লগইন রেজিস্ট্রেশন

আলেম ও ইমামদের দায়িত্ব-কর্তব্য

লিখেছেন: ' মাসরুর হাসান' @ বুধবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১০ (১২:৪৭ অপরাহ্ণ)

মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান দা. বা.

স্থান : কলতাবাজার আলমুঈন মাদরাসা তারিখ : ৬/১০/২০০৬

اللهم صل علي محمد وعلي ال محمد وسلم تسليما

মানুষের কর্ম ভেদে ইউনিফর্ম তথা পোশাক বিভিন্ন হয়ে থাকে। এমনটি হওয়া অতি প্রয়োজনীয়ও বটে। যেমন, একটি দোকান, যা বিভিন্ন প্রকার জিনিসপত্রে ভরপুর। এখন যদি এই মালামাল হেফাযতের জন্য দরজায় তালা না থাকে তাহলে দোকানের মূল্যবান বস্তুসামগ্রী সব চুরি হয়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী। ইসলামী পোশাক-পরিচ্ছদ তথা ইউনিফর্ম হলো অন্তরজগত হেফাযত ও সংরক্ষণের জন্য তালাস্বরূপ। যদি এই পোশাক না থাকে তাহলে আত্মার ভেতরের অবস্থা উলোটপালট হওয়া থেকে মুক্ত থাকে না। অনেকে এই বাহ্যিক পোশাকের বাধ্যবাধকতাকে গুরুত্বহীন মনে করে। তাদের মতে পোশাক একটা হলেই হলো। আত্মার উপর বাহ্যিক পোশাকের ক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই মূলত তারা এমনটি ভেবে থাকে। আমাদের সমাজে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে গিয়ে পড়ে তাদের মধ্যেও অনেকেই ইসলামী পোশাক পরিধান করে না, বরং ইংরেজদের পোশাক পরিধান করে নামায পড়ে। খৃষ্টান, ইহুদী ও হিন্দুদের মধ্য থেকে এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না যে উপাসনার সময় মুসলমানদের পোশাক পরিধান করে। চিন্তা করে দেখুন, অমুসলিমরা আমাদের থেকে কতটুকু এগিয়ে আছে! তারা তাদের ধর্মের ব্যাপারে খুবই কঠোর। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের এই দেশেও একজন হিন্দুকে পাওয়া যাবে না যে, সে নিয়মিত ইসলামী পোশাক পরিধান করে; আর ভারতের হিন্দুদের ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই উঠে না।
হিন্দুদের ঘরে মুসলমানদের কেবলা তথা কা’বার ছবি, মদীনার ছবি, কিংবা যে কোনো মসজিদের ছবি, এক কথায় ইসলামী ঐতিহ্যের কোনো কিছুর ফটোই পাওয়া যাবে না। পক্ষান্তরে অতি আফসোসের বিষয় যে, আজ মুসলমানের আশি ভাগের ঘরেই মূর্তি আছে। তাদের সোকেচ বিভিন্ন হিন্দুয়ানা ছবি ও মূর্তি দিয়ে ভরপুর। মুসলমান পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, রোযা রাখে, কিন্তু তার শরীর, ঘর ও চলাফেরার ষ্টাইলে খৃষ্টানী কৃষ্টি-কালচারের ছাপ যেন সর্বদাই লেগে আছে। মুসলমানদের উপর বিভিন্নভাবে আযাব-গযব আসার কারণ তো এগুলোই। মুসলমানরা ইসলামী কৃষ্টি-কালচার ছেড়ে দেয়ার কারণেই আজ তারা ভিন্ন ধর্মালম্বীদের হাতে প্রতি নিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। হাদীস শরীফে আছে, من تشبه بقوم فهو منهم
এর মর্মার্থ হলো-
যে যাকে ভালবাসে তার সঙ্গে তার হাশর হবে।
একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। আরব দেশে প্রচলন ছিল, কোন বুযুর্গ ব্যক্তি মারা গেলে তার কবর ক্রয় করে রাখা হত। এরপর তা পুরাতন হয়ে গেলে সেখানে ক্রেতার কোনো মৃত আত্মীয়কে দাফন করা হত। এটাকে তার জন্য নাজাতের উসিলা মনে করা হত। প্রথানুযায়ী এক বুযুর্গ ইন্তেকাল করার পর এক লোক তাঁর কবরের জায়গা ক্রয় করে রাখলো। দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাতে তার জনৈক আত্মীয়কে দাফন করার নিয়তে যখন কবর খোলা হলো, দেখা গেল সেখানে এক মহিলার লাশ। মহিলাটা আবার আরব দেশীয় নয়, ফ্রান্সের অধিবাসী। এ অবস্থা দেখে সবাই নির্বাক হয়ে গেল। প্রত্যেকেরই একই প্রশ্ন, বুযুর্গের কবরে মহিলার লাশ এলো কেমন করে? তাও আবার ফ্রান্সের মহিলা। এই সংবাদ যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো তখন বিভিন্ন দেশ হতে ওমরার জন্য মক্কায় আগত লোকজনও ব্যাপারটি সচক্ষে দেখার জন্য ঐ কবরস্থানের পাশে জমা হলো। এরি মধ্যে হঠাৎ একজন উমরাকারী চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, আরে, এ মহিলা তো আমার ছাত্রি! ফ্রান্সে আমি তাকে প্রাইভেট পড়াতাম। ফাঁকে ফাঁকে সে আমার কাছ থেকে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয় জেনে নিত। এক পর্যায়ে সে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গোপনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তবে মাতা-পিতা ও সমাজের ভয়ে এটা কোন দিন প্রকাশ করতে পারেনি। খৃষ্টানরাও মুসলমানের ন্যায় লাশ দাফন করে রাখে। মনে হয় ইসলামের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসার কারণে আল¬াহপাক তাঁকে এই মর্যাদা দান করেছেন।
তাহলে এই কবরে দাফনকৃত বুযুর্গ ব্যক্তি কোথায় গেলেন? এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য মক্কা হতে একদল লোক ফ্রান্সে গেল। তারা সেখানে গিয়ে খুজে বের করলো মহিলার পরিবারকে। অতঃপর তাদেরকে বলে সরকারী নির্দেশ নিয়ে ঐ মহিলার নির্ধারিত কবর খুলে দেখলো, সেখানে মক্কার সেই বুযুর্গ শুয়ে আছেন। সব মানুষেরা বিস্ময়ে বিমূঢ়! কোথা থেকে কী হলো!
শেখ আবুল মায়াল আল মুনতাকী এই ঘটনা তার কিতাবে লিখেছেন এবং তিনি বলেছেন, এই ঘটনার শতভাগই সত্য। যাহোক মক্কার দলটি ফ্রান্স থেকে ফিরে ঐ আল্লাহর ওলীর বাড়ীতে গিয়ে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলো, আপনার স্বামী কেমন লোক ছিলেন? উত্তরে স্ত্রী বললো, আমার স্বামী খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। নামায, রোযা ও কুরআন তেলাওয়াতের সাথে ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক। লোকেরা বললো, বিশেষ এক কারণে আমরা আপনার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করতে এসেছি। গভীর চিন্তা করে বলুন তো তিনি আরো কী কী করতেন? স্ত্রী কতক্ষণ চিন্তা করার পর বললো, আমার স্বামী অনেক সময় বলতেন, খৃষ্টান ধর্মে স্বামী-স্ত্রী মিলনের পর গোসল নেই। শীত মৌসুমে ফরজ গোসলের সময় হলে বলতেন, এই গোসলের ক্ষেত্রে খৃষ্টান ধর্মের বিধানটা ভাল লাগে।
