লগইন রেজিস্ট্রেশন

সাধারণ শিক্ষা ও কওমী মাদরাসা শিক্ষার পার্থক্য 1

লিখেছেন: ' মাসরুর হাসান' @ শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১০ (৬:২৮ পূর্বাহ্ণ)

মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান
(গত তারিখ : ৩০/৭/১০ জামিয়া ইসলামিয়া যাত্রাবাড়ী মদরাসার দাস্তার বন্দী মাহফিলে প্রদত্ত বয়ান)
মাদরাসা শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য দুটি ১. তালিম ২. তরবিয়াত। কিছুদিন আগে আমি ঢাকার মতিঝিল মাদরাসায় গিয়েছিলাম খতমে কুরআন ও খতমে বুখারীর অনুষ্ঠানে। সেই মাহফিলে ঐ মাদরাসার কমিটির একজন বলছিল, কওমী মাদরাসার শিক্ষানীতিতে সবই আছে কিন্তু সামান্য কিছু বাকি আছে। কী জিনিসটা বাকি আছে তা তিনি বলতে পারেন না। শুধু বলেন, সংগীত নেই, পতাকা নেই। আমি তাকে বললাম, কওমী মাদরাসা শিক্ষায় যে সমস্ত বিষয় এখনো বাকী আছে তাহলো ফ্রী সেক্স, যিনা-ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, প্রতারণা বিদেশে অর্থ পাচার ইত্যাদি। এগুলো ব্যতীত কওমী মাদরাসায় দুনিয়া-আখেরাতের সবকিছুই শিক্ষা দেয়া হয়।
অনেকে দুনিয়া থেকে আখেরাতকে পৃথকভাবে দেখে। এটা সম্পূর্ণ ভুল। আত্মাবিহীন শরীরের এবং শরীর বিহীন আত্মার কোন দাম নেই। তদরূপ দুনিয়া থেকে আখেরাতকে অলাদা করা যাবে না। যারা দুনিয়াকে আলাদা করে দেখবে তারা হয়তো ইহুদী বা খৃষ্টান হবে। ইহুদীরা আখেরাত বোঝে না। তারা শুধু বস্তু বস্তু করে। আর খৃষ্টানদের মধ্যে অনেকে আখেরাত করতে করতে দুনিয়া-বিরাগী হয়ে যায়। কিন্তু ইসলাম আখেরাত ও দুনিয়াকে দুভাগ করে দেখে না। দুনিয়া শরীর আর আখেরাত হলো তার আত্মা। এই হলো এ দুটির সম্পর্ক।
পৃথিবীতে যত অত্যাধুনিক শিক্ষা চালু আছে তার সবগুলোই শুধু বড়গলার আওয়াজ। আমি সেই দিন মতিঝিলে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম যে, পৃথিবীতে তোমাদের যত শিক্ষানীতি আছে তার একটি করে দেখাও, যাতে সব সমস্যার সমাধান রয়েছে। ইহুদী, খৃস্টান ও পাশ্চাত্যের যে কোন একটি শিক্ষানীতি এনে দেখাও যাতে দুনিয়া-আখেরাতের সমস্ত বিষয়ের সমাধান আছে। যারা নারী অধিকারের আওয়াজ তুলে পৃথিবী ব্যাপী মাতলামি শুরু করেছে, তারাই নারীদের অধিকার বিভিন্নভাবে হরণ করছে। যারা এ কাজ করছে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। সেখানে কোন আলেম, মুফতি, হাফেয নেই। আমি শবে বরাতের রাতে গুলশানে বয়ানে বলেছিলাম, যারা নারীর মহরানা আদায় করেননি তাদের জন্য এ রাতে ইবাদত বন্দেগী করে লাভ নেই।
প্রকৃতপক্ষে যারা নারীর অধিকারের শ্লোগানে রাস্তা-ঘাট ও মঞ্চ মুখরিত করে তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। কুরআনের বিধানে নারীর যে অধিকার দেয়া হয়েছে- তার বিপরীতে পার্লামেন্টে অন্য আইন পাশ করবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। তার কারণ হলো, আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, কুরআনের বিরুদ্ধে কোন আইন এ দেশে করা হবে না। আমরা তার এ কথা বিশ্বাস করি। কিন্তু যে দিন তার কথা অসত্য অঙ্গীকার হিসেবে সাব্যস্ত হবে সেদিন মুসলমানদের ক্ষোভ দমিয়ে রাখা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।

ইসলামের বিধান হলো, নারী দু জায়গা থেকে সম্পত্তির ওয়ারিস হবে। ১. বাপের বাড়ী থেকে ২. স্বামীর বাড়ী থেকে। স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পুরুষের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ নারীর অধিকার নিয়ে মায়াকান্নাকারীরা আজ বহু নারীকে অফিস-ফ্যাক্টরী, গার্মেন্ট ও ক্ষেত-খামারের কাজে লাগিয়ে রেখেছে। এটা কি তাদের অধিকার আদায় করা হলো নাকি অধিকারকে হরণ করা হলো? আজ সমান অধিকার শুধু দুজনের মধ্যেই বন্টন করে নেয়া হয়েছে। কিছুদিন একজন প্রধানমন্ত্রী হয় আবার কিছুদিন অপরজন প্রধানমন্ত্রী হয়। ঘুরে ফিরে এ অধিকার দুজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। বারবার নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েও নারীদের অধিকার আদায়ে কী করতে পেরেছে?
