লগইন রেজিস্ট্রেশন

মুসলিম জীবনে ‘সময়’ – শেষ পর্ব

লিখেছেন: ' মুসলিম৫৫' @ শনিবার, এপ্রিল ২৪, ২০১০ (৬:৫৮ পূর্বাহ্ণ)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
السلام عليكم ورحمة الله و بركاته

[এই সিরিজের প্রথম লেখা ৩ টি রয়েছে এখানে: www.peaceinislam.com/muslim55/5793/
www.peaceinislam.com/muslim55/5822/
www.peaceinislam.com/muslim55/5919/ ]

আজকালকার কনজ্যুমার কালচারের “মুষিক দৌড়ের” যুগে অত্যন্ত সুহৃদ কারো বাসায় গিয়ে আমাকেই অনেক সময় বিব্রত হতে হয়েছে। একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে করতে পারি:
আমাদের বাসগৃহে স্যাটেলাইট সংযোগ না থাকাতে, আমার স্ত্রী এবং আমি দেশের ঐ সব ‘নালায়েক’ অপদার্থদের দলভুক্ত, যারা জানলই না যে হিন্দুস্থানের নির্ভেজাল কাফির-কালচার ভিত্তিক কোন অভূতপূর্ব সিরিয়ালটি (যেটি না দেখলে আমাদের ; মুসলিমদের জন্ম প্রায় অর্থহীন হয়ে যেতে পারে) সপ্তাহের কোন দিনে এবং কোন ক্ষণে! এভাবেই একদিন আমরা ঠিক ঐ ধরনের একটি বিশেষ মুহূর্তে এক বন্ধুর বাসার দুর্গের প্রহরীদের ছাঁকুনী পেরিয়ে তার কলিং বেলের বোতাম টিপি। দরজা খুলে আমাদের দেখে বন্ধুর পরিবারবর্গের চেহারা বিবর্ণপ্রায়। তাড়াতাড়ি TV বন্ধ করে তাদের ড্রয়িংরুমের ঘরোয়া পরিবেশকে আমাদের উপযোগী করে তোলা হলো। ঐ পরিবারের সবাইকে ইঙ্গিতে জানিয়ে দেয়া হলো যে, the party is over । ব্যাপারটা এতই অস্বস্তিকর ছিল যে, আমরা তাদের ঠিক কোন অপ্রতিরোধ্য সিরিয়ালটি দেখা থেকে বিরত করে তাদের মানব জনম প্রায় বিফল করে দিলাম – লজ্জায়-সংকোচে একথাটা তাদের আর জিজ্ঞেসই করতে পারলাম না। আমার অপরাধবোধের আরেকটা কারণ ছিল এই যে, আমি তাদের বলতেও পারছিলাম না যে, তারা যা দেখছিলেন তা দেখলেই পারেন – আমরাও তাদের সাথে দেখবো – দেখা শেষে না হয় আলাপ করা যাবে।

এভাবেই তাহলে আজ তিন দশকের বন্ধুত্বকে ‘সময়’ দেয়া থেকে, কাফিরের রূপ-ব্যবসার গ্রাহক বা consumer হওয়াটা আমাদের মুসলিমদের কাছে অধিকতর প্রিয়। এই বাস্তবতাকে আহমাদ থমসন তার বইতে: “There is less time to meet together and more time to watch television.” বলে বর্ণনা করেছেন [দেখুন:page#12, Dajjal – the AntiChrist – Ahmad Thomson.] । যাহোক্, আমরা যে দ্রুত অন্ধকার মৃত্যুর দিকে অনিবার্যভাবে ধেয়ে চলেছি – নিজের অস্তিত্বের চেয়ে অধিকতর নির্ভরযোগ্য এই সত্য অনুধাবন করার পর, আমার পরিবারের সদস্যরা, আমরা, বর্তমান বিশ্বে যাদের “আলোকপ্রাপ্ত” বলা হয় – ভোগ-সুখের রঙিন আলোতে ডুবে থেকে যারা মৃত্যুর অন্ধকার ভুলে থাকতে চান – সে সব মানুষের সাথে সামাজিক পর্যায়ের উঠাবসা বা সখ্যতা প্রায় এড়িয়েই চলি। এর ব্যতিক্রম হচ্ছেন তারা, যে সব আত্মীয়-বন্ধুদের আমরা খুব কাছের মনে করি এবং যাদের জাহান্নামের সর্বগ্রাসী আগুনে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করাটা সত্যিকার অর্থে তাদের প্রতি আমাদের স্নেহ-ভালোবাসার সবচেয়ে বড় দাবী বলে আমরা মনে করি – তাদের কাছে আমরা বার বার যাই – যাতে তাদের দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার একটা রাস্তা খোলা থাকে বা সুযোগ থাকে – যদিও TV নাটক, সিরিয়াল বা সিনেমার ঘোরে অচেতন অধিকাংশ মানুষের জীবনে এসব নিয়ে কথা বলার অবকাশ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রেই ভাবটা এমন যে, ‘কি করবো বলুন জীবনে সময় এত কম – জীবন এত ব্যস্ত যে, এসব নিয়ে ভাবারই সুযোগ হয় না’ – আবার কারো কারো ভাব এমন যে, “এখুনি কি? এসব নিয়ে ভাবার অনেক ‘সময়’ পড়ে রয়েছে, বয়সটা আরো বাড়ুক – তখন দেখা যাবেখন।”