ভায়েরা আমার! এখানে একটি মাসয়ালা বলা খুবই প্রয়োজন মনে করছি। তা হলো, স্বামী-স্ত্রী মিলনের পর গোসল ফরজ হয়ে যায় চাই বীর্য নির্গত হোক বা না হোক। অনেকে মনে করে বীর্য নির্গত না হলে গোসল ফরজ হয় না। এটা তাদের মারাত্মক ভুল ধারণা। যাহোক ঐ বুযুর্গের এই একটি কথার কারণে আল¬াহ তায়ালা তার উপর মারাত্মক নারাজ হলেন এবং তাকে এই শাস্তি প্রদান করলেন।
ইসলামী আকীদা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণে আমাদের মধ্যে অনেকেরই মারাত্মক ধরনের ভুল হয়ে যায়। যেমন বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি ইত্যাদি বিপদ আসলে অনেক মানুষ বলে ফেলে যে, আল¬াহ এখন কোথায় গেল? ঝড় কমে না কেন? আল¬াহ মারা গেলেন নাকি? (নাউযুবিল্লাহ) এ ধরনের ঈমান বিধ্বংসী কথা কোন মুমিনের মুখ থেকে বের হতে পারে না! জেনে বুঝে এমন বললে সাথে সাথে ঈমান হারা হয়ে যাবে। আমাদের রাজনীতিকগণ দেশে দুর্যোগ দেখা দিলে তা মোকাবেলা করার কথা বলেন। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য অন্যকেও উৎসাহিত করে থাকেন। দুযোর্গ যিনি দেন তার সাথে মোকাবেলা করার শক্তি কি পৃথিবীর কোন মাখলুকের আছে? জেনে বুঝে এরকম ভাষা মুখে আনা তো খোদাদ্রোহিতা। সুতরাং কথা বলার সময় চিন্তা-ফিকির করে বলা প্রয়োজন। কারণ তা যদি ইসলামী কোনো আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে জীবনে মহামুসিবত নেমে আসতে পারে, যেমনটি ঐ বুযুর্গের ক্ষেত্রে হয়েছিল। যারা দুযোর্গ মোকাবেলা করতে চায় তারা আসলে স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন। আল¬াহর শক্তির সঙ্গে কারো শক্তির তুলনা হতে পারে না।
যাদের মাঝে দ্বীনী শিক্ষা নেই তাদের দেমাগে ভাল কাজের উৎসাহ আসে না। দেশে দুর্যোগ দেখা দেয়ার সময় কণীয় সম্পর্কে গুলশানে আমি বলেছিলাম যে, দেশের মন্ত্রী-এম্পিরা যদি নামাযের প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদায় পড়ে কাঁদে, সাথে সাথে যদি তারা দেশের সব মানুষকে এই নির্দেশ দেয় যে, সবাইকে মসজিদে এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে হবে, তাহলে দেখবেন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অধিকাংশ মসিবত দূর হয়ে যাবে। এই যে আমি শুধু একা বলে যাচ্ছি, আমার কথায় কি সবাই মসজিদে আসা শুরু করবে? সরকার যদি বলতো তাহলে প্রায় সকলেই মানতো।
ভায়েরা আমার! আমরা দ্বীনের কাজ না করার কারণে ইহুদী-খৃষ্টানরা আমাদের মাধ্যমে তাদের কাজগুলো ভালভাবে করিয়ে নিচ্ছে। আল্লাহর আযাব-গযব আসলে বাঁধ নির্মাণ, ছাদ নির্মাণ ইত্যাদি কোন কিছুই কাজে আসবে না। একমাত্র কান্নাকাটি ও তাওবার মাধ্যমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই আযাব হতে নাজাত পাওয়া সম্ভব হবে। নতুবা বিপদ একটা যাবে তো আরেকটা এসে পড়বে। এই যে