ইসলাম নারীদেরকে রাণীর আসনে বসিয়েছে। তারা ঘরে বসে থাকবে আর স্বামীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাল উপার্জন করে স্ত্রীদের হাতে এনে দিবে। অতীব দুঃখের বিষয় যে, আজ নারীদেরকে মুরগীর বাচ্চার ন্যায় রাস্তা-ঘাটে ছেড়ে দেয়া হয়েছে আর চিলের ন্যায় একদল মনুষ্যত্বহীন পুরুষ তাদেরকে ছো মেরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ইসলামের আইনে বোন পাবে ভাইয়ের অর্ধেক। আইয়ূব খান পাকিস্তান আমলে পারিবারিক আইন চালু করে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সে আইন গ্রহণ করেনি। এই দেশের মানুষ পাকিস্তানের দ্বারা জুলুমের শিকার হয়েছে। এদেশের মানুষের নিজস্ব জাতিসত্তা রয়েছে। পাকিস্তানের ফ্যামেলী প্লানিং আইন বাংলাদেশে চলতে পারে না।
পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে যারা নারী অধিকার নিয়ে চেচামেচি করছে, দেখা যায় যে, শতকরা আশি ভাগ নারীদেরকে তারা সবচেয়ে নিম্নমানের কাজে লাগিয়ে রেখেছে। যেমন, রাস্তা পরিষ্কার করা, সুইপারি, ইট ভাঙ্গা ইত্যাদি। মাস শেষে বেতন পায় মাত্র দু থেকে তিন হাজার টাকা। পুরুষ যে পদে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পায় সে পদে নারীকে বসিয়ে ২ হাজার টাকা দেয়া হয়। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সমান পাবে এই আইন সরকার করবে না। কারণ, সরকার বারবার বলে আসছে যে, ইসলাম বিরোধী কোন আইন করা হবে না। যদি সম্পত্তিতে সমান করতে চায় তাহলে অমুসলিমদের জন্য করা যেতে পারে। কারণ ইহুদী-খৃস্টান ইত্যাদি ধর্মে নারীদের জন্য এক ইঞ্চি জমিও বরাদ্দ নেই। আল্লাহপাক নারীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তির বিষয়ে কুরআনে কারীমে সুস্পষ্ট ও অতি সুন্দর বিধান উল্লেখ করেছেন। এরপর কুরআনের একটি সূরার নাম নিসা [মেয়ে] নির্ধারণ করে তাদেরকে মহা সম্মানিতও করেছেন। ‘রিযাল’ [পুরুষ] নামে কোনো সূরা নেই। সূরা বাকারা [গাভী] নাহল [মৌমাছি] ইত্যাদি নামে সূরা অবতীর্ণ করেছেন। কিন্তু সুরাতুর রিযাল নামে কেনো সূরা আল্লাহ অবতীর্ণ করেননি।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পূর্বে বিশেষ তিনটি ওসিয়্যতের একটি ওছিয়্যত এই করে গিয়েছেন যে, হে আমার উম্মতরা? তোমরা নারীদেরকে কষ্ট দিও না। তাদেরকে কষ্ট দিলে আমি কষ্ট পাই। নারীদের জন্য লোক দেখানো শ্লোগানধারীরা যদি “সম্পত্তিতে পুরুষের সমান পাবে নারী” এই আইন করতে চায় সর্বাগ্রে তারাই এই আইনের আওতায় প্রথম পাকাড়ও হবে। আমি সেদিন গুলশানে জুমার বয়ানে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, এখানে উপস্থিতদের মধ্যে কয়জন স্ত্রীর মহরানা আদায় করেছেন? যারা আজ অধিকার অধিকার বলে মুখে ফেনা তুলছে তাদের ৯০%এর বেশির প্রতি নারীদের অভিযোগ রয়েছে যে, তারা স্ত্রীদেরকে কষ্ট দেয়, নির্যাতন করে, স্ত্রীর মহরানা আদায় করে না।
অনেকে প্রথম দিন রাতে স্ত্রীর নিকট বলে যে, আমার মাল তোমার মাল একই মাল একই মাল। এরপর ছলে-বলে কৌশলে মহর মাফ করিয়ে নেয়। বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে, যারা স্ত্রীর মহর আদায় না করার নিয়তে বিবাহ করবে তাদের স্ত্রী-মিলন ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত হবে। নর-নারীর যে মিলন হারাম ও পশুসূলভ কাজ ছিল তা মহরানার মাধ্যমে হালাল করা হয়েছে। এখন যদি কেউ মহরানা আদায় না করে তাহলে স্ত্রী মিলন যিনা হিসেবে সাব্যস্ত হওয়াই তো স্বাভাবিক।
উম্মত যেন এ সমস্ত বিধান যথাযথ মেনে চলে সে লক্ষ্যে আল্লাহপাক নবী-রাসূল প্রেরণ করতেন। এখন নবী নাই তাই নবীর ওয়ারিছ শত শত হাজার হাজার আলেম তৈরি হচ্ছে। আলেম নিজে আমল করবে এবং সমাজের মানুষদেরকেও শরীয়তের বিধান শিক্ষা দিয়ে আমলদার বানাবে। আবু দাউদের এক হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যত দিন আলেমরা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ততদিন আমার উম্মত ধ্বংস হবে না। কিন্তু আলেমরা যেদিন পথচ্যুত হয়ে যাবে তখন জাতিও ধ্বংস হয়ে যাবে। উম্মত যেন ধ্বংস না হয় সে জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের জামাত তৈরি করে গিয়েছিলেন। তাদের পর তাবেয়িন, তাবে