সিঙ্গাপুরীদের ভিতর একটা চুটকি প্রচলিত আছে, যেটা ভিন্ন আঙ্গিকে আমি অন্য দেশের লোকজনদেরও বলতে শুনেছি। গল্পটা এমন: সেখানকার মাছের বাজারে জীবন্ত কাঁকড়া বিক্রি হয় – যেগুলোকে পাত্রে রাখা হয়। ঐ সব পাত্রের মুখ ঢেকে রাখতে হয়, যাতে কাঁকড়াগুলো পাত্র থেকে বেরিয়ে চলে না যায়। সিঙ্গাপুরের বাজারে, আমদানীকৃত কাঁকড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কাঁকড়াও পাওয়া যায়। এক বিক্রেতা এমন তিনটি পাত্রে, তিনটি ভিন্ন উৎসের কাঁকড়া নিয়ে বসেছিল। দু’টো পাত্রের মুখ ঢাকা ছিল কিন্তু তৃতীয়টির উপর কোন ঢাকনা ছিল না। কোন ক্রেতা জিজ্ঞেস করলে, বিক্রেতা ব্যাখ্যা করেন যে, আমদানীকৃত কাঁকড়াগুলো ঢেকে রাখতে হয়, না হলে ওগুলো পাত্র থেকে বেরিয়ে চলে যায়। তবে সিঙ্গাপুরী কাঁকড়ার সমষ্টি নিয়ে সে ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না। ক্রেতা তখন আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে, বিক্রেতা ব্যাখ্যা করেন যে, সিঙ্গাপুরী কোন একটা কাঁকড়া যদি পাত্র থেকে বেরুতে চায়, তবে বাকী যেগুলো বেরুতে অক্ষম, সেগুলো সেটাকে টেনে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসে। সুতরাং কারো আর পাত্র থেকে বেরিয়ে আসা হয় না।

আমাদের দেশে এমন বহু পরিবার আছে, যেখানে একজন ছেলে বা একজন মেয়ে, প্রচলিত ধারার একেবারে বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে আল্লাহর অশেষ রহমতে হেদায়েত লাভের আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত – অথচ, এদের পরিবারের বাকী সকলে যেন পণ করেছেন যে, তাকে তারা কিছুতেই Pit of hell বা নরককুণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে দেবেন না। আমি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স্কা এমন বেশ কয়েকজন মুসলিমাহ্ সম্বন্ধে জানি, যারা নিজ পরিবার কর্তৃক নির্বাসিত ও নিগৃহীত – কারণ তারা বিশ্বাসী এবং তারা হয়তো কুর’আনের ঐ বক্তব্য, যেখানে বলা হয়েছে যে, ‘আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্য’ – সেটাতে বিশ্বাস করেন। ঠিক এমনিভাবে আমি তিনজন ভদ্রলোকের কথা জানি, যারা মধ্যবয়স্ক বা বলা যায় মধ্যবয়সও পেছনে ফেলে মৃত্যুপথযাত্রী – অথচ, তাদের পরিবার, বিশেষত তাদের স্ত্রীরা, কিছুতেই যেন তাদের Pit of hell থেকে বেরিয়ে আসতে দেবেন না বলে পণ করেছেন – এরা সবাই সম্মানজনক সামাজিক অবস্থায় ও অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। অথচ জীবনের স্রোতের উজানে, হয়তো বিশ বছর আগে ইসলামসম্মত উপায়ে স্ত্রী নির্বাচন না করার যে ভুল করেছিলেন, তারই খেসারত দিতে গিয়ে আজ নিজ গৃহে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তিলে তিলে পৃথিবীতেই যে বেহেস্ত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, বৈষয়িক দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ বেহেস্ততুল্য ঘর সাজাতে পারলেও, তা জাহান্নামতুল্য সংসারে পরিণত হয়েছে - অথচ সংস্কার বা অনিশ্চয়তার ভয়ে সেই সাজানো বাগানসদৃশ নরককে ভেঙ্গে তছনছ করে নতুন করে, house-এর পরিবর্তে সুন্দর home-এর স্বপ্ন দেখতে তারা ভয় পান। এজন্যই আল্লাহ্ বুঝিবা কুর’আনে বলেছেন যে, স্ত্রী-সন্তানের মাঝে আমাদের শত্রু নিহিত রয়েছে ।

এতক্ষণ ধরে আমরা উপরে যা আলোচনা করলাম, সেখান থেকে আমরা এই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, আধুনিকায়নের ফলে, যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের ফলে, নানা রকমের gadget-এর উদ্ভাবনের ফলে আমরা আজ প্রচুর ‘সময়’ বাঁচাতে সক্ষম। গড় আয়ু ৫৭ বছর ধরলে, জীবনে আমরা হিসেব করেছি গড়ে ৯.৫ (সাড়ে নয়) বছর বা, গোটা জীবনের ১/৬-এর সমতুল্য অতিরিক্ত ‘অবসর সময়’ বেরিয়ে আসছে, যা ৫৭ বছরের আয়ুষ্কালের ১৬.৬৭%। আমরা যদি বিশ্বাস করতাম যে, ‘আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল আল্লাহ্র ইবাদত করার জন্য’, তাহলে, সময়ের এই বিশাল সাশ্রয়কে আমরা আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে ব্যয় করতাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, আমরা সাশ্রয়কৃত ঐ সময়কে সিগারেট ফুঁকা, ক্রিকেট খেলা দেখা, ভিডিও গেম খেলা, ইন্টারনেটে পর্ণোগ্রাফিক সামগ্রী উপভোগ করা, বা সিনেমা-নাটক দেখা ইত্যাদির মত ‘মহৎ’ কাজে ব্যয় করে এমন ব্যস্ততার ভান করছি যে, সময়ের অভাবে আমরা দ্বীনের দু’টো কথা শোনা বা কি করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, এসব চিন্তা ভাবনা করা তো দূরে থাক, অনেকে হয়তো ব্যস্ততার জন্য ন্যূনতম ফরজ নামাজটুকুও পড়তে পারছি না। আমাদের জীবনের এই ধরন এবং জীবনযাত্রা দেখে, তাহলে কি একথা বলতে হয় যে আমাদের, অর্থাৎ কুফরে ডুবে থাকা মুসলিম নামধারীদের জন্মই হয়েছে কেবল অর্থ-উপার্জনের জন্য, TV দেখার জন্য, বিনোদনে গা ভাসিয়ে দেয়ার জন্য এবং ভোগ-সুখে আত্মনিয়োগ করার জন্য?
****
রাসূল (সা.) অবসর সময় ও নীরোগ স্বাস্থ্য বা সু-স্বাস্থ্য – এ দুটো নিয়ামতকে যথাযথ উপায়ে ব্যবহারের তাগিদ দিয়ে গেছেন। এছাড়া আর একটি হাদীসে তিনি ৫টি নিয়ামতের কথা উল্লেখ করে, সেগুলো হারিয়ে যাবার আগেই সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে বলেছেন। আমরা একটু খেয়াল করলে বুঝবো যে, সেগুলো ঘুরে ফিরে আবার ‘সময়ের’ সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সম্পৃক্ত – বস্তুত ‘হারিয়ে যাওয়া’ কথাটার ভিতরেই সময়ের variable বা function হবার একটা sense রয়েছে। আসুন আমরা ঐ পাঁচটি নিয়ামতকে একটু পরীক্ষা করে দেখি।