দেখুন, বন্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এখন এমন বৃষ্টি শুরু হলো যে, তা বন্যাকেও হার মানিয়েছে। এ বৃষ্টিতে যাত্রাবাড়ী মাদরাসার মসজিদের ভিতরেও পানি প্রবেশ করেছিল। একজন এসে আমাকে বললো, হুযুর! দোয়া করুন, যাতে পানি চলে যায়। প্রশ্ন করলাম এই পানি আমাদের জন্য আযাব না রহমত? মাদরাসায় পানি প্রবেশ করেছে শুনে অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন আমি কি এই পানি চলে যাওয়ার জন্য দোয়া করবো? চার মাসে যে অনুদান আসেনি, এই চার পাঁচ দিনেই তা এসেছে। তাই বলি যে, এই পানি মাদরাসার জন্য রহমত স্বরূপ এসেছে। অনেক মানুষ তো দান করার সময় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকে, যারা অসহায় তাদের দিকে তাকায় না। মানুষের দিল এখন কঠিন হয়ে গেছে। বিপদে পড়লেও মানুষ কাঁদে না, আল¬াহকে ভয় পায় না, নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয় না।
আল্লাহ পাক বড় হেকমতওয়ালা। তিনি কাউকে কালো বানান, কাউকে বানান সাদা। কারো মনে কালোর প্রতি এমন আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেন যে, সাদার প্রতি তার কোন সময়ই আকর্ষণ হয় না। একদিন এক লোক আমাকে বললো, হুযুর! বাংলাদেশের মানুষদের চেহারায় এত লাবণ্যতা কেন? উত্তরে আমি বললাম, বাংলাদেশের মানুষ হলো কালো; তাই আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে তাদের চেহারায় আকর্ষণের বস্তু রেখে দিয়েছেন। ফলে দর্শকের দৃষ্টিতে তাদেরকে এত সুন্দর দেখায়।
কালো মানুষদের মধ্যেও অনেক মানুষ এমন আছে, যাদের চেহারা খুবই সুন্দর লাগে। তাছাড়া বেশি ধলা ও রূপসী হওয়া ভাল নয়। রূপ-সৌন্দর্য অন্তরে অহংকার সৃষ্টি করে যেটি জীবনের পতনের মূল।
সুন্দরী বউকে বাড়ীতে রেখে কোথাও যাওয়া খুব সমস্যা। বাস্তবতায় দেখা গেছে যে, স্ত্রী যদি কালো হয়, তাহলে সে স্বামীর খুবই ভক্ত হয়, স্বামীর সর্বপ্রকার কাজের প্রতি খেয়াল রাখে। রূপের ঝলক দেখিয়ে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেনি বিধায় গুণের মাধ্যমে স্বামীকে খুশি রাখে। গ্রামের একটি প্রবাদ বাক্য আছে। “কালা-ই আমার গলার মালা, ধলা হলো জীবনের জ্বালা।”
যাহোক কথা বলার সময় চিন্তা ফিকির করে বলা চাই। মানুষ যে সমস্ত কথা মুখ দিয়ে প্রকাশ করে তা তার আমলনামায় যথাযথভাবে লেখা হচ্ছে। পূর্বোল্লিখিত বুযুর্গের একটি শরীয়ত-বিরোধী কথার কারণে আল্লাহপাক অসন্তুষ্ট হয়ে তার লাশ খৃষ্টান দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। চোখ, যবান, হাত, পা ইত্যাদি হেফাযত করা আমাদের জন্য খুবই জরুরী। মাসয়ালা-মাসায়েলের আলোচনা এজন্যই করতে হয়, যাতে অজানা বিষয়কে জেনে আমল করা যায়। ইমাম,মুয়াযযিন, আলেম-উলামারা যদি আমল না করে তাহলে সমাজে কারা আমল করবে? আমাদের, বিশেষ করে ইমাম সাহেবদের কর্তব্য হলো মানুষদেরকে দু’চারটি সুন্নতের বিষয় বলা এবং আমলের জন্য তাকীদ দেয়া। অল্প অল্প করে শেখালে একদিন দেখা যাবে অনেক সুন্নত শেখা হয়ে গেছে। বস্তুত জানলেই তো আমল করা যায়। জেনে-শুনে-বুঝে আমল করার জন্য আল্লাহ পাক আসমানী কিতাব ও তার সঙ্গে পয়গম্বর পাঠিয়েছেন। ইমাম সাহেবগণ নবীর ছেড়ে যাওয়া দায়িত্ব পালন করবে। কারণ আর কোনো নবীর আগমন দুনিয়াতে হবে না। তাই দ্বীনী মাসয়ালা-মাসায়েল মুসল্লীদেরকে অল্প অল্প করে শেখানো উচিত।