তাবেয়ীন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন, এভাবে আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দ হয়ে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত খাটি জামাত তৈরি হয়ে আসছে। আজ এখান থেকে যারা পাগড়ী নিয়ে বিদায় হবে তারা সেই জামাতেরই এক অংশ। এরা আসহাবে সুফফার বৈশিষ্ট মণ্ডিত জামাত। এদের চেয়ে দামী কোন জামাত পৃথিবীর বুকে নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে যে সমস্ত অন্যায় অপরাধ ছিল সে ব্যাপারে তিনি দুটি উদ্যেগ গ্রহণ করেছিলেন, [১] সমাজ থেকে এ সমস্ত অপরাধ দূর করা [২] যাতে সমাজে এমন অপরাধ আর সংঘটিত না হয় সে জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ। এই দু’টি কাজের জন্য তিনি একটি শক্তিশালী জামাত তৈরি করেছিলেন। সে জামাতকে বলা হয় সাহাবাদের জামাত। তারা সর্বগুণে গুণান্বিত ছিলেন। পবিত্র কুরআনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-

مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ۖ سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ ۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ ۚ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ۗ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا

অর্থ : মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মাঝে পরস্পরের প্রতি সহানুভুতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে; তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইঞ্জিলেও। তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যা হতে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয়, এবং পরে কান্ডের উপর দাড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের। [সূরা ফাতাহ : ২৯]
যারা আজ ফারেগ হয়ে চলে যাচ্ছ তারা এই আয়াত খানা মুখস্থ করে নাও। এই আয়াতে ৬-৭ টি গুণের কথা বলা হয়েছে। এই গুণগুলো আল্লাহ পাক সাহাবায়ে কেরামদের দান করেছিলেন। তোমাদেরকে সে গুনে গুনান্বিত হতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে কয়েকটি দলে ভাগ করেছিলেন। একদলকে দেশের সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে দিয়েছিলেন, এক দলকে ইসলামের দাওয়াতের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। অপর দলকে কাফেরদের মুকাবেলায় জিহাদের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। জিহাদকে আজ ইসলামের শত্র“রা জঙ্গীপনা নাম দিয়ে বিশ্বময় বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইসলামের জিহাদ কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে।
অন্যান্য যুদ্ধের সাথে জিহাদকে তুলনা করা চলে না। জিহাদে ছোট বাচ্চা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরকে মারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামী জেহাদের মূল উদ্দেশ্যো হলো, অমুসলিমদেরকে কালিমা পড়িয়ে মুসলমান বানানো। একদল মানুষ আজ বলে যে, ইসলামের জিহাদে মারামারি-কাটাকাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। যারা এরকম কথা বলে তারা জিহাদ সম্পর্কে কোন জ্ঞানই রাখে না। ইরাক, ইরান, আফ্রিকা, রাশিয়া আফগাানিস্তান প্রভৃতি দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ইসলামের দুশমনরা মুসলমানদেরকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে হত্যা করছে, তাদের বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পত্তি ধ্বংস করছে এবং লুটে নিচ্ছে।
ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম। এই ধর্মে কাউকে অনর্থক আঘাত করা নিষেধ। ইসলামের শিক্ষা হলো, অমুসলিম যেই হোক তাকে আদর-আপ্যায়ন করে, সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দ্বীনের পথে আনতে হবে। এক যুদ্ধের ময়দানে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. যখন দুশমনের বুকের উপর উঠে তলোয়ার চালাবেন তখনই ঐ কাফের মুখে কালিমা পড়ে নিল। হযরত খালিদ রা. কালিমা পড়ার পরও তাকে হত্যা করে ফেলেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ঘটনা শুনে মারাত্মাক কষ্ট পেয়ে হযরত খালিদ রা. কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে খালিদ কালিমা পড়ার পরও তুমি তাকে কেন হত্যা করেছিলে? হযরত খালিদ রা. উত্তর দিলেন, সে তলোয়ারের ভয়ে এবং চাপের মুখে কালিমা পড়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে ভয়ে পড়–ক বা অন্য কোন কারণে পড়–ক তার মুখ দিয়ে তো কালিমা বের হয়েছিল। তুমি তো তার অন্তর ফেড়ে দেখনি যে, সে কী কারণে কালিমা পড়ছিল। হে খালিদ, তুমি একাজটা মোটেই ঠিক করোনি।
