লগইন রেজিস্ট্রেশন

মানবতার সেবায় এগিয়ে আসুন।

লিখেছেন: ' মুসাফির' @ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২১, ২০১১ (৩:৫৪ অপরাহ্ণ)

লেখক রুখসানা তাজিন।
“আমরা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। বড়লোকের কুকুরের এক ঠ্যাংয়ের চেয়েও আমাদের মূল্য কম। আমাদের কথা ভাবার মত সময় কারো নেই।” হাস্যচ্ছলে এই নির্মম সত্য কথাগুলো সহকর্মীদের আর আমার মুখের উপর ছুঁড়ে দেয়া মানুষটার দিকে তাকালাম। পিএইচডি গবেষণার কাজে রাজশাহীর এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে সাব্বিরের কথা শুনলাম। বাংলাদেশের পতাকাসমত একটা হালকা সবুজ টিশার্ট গায়ে। মুখে সাদাকালোর মিশেলে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। ঠোঁটজোড়া সাদা হয়ে আছে। মুখের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘোলাটে চোখের আড়ালে জীবনের যে স্ফুলিঙ্গ উঁকি দিচ্ছে তা আমাকে শিহরিত করলো। আগের দিন এই মানুষটার কথা অন্য শিক্ষকদের কাছে শুনেছি। দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিস্থাপন ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। মৃত্যুর সাথে প্রতি মুহূর্তে যুঝে চলেছেন যিনি, তাঁর সামনাসামনি হয়ে সুস্থ থাকার লজ্জায় আমার মাথা নুয়ে এলো। আকর্ণবিস্তৃত নিষ্পাপ হাসি আর চোখের ঔজ্জ্বল্য বলে দিলো, প্রায় মধ্য তিরিশের এ মানুষটা পর্বতসম বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
মোহাম্মদ সাব্বির রহমান। রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া থানার মন্নুজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। দু’বছরের কন্যাসন্তান মৃদুলার কথা একবুক দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এলো, “মেয়েটা আমার এত সুন্দর। ওর জন্য বড় বাঁচতে ইচ্ছা করে। মিছেমিছি রান্না করে আমাকে বলে, আব্বু গোসতো নান্না করেছি, সুড়ুত করে খেয়ে ফেলো। হায়রে মেয়ে, এতিম হয়ে বড় হতে হবে। মাথার উপর কোন ছায়া থাকলোনা, বাবার আদর এই সুন্দর মেয়েটার কপালে নেই।“ সহকর্মীরা মিথ্যে সান্ত্বনা দিলেন, সর্বশক্তিমানের উপর আস্থা রাখতে বললেন। সাব্বিরের অসহায় হাসিই বলে দিলো তাঁর সব মনোবল শূণ্যের কোঠায় ঠেকতে বসেছে।