আমাদের না জানার প্রধান কারণ হলো অলসতা ও উদাসীনতা। এই অলসতা পরিহার করে জানার মেহনতে লেগে গেলেই সব ঠিক হয়ে আসবে। যারা মদ পানে অভ্যস্ত হয়েছে তারা প্রথমে অল্প অল্প করে খেয়েছিল। কিছুদিন পর পরিমাণ একটু বাড়ায়। এক সময় স্বভাবের সাথে খাপ খেয়ে যায়। ঠিক তদরূপ আমল করতে গেলে কষ্ট লাগবে, মন চাইবে না; তাই অল্প অল্প করে শুরু করলে একদিন আমলে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, ইবাদতে মজা আসবে।
প্রত্যেক ইমাম সাহেবের কর্তব্য, মুসল্লীদেরকে প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল শেখানো। সময় না হলে প্রতি জুমাবারে বয়ানের পর কমপক্ষে দুটি বিষয়ের মাসআলা বলে দেয়া যায়। এভাবে করলে মাসে আটটি মাসআলা মুসল্লীদেরকে শেখানো হয়ে যায়।
একদা একজন বড় আলেম আমার সাথে চার-পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েছিলেন। মুয়াযযিন সাহেব যখন ইক্বামাতে “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” বলেন, তখন ঐ আলেম জবাবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন। দুই তিন বার এরকম দেখার পর একদিন আমি তাকে বললাম, আপনি ইকামতের মধ্যে নবীর নাম শোনার পর দরূদ কেন পড়েন? তিনি বললেন, জাওয়াব দেয়ার জন্য পড়ি। পাল্টা প্রশ্ন করলাম যে, জওয়াবের এ নিয়ম কোথায় পেয়েছেন? তিনি তখন বললেন, সবাই পড়ে, এজন্য আমি পড়ি। আমি বললাম, আপনি হাদীসের কিতাব পড়ান অথচ এই মাসআলাটা আপনার জানা নেই? তিনি বললেন, বিষয়টির প্রতি সেভাবে খেয়াল করিনি।
বস্তুত তিনি এমনটি করেন অতীতের অভ্যাসের কারণে। ইমাম-মুয়াজজিন ও আলেমরা যদি ভুল আমল করতে থাকেন তাহলে মুসল্লীরা কী করবেন? অনেক এলাকাতে শুনেছি সকলেই “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” এর জবাবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে। এটা ভুল। সঠিক হলো, মুয়াযযিন যা বলেন মুসল্লী তাই বলবেন। আযান শেষ হলে দুরুদ পড়ে নিতে হবে। অনেকে আযানের জওয়াব দেন কিন্তু ইক্বামাতের জাওয়াব দেন না। অথচ ইকামতের জাওয়াব দেয়াও সুন্নাত। এই যে দুটি মাসআলা আমি বললাম, এরকম দুটি করে মাসআলা বলে দিলেও তো মুসল্লীরা শিখতে পারেন।