ইসলামের বিধান হলো, গরু, ছাগল ইত্যাদি যবাই করার সময় চাকু ধার দিতে হবে প্রাণীর চোখের আড়ালে। যাতে প্রাণী তা দেখে এবং তার আওয়াজ শুনে অন্তরে কষ্ট না পায়। ইসলাম যেখানে জানোয়ারকে কষ্ট দিয়ে যবেহ করা হারাম করেছে সেখানে একজন নিরপরাধ মানুষকে কখনো কষ্ট দেয়ার অনুমতি থাকতে পারে? যারা ইসলামকে কলুষিত করার জন্য জিহাদের অপব্যাখ্যা করে, তারা নিজেরাও গুমরাহ, অন্যকেও গুমরাহির পথে নিয়ে যেতে চায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের কাজকে ৪ প্রকারে ভাগ করেছিলেন। সেগুলো হলো
১. সীমান্ত পাহারা ২. দাওয়াত ও তাবলীগ, ৩. জিহাদ, ৪. রাষ্ট্র পরিচালনা। প্রত্যেকটি বিভাগের বাহিনীর জন্য তিনি পৃথক পৃথক সেনাপতি বা আমির নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। উল্লেখিত চার জামাত ছাড়াও অন্য একটি জামাত ছিল যাদেরকে বলা হয় আসহাবে সুফফা। তাদের কাজ ছিল শুধু কুরআন-হাদীস মুখস্থ করা ও লেখা। এই জামাতের আমীর ছিলেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারই নির্দেশে এই জামাত চলতো।
প্রকৃত অর্থে ‘ছাত্র’- তো তাকেই বলা হয় যে শুধু লেখা পড়ায় আত্ম নিয়োগ করো। এ যুগের ছাত্ররা লেখাপড়া বাদ দিয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাইরে ঘোরাফেরা করে। যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় আগামী বছর থেকে কঠোরভাবে মোবাইল নিষিদ্ধ থাকবে। যদি কোন ছাত্র মোবাইল না চালানোর শর্তে ভর্তি হতে চায় তাহলে ভর্তি হতে পারবে, অন্যথায় এখানে ভর্তির সুযোগ নেই। আজ ব্যক্তি ও সমাজের চরিত্র নষ্ট ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাড়িয়েছে এই মোবাইল ফোন। সমাজের উঠতী বয়সের মোবাইলের অপব্যবহার করছে চরমভাবে। মোবাইল নামের এই ছোট বস্তুটির মধ্যে যুবসমাজ ধ্বংসের সব উপকরণ রেখে দেয়া হয়েছে। অসংখ্য ভদ্র ঘরের যুবকেরা এই ধ্বংসাত্মক বস্তুকে তাদের জীবনের জন্য খুবই ক্ষতিকর মনে করছে। জীবন ধ্বংসকারী এই ছোট্ট দানবকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জোরালো আহবান জানাচ্ছে তারা।
নারীর কর্ম ও অধিকার বিষয়ে আবার ফিরে আসি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদরের কন্যা হযরত ফাতেমা রা. নিজ হাতে সব কাজ-কর্ম করতেন। কলসিতে করে দূর থেকে পানি আনতে আনতে এবং আটা পিষতে পিষতে কোমরে ও হাতে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিনি কার কন্যা ছিলেন? উভয় জাহানের বাদশা, নবী-রাসূলদের সরদার এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কের কন্যা। আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনরা কি ঘরের যাবতীয় কাজ নিজের হাতে করে? কল্পনাই করা যায় না। তাদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কত শত সুযোগ-সুবিধা লিখিতভাবে থাকে, এরপরও তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে আরো শত ধরনের অলিখিত সুবিধা আদায় করে নেয়।
এক যুদ্ধের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে অনেক গোলাম বাদী এসেছিল। হযরত আলী রা. এ সংবাদ শুনে হযরত ফাতেমা রা. কে বললেন, ফাতেমা তুমি তোমার পিতার কাছে গিয়ে তোমার কাজের সাহায্যের জন্য একজন বাদী চেয়ে নিয়ে আসো। হযরত ফাতেমা বললেন, আব্বাজানের কাছে বাদী চাইতে আমার লজ্জাবোধ করছে। কারণ তিনি সারা জীবন কষ্ট সহ্য করেছেন। নিজের পেটে পাথর বেধেছেন। কোনো মাল হাতে আসলে সাথে সাথে ফকির-মিসকীনদের দান করে দেন। তার কন্যা হয়ে বাদীর জন্য কীভাবে যাই। তারপরও হযরত আলী রা. অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে হযরত ফাতেমা রা. কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে পাঠালেন। হযরত ফাতেমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে গিয়ে