লগইন রেজিস্ট্রেশন

জাতির এই দুর্দিনে মুফতি আমিনীকে খুব মনে পড়ে

লিখেছেন: ' মাসরুর হাসান' @ সোমবার, জানুয়ারি ৭, ২০১৩ (৫:৩২ অপরাহ্ণ)

মহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান
আমি কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি নই। রাজনৈতিক কর্মকান্ড আমার স্বভাবগত বিষয় নয়। কিন্তু মাওলানা আমিনীর মৃত্যু আমাকে বিদগ্ধ করেছে। কারণ-
১.প্রথমত তিনি আমার সিনিয়র সাথী ছিলেন। কিন্তু পরে তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানে জামিআতুল ঊলুমিল ইসলামিয়া বিন্নূরী টাউনে আমরা এক সাথে দাওরা পড়েছি। তাই তিনি আমার যুগপৎ সিনিয়র এবং সহপাঠী সাথীও। তাকে নিয়ে আমার হৃদয়ে ছিল অনেক আশা আকাংক্ষা।
২. তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, সময় সংযমী। পাঠ্য কিতাবতো বটেই আনুসংগিক কিতাবাদি এবং বৈষয়িক জ্ঞান আহরণেও তিনি ছিলেন উচ্চতর প্রতিভার অধিকারী। তার মত ছাত্র জীবনে কমই হয়ে থাকে। তার নিমগ্নতা এবং অধ্যয়নের প্রেরণা যেমন ছাত্রদেরকে পড়াশুনায় প্রেরনা যোগাতো,তেমনি আমাকেও অনুপ্রাণিত করতো।
৩.মুফতী আমিনী ছাত্র জীবনেই দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবতেন। ইসলাম বিরোধী চক্রান্তে তার হৃদয় শিহরিয়ে উঠতো। বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছাত্র জীবনেও কঠোর ভূমিকায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন,যা ইসলাম দরদী ছাত্র শিক্ষক ও জনগণের অন্তরে শক্তি যোগাতো।
৪.মুফতী আমিনী একজন সুদক্ষ এবং অভিজ্ঞ আলেম ছিলেন। একজন সুযোগ্য শিক্ষক ছিলেন।তাঁর উপস্থাপনার মাধুর্যতা ছাত্রদেরকে মুগ্ধ করে রাখতো। তাঁর মত শিক্ষক এবং শাইখুল হাদীস পাওয়া যাবে কোথায়।
৫.মুফতী আমিনী কেবল একজন অসাধারণ শিক্ষক , শাইখুল হাদীস ও মুহতামিমই ছিলেন না, পাশাপাশি তিনি ছিলেন জাতীয় ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামের মূখ সক্রিয় মূখপাত্র। বর্তমান সময়ে তার কোন নজীর দেখা যায় না। বাতিলপন্থিরা যখনই প্রকাশ্যে অথবা গোপনে কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো,মুফতী আমিনীর হুংকারে বাতিলের হৃদয়ে প্রকম্পন সৃষ্টি হতো। ইসলাম বিরোধী যে কোন শক্তির মুকাবেলায় তিনি সিংহের মত গর্জে উঠতেন। কে তার সমালোচনা করলো, কে তার সমর্থন করলো, এসব বিষয় তার কাজের ক্ষেত্রে বাধা হতো না। আল্লাহ পাকের উপর ভরসা করে তিনি একাই শতদলের ভাষায় কথা বলতেন।
৬. মুফতী আমিনীর বাহ্যিক সংগঠন তেমন সামগ্রিক ছিল না, কিন্তু দেশ বিদেশের মুসলিম জনতা,শিক্ষক- ছাত্র এবং ওলামা মাশায়েখদের অন্তরে তার কর্মকান্ডের প্রবল প্রভাব ছিলো। জাতীয় ইদগাহ ময়দানে তাঁর জানাযার নামাযে জনতার ঐতিহাসিক ঢল এর বাস্তবপ্রমান। হাদীসের আলোকে আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় লোকদের মুহাব্বত মানুষের অন্তরে ঢেলে দেন। তারই বাস্তবপ্রমাণ ছিল জানাযায় ব্যাপক লোকসমাগম।
৭.মুফতী আমিনী একাই একটি দল ছিলেন। রাজনৈতিক ময়দানে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। আল্লাহ ব্যতীত কাউকে পরোয়া করার অভ্যাস তার ছিল না। এবিষয়ে সকলে একমত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমরা স্বভাবগত কারনেই যথাযথভাবে উপকৃত হতে পারিনি। এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব কোথায় মিলবে।
৮. মুফতী আমিনী প্রকৃত অর্থেই বর্তমান যুগের রাজনীতির কলা কৌশলে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি ভাল ভাবেই অবগত ছিলেন স্বীয় কর্মসুচী বা¯Íবায়নের পথে কারা কারা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পর-আপনের বৈচিত্রে ভরা এদেশের মানুষের স্বভাব প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি সজাগ ছিলেন। তাই তিনি এক পর্যায়ে বি এন পি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগদান করেন। বি এন পি তার দ¦ারা উপকৃত হয়। দেশের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট বি এন পির দিকে গ্রো করে। এলাকার জনগন মুফতী আমিনীকে এমপি নির্বাচিত করে। কিন্তু বি এন পি তাকে যথাযথ মুল্যায়ন করেনি। ইসলামের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করলে হয়ত বি এন পির এ অধপতন হতো না। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য মুলক আচরনের কারণে বি এন পি আজ ক্ষত বিক্ষত।