মুসল্লীদেরও কর্তব্য হলো, নিজে না জানলে আলেমদের নিকট হতে জেনে নেয়া। তাও সম্ভব না হলে মাসআলার সঠিক বাংলা বই যেমনÑ বেহেশতী জেওর, আহকামে জিন্দেগী ইত্যাদি কিতাব পাঠ করে করে শিখতে থাকা। অনেক মুসল্লীকে দেখা যায় মাসবুক হওয়ার পর ইমাম সাহেবের প্রথম সালাম শুরু করার সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে যান বাকী নামায আদায় করার জন্য। এটা ভুল। সঠিক মাসআলা হলো, ইমাম সাহেব উভয় দিকে সালাম শেষ করার পর মাসবুক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বাকী নামায আদায় করবেন। এগুলো কঠিন কোন মাসআলা নয়। একটু হিম্মত করলেই শেখা যায়। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, মসজিদে দীর্ঘ বয়ানের দ্বারা মুসল্লীদের ফায়দা কম হয়। তার চেয়ে দু’চারটি মাসআলা শিক্ষা দিয়ে দিলে আর এর উপর আমল করতে পারলে অনেক বেশি লাভ হয়।
ইমাম সাহেবদের উচিত মুসল্লীদের সামনে কষ্টদায়ক, পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্রুপাত্মক ওয়াজ না করা। পবিত্র কুরআনে এসেছে
ادع الي سبيل ربك باحكمة والموعظة الحسنة
এর মর্মার্থ হলো মানুষকে যখন দ্বীনী কথাবার্তা শোনানো হয় তখন এমনভাবে বলা উচিত যাতে তারা আকৃষ্ট হয়ে তা গ্রহণ করে। হেকমত এর মাধ্যমে বলার উদ্দেশ্য হলো কারো অন্তরে আঘাত দিয়ে কথা না বলা। কষ্টদায়ক কথা বলার দ্বারা মানুষের মাঝে ঝগড়া-কলহ সৃষ্টি হয়। ফলে সমাজে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি জেগে উঠে। বয়ানের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শ্রোতাদের আমল করানো। এখন এই বয়ান যদি বিপরীতমুখী হয় তাহলে তো তা আর বয়ান হলো না, বরং তা ফেতনার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। যদি কেউ ওয়াজে বলে যে, বেদআতীতের চৌদ্দপুরুষসহ সবাই জাহান্নামে যাবে, তাহলে তো বেদআত আর দূর হবে না। নিয়ম হলোÑ প্রথমে বেদআতের ক্ষতির সে বিষয় গুলো বলা, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। এরপর সুন্নতের লাভ ও ফায়দার আলোচনা করা। এভাবে করলে সমাজ থেকে বেদআত দূর হয়ে সুন্নতের হাওয়া চালু হবেই। মোটকথা দ্বীনী কথা বলার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, শ্রোতাগণ যেন তা সাদরে গ্রহণ করে এবং তদনুযায়ী আমল করে। একজন মানুষ নামাযই পড়ে না; এখন যদি তাকে বলা হয় যে, খানার মধ্যে ষোলটি সুন্নত পালন না করলে খানাটা শয়তানের খানা হয়ে যাবে। তাহলে কি তার মধ্যে কোন ভালো প্রতিক্রিয়া হবে? নিয়ম হলোÑথ এভাবে না বলে তাকে বলতে হবে, ভাইজান! আপনি প্রথমে শুধু শুক্রবারের নামাযটুকু পড়বেন। তারপর একদিন বললেন, ভাই মাগরিবের নামাযটাও পড়বেন। কারণ, মাগরিবের নামায সূর্য ডোবার পর হয়। একদিন আমাদের জীবনের সূর্য এভাবে ডুবে যাবে। এভাবে বলতে বলতে একদিন দেখা যাবে ঐ ব্যক্তি পাচ ওয়াক্ত নামায ওয়ালা হয়ে যাবে। হযরত থানবী রহ. হিকমতের মাধ্যমে মানুষকে সৎপথে আনার পদ্ধতি গ্রহণ করতেন। এরকম দুটি ঘটনা আছেÑ
