লগইন রেজিস্ট্রেশন

এই ধর্মতো সহজ ধর্ম..

লিখেছেন: ' মুসলিম' @ বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১০, ২০০৯ (১:২১ অপরাহ্ণ)

মূল: শেখ সালমান আল-আওদাহ

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেন,” এই ধর্মতো সহজ ধর্ম । কেউ ধর্মে অত্যধিক কঠোরতা আরোপ করতে গেলে, সে নিজেই ধর্মের হাতে ধরাশয়ী হয়ে পড়বে। কাজে কাজেই, যতটা পার সর্বোত্তমভাবে তোমার দায়িত্ব পালন কর এবং উত্ফুল্ল হও। তোমার সকালের এবং সন্ধ্যার প্রচেষ্টার ওপর ভরসা কর, এবং রাতেও একটু, আর তাহলে তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।” [সহীহ বুখারী]

রাসুল সা. এর এই কথাগুলো প্রকৃত ইসলামী মধ্যপন্থা কী জিনিস তা আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয়। আমরা জানি যে, ইসলামের কোনো মৌলিক নীতি ঠিকমতো বুঝতে হলে ব্যক্তিবিশেষের খেয়ালখুশি নয় বরং প্রতিষ্ঠিত সূত্রগুলো থেকেই ঐ নীতি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় কোনো ইসলামী নীতিকে এমন ভুলভাবে সংজ্ঞায়িত করে ফেলা হতে পারে যা কেবল অত্যন্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচায়ক এবং যা ইসলামী দাওয়াত ও কর্মপন্থার সামনে হাজির হওয়া বিবিধ চ্যালেনজ মোকাবেলায় অক্ষম।

রাসুল সা. বলেন,” এই ধর্মতো সহজ।” সহজতা মানেই মধ্যপন্থা। সুতরাং আমাদের ধর্ম একটি মধ্যপন্থী ধর্ম, আর জাতি হিসেবেও আমরা মধ্যপন্থী। আল্লাহ বলেন, “আর এভাবেই আমরা তোমাদের বানিয়েছি একটি মধ্যপন্থী জাতি।” [সুরাহ বাকারা: ১৪৩]

রাসুল সা. মধ্যপন্থার বৈশিষ্টগুলো নিম্নলিখিতভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন:
[১] তিনি বলেন, “কাজেই তুমি তোমার দায়িত্ব পালন কর..” এখানে মূল আরবী শব্দটি হলো ‘সাদ্দাদু’ – যার আক্ষরিক অর্থ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত করা, তীর যেমন লক্ষ্যে গিয়ে আঘাত হানে। কাজেই বোঝা গেল যে, মধ্যপন্থা আমাদেরকে কখনই ইসলামী আইনের বাইরে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়না। ইসলামী হুকুম অবশ্যই কোরআন এবং সুন্নাহ থেকে উত্সারিত হতে হবে। সহজতা বা মধ্যপন্থা কোনো অবস্থাতেই ইসলামী আইনের শৈথিল্য বোঝায়না, এটা এও বোঝায়না যে ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত আচরণে কেউ তার নিজের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে চলবে। কাজেই আমরা যদি ইসলামী আইন ও হুকুম থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে ফেলি, তাহলে প্রকৃত মধ্যপন্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যই হারিয়ে যাবে।

[২] তারপর তিনি বলেন, “যতটা পারো সর্বোত্তমভাবে..” এখানে রাসুল সা. মধ্যপন্থার একনম্বর বৈশিষ্ট্যটি বলার পরপরই এর সম্পূরক বৈশিষ্ট্যখানি উল্লেখ করলেন। আল্লাহ আদমকে তৈরী করেছেন এমনভাবে যে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ খুব সামান্যই। আল্লাহর হস্তক্ষেপ ছাড়া মানুষের পক্ষে নিখুঁতভাবে কোনো কাজ ই করা সম্ভব নয়। কাজেই ‘যতটা পারো সর্বোত্তমভাবে’ বলে রাসুল সা. বোঝাতে চাইছেন যে, মানুষের কাছে সম্পূর্ণ ত্রুটিহীনতা আশা করা হচ্ছেনা। আমরা এও বলতে পারি যে, মানুষের কাছে পরম নিখুঁত আচরণ আশা করা মূলত: মধ্যপন্থার নীতিরই পরিপন্থী।