চারমাস আগে রাজশাহীতে করা টেস্ট রিপোর্ট অনুযায়ী সাব্বিরের ক্রনিক কিডনি রোগ ধরা পড়ে যা সর্বোচ্চ পঞ্চম ধাপে পৌঁছে গেছে। মার্চে ডাক্তার জানান অতিসত্বর হাসাপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। সিরাম ক্রিয়েটিনিন এর মাত্রা ১৫৪৫, যার স্বাভাবিক মাত্রা হওয়া উচিত ৬৬-১২৪। রক্তের ইউরিয়া ২৮.৪ (স্বাভাবিক ৩.৫-৪)। এছাড়াও অন্য অনেক ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী। ভারতের ভেলোরে যান উন্নত চিকিৎসার জন্য। সেখানেও ডাক্তাররা বলে দেন সাব্বিরের বাঁচানোর উপায় দুটো, কিডনি প্রতিস্থাপন অথবা আজীবন ডায়ালাইসিস এর আশ্রয় নেয়া। ডায়ালাইসিসের খরচ সাধ্যাতীত হওয়ায় প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন সাব্বির। সাব্বিরকে কিডনি দান করার জন্য তাঁর আপন বোন এবং ফুফাতো বোন রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু এই মার্চে বারডেম এ ক্রস ম্যাচিং করে দেখা যায় তাঁদের কারো সাথেই কিডনি ম্যাচ হয়নি।
সাব্বিরের জন্য সাহায্য চেয়ে দৈনিক আমার দেশ, কালের কন্ঠ, সানশাইন এসব পত্রিকা ছাড়াও রাজশাহীর স্থানীয় একটি ভিসিডি চ্যানেলে সংবাদ প্রচারিত হয়। “শিক্ষকরা আমার কষ্ট বোঝেন। এ পর্যন্ত যতটুকু অর্থ সংগৃহীত হয়েছে তার বেশিরভাগ পেয়েছি এঁদের কাছ থেকে। হাত বাড়িয়েছেন স্থানীয় কিছু বড়মনের মানুষ। ছাত্র, অভিভাবক যে যা পারে আমাকে ভালোবেসে তা-ই দিয়েছে”, জানালেন সাব্বির। কিডনি ম্যাচিং এর জন্য দু’বার টেস্ট এ চলে গেছে বেশ কিছু অর্থ। প্রতিদিন সাব্বিরকে অনেক টাকার ওষুধ খেতে হচ্ছে। নিয়মিত চেক-আপের জন্য ভারতে যেতে হচ্ছে। কিডনি বিক্রয়ের জন্য আগ্রহীরা যে মূল্য চাচ্ছেন তা সাব্বিরের সাধ্যের বাইরে। ভারত এবং বাংলাদেশের ডাক্তাররা জরুরি ভিত্তিতে প্রতিস্থাপনের জন্য তাগাদা দিলেও কিডনি সংগ্রহেই ব্যর্থ হচ্ছেন সাব্বির। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অপারেশন, আনুষঙ্গিক ব্যয় ছাড়াও অপারেশনের পরে একটা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমূল্যের ওষুধ সেবন করে যেতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় বিশ লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন। সাহায্যের অর্থ হাতে যা আছে তা দিয়ে কোনভাবেই কিডনি ক্রয় এবং পরবর্তী চিকিতসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেননা সাব্বির। আর এজন্যে দিনে দিনে স্বাস্থ্য আরো ভেঙ্গে পড়ছে। আস্তে আস্তে শরীরের সব প্রতিরোধ ক্ষমতা শেষ হয়ে আসছে। এখন হাঁটার মত শক্তি পাননা। একটু কথা বললেই হাঁপিয়ে পড়েন। সারারাত কাটে নির্ঘুম। ফুসফুসে পানি জমতে শুরু করেছে। সহকর্মীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ঘন্টা বেজে গেছে গো চাচী। ক্ষয়ে পড়ছে সবকিছু। সব শক্তি ফুরিয়ে যাবার সময় হয়ে এলো।” নিজে নিজে পড়াশোনা করে হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাওয়া ধরেছেন সাব্বির। প্রতিস্থাপনের আগ পর্যন্ত শরীরকে তো টিকিয়ে রাখতে হবে, এজন্যেই এই বিকল্প ব্যবস্থা।