(১) এক গায়ক হযরত থানবী রহ.-এর দরবারে এসে মুরীদ হলো এই শর্তে যে, সে কোন আমল করতে পারবে না। হযরত বললেন, তোমাকে বেশি কোন আমল করতে হবে না, শুধু একটি আমল করবা; তাহলো, আযান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাযটুকু আদায় করে নিও। এরপর আবার তোমার গান চালিয়ে যেও। লোকটি বিভিন্ন আসরে গান গাইতো। থানভী রহ.-এর কথা মুতাবেক গান গাওয়ার সময় আযান হয়ে গেলে তা ফেলে মসজিদে চলে যেত। গান গাওয়া বাদ দিয়ে মসজিদে চলে গেলে স্বাভাবিকভাবে শ্রোতাদের অসুবিধা হয়। এভাবে কয়েক দিন অতিবাহিত হওয়ার শ্রোতারা বিরক্ত হয়ে তাকে বাদ দিয়ে দিল। এভাবে নামাযের বরকতে লোকটি সমস্ত পাপ ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত খাঁটি আল্লাহ ওয়ালা বনে গেল।
দ্বিতীয় ঘটনা হলো, হযরত থানবী রহ. একবার ট্রেনের সফরে কোথাও যাচ্ছিলেন। পাশের সিটে বসা ছিল একজন ক্লীন শেভ করা ভদ্রলোক। হযরত থানভী রহ. সেই লোকের সাথে এমন আলাপাচারিতা শুরু করলেন যেন তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। এক পর্যায়ে যোহরের নামাযের সময় হয়ে গেল। হযরত থানবী তাকে কিছু না বলেই নামাযে চলে গেলেন। এ দিকে লোকটির মনে এই ধারণা উদয় হতে লাগলো যে, এই ব্যক্তি এত বড় আলেম, আমার সাথে কত সুন্দরভাবে কথাবার্তা বললেন। যখন নামায পড়তে গেলেন আমাকে কিছুই বললেন না! মনে হয় নামায পড়ে এসে তিনি আর আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। এদিকে থানভী রহ. নামায শেষ করে পূর্বের ন্যায় আবার লোকটির সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। আসরের নামাযের সময় হলে হযরত থানবী লোকটিকে এবারও কিছু না বলেই আসরের নামায পড়তে গেলেন। লোকটির মনেও পূর্বের ধারণাটা আরো প্রকটভাবে উদয় হলো যে, আগের বার ফিরে এসে কথা বললেও এবার মনে হয় নিশ্চিতই চুপ থাকবেন। কিন্তু না, হযরত থানবী রহ. আসরের নামায পড়ে এসেও হাসি-খুশি মুখে পূর্বের ন্যায় লোকটির সঙ্গে আলাপে লিপ্ত হলেন। অতঃপর মাগরিবের নামায পড়লেন এবং পুনরায় কথাবার্তা বললেন। যখন এশার সময় হলো, তখন থানবী রহ.-এর সফরসঙ্গী এবং খলীফা খাজা আযীযুল হাসান মাজযুব রহ. হযরত থানবী রহ.-কে বললেন, হযরত! লোকটি মনে হয় আপনার খুবই ভক্ত হয়ে গেছে। যদি এবার তাকে নামাযের কথা বলতেন তাহলে হয়তো নামায পড়তো। হযরত থানবী রহ. বললেন, যদি আমি তাকে নামাযের কথা বলি তাহলে সে আমার কথা মান্য করতেও পারে, নাও করতে পারে। যদি আমার কথা মতো সে নামায পড়তে যায় তাহলে সেটা হবে চাপের করণে। পরে আর পড়বে না।
এ দিকে লোকটি বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে পুরো ঘটনা খুলে বললো, তারপর অনুশোচনার সাথে বলতে লাগলো যে, আমি আজ যবাই হয়ে গেছি। স্ত্রীও তাকে মৃদু ভর্ৎসনা করলো। সর্বশেষ ফলাফল হলো, লোকটি তখন থেকে পাকা নামাযী হয়ে গেল।
আমার নিজের একটি ঘটনা শুনাই। একবার আমি হারদুঈ সফরে গেলাম। পথে ইন্ডিয়ার এক ক্রীড়া দলের সেক্রেটারীর সাথে দেখা হলো। দেখা হওয়ার পর তিনি আমাকে বললেন, হুযুর! আপনি বাংলাদেশের বড় আলেম! কোথায় যাওয়ার ইচ্ছা করেছেন? বললাম, হারদুঈতে যাবো। তিনি বললেন, আমার বাসায় যদি একটু পদধুলি দিয়ে যেতেন তাহলে খুব খুশি হতাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাতে লাভ কী? উত্তরে বললেন, শুধু একটু বরকতের আশায়।
