্ত হবে, এটাই আল্লাহ পাকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সাহাবাগণ, তাকেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করবে, তাই আমার নির্ধারিত করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।” বাস্তবেও সাহাবাগণ তাঁর খেলাফতের উপর ঐক্যমত হয়ে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাহিদা ও সিদ্ধান্তকেই কার্যকর করেছেন। বুখারী শরীফের অপর এক হাদীসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, “তোমরা আমার মৃত্যুর পর সর্ববিষয়ে আবু বকরকে মেনে চলবে।”
যতদিন হযরত আবু বকর রা. জিবীত ছিলেন ততদিন তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মুসলিম উম্মার সার্বিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সর্বসম্মত প্রথম খলীফা নামে অবিহিত হয়েছেন। সুতরাং প্রবন্ধকারের নিম্নোক্ত কথারও অসারতা সাব্যস্ত হয় যে, “ইসলামের নবীর মৃত্যুর পরে আরব জাতির শাসনকর্তারা নবীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোন পদবি নেননি। কিংবা নিতে সাহস পাননি।” অথচ তখন আরবের শাসনকর্তা বলতে যাদেরকে বোঝানো হয়েছে তারা সবাই ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত। তাঁরা হযরত আবু বকর সিদ্দীকেরও স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আনুগত্য করেন এবং সর্বসম্মতভাবে তাঁকে ‘খলীফাতুর রাসূল’ খেতাবে ভূষিত করেন। এমনকি হযরত আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর পর একই ধারাবাহিকতায় হযরত উমর রা.কেও ‘খলীফাতু-খলীফাতির রাসূল’ বলা হতো। কিন্তু পদবির দীর্ঘতাকে সংকোচিত করণের প্রয়োজনে ‘আমীরুল মুমিনীন’ পদবি চালু করা হয়, যা পরবর্তী সমস্ত ইসলামী খলীফাদের পদবি হিসেবে চালু থাকে। প্রবন্ধকার যদি ‘বেদায়া নেহায়া’, ‘তারীখুল আরব’, ‘খুলাফায়ে রাশিদীন’, ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ ইত্যাদি কিতাবাদি অধ্যয়ন করতেন তাহলে তার চিন্তার সঠিক খোরাক পেতেন। কিন্তু তিনি হয়তো কোন গোপন উদ্দেশ্য হাসিলের প্রয়োজনে বক্রপথ অনুসন্ধান করেছেন, যার কিছুটা পরবর্তী লেখা থেকে আঁচ করা যায়।
মদীনার রাষ্ট্র পরিক্রমা
প্রবন্ধকার লিখেছেন, “যদি মক্কার অধিবাসী গোত্রগুলো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত কিংবা তারা ইসলাম প্রচারে হিংসাত্মক সশস্ত্র বাধা না দিত তবে ইসলামের নবী মদীনা গিয়ে আশ্রয় নিতেন না এবং তাঁকে মদীনায় একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হতো না। তৎকালে মদীনায় অনেক ইহুদী বাস করায় রাষ্ট্রটির চরিত্র স্বাভাকি কারণেই ছিল লুকায়িত।” প্রবন্ধকারের মতের সাথে অনৈক্যমত পোষণ করে বলা যায় যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ইসলাম প্রচারে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্ব ইচ্ছায় নয় বরং আল্লাহপাকের ইচ্ছায় তাঁরই নির্দেশে হিজরত করেন এবং ইসলাম প্রচারের প্রয়োজনে যা করেছেন যেমন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন তাও আল্লাহপাকের নির্দেশেই করেছেন। কেননা নবী হিসেবে তাঁর স্বইচ্ছায় নিজস্ব কোন কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অধিকার মোটেই যে ছিল না তা তিনি বারংবার ইরশাদ করেছেন এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ পবিত্র কুরআনেও এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং অপ্রত্যাশিত আকস্মিকভাবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করেছেন, এই উক্তির পিছনে যথেষ্ট ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত মেলে।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আর একটি দিক পর্যালোচনা করা যায়, তা হলো- ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান। সর্বস্তর থেকে জুলুম-অত্যাচার, শোষণ-নিপীড়ন দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী জীবন বিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, ভাল-মন্দ ও হক-না হকের মুকাবেলা যেমন ব্যক্তি জীবনে পরিলক্ষিত হয় তেমনি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও পাওয়া যায়। বরং বাস্তবতা এই যে, ব্যক্তি জীবনে ভাল-মন্দ কেবল ব্যক্তি জীবনের ভাল-মন্দের কারণ হয়, অপরদিকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ভাল-মন্দের ছোঁয়ায় সামগ্রিকভাবে প্রক্রিয়া হয়। সুতরাং ব্যক্তি জীবনের তুলনায় সামগ্রিক শান্তি-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং পরিশুদ্ধি অভিযান অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে ইসলামের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়, তাহলে মূলত ইসলামকেই অস্বীকার করা হয়, ইসলামী বিধানের ব্যাপকতা ও সামগ্রিকতাকে অস্বীকার করা হয়। বস্তুত ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরস্পর ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কতিপয় চরিত্রবান, নিবেদিতপ্রাণ ভাল লোকের সমন্নয়ে একটি মানসম্মত ভাল সমাজ গড়ে ওঠে। যারা স্বার্থপর, অর্থসম্পদ ও ক্ষমতার লোভী, অসৎ চরিত্রের অধিকারী তাদের আদৌ সভ্যতা ও মানবতা বোধ থাকতে পারে না। এদের দ্বারা যে সমাজ গঠিত হয় সে সমাজও আদৌ সভ্য হয় না। আর সমাজের লোক দ্বারাই তো প্রশাসন গঠিত হয়। সুতরাং ব্যক্তি জীবনকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে আলাদা করে বিবেচনা করার কোন উপায় নেই।
ইসলামের বিধানসমূহ এক হিসেবে দুইভাগে বিভক্ত
১. যেমন নামায, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি স্বইচ্ছায় আদায় করতে সক্ষম। এর বাস্তবায়নের জন্য কোন রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব কার্যকর না হলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই বল প্রয়োগ ব্যক্তিগতভাবে মোটেই সম্ভব নয়।
২. চুরির বিধান হাতকর্তন, যিনার বিধান পাথরাঘাত, মুরতাদের উপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করণ, হত্যার বদলে কতলের বিধান কার্যকর করা ইত্যাদি কর্মগুলোর রাষ্ট্রীয়পক্ষের দায়িত্ব সরকারের। কোন ব্যক্তি, সমাজ, গ্রাম্য শালিস বা পঞ্চায়েতের উপর মোটেই সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় ইসলামে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার প্রয়াসই না থাকলে, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম না করা গেলে ইসলামের এ সমস্ত বিধিবিধান কার্যকর করণের পদ্ধতি কী হবে এবং কার্যকর করবে কারা? সুতরাং ইসলামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে অস্বীকার করা পাগলের প্রলাপ ব্যতীত আর কী হতে পারে? সুতরাং প্রবন্ধকারের উক্তি : “মদিনার সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে লেখা ছিল, ইহুদী মুসলমানগণ এক উম্মাহ। ইহুদীদের জন্য তাদের ধর্ম এবং মুসলমানদের জন্য তাদের ধর্ম। অতএব দেখা যাচ্ছে মদিনায় প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রটি ঘটনা-পরম্পরা বা ঐতিহাসিক এ্যাক্সিডেন্ট এটা বিভ্রান্ত বিবেকের পরিচয় বহন করে। একজন সৎ ও শিক্ষিত মেধার অধিকারী ব্যক্তি থেকে এরূপ উক্তি বের হতে পাওে না।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১১১ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)