রাসূল (সা.) জীবনে ৫টি নিয়ামতের পূর্ণ বা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে বলেছেন, সেগুলো ৫টি পরিণতিতে পৌঁছাবার আগেই :
ক) জীবনকে কাজে লাগতে বলেছেন মৃত্যু আসার আগেই।
খ) সু-স্বাস্থ্যকে কাজে লাগাতে বলেছেন অসুস্থ হবার আগেই।
গ) অবসর সময়কে কাজে লাগাতে বলেছেন ব্যস্ততা আসার আগে।
ঘ) যৌবনকে কাজে লাগাতে বলেছেন বার্ধক্য আসার আগে।
ঙ) সম্পদকে কাজে লাগাতে বলেছেন দারিদ্র্য আসার আগেই।

গণিতে Parametric Equation বলে একটা কথা আছে। ধরুন ‘x’ একটা রাশি যা ‘t’-এর সাথে একটি সমীকরণ দ্বারা সম্পর্কযুক্ত (আমরা বলতে পারি t হচ্ছে x-এর variable) । তেমনি ধরুন ‘y’ হচ্ছে আরেকটি রাশি যা আবার আরেকটি সমীকরণ দ্বারা ‘t’-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত (আমরা বলতে পারি t হচ্ছে y-এরও variable)। এই দু’টো Parametric Equation থেকে আমরা বলতে পারবো বা প্রমাণ করতে পারবো যে, x-এর সাথে y-এর একটা নির্দিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ঠিক একই ভাবে উপরের ৫টি নিয়ামতের প্রত্যেকটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সময়ের variable । ঐ ৫টি উপদেশের সারমর্ম হচ্ছে: “জীবনের একটি মুহূর্তও নিষ্ফলভাবে হারিয়ে যেতে দিও না”- এই তো!

এখানে আরেকটা ব্যাপার ভাবার রয়েছে, যা আমার মাথায় আগে ঠিক এভাবে কখনো আসেনি। ধর্মান্তরিত মুসলিম ‘আলেম, ভাই সেলিম মর্গান, তাঁর এক খুৎবায় বললেন যে, আপনি যৌবনে পদার্পণ করার পর অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছার পরই আপনার আমলনামা লেখা শুরু হয়। তখন থেকে আপনার প্রতিটি কর্ম হয় আপনার পক্ষে যাবে অথবা আপনার বিপক্ষে যাবে – আপনি কি করলেন বা করলেন না, তা হয় আপনার পক্ষে যাবে বা বিপক্ষে যাবে – অথবা বলা যায় যে, অনিশ্চিত দৈর্ঘ্যের সীমিত জীবন আল্লাহ্ আপনাকে দিয়েছেন, তার প্রতিটি মুহূর্ত হয় আপনি এমনভাবে ব্যয় করছেন যে, তা আমলনামায় সৎকাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে, না হয় মন্দকাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে এখানে এই দুই অবস্থার মাঝখানে নিরপেক্ষ কোন অবস্থা নেই - কারণ, ভালো কাজে না লাগিয়ে এমনি এমনি সময় কাটিয়ে দিলেও আপনি আপনার জীবনের অপব্যয় করলেন – এবং তা আসলে অপব্যয় হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। একজন মুসলিমের সুতরাং, Passage of Time-এ উৎফুল্ল হবার কোন কারণ নেই।