“আট নয় হাজার টাকার বেতনের চাকুরি করে ব্যয়বহুল এই চিকিতসা গরীবের ঘোড়ারোগ ছাড়া আর কী?” সাব্বিরের অট্টহাসি আবার আমার অন্তর নাড়িয়ে দিলো। সবার অলক্ষ্যে অশ্রু মুছলাম। চোখের সামনে যার মৃত্যুর ছায়া ঝুলছে তাঁর সামনে কোন দুর্বলতা দেখানো মানে মানুষটার অদম্য প্রাণশক্তিকে হেয় করা। এত অসুস্থতা সত্ত্বেও সাব্বির নিয়মিত স্কুলে আসার চেষ্টা করছেন। যতটুকু পারছেন সহকর্মীদের কাজে সাহায্য করছেন। নির্ঘুম রাতের সঙ্গী এখন সাহিত্যের বই। নিজের সংগ্রহ থেকে বই এনে সহকর্মীদের সাথে বিনিময় করছেন সাব্বির। কেউ না জানলে বুঝবেনা কী ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছে গেছে তাঁর শারীরিক অবস্থা। সহকর্মীদের সাথে স্বাভাবিক কৌতুক করছেন, প্রাণখোলা হাসি হাসছেন। নিজের অসহায়ত্ব আর শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে হালকা রসিকতা করতেও কুন্ঠাবোধ করছেননা সাব্বির। প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, কোন বিষয়গুলোতে প্রাধান্য দেয়া উচিত এসব বিষয়ে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করছেন। “শিক্ষকদের ভালোমন্দের দিকে নজর না দিলে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বৃক্ষের নীচে যতই পানি ঢালা হোক, কোন ফল আসবেনা”, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা কী অবলীলায় বলে ফেললেন সাব্বির। সুস্থ হয়ে উঠলে স্কুল নিয়ে, ছাত্রদের নিয়ে তাঁর কী কী পরিকল্পনা আছে তার বিবরণ জানিয়ে আমাদের সবাইকে নিজেদের কাছে আরো ছোট করে দিলেন। এ যেন সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ভালো থাকার অভিনয় করে যাওয়া। কী অপূর্ব প্রাণস্পৃহা! আমার সব শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস সাব্বিরের সামনে নুড়িসম মনে হলো। জীবনের কত ক্ষুদ্র অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা নিয়ে আমরা হতাশায় কালক্ষেপণ করি। আর জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কীভাবে একটা মানুষ এত স্পৃহা নিয়ে স্বপ্ন, আশার কথা বলে যায়! শিক্ষার আলো ছড়াবার ব্রত নিয়ে যে মানুষটা কর্মজীবন শুরু করেছে, সে কি কান্নার হাসি হাসতে হাসতেই হারিয়ে যাবে?
সাব্বির যে সুন্দর দেশের সুন্দর মানুষের স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত, আমাদের মধ্যে এখনো সেই মানুষগুলো বিরাজ করে। এজন্য বাইশ বছরের ছন্দা সাব্বিরের খবর শুনে কিডনি দেয়ার জন্য সাব্বিরকে ফোন দেন। সাব্বির তাঁকে হেসে বলেন, “তুমি এখনো ছোট। সামনের তোমার পুরোটা জীবন। আমার জন্য একটা অঙ্গহানি করবে কেনো?” এরকম অনেক ছন্দা সাব্বিরের জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। আমি আজ করজোড়ে সাহায্য চাইছি আপনাদের কাছে। যার যতটুকু সামর্থ্য তাই নিয়ে আমরা সাব্বিরের পাশে দাঁড়াই। অর্থ দিয়ে, মনোবল দিয়ে আমরা একজন আলোকিত শিক্ষকের সুস্থতার জন্য একতাবদ্ধ হই। পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী সবার কাছে সাব্বিরের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করি। সমাজে এমনও অনেক মানুষ আছেন যাঁদের দানে বিশ লক্ষ টাকা অল্প সময়েই উঠে যেতে পারে। আমরা তাঁদের কাছে সাব্বিরের খবরটুকু পৌঁছে দেই। যত দ্রুত আমরা একটা অংক সাব্বিরের হাতে তুলে দিতে পারবো তত দ্রুত তিনি কিডনি ক্রয় এবং পরবর্তী চিকিৎসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। নিজের একটু সঞ্চয় আমরা একটা জীবনের জন্য আজ তুলে দেই। আমি আপনাদের উপর আশা রাখি, সাব্বিরকে দেখে আবারো মানুষের উপর আস্থা অর্জন করি। আমরা পারবো। আমরা অতি দ্রুত সাব্বিরকে কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করে দিতে পারবো। এ আবেদনটা সাক্ষাতে, ফোনে, ইমেইলে, ফেসবুকে, টুইটারে আমরা পরিচিত সবার কাছে ছড়িয়ে দেই। অনেক আশা নিয়ে আজ আপনাদের শরণাপন্ন হয়েছি।

সাব্বির চাতকের মত বসে আছেন মনুষ্যত্বের গরিমা দেখার জন্য। তাঁর ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিতঃ সাব্বির রহমান, সঞ্চয়ী হিসাব নং ১১২২১০৮০০১৪৪১৩, প্রাইম ব্যাংক, রাজশাহী। মুঠোফোনে সাব্বিরকে পাবেন ০১৭১৯৯৩৩০৯৬ এই নম্বরে।

সাব্বিরকে ভালো কিছু খবর জানাতে পারবো এই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করছি।

বি.দ্র.: একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো রক্তের গ্রুপ মিলে যাওয়া। সাব্বির ভাইয়ের বি পজেটিভ। কিডনি দাতার গ্রুপও একই হতে হবে। কিডনি পাওয়ার পরে বারডেম এ টিস্যু ম্যাচিং এবং ক্রস ম্যাচিং এর জন্য খরচ লাগে প্রায় ২০/২৫ হাজার টাকা। ম্যাচ হওয়াটাই প্রথম ধাপ। নাহলে এই খরচটা বিফলে গেলো।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১০৮ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৪.৫০)