এদিকে আমার সাধারণত কারো বাসা-বাড়ীতে দাওয়াত খাওয়ার জন্য যাওয়া হয় না। তিনি এত পীড়াপীড়ি করলেন যে, না যেয়ে পারা গেল না। শেষ পর্যন্ত গেলাম। আমার সঙ্গে ছিল আমার মাদরাসার এক ছাত্র। আমি মনে মনে ভাবছিলাম যে, না জানি আমার ছাত্র যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় গিয়ে কী কথা বলে? যাহোক রাত সেখানেই কাটাতে হল। সকালে নাস্তা খেয়ে যখন রওনা দেব তখন ঐ লোকের বড় দুই মেয়ে ও স্ত্রী দোয়া নেয়ার জন্য আমার সামনে চলে আসলো। আমার ছাত্র তো আমার সম্পর্কে জানে। সে ভাবছে, আজ না জানি হুযুর কেমন ধমক শুরু করে। যাহোক আসতে দেখেই আমি চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম। ওরা এসে পায়ে সেলাম করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি দোয়া করে তাদেরকে বিদায় দিয়ে দিলাম এবং আমিও বিদায় নিয়ে নিলাম। পরবর্তী বছর আমি যখন হজ্বের উদ্দেশ্যে মদীনা শরীফে গেলাম তখন এক জায়গাতে হাটা অবস্থায় শুনতে পেলাম যে, পেছন থেকে ‘হুযুর হুযুর’ বলে এক লোক আমাকে ডাকছে। দাঁড়িয়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে আপনি? আপনাকে তো চিনতে পারছি না। উত্তরে তিনি বললেন, ইন্ডিয়াতে গত বছর যার বাড়ীতে মেহমান হয়েছিলেন আমি সেই ব্যক্তি। পরিচয়ের পর তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে বললো, আমার স্ত্রী ও মেয়েরা শুধু আপনার কথা বলে এবং আপনাকে নেয়ার জন্য আমাকে বারবার তাগাদা দেয়। প্রশ্ন করলাম, কারণ কী? উত্তরে বললেন, ওরা যখন আপনার সামনে এসেছিল তখন আপনি নাকী চোখ বন্ধ করে দোয়া করেছিলেন। ওরা বলে যে, হুযুর অনেক ভাল মানুষ। তিনি আমাদেরকে ধমক না দিয়ে চোখ বন্ধ করে আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। আপনার এই কাজটা তাদের অন্তরে এমন প্রতিক্রিয়া করেছিল যে, এরপর থেকে আমাদের পরিবারের সবাই নামায পড়তে শুরু করলাম। পুরুষরা দাড়ী রাখলাম, আর মহিলারা পর্দা করা শুরু করলো।
এ ঘটনা শোনানোর উদ্দেশ্য একথা বোঝানো যে, মানুষকে দ্বীনের পথে আনার পদ্ধতি কয়েকটি। একটি হলো কথার মাধ্যমে অন্যটি হলো আমল বা কাজের মাধ্যমে। বস্তুত কাজের মাধ্যমটিই মানুষের অন্তরে বেশি ক্রিয়াশীল হয়।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে দ্বীন বোঝা এবং অপরকে বোঝানোর তাওফীক দান করুন!

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১১২ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ১.০০)

২ টি মন্তব্য

  1. আল্লাহ তায়ালা মুহিউস সুন্নাহ মাহমুদুল হাসান দা: বা: কে নেক হায়াত দান করূন। এবং উনার ইসলাহী বয়ানের দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করূন। (আমীন)
    আপনাকে ধন্যবাদ উনার বয়ান পোষ্ট করার জন্য, আরও বেশি বেশি আশা রাখব। (*) (*) (*)