তর্কের খাতিরে আমি আবার বলছি যে, মনে করুন আপনার জীবনের আয়ুষ্কাল ৫৭ বছর যা আসলে ২,৯৯,৫৯,২০০ মিনিটের সমষ্টি। ধরুন, আপনার সারা জীবনের জীবিকার জন্য মিনিটে ১ টাকা হিসেবে আপনার হাতে ১০০ টাকার নোটে, মোট ২,৯৯,৫৯,২০০ টাকা একত্রে তুলে দেয়া হয়েছিল। আপনি একটা চুলার পাশে বসে, একের পর এক ১০০ টাকার নোট চুলায় পুড়িয়ে ফেললেন ২ দিনের ভিতরই। তারপর আপনার জীবনের নির্ধারিত টাকা শেষ হয়ে গেলে, জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহনের জন্য আপনার হাতে আর কোন অর্থ রইলো না। বাকী জীবন আপনাকে ভিক্ষার উপর এবং অন্যের করুণার উপর বাঁচতে হবে – এমন নির্বুদ্ধিতার কাজ কি কোন উন্মাদ ব্যক্তির কাছেও আশা করা যায়? না, কারণ আজকালকার পাগলেরা – এমনকি শিশুরাও বুঝি “অর্থ” সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন। যা হোক, এখন দেখুন আখেরাতের সীমাহীন জীবনের provision বা ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার জন্য, আপনার হাতে ২,৯৯,৫৯,২০০ মিনিট সময় তুলে দেয়া হয়েছিল – আপনি কি পৃথিবীর চুলার পাশে বসে সেসব পুড়িয়ে শেষ করতে পারেন? সামান্য বুদ্ধি থাকলে প্রথম বর্ণনার ব্যক্তি যেমন ঐ টাকা দিয়ে কিছু কিনতো, কোন সম্পদ, বা তা কোন ব্যবসায় খাটাতো বা অন্তত তার ৫৭ বছরের জীবনকে সামনে রেখে কি করে সে জীবন যাপন করবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতো – ঠিক তেমনি আমাদের সবার হাতে আখেরাতের সীমাহীন জীবনের ব্যবস্থাপত্র করে নেয়ার জন্য যে নির্দিষ্ট পরিমাণ “সময়” তুলে দিয়েছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’লা, সামান্য বুদ্ধি থাকলে আমরা চেষ্টা করবো তা দিয়ে provision কেনার। তা না করে, যেন তেন ভাবে সময় কাটিয়ে আমরা যদি কবরে যাই, তবে আমাদের একমাত্র ভরসা হবে করুণাবশত কেউ যদি(যেমন সন্তান-সন্ততি) আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করে এবং সেজন্য আল্লাহ্ যদি আমাদের শাস্তির ভার লাঘব করেন। এমন সন্তান, যারা পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে করুণা ভিক্ষা করবে – তাদের নিশ্চয়ই সুসন্তান হতে হবে! বলা বাহুল্য যে, তেমন সুসন্তান পৃথিবীতে রেখে যাবেন যে পিতা, তিনি নিজেও ভালো মুসলিম হবেন, এটাই স্বাভাবিক (অন্যথা হচ্ছে ব্যতিক্রম) – সুতরাং, যিনি নিজের জীবন অপব্যয় করে যাবেন, তার সন্তানেরা যে তার জন্য দোয়া করতে গিয়ে TV-তে Bay watch বা জেনিফার লোপেজের চটকদার waiting for tonight-এর মত একটা গানের ভিডিও দেখার “অপরিহার্য মহৎ কাজ” থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, বাবার জন্য দোয়া করে তাদের ‘সময়’ ব্যয় করবে – তা আশা করা উচিত নয়। তবে হ্যাঁ, পিতা যদি তাদের ‘মানুষ’ করে যান – প্রচলিত অর্থে যার সারমর্ম হচ্ছে চুরি করে হোক বা অসৎ পথে উপার্জন করেই হোক, সন্তানদের বিত্ত বৈভবের অধিকারী হবার যোগ্য করে তোলা – তবে তারা হয়তো ‘শবে বরাতের’ রাতে দশ পদ হালুয়ার সাথে রুটি বিতরণ করে, অথবা, পিতার আত্মার শান্তি কামনায় একসাথে ১০ জন মোল্লা ডেকে, জন প্রতি ৩ সিপারা হিসেবে মাত্র দু’ঘণ্টায় ৩ x ১০ বা ৩০ সিপারা, অর্থাৎ গোটা কুর’আন ‘খতম’ করার ব্যবস্থা করবে – অবশ্য যদি ঐ রাতের সাথে once in a life time মার্কা কোন অনুষ্ঠান coincide না করে যায়। ‘শবে বরাতের’ সময় যেহেতু পরিবর্তন হতে থাকে – তা কখনো কোন অপরিহার্য বিশেষ অনুষ্ঠান, যেমন ধরুন ‘অস্কার পুরস্কার’ বিতরণ অনুষ্ঠানের সাথে মিলে গেলে, মৃত পিতার কপাল খারাপ বলতে হবে। একসাথে এত বিশাল সংখ্যক দেহ ও রূপ ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বকে একনজর দেখার এমন বিরল সুযোগ হাতছাড়া করে, কি করে ঐ সব আয়োজন করা যায় – তার চেয়ে না হয় পরের দিন ‘দোয়া-দরূদের’ ব্যবস্থা করলে হয় – শবে বরাতের পরের দিনটাও তো ‘ফজিলতপূর্ণ’ – ইসলামী নিয়মে তো সন্ধ্যা থেকে দিন শুরু হয়ে পরের সন্ধ্যা পর্যন্ত একই দিন থাকে নাকি!

আবারো একটা প্রাসঙ্গিক গল্প মনে হলো। যুক্তরাজ্যের পটভূমিতে ঘটা একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গল্প। জনৈক ইয়েমেনী ভদ্রলোক – খুব সম্ভব রেঁস্তোরার ব্যবসায়ী। যখনই তাকে কোন দ্বীনী মজলিসে ডাকা হতো – তিনি বলতেন যে তার ‘সময়’ নেই – বৌ-বাচ্চার জন্য উপার্জন করাও তার জন্য সমধিক জরুরী বলে তিনি মত প্রকাশ করতেন। বলা আবশ্যক যে, জীবনে তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপার্জন করেন এবং সেই সুবাদে মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য অনেক সম্পদ রেখে যান। যে মজলিসে তিনি “সময়ের অভাবে” আসতে পারতেন না, সেই মজলিসের দ্বীনী ভাইরাই তার জানাযা ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, লাশ সমাহিত করার জন্য, কিছু নিয়ম কানুন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবার অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। সেসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত মরদেহ মর্গে বরফ-বাক্সে সংরক্ষিত থাকে। ঐ ভদ্রলোকের মরদেহ বরফ-বাক্সে রাখার পরে, ভদ্রলোকের স্ত্রী-পুত্র হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে উক্ত মজলিসের দ্বীনী ভাইদের জিজ্ঞেস করেন যে, ঐ ভদ্রলোকের হাতে অত্যন্ত দামী একটা আংটি ছিল সেটার কি হয়েছে? দ্বীনী ভাইয়েরা বললেন যে, স্বাভাবিকভাবে তারা আংটিখানা বের করতে পারেন নি বলে, তা রয়ে গেছে ওভাবেই – মৃতদেহকে আর ‘কষ্ট’ দিতে চাননি তারা। মৃত ভদ্রলোকের স্ত্রী-পুত্র অসন্তুষ্ট চিত্তে ছুটলেন ‘মিস্ত্রী’ আনতে – দ্বীনী ভাইদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে। মজলিসের ভাইরা তাদের অনুরোধ করছিলেন মৃতদেহের আঙ্গুল কেটে আংটি না বের করার জন্য, কারণ আল্লাহর রহমতে তিনি প্রচুর সহায় সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন তাদের জন্য। কিন্তু তারা তা শুনলেন না – উত্তরাধিকারের দাবীতে ভদ্রলোকের নিস্প্রাণ দেহের আঙ্গুল কেটে সম্পদ আহরণ করলেন ভদ্রলোকের স্ত্রী ও পুত্র। হায়, এদের জন্য উপার্জন করতে গিয়েই তিনি কখনো দ্বীনের দু’টো কথা শোনার ‘সময়’ পাননি!