[৩] তারপর তিনি বললেন, “এবং উত্ফুল্ল হও..” কাজেই মধ্যপন্থার সংজ্ঞা জানা এবং আমাদের সীমাবদ্ধতা জানার পর রাসুল সা. আমাদের আনন্দিত হওয়ার সুসংবাদ জানাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে মানুষে মানুষে যতরকম সমস্যা ও জটিলতা বিরাজ করে তার বেশিরভাগের সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই, বরং ওসব সৃষ্ট হয় দলীয় আনুগত্য ও পক্ষপাতিত্ব থেকে। কাজেই আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা বজায় রেখেই আচার-আচরণ করা মধ্যপন্থার অন্যতম নীতি।

[৪] সবশেষে তিনি বললেন, “তোমার সকালের এবং সন্ধ্যার প্রচেষ্টার ওপর ভরসা কর, এবং রাতেও একটু, আর তাহলে তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।” এই কথা থেকে আমরা বুঝলাম যে, মধ্যপন্থার অন্যতম নীতি হলো আমাদের পক্ষে কতটুকু সম্ভব সেটা বিবেচনায় রাখা এবং ঐ সীমারেখার মধ্যেই অবস্থান করা। এটা এও বোঝায় যে মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে এবং অন্যের সাথে আচরণের সময় জিদ-গোয়ার্তুমি পরিহার করবে।

নিজের সামর্থ্যের মধ্যে কাজ করার নীতিটির ব্যবহারিক মূল্য ব্যপক। এটা আমাদেরকে সুযোগ এনে দেয় অন্যান্য মুসলিমের বিভিন্ন রকম দাওয়াতি তত্পরতাকে আন্তরিকভাবে আলিঙ্গন করতে। আমাদের কখোনই উচিত নয় অন্য মুসলিমের দাওয়াতি কাজ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখা – যদি না তারা ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ও অবিসংবাদিত বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে কিছু না করে। স্রেফ মতামত বা ধারণার উপর ভিত্তি করে এমনটা করা কখোনোই ঠিক নয়।

আমাদের সমস্যা হলো, অনেক লোক মধ্যপন্থা বলতে যা বোঝে তাতে পূর্বোল্লিখিত চারটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটেনা। কেউ কেউ মধ্যপন্থার কনসেপ্ট তৈরীতে ইসলামের মূলনীতি আঁকড়ে ধরে রাখতে আগ্রহী নয়। ফলে তাদের আইডিয়াগুলো হয়ে পরে স্ববিরোধী এবং দুর্বলভাবে সংজ্ঞায়িত। আরেক দল আবার ঠিক বিপরীত। এরা মানুষের কাছ থেকে পারফেকশন (পূর্ন নিখুঁত হওয়া) দাবী করে। অথচ স্বয়ং আল্লাহ আমাদের কাছে ততটুকুই চান যা আমাদের সামর্থ্যের ভিতরে, আর সেটাও ইসলামের মৌল আইনের (the Law) ব্যপারে, ফিকহ সংক্রান্ত বিবেচনার (juristic discretion) বিষয়গুলোয় তো আরো ছাড় প্রত্যাশিত। কিন্তু আজকাল এমন মুসলিম গজিয়েছে যারা তাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে তাল না মিলালে অন্যদের দূরে ঠেলে দেয়, আর তাদের মতের বিরোধিতা করলেতো রীতিমতো ঘৃণা ছড়াতে শুরু করে।

এটা পরিতাপের বিষয় যে, তারা একে অন্যকে পরিহার করে এই অজুহাতে যে তারা নাকি প্রতিষ্ঠিত ইসলামী নীতিকেই (যেমন, মধ্যপন্থার নীতি বা কোরআন-সুন্নাহ মেনে চলার নীতি) রক্ষা (defend) করছে, বা সালাফে সালেহীন (প্রথম যুগের পূণ্যবাণগণ) এর পথকে আঁকড়ে আছে। এই লোকগুলো আসলে কোনটা প্রকৃত নীতি আর কোনটা নীতি সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ধারণা – এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়। কাজেই তারা অন্যকে ইসলামী নীতি লংঘনের দায়ে দোষারোপ করে, এটা না বুঝেই যে এসব মতপার্থক্যের সাথে মৌলনীতির কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এটা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেরই (interpretation) ফলাফল।

আজকের যুগে ইসলামী কাজের (Islamic work) ক্ষেত্রে যে অমার্জনীয় পরিমান কনফিউশন ও স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার কারণ হলো ইসলামের কর্মীগণ মধ্যপন্থার নীতিকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এসব সমস্যাসত্ত্বেও প্রতিনিয়ত অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, এবং মধ্যপন্থার অনেক অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদাহরণও আমরা প্রতিনিয়তই লক্ষ্য করছি।
————-

Link: http://www.islamtoday.com/showme2.cfm?cat_id=31&sub_cat_id=750

বি দ্র: লেখাটি ইসলামিক ডিসকাশন ফোরামেও পোস্ট করা হয়েছে।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৬৬ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)