কিছু না বলে অল্প সময় অবস্থান করে আবার স্বামীর বাড়ীতে ফিরে গেলেন। হযরত আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, খালী হাতে কেন ফিরে আসলে? ফাতেমা রা. উত্তর দিলেন, চাইতে পারলাম না। হযরত আলী রা. বললেন, আবার যাও। হযরত ফাতেমা রা. বললেন, আপনি তার জামাতা, আপনি গিয়ে এ সম্পর্কে বললে হয়তো তিনি তা গ্রহণ করতে পারেন। হযরত আলী রা. বললেন, আমার সাহস হয় না। হযরত ফাতেমা রা. বললেন, তাহলে চলেন দুজন এক সঙ্গে যাই। অতঃপর উভয়ে একসাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে গিয়ে হযরত আলী রা. প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ফাতেমার নাকি কাজ করতে করতে হাতে দাগ পড়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বুঝতে পেরেছি, তোমরা কেন এসেছ। শোন, তোমাদেরকে বাদি দেয়া সম্ভব নয়। তার চেয়ে অনেক দামী একটি জিনিস তোমাদেরকে দিয়ে দেই, এটাই নিয়ে যাও। তা হলো, রাতে ঘুমানোর পূর্বে ৩৩ বার سبحان الله ৩৩ বার الحمد لله ৩৪ বারلااله الاالله الله اكبر পাঠ করবে। এটি গোলাম-বাদি এমনকি দুনিয়ার সবকিছুৃ হতে শ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর নিকট অতি পছন্দনীয়।
পরবর্তীতে হযরত আলী রা. বলেন, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত আমি এই আমল করছি। তবে ছিফফিনের যুদ্ধের রাতে তা পড়তে দেরি হয়ে গিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা. কে বলেছিলেন, জানো আমি তোমাদেরকে কেন দেইনি? কারণ হলো, এগুলো আহলে সুফফার ছাত্রদের কাজে লাগানো হবে। ওরা কুরআন মুখস্থ করে, হাদীস লেখে। ওদের খানা-পিনার ও থাকার ব্যবস্থা নেই। ওরা সবাই গরীব, নিঃস্ব।
ভায়েরা আমার আমাদের সবার ইতিহাস পড়ার দরকার। কুরআন-হাদীস পড়া দরকার। নবী যুগের আহলে সুফফার ছাত্রদের মধ্যে একজনেরও দুটি কাপড় ছিল না। হযরত ওমর ফারুক রা. এর যুগেও ছিল না। হযরত ওমর ফারুক রা. এক জুমার দিনে দুটি কাপড় পরিধান করে জুমআর খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় একজন লোক দাড়িয়ে অভিযোগ করে বসলো, হে আমীরুল মুমিনীন খুতবা বন্ধ করে আগে জবাব দিন, আপনার শরীরে দুটি কাপড় আর আমাদের শরীরে একটি কাপড় কেন?
বুখারী শরীফের হাদীসে এসেছে সাহাবী জাবের রা. যখন এক কাপড় পরিধান করে নামায পড়তেন তখন মানুষ এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দিতেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সাহাবাদের শুধু একটিই কাপড় ছিল। হাদীসে এসেছে, শীতের মৌসুমেও আহলে সুফফাদের একটি মাত্র কাপড় থাকতো। তারা এটিকে দিয়েই ছোট বাচ্চাদের ন্যায় গলায় পেচিয়ে শীত নিবারণ ও ছতর ঢাকার কাজ চালাতেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মহিলারা মসজিদে এসে পিছনের কাতারে দাড়িয়ে জামাতে নামায পড়তো। [তখন এর পরিবেশ ছিলো। এখন নেই] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে, পুরুষরা সিজদা থেকে উঠে বসার পর মহিলারা মাথা উঠাবে। তার কারণ হলো, এক কাপড়ে নামায পড়ার দরুন সিজদার সময় তাদের পিছনের বিশেষ অঙ্গ দেখা যেত।
বর্তমানে মাদরাসার ছাত্রদেরকে জেনারেল শিক্ষিতদের অনেকে ছোট মনে করে। আমার মনে হয় নবীর সেই সুন্নতকে যিন্দা রাখার জন্যই আল্লাহপাক এই এক কাপড় ওয়ালাদেরকে নির্বাচন করেছেন। মানুষে এই ছাত্রদেরকে গরীব, অসহায়, নিঃস্ব মনে করে যে যাই বলুক আমার মনে হয়, আহলে সুফফার আদর্শকে এদের মাধ্যমেই যিন্দা রাখা হয়েছে। এটা কুদরতী ফয়সালা।

নবীযুগে আহলে সুফফার ছাত্রদের জন্য এলাকার লোক নামাযে আসার সময় বা অন্য কোন সময়ে খেজুর, পনির, ছাতু ইত্যাদি পাঠিয়ে দিত। যার বাড়ীতে দুটি খেজুরের ছড়া থাকতো সে একটি আহলে সুফফারদের জন্য পাঠিয়ে দিত। এলাকার সাহাবীরা জানতো, এ সমস্ত লোক কুরআন-হাদীস মুখস্থ করে তাদের খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। বুখারী শরীফে এ বিষয়ে দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত আছে। আহলে সুফফার জন্য এ সমস্ত খাদ্য রাখা হলেও তারা কেউ তা আগে ধরতে যেত না। চিন্তা করতো যে, আমার অমুক ভাই পেয়েছে কি না। সে আমার আগে নিয়ে যাক। তাদের মাঝে পরোপকারের এমন মানসিকতা ছিল। আমাদের অবস্থা তো বিবাহের খেঝুর ছিটানো হলে কার পূর্বে কে নিবে এই প্রতিযোগিতা লেগে যায়। কিন্তু তাদের যুগে দেখা যেত খেজুর জায়গাতেই পড়ে আছে। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত করতেন। তাদের একটি দলকে কেবল কুরআন-হাদীস পড়া ও লেখার কাজেই নিযুক্ত করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