আমার গল্প এখানেই শেষ। মাননীয় পাঠক, আমি বলছি না যে আপনি আপনার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়-দায়িত্ব পরিহার করে বৈরাগী হয়ে যাবেন! না মোটেই না। পরিবারের জন্য, পরিবারের প্রয়োজনীয় ভরণ-পোষণের জন্য আপনার ব্যয়, ধর্মযুদ্ধে ব্যয়কৃত অর্থের চেয়ে শ্রেয়। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে যে, প্রয়োজনীয় মৌলিক দাবীগুলো পূরণের পর আপনি যখন সম্পদ-আহরণের-জন্য ‘সম্পদ আহরণে’ আত্মনিয়োগ করবেন, অথবা, আপনি স্ত্রী পুত্রের জন্য সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে আল্লাহ্ যে আপনাকে কেবল তাঁর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তা ভুলে রইলেন, তখন আপনি আপনার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হলেন।

আপনি যখন ঢাকা থেকে সিলেট যাবার জন্য ট্রেনে চাপেন, তখন যদি শুরুতে আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করে যে, আপনি ট্রেনে কেন উঠেছেন – আপনার সহজ উত্তর হবে যে আপনি সিলেট যাবার জন্য ট্রেনে উঠেছেন। এখন সিলেট যাবার পথে আপনার গাড়ি আখাউড়া (অল্প কিছুদিন আগেও ঢাকা থেকে ট্রেন আখাউড়া হয়ে সিলেট যেত) , শ্রীমঙ্গল ইত্যাদি নানা স্টেশনে থামলো। আপনি কোথাও প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হয়তো একটা ডাব খেয়েছেন – কোথাও বা বাড়িতে আপনার পথ চেয়ে বসে থাকা মায়ের জন্য ফল কিনলেন – এগুলো আনুষঙ্গিক ঘটনা। সিলেট যাবার মূল লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে পথে ঘটা আনুষঙ্গিক ঘটনা। আপনি কেন ট্রেনে ভ্রমণ করছেন এর উত্তরে আপনি নিশ্চয়ই কাউকে বলবেন না যে, আখাউড়া স্টেশনে একটা ডাব খাবার জন্য আপনি ট্রেনে উঠেছেন। পথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা সত্ত্বেও আপনি আপনার মুখ্য উদ্দেশ্যের কথাই বলবেন। ঠিক তেমনি আপনাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করা ‘উদ্দেশ্যে’। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পথ চলতে গিয়ে আপনার জীবনে অনেক আনুষঙ্গিক ব্যাপার স্বাভাবিকভাবেই আসবে। কিন্তু কখনো এসব আনুষঙ্গিক ব্যাপার যদি মুখ্য হয়ে যায়, তবে আপনি আপনার জীবনের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন বলে বলতে হবে এবং তা আপনার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বলতে হবে – অনেকটা আখাউড়া স্টেশনে ডাব খেতে গিয়ে আপনি ভুলে গেলেন যে আপনি আসলে সিলেট যাবার জন্য ট্রেনে উঠেছিলেন এবং আপনার ট্রেনখানা আপনার অজান্তেই আখাউড়া ছেড়ে চলে গেল – এমন একটা ঘটনার মতই হাস্যকর এবং দুঃখজনক হবে আপনার জীবনের সেই ভ্রান্ত-দশা।

মুসলিম জীবন গাধার মত কেবল উপার্জনের পেছনে খাটাখাটুনি করবার জন্য সৃষ্ট নয়। বরং মুসলিম জীবনে সবকিছুর জন্য সঠিক পরিমাপের ‘সময়ের’ ব্যয়বরাদ্দ থাকবে। আমরা গল্প করবো, সামাজিকতায় সময় ব্যয় করবো, স্ত্রীকে সঙ্গ দেব – গল্প করার জন্য, ভ্রমণের জন্য বা স্রেফ মনোরঞ্জনের জন্য। কিন্তু এসব কিছুর ঝামেলায় কিছুতেই আমাদের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্যটা হারিয়ে যাবে না।

ইসলামী পরিভাষার ভুল ব্যয়ের বা অপব্যয়ের দু’টো ধারণা রয়েছে – একটা হচ্ছে ভুল পথে ব্যয় করা – অপরটি হচ্ছে সঠিক পথে হলেও, অতিরিক্ত ব্যয় করা। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি মদ কিনতে আপনার অর্থ ব্যয় করলেন – এখানে মদ কেনার উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করাটাই নিষিদ্ধ বা হারাম, তার পরিমাণ যাই হোক না কেন – ঐ পথে সামান্যতম অর্থ বা সম্পদ ব্যয় করাটাই ‘হারাম’। এই ধারণাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ‘তাবজীর’। আরেকটি অপব্যয়ের ধারণাকে বলা হয় ‘ইস্রাফ’ – যেখানে কোন নির্দিষ্ট পথে ব্যয় করাটা মূলত ‘হারাম’ নয়। কিন্তু ঐ পথে অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে বলে তা অপব্যয়। উদাহরণস্বরূপ, খাবার কিনতে অর্থ ব্যয় করাটা এমনিতে হারাম নয় – কিন্তু আপনি যেখানে ২/৩ পদ দিয়ে তৃপ্তি সহকারে আপনার আহার সম্পন্ন করতে পারেন, সেখানে আপনার সঙ্গতি আছে বলে ১০/১৫ পদের আয়োজন করলেন – কিছুটা খেলেন, বাকীটুকু ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করলেন। এখানে ব্যাপারটা over allocation-এর পর্যায়ে পড়লো – এটাও অপব্যয় এবং জুলুম।