৯. ইসলামের অবমূল্যায়নের কারণে শুধু বি এন পিই ক্ষতিগ্র¯Í হয়নি বরং এদেশের মুসলমানরাও অপূরনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। স্বয়ং মুফতী আমিনী সমালোচিত হয়েছেন। চরম ভাবে বিপদগ্র¯Í হয়েছেন। জেল হাজতের গøানি ভোগ করে অবশেষে গৃহবন্দী অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুতে যে শুণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কিভাবে কার মাধ্যমে পূরন হবে? এর জন্য বোধহয় কেবল অপেক্ষাই করতে হবে।
১০. এদেশ মুসলমানদের দেশ। এদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠি ইসলামে বিশ্বাসী।যে কোন রাজনৈতিক দল বা সরকার যখনই ইসলামী চেতনার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে,তখনই ইসলামের প্রবল শক্তির প্রভাবে মারাত্মক ভাবে পর্যুদ¯Í হয়ে পরাজয়ের গøানী ভোগ করেছে। ইসলামের এই প্রবল শক্তির প্রভাবেই চরম ইসলাম বৈরী দলকেও মাথায় পট্টি ও হাতে তাসবীহ নিয়ে জনগণের দুয়ারে ভোট ভিক্ষা করতে হয়। কিন্তু কেন যেন ওলামা মাশায়েখদের মধ্যে এই শক্তির সঠিক বা¯Íবায়নে কার্যকর কোন প্লাটফর্ম গড়ে উঠে না। না উঠার একটি কারণ ছাড়া কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না। আর তা হচ্ছে আদর্শের ঐক্য থাকা সত্তে¡ও নেতৃত্বের ঐক্য নেই। সকল ইসলামী দলের একই কর্মসূচি একই আহবান। ইসলামী সরকার ও মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, ইসলাম বিরোধী তৎপরতা বন্ধ করা, দেশ ও জাতির শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ইত্যাদি। কিন্তু উদ্দেশ্য ও লক্ষ এক হওয়া সত্তে¡ও নেতৃত্বের কোন্দলে সব আশা-আকাংক্ষা ধুলিস্যাত হয়ে যাচ্ছে। অথচ এব্যাপারে কারো কোন চিন্তা ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।
বিভক্ত মুসলিম দলসমুহ নিজ নিজ অবস্থান থেকে মৌলিক ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একক নেতৃত্বে কাজ করলেও অভিষ্ট লক্ষ অর্জন করা যেত, কিন্তু তারও কোন লক্ষণ পরিদৃষ্ট নয়। অন্যান্য অনৈসলামিক দলসমুহের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকদের সমর্থন না থাকা সত্তে¡ও তাদের ঐক্য ও দূরদর্শী পলিসির কারণে ক্ষমতায় বসে দেশ শাসন করে, আর সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন প্রাপ্ত ইসলামী দলসমূহ কেবল নেতৃত্বের অনৈক্যের কারণে সরকার গঠনের ধারে কাছেও যেতে পারছেনা। এটা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কি হতে পারে? মুফতী আমিনীকে রাজনৈতিক ময়দানে এমন অসহায় অবস্থায় বিভিন্ন কুল রক্ষা করে এগুতে হয়েছে।
এখন আর মুফতী আমিনী নেই। ফিরে আসারও সুযোগ নেই। এ মুহুর্তে তার মত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের তিরোধানে আল্লাহর কী মহিমা লুকায়িত আছে তা কারো জানা নেই।
এদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি আরো কঠিন হয়ে উঠবে কি না তা বুঝা মুশকিল। হাদীসের ভাষায় আলেমদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অবর্তমানে মূর্খদের রাজত্ব কায়েম হবে। আর তখন জাতির উপর নেমে আসবে মহা দুর্যোগ। আমাদের জন্য কোন্ মহা দুর্যোগ অপেক্ষা করছে,সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
ইতিমধ্যে এর আলামতও ফুটে উঠেছে। ইসলামকে বাদ দিয়ে যে এদেশের সরকার ও প্রশাসন চলতে পারেনা – এ কথা ইসলাম বিরোধী শক্তি ভালভাবে উপলব্ধি করেছে।এজন্য তারা মুনাফেকীর আশ্রয় নিয়ে তাদের পছন্দমত লোকদের মাধ্যমে নামসর্বস্ব ইসলামী জোট গঠনের কাজে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে। হয়ত আগামী নির্বাচনেই এসব নামধারী ইসলামী দলের ভাগ্য খুলে যাবে। তারা কম করে হলেও পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হবে এবং মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মত একটি গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তাদের দখলে আসলে তারা আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। এভাবে তারাই একদিন ইসলাম ও মুসলমানদের একক নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রয়াস পাবে এবং জনগণকে হক্কানী আলেমদের প্রতি সমর্থন থেকে সরিয়ে নিতে সর্বশক্তি ব্যয় করবে। এমন পলিসি সত্যিই ভয়ংকর। ইসলামের সূচনা কাল থেকেই এই অস্ত্র ব্যবহার করে কুচক্রীরা সফলকাম হয়েছে। আমাদের দেশে ভয়ংকর কলাকৌশল হাতে নিয়ে ইসলাম বিরোধী শক্তি মাঠে নেমেছে। আমাদের সরল প্রাণ জনগণ তাদের পলিসি বুঝতে সক্ষম নয়। এমতাবস্থায় কেবল মুফতী আমিনীর কথা মনে পড়ে। এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে এদেশের আলেম উলামাগণ কোন একটি ইস্যুতে নেতৃত্বের ঐক্য সৃষ্টি করে বাতিল শক্তির মুকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ কর্মপন্থা খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন কী?
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, হক্কানী আলেমদের এই অনৈক্য যদি রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীন পরিধি পর্যন্ত সীমিত থাকতো, তবুও সেটা সহনীয় ছিল। কিন্তু এই অনৈক্য রাজনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ফলে কওমী উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক ভাগ সরকারের সমর্থনে অন্ধ। আরেক ভাগ বিরোধী দলের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ এ দু’টি দলের কোনটিই ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে কোন কাজই করেনি।
ভাবতে অবাক লাগে যে, যারা ইসলামের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ভূমিকায় অবতীর্ণ,যারা সংবিধান থেকে মহান আল্লাহর নাম মুছে ফেলে,যারা ইসলামী শিক্ষার সূতিকাগার কওমী মাদরাসা সমূহকে জঙ্গী উৎপাদনের কারখানা বলে আখ্যায়িত করে,যারা নিরীহ মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রদের অন্যায় ভাবে গ্রেফতার করে নির্যাতন করে,যারা দাড়ি টুপিধারীদেরকে রীতিমত ভর্ৎসনা করে,যারা ধর্মহীন স্যেকুলার শিক্ষা চাপিয়ে দেয়,যারা কুরআনের স্পষ্ট আইন বাতিল করে মুসলিম পারিবারিক আইন জারি করে,যারা ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আহুত হরতাল দলীয় কর্মী ও পুলিশ দিয়ে সফল করে,যারা সবসময় ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষায় নির্লজ্জভাবে দালালী করে,তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে পরস্পর বিভক্ত হয়ে মুখোমুখী অবস্থান গ্রহণ করা কিভাবে সম্ভব হতে পারে? সর্বপ্রকার সংকীর্ণ স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সম¯Í উলামায়ে কেরাম যদি রাজনীতির ময়দানে স্বতন্ত্র অবস্থানে ঐক্যবদ্ধ হতেন,তাহলে কি এদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের এমন করুণ অবস্থা হতো! এই দুঃখজনক অবস্থার অবসানে উলামায়ে কেরাম কবে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দেবেন? সংকীর্ণতার সকল বেড়াজাল ছিন্ন করে উলামায়ে কেরাম কবে ঐক্যবদ্ধ হবেন? সেই শুভ দিনের প্রত্যাশায় এদেশের কোটি কোটি তৌহিদী জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১২৯ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)

১ টি মন্তব্য

  1. অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, হক্কানী আলেমদের এই অনৈক্য যদি রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীন পরিধি পর্যন্ত সীমিত থাকতো, তবুও সেটা সহনীয় ছিল। কিন্তু এই অনৈক্য রাজনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ফলে কওমী উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক ভাগ সরকারের সমর্থনে অন্ধ। আরেক ভাগ বিরোধী দলের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ এ দু’টি দলের কোনটিই ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে কোন কাজই করেনি।