فلولا نفر من كل فرقة منهم طائفة ليتفقهوا في الدين ولينذرواقومهم اذا رجعوا اليهم لعلهم يحذرون
আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, দাওয়াত-তাবলীগ, সীমান্ত পাহারা রাষ্ট্র পরিচালনা ও জিহাদের জন্য যে ইলমের প্রয়োজন তা অর্জন করা হলো মূল জিনিস। ইলম না হলে সঠিকভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করা যায় না, ইলম না হলে দাওয়াতের কাজ করা যায় না, জিহাদের কাজ করা যায় না। সঠিক ইলম যার মাঝে থাকে না সে-ই জিহাদ বাদ দিয়ে বোমাবাজি শুরু করে। জিহাদের মূল কথা হলো, অমুসলিম রাষ্ট্রে গিয়ে প্রথমে কালিমার দাওয়াত দেয়া। যদি তারা দাওয়াত গ্রহণ করে তাহলে তাদেরকে পূর্বের অবস্থায় রেখে আসা। যদি তারা দাওয়াত গ্রহণ না করে তাহলে সন্ধির প্রস্তাব দেয়া। এ প্রস্তাবও না মানলে তাদের সঙ্গে জিহাদ করা। তবে শর্ত হলো এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের পদ ও অর্থ কামানোর ইচ্ছা করা যাবে না এবং শিশু, প্রতিবন্ধী ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরকে আঘাত করা যাবে না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সর্ব প্রথম যিনি হাদীসের কিতাব লিখেছিলেন তিনি হলেন আমর ইবনুল আস রা. তার কিতাবের নাম ছিল আসসাদেক্বাহ। কুরআনের পর তার এই কিতাবটা হলো সবচেয়ে সহী কিতাব। কারণ তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে লেখা হয়েছিল। এই কিতাব বর্তমানে ছাপা হয়ে বাজারে আসার পথে।

আসহাবে সুফফার দায়িত্বে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই জন্যই ছিলেন যে, আল্লাহ তায়ালার বিধানাবলী দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত করা একমাত্র আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিসদের দ্বারাই সম্ভব। একারণেই তিনি তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই ছাত্রগুলো যারা আজ ফারেগ হয়ে চলে যাচ্ছে তারা রাসূলের ঐ জামাতেরই অংশ।

সূধী মণ্ডলী এ সময়ে বিভিন্ন মাদরাসা থেকে আপনাদেরকে আহবান করা হয়। আমরাও আপনাদেরকে ডেকেছি। আপনাদের জানা উচিত যে, এখানে কী হয়, ছাত্ররা কী করে। এই মাদরাসাতে সব বিভাগ মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের মতো ছাত্র আছে। বছরে তাদের পিছনে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। জানি না আল্লাহপাক কোথা থেকে ব্যবস্থা করেন। নিজের গাছের ফল নিজে দেখলে আনন্দ লাগে। আজ এখান থেকে প্রায় ৯০০ ছাত্র ফারেগ হয়ে কর্মজীবনে চলে যাচ্ছে। হে ছাত্ররা আজ মাওলানা হয়ে তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালনে ময়দানে নেমে যাচ্ছ। এত বছর পড়াশোনার উদ্দেশ্য কী তা তোমাদের বুঝতে হবে। তোমাদের মাদরাসায় আসার উদ্দেশ্য কী? তোমাদের পিছনে জনগণ কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে? তোমাদের জন্য যারা টাকা-পয়সা খরচ করে, তারা আজ তোমাদেরকে দেখলে খুশিতে বাগ বাগ হয়ে যাবে। নিজের গাছের ফল দেখলে কার না শান্তি লাগে
হে ছাত্ররা তোমরা যদি তোমাদের আমল ঠিক রাখ, নবীর সুন্নত মোতাবেক জিন্দেগী বানাও, সুন্নত প্রচার করো, বিদাতের দিকে না যাও, তাহলে দেখবে সমাজের মানুষ তোমাদেরকে মাথায় রাখবে। দ্বীনী মাদরাসার তালিম সম্পর্কে মানুষের মনের মাঝে নানা বিভ্রান্তি ঘুৃরপাক খায়। দেশের সরকার ও দায়িত্বশীলদের স্বউদ্যোগী হয়ে এসব মাদরাসার সিলেবাস ও শিক্ষাকারিকুলাম সম্পর্কে পরিষ্কার মন নিয়ে যথাযথ অনুসন্ধান চালানো উচিত। অতঃপর দেশ পরিচালনায় এদেরকেও শরীক করা উচিত। এগুলো আমাদের দাবি। আমি দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পারি দেশের সাধারণ শিক্ষানীতি একেবারেই অসম্পূর্ণ। যেমন, এই শিক্ষানীতিতে পরকাল সম্পর্কে একটি কথাও নেই। তাহলে মানব জীবনের প্রধান অংশই বাদ পড়ে গেল। অতএব এ শিক্ষানীতি অর্ধেক শিক্ষানীতি। নারীদের প্রতিমাসে দশদিন ঋতুস্রাব হয়। অর্থাৎ বছরে ১২০ দিন ঋতস্রাব হয়। এ ব্যাপারে সাধারণ শিক্ষানীতিতে একটি শব্দও লেখা নেই। তাদেরকে জানাতে চাই যে, আমরা আমাদের ছাত্রদেরকে এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করি। তোমরা দেখাও, তোমাদের কোন বিষয়টা আমাদের শিক্ষানীতিতে নেই। যদি বিজ্ঞানের কথা বলো, এটাও আমরা পড়াই। আমরা আমাদের ছাত্রদেরকে মেট্রিক সমমান পর্যন্ত বাংলা পড়াই। সাহিত্যিক তৈরি করি। বাংলাদেশে ধর্মীয় ও নির্ভরযোগ্য যত ইসলামী বই আছে তার ৯০% কওমী মাদরাসার ছাত্র শিক্ষকদের হাতে লেখা। আজ কওমী মাদরাসার ছেলেরা ইসলাম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে অহরহ বই লিখে যাচ্ছে। তোমরা তোমাদের ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞান সম্পর্কে যে বইটা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে পড়াও তা হচ্ছে আমাদের দেওবন্দের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. এর লিখিত, যা তোমরা ইংরেজীতে অনুবাদ করে পড়াও। ইউনিভার্সিটিগুলোতে অর্থনীতি সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাধান্য দিয়ে যে বইটি পড়ানো হয়, তা হচ্ছে ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর লিখিত কিতাবের ইংরেজী অনুবাদ। তোমাদের ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি ও আইন-কানুন সম্পর্কে যা পড়ানো হয়, তা আমাদের হেদায়া কিতাবে রয়েছে। পৃথিবীর সব দেশেই ইহুদী খৃষ্টানসহ সবাই তা ইংরেজীতে অনুবাদ করে পড়ছে। তোমরা যা পড়ছ তা সবই আমাদের কওমী মাদরাসার পাঠ্য কিতাব।
আমি সেদিন মতিঝিলে বলেছিলাম, তোমরা আমাদেরকে অর্থনীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে চাও? অন্যের কথা নয়, নিজের কথাই বলি। আমি একবার মাদরাসা শুরু করে ছিলাম মাত্র পনের হাজার টাকা নিয়ে, বছরের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখি তা উন্নতি হয়ে বিশ কোটিতে দাড়িয়েছে। অন্য একজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কত টাকা নিয়ে ব্যবসাতে নেমেছেন আর তাতে লাভের পরিমাণ কী দাড়িয়েছে? লোকটি জবাব দিল, হুযুর বিশ কোটি টাকা নিয়ে নেমেছিলাম। তাতে লাভ হয়েছে মাত্র দুকোটি টাকা। তার থেকে ঘুষ দিতে হয়েছে ৫০ লাখ। অপর একজনকে ব্যবসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে বললো, কয়েক কোটি টাকা ঘুষ দেয়ার পর আমার লাভ হয়েছে মাত্র ৩ কোটি টাকা। এখন আপনারাই বলুন, অর্থনীতি আমি বুঝি কি না? ওরা কোটি কোটি টাকা খাটিয়ে কি পেয়েছে আর আমি ১৫ হাজার খাটিয়ে কী পেলাম। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি যে, পারলে তোমরা এমন একজন অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশে বের করে দেখাও, যিনি ১৫ হাজার খরচ করে ২০ কোটি লাভ করতে পেরেছেন। শুধু তাই নয় ১ পয়সাও আমার ঘুষ দিতে হয়নি। ঋণ আনতেও হয়নি। কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করলেও তোমরা এমন অর্থনীতিবিদ বের করে দিতে পারবে না। বৃক্ষের পরিচয় হলো ফলে। আজ এই মাহফিলে আপনারা হাজার হাজার মানুষ বসে আমার ওয়াজ শুনছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা এভাবে চুপচাপ বসে যে ওয়াজ শুনবেন তা অনেকেরই ধারণার বাইরে ছিল। একজন রাজনীতিবিদ এতক্ষণ বক্তৃতা দিলে মানুষ এখানে বসে থাকতো না। সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব বলেছিলেন, আমি মাওলানা মাহমূদুল হাসান সাহেবের এক ওয়াজে সাত ঘণ্টা বসে বয়ান শুনেছি। সামান্যও বিরক্ত হইনি। পূর্ব রেকর্ডকৃত ক্যাসেটের মতো তার যবান থেকে অনর্গল কথা বের হতে দেখে আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়েছি।
আমি এরশাদ সাহেবকে বলেছিলাম, এটা আমার কোন কৃতিত্ব নয়। আমার মুখটা শুধু মাইক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল আর অপর প্রান্ত হতে জিব্রাইল আ. কথা বলছিলেন।

আপনাদের এত লোকের উপস্থিতি দেখে আমাদের ছেলেদের মন খুব আনন্দিত। আজ যে সমস্ত মানুষ কওমী মাদরাসা ও এর ছাত্রদের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদের ব্যাপারে আপনারা সজাগ থাকবেন। এটা আপনাদের বড় দায়িত্ব। যে ভায়েরা বুঝবেন বলে মনে হয় তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। একথা সবার বোঝা উচিত যে, এসব মাদরাসা সরাসরি আল্লাহর নেগরানীতে চলে। তাই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কোন লাভ হবে না। এই মাদরাসাগুলোর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত থাকবে তারা রাসূলের ছাত্র হয়ে যাবে। আমার উস্তাদ বিন্নুরী সাহেব রহ. বলেছেন, যারা কুরআন-হাদীস পড়ে তারা দুনিয়াতে রুহানী সাহাবী থাকবে কিন্তু কাল হাশরের ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গিয়ে সরাসরি সাহাবী হয়ে যাবে। হাদীসে এসেছে যারা ইলমে দ্বীন তলব অবস্থায় ইন্তেকাল করে তারা অবশ্যই জান্নাতে যাবে। এক হাদীসে এসেছে-
كن معلما او متعلما او معينااومحبا ولاتكن خامسا
আদর্শ উস্তাদ হও নতুবা ছাত্র হও, তা হতে না পারলে ছাত্রদের সাহায্য কারী হও। তাও না হতে পারলে ওদের মুহাব্বাতকারী হও, এর বাইরে পঞ্চম শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। হাদীসে এসেছে, এক সাহাবীর প্রশ্নের জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে যাকে মুহাব্বত করবে তার সঙ্গে তার হাশর হবে। আপনারা এই ছাত্র আলেমদেরকে মুহাব্বত করেন বলেই তো এখানে এসেছেন। হাশরের মাঠেও এভাবে একসাথে থাকবেন ইনশাআল্লাহ।
আপনাদেরকে এখানে ডেকেছি খতমে কুরআন ও খতমে বুখারীর বরকত হাসিল করার জন্য। কুরআন ও হাদীস থেকে কয়েকটি কথা বলে ছাত্র উস্তাদ ও আপনাদেরকে নিয়ে দোয়া করবো, এটাই উদ্দেশ্যো।
আমাদের দেশের সংবিধান সংশোধনের আওয়াজ উঠেছে। মানব রচিত হওয়ার দরুন এটাকে কয়েক দিন পরপর সংশোধন করতে হয়। যে জায়গায় সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তা তো সংশোধন করতেই হবে কিন্তু পবিত্র কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক যেন না হয় সেটাও কঠিনভাবে লক্ষ রাখতে হবে। এটা মানুষের বানানো। তাতে ভুলভ্রান্তি থাকাটা স্বাভাবিক। তবে একটি মুসলিম দেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধন খুব ভেবে চিন্তেই করা উচিত। আর এ কাজটা সর্বসম্মতিক্রমে দলমত নির্বিশেষে সকলে মিলে করতে হবে। পবিত্র কুরআন ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত সংবিধানই সংশোধন করা যাবে। কারণ, কুরআন এমন এক সংবিধান যার সংশোধন পৃথিবীর মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আল্লাহপাক নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন-ذالك الكتاب لاريب فيهহে দুনিয়ার মানুষ আমি এমন এক সংবিধান নাযিল করেছি যার মাঝে কোন সন্দেহ নেই। কিয়ামত পর্যন্ত এর যের-যবরের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ইহুদী-খৃস্টানরা তাদের সংবিধান পরিবর্তনের সময় নিজের আক্বীদা ও মাযহাবের কথা স্মরণ রাখে। খুবই দুঃখের সাথে একটি কথা বলতে হয় যে, মনে হয় ইসলামের দুশমনরা কৌশল করে বাংলাদেশের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে একথা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে যে, বাইবেলের আলোকে জীবনের সব ধরনের সমস্যাার সমাধান করা হবে। কোন মুসলমান কখনো এটা মেনে নিতে পারে না। আমি এই শিক্ষানীতি সংশ্লিষ্ট বড় এক শিক্ষিতকে প্রশ্ন করেছিলাম, ৯০% মুসলিম দেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাইবেলের আলোকে বিশ্ব সমস্যার সমাধান করা হবে, এ বাক্যটা কেমন করে আপনারা সংযুক্ত করলেন? ঐদিন সে আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কয়েক দিন পর এসে বললো, হুযুর বিষয়টা বুঝতে আপনার ভুল হয়েছে। আমি বললাম, হুযুররা তো একটু কমই বোঝে। তাহলে আমাকে বুঝান, কোন জায়গায় আমার বুঝতে ভুল হয়েছে? সে বললো, এ শিক্ষানীতিতে মুসলিম ধর্মের পাশাপাশি ইহুদী-খৃস্টান ও হিন্দু ধর্মের কথাও আছে। লেখা হয়েছে যে, বাইবেলের আলোকে খৃস্টানদের সমস্যার সমাধান দেয়া হবে। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য তা লেখা হয়নি। তার এ সমস্ত ব্যাখ্যাার পর আমি চুপচাপ ছিলাম। বিধায় সে মনে করেছিল আমি আটকে গেছি। এর সুযোগে সে আমাকে একই বিষয় বারবার বোঝাতে চেষ্টা করছিল।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১৩০ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)