পবিত্র কুর’আনে এই দুটো অপব্যয়ের concept-ই উল্লেখিত আছে। ‘তাবজীর’ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ১৭ : ২৬-২৭ আয়াতে আর ‘ইস্রাফ’ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ২০ : ১২৪-১২৭ আয়াতে। সময়কে ইসলামে মহা-মূল্যবান সম্পদ বলে গণ্য করা হয় বলে, অপব্যয়ের ব্যাপারে তিরস্কারসমূহ, সময়ের অপব্যয়ের ব্যাপারেও প্রযোজ্য। অন্য সম্পদের মতই সময়ের অপব্যয়ও এই দুই শ্রেণীভুক্ত হবে। যেমন ধরুন মালাইকা অরোরার নৃত্য বা পামেলা এন্ডারসনের দেহ সৌন্দর্য্যরে দৃশ্য TV-তে উপভোগ করতে গিয়ে আপনি সময় ব্যয় করলেন – এটা প্রথম শ্রেণীতে পড়বে অর্থাৎ ‘হারাম’ পথে সময় ব্যয় করা হলো বলে তা ‘তাবজীরের’ পর্যায়ে পড়বে। আবার ধরুন আপনি একটা দোকান সাজিয়ে ‘হালাল’ সামগ্রীর ব্যবসায় করেন। কিন্তু বিকিকিনি খুব ভালো হচ্ছে বলে আপনি আপনার সব সময় সেখানেই ব্যয় করলেন – দ্বীনের কাজ-কর্ম ভুলে রইলেন – এই পথে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করাটা ‘ইস্রাফ’ বলে গণ্য হবে, যদিও আদতে ব্যবসায়টা ‘হারাম’ ছিল না।

সুতরাং সময়ের ব্যাপারে আমাদের অত্যন্ত সাবধান হতে হবে – প্রথমত আমরা যেন ‘হারাম’ কাজে সময় ব্যয় না করি। আর দ্বিতীয়ত জীবন ধারণের জন্য – ‘কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্য’ সৃষ্ট আমাদের এই জীবন ধারণ ও সে জীবন যাপনের জন্য – স্বাভাবিকভাবেই কিছু আনুষঙ্গিক ব্যাপার বা incidental ব্যাপার থাকবে, যেগুলোর জন্য কিছু সময়ের বরাদ্দও অনুমোদিত। কিন্তু আখাউড়ার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ডাব খেতে গিয়ে ট্রেন মিস্ করার মত করে, সেসব আনুষঙ্গিক ব্যাপারকে মুখ্য মর্যাদা দিয়ে, সেদিকে সব ‘সময়’ ব্যয় করে যদি আমরা আমাদের কাছে প্রত্যাশিত ইবাদত-কার্য পালনে ব্যর্থ হই, তবে আমাদের অবস্থা হবে ২০ : ১২৪-২৭ বর্ণিত দুর্ভাগা ব্যক্তির মত।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি মুহূর্ত কেটে যাবার সাথে সাথেই ঐ মুহূর্তে আমরা কি করলাম তা ‘রেকর্ড’ হয়ে রইলো – হয় তা আমাদের পক্ষে যাবে, নয় তা আমাদের বিপক্ষে যাবে। এই ‘রেকর্ড’ কিছুতেই মোছা যাবে না – এই ‘রেকর্ড’ reversible নয়। ‘ঘুষ’ দিয়ে বা দারোগা সাহেবের হাতে-পায়ে ধরে আসামীর তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ানোর কোন system নেই এক্ষেত্রে।

যারা চতুষ্পদ জন্তুর মত ভোগ-সুখের প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিতে নারাজ এবং যাদের চিন্তাশক্তি কাফির-মুশরিকদের দেহ তথা রূপ ব্যবসায় ভিত্তিক মায়াজালে আবদ্ধ নয়, তারা হয়তো ভাবনায় পড়তে পারেন যে, জীবনের সময়কে তাহলে কি করে সর্বোত্তম ও সর্বাপেক্ষা কাজে লাগানো যায়। এ ব্যাপারেও আল্লাহ্ স্পষ্ট দিক নির্দেশনা দিয়েছেন পবিত্র কুর’আনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে ছোট্ট সূরাসমূহের একটিতে ।

সূরা আল্ আসরের সর্বমোট তিনটি আয়াতের প্রথম আয়াতটি হচ্ছে, “আসরের শপথ” – অধিকাংশ তফসীরকার বা অনুবাদকের মতে একথার অর্থ হচ্ছে “সময়ের শপথ”। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, “নিশ্চিতই মানুষ ক্ষতির মাঝে রয়েছে।” তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন “কেবল তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, যারা সৎকাজ করে, যারা একে অপরকে সত্য সম্বন্ধে শিক্ষা দেয় এবং যারা একে অপরকে ধৈর্যের পরামর্শ দেয়।” – ব্যাস্ কি Precise এবং Concise দিক নির্দেশনা – এক পৃথিবী বক্তব্য মাত্র তিনটি বাক্যের ভিতর সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘সময়ের শপথ’ দিয়ে শুরু করাটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের সকল চিন্তা-ভাবনা, অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান, বিত্ত, বৈভব সবকিছুকে নিষ্ফল প্রতীয়মান করে বলা হয়েছে, ”মানুষ মাত্রই ক্ষতির ভিতর পতিত” – যদি সে এই চারটি শ্রেণীভুক্ত না হয়ে অন্য কিছু হয়। এই চারটি শ্রেণীভুক্ত হতে গিয়ে সে যেটুকু সময় ব্যয় করবে জীবনের, সেটুকুই তার লাভ — বাকী সকল প্রয়াস ও সময়ক্ষেপণ তাকে কেবল ক্ষতির দিকেই টেনে নিয়ে যাবে।

মুসলিম বিশ্বাস মতে প্রথম শ্রেণীভুক্ত না হতে পারলে জীবনের “ষোল আনাই মিছে” – ঈমান না আনলে গোটা জীবনের সমীকরণের দুপাশেই শূন্য লেখা থাকবে। দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে যারা সৎকাজ করে। বলা বাহুল্য প্রথম শ্রেণীতে দাখিল হবার পরেই কেবল, দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত হওয়াটা অর্থবহ হবে – ঈমানবিহীন কোন কাজই ইসলামের দৃষ্টিতে ‘সৎকাজ’ বলে পরিগণিত হতে পারে না – ঈমান সমেত ‘সৎকাজ’ও আবার হবে সেই কাজ, যেটাকে আল্লাহ্ বা আল্লাহর রাসূল(সা.) ‘সৎকাজ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। আপনি মানবতাবাদী বলে যদি মনে করেন যে, প্রতিটি মানুষের নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রয়েছে – আর তাই সমকামী মেয়েরা যদি নিজেদের মাঝে সমকামী বিবাহের মাধ্যমে জীবনে সুখী হতে চায়, তবে তা সমর্থনযোগ্য – তবে আপনি আপনার এহেন ‘মানবিক’ গুণাগুণের জন্য ‘পুলিটজার’ পুরস্কার পেলেও, আপনার নিশ্চিত গন্তব্য জাহান্নাম হবার কথা এবং আপনার এই ‘মহৎ’ কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে কখনোই ‘সৎকাজ’ বলে গণ্য হবে না। সুতরাং, আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূল(সা.) যে সবকে ‘সৎকাজ’ বলেছেন, সে সব সৎকাজে নিয়োজিত হতে হবে। ‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ মার্কা কাফির-শিল্প উপভোগ করার মহৎ কাজে আত্মনিয়োগ করে নিজের আত্মীয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা ‘সৎকাজ’ নয় বরং ঘরে কোন মেহমান আসলে তার বাস্তবতাকে, TV-র স্বপ্নরাজ্যের উপরে স্থান দিয়ে, তাকে ‘সময়’ দেয়াটা ‘সৎকাজ’ বলে গণ্য হতে পারে। যাহোক, তৃতীয় শ্রেণীটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ – বুঝতে হবে দান-খয়রাত করা, মসজিদে বানানো, তসবীহ জপা, অতিথি আপ্যায়ন, মিস্কীন খাওয়ানো – এসব সৎকাজ হলেও, এগুলোকে আল্লাহ্ নাম ধরে উল্লেখ করেন নি – সবকিছু সৎকাজের ভিতর এসে যাচ্ছে – অথচ ”একে অপরের সাথে সত্য নিয়ে আলোচনা করা বা সত্য সম্বন্ধে জ্ঞানদানকে” এই আলাপ আলোচনার ব্যাপারকে – কত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, মানব জীবনের সারমর্মকে যে চারটি শ্রেণীভুক্তির ভিতর Narrowed down করা হয়েছে, তার ভিতর একটি হচ্ছে এই সত্য সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা, শিক্ষাদান বা পরামর্শ করা মানবশ্রেণী। তাহলে দেখুন TV দেখে সময়ক্ষেপণ করে দ্বীনের দুটো কথার ‘সময়’ নেই বলাটা কত আত্মঘাতী একটা ব্যাপার এবং কত বড় গর্হিত একটা অপরাধ। চতুর্থ শ্রেণী হচ্ছে “যারা একে অপরকে ধৈর্যের পরামর্শ দেয়” – ধৈর্যের অর্থও ব্যাপক – আপনি রেগে যাচ্ছেন, আমি আপনাকে ধৈর্য ধারণ করতে বলতে পারি, আপনার সন্তানগুলো একের পর এক মৃত্যুবরণ করে চলেছে জন্মের পর পরই – সেজন্য আপনার কাছে জীবন অর্থহীন মনে হয়, আমি আপনাকে আপনার দ্বীনী ভাই হিসেবে ধৈর্যধারণ করতে অনুরোধ করতে পারি – আপনাকে সান্ত্বনা দিতে পারি – এভাবে মুসলিম সামাজিক জীবনে ধৈর্য ও ধৈর্যের উপদেশের তাৎপর্য অপরিসীম।

তাহলে দেখুন আল্লাহর স্পষ্ট শ্রেণী চিহ্নিতকরণে, আপনি যদি এই চার শ্রেণীভুক্ত বলে নিজেকে গণ্য করতে পারেন, তবেই আপনার জীবনের একটা অর্থ রয়েছে, তা না হলে আপনার জীবন অর্থহীন এবং আপনি ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন। এই চার দলভুক্ত হবার প্রয়াসে আপনি যে ‘সময়’ ব্যয় করবেন সেটাই সার্থক – বাকী কাজে যে ‘সময়’ ব্যয় করলেন, তা যেন অনেকটা চুলার পাশে বসে আপনার গোটা জীবনের পাথেয় স্বরূপ পাওয়া টাকার সমষ্টি থেকে একটার পর একটা নোট আগুনে ছুঁড়ে দেয়ার মতই অর্বাচীনের কাজ।

মাননীয় পাঠক! আমি মনে করি, আমাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে কেবল আল্লাহর ইবাদত করার জন্য! আপনি? আপনি কি মনে করেন?

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৩১৩ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৪.৭৫)

১০ টি মন্তব্য

  1. আমাদের দেশে এমন বহু পরিবার আছে, যেখানে একজন ছেলে বা একজন মেয়ে, প্রচলিত ধারার একেবারে বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে আল্লাহর অশেষ রহমতে হেদায়েত লাভের আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত – অথচ, এদের পরিবারের বাকী সকলে যেন পণ করেছেন যে, তাকে তারা কিছুতেই Pit of hell বা নরককুণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে দেবেন না।

    প্রসঙ্গক্রমে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো-

    গত চার-পাঁচ মাস আগের ঘটনা। আমার সবচাইতে কাছের বন্ধু, পড়ালিখা করে চট্রগ্রাম এর একটি প্রাইভেট মেডিকেল এ। ওকে জীবন-ধর্ম-কর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে সবসময় বোঝাতে চাইতাম। এমনিতেই ওর সাথে সবসময় যোগাযোগ থাকতো, এরপরতো আরো বেড়ে গেলো। মহান আল্লাহ তায়ালার রহমতে অচিরেই সে সাড়া দিতে লাগলো। নিয়মিত নামাজ পড়তে লাগলো। নামাজরে জন্য প্রয়োজনীয় সুরাসমূহ আমি প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর মোবাইল ফোনে মশক করাতাম। ১৫-২০ দিনেই সে প্রায় ১০টি সুরা ভালো ভাবেই আয়ত্ত করে ফেললো। কোরআন শিক্ষার জন্য সেখানকার একজন হাফেজ সাহেবের সাথে খাতির জমিয়ে ফেলেছিলো আর হাফেজ সাহেবও সানন্দে রাজী হয়ে পড়ানো শুরু করে দিয়েছিলেন।

    ধীরে ধীরে সে কবিরা গুনাহ সম্পর্কে সচেতন হতে লাগলো। ২মাস পর দেখা গেলো জীবন ধারণের সবক্ষেত্রে মুসলমান পরিচয় দেয়ার মতো একটি অবস্হা তার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিলো। তারপরই শুরু হলো বিপত্তি।

    একদিন তার বাসা থেকে বাবা ফোন করে জিজ্ঞেস করলোঃ কি করছিস? সে বললোঃ হাদীসের একটি বই পড়ছি। তিনি তৎক্ষনাৎ কিছুটা রেগে বললেনঃ আমিকি তোকে হাদীসের বই পড়ার জন্য সেখানে পাঠিয়েছি? (নাউযুবিল্লাহ)। এছাড়া তার মা, প্রেমিকা (আগে থেকেই ছিলো। পরিবর্তন শুরু হবার পর থেকে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলো সে) এরা সবাই বিভিন্ন ভাবে বিরোধিতা করছিলো। প্রত্যক্ষ ভাবে না করলেও পরোক্ষ ভাবে বিভিন্ন ভাবে, সে সবসময় ফোনে অভিযোগ করতো। যেমনঃ আন্টি বলতেন নামাজ পড়ো, কিন্তু বেশী বাড়াবাড়ি করো না। পেন্টের নিচে কাটার কি দরকার? ইত্যাদি। এছাড়া জামাত-তাবলিগ-আহলে হাদীস-মাজহাব ইত্যাদি নিয়ে টানাটানি তো ছিলোই, কারণ সেখানে বিভিন্ন ধারার মানুষ থাকতো। সে যেহেতু এসবে নতুন ছিলো কিছু শুনলেই আমাকে ফোন করে অভিযোগ করতো, অমুক অমুক কথা বলেছে অথচ আমি ওকে ওভাবে বলেছি। ওকে সবসময় বলতাম আপাতত এসব নিয়ে চিন্তা না করতে।

    শেষ পর্যন্ত যা হবার তাই হলো। পরিবারের এবং বন্ধুবান্ধবের কাছে হেরে গিয়েছিলাম আমি। হেদায়াতের মালিক আল্লাহ তায়ালা। সে ধীরে ধীরে নামাজ পড়া ছেড়ে দিলো। দীর্ঘ ১০ বছরের অভ্যাস সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো, ৩ মাস পর আবার ধরলো। গান শোনা, টিভি দেখা ইত্যাদিতেও আর আপত্তি নেই। ধীরে ধীরে আবার অবস্হা ফিরে আসতে লাগলো।
    গত কয়েকদিন আগে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম নামাজ পড়েছে কিনা? সিগারেট ফুকতে ফুকতে সে জবাব দিয়েছিলোঃ এখন এসব বলে লাভ নেই, আমি আবার খারাপ হয়ে গিয়েছি!!!

    আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন, তার ভাগ্যে কি রয়েছে। তিনিই হিদায়াত দাতা। বাহ্যিকভাবে তার এই অধঃপতনের কারণ হিসেবে আমি চিহ্নিত করেছি তার পরিবারকে। যদি আমাকে পরিপূর্ণ সাপোর্ট দিয়ে যেত তাহলে হয়তোবা এমন হতো না।

    মুসলিম৫৫

    @দ্য মুসলিম, আপনার real-life গল্পের জন্য ধন্যবাদ। এরকম আরো বহু ঘটনা আমি জানি।
    এজন্যই একজন পিতার উপর তার অনাগত সন্তানের “হক” বা অধিকার হচ্ছে, তিনি যেন তার জন্য একজন ভালো “মুসলিমাহ্” মা choose করেন। আমাদের সমস্যটা শুরু হয় বিয়ে থেকেই – অন্যদের কথা বাদই দিলাম – বিয়ে করতে গেলে ক’জন দাড়ি/টুপি ওয়ালা মুসলিম “দ্বীন”-কে একনম্বর criterion মনে করেন?

  2. আপনি একটা চুলার পাশে বসে, একের পর এক ১০০ টাকার নোট চুলায় পুড়িয়ে ফেললেন ২ দিনের ভিতরই। তারপর আপনার জীবনের নির্ধারিত টাকা শেষ হয়ে গেলে, জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহনের জন্য আপনার হাতে আর কোন অর্থ রইলো না। বাকী জীবন আপনাকে ভিক্ষার উপর এবং অন্যের করুণার উপর বাঁচতে হবে – এমন নির্বুদ্ধিতার কাজ কি কোন উন্মাদ ব্যক্তির কাছেও আশা করা যায়?

    এ প্রসঙ্গে আমার আব্বু সবসময় একটা উদাহরণ দিতেন। তিনি বলতেনঃ ধর, তুমি পরিক্ষা দেয়ার জন্য হলে গেলে। সময় সীমা ৩ ঘন্টা। এখন তুমি যদি ২ঘন্টা বসে গল্প করে কাটিয়ে দিলে, ১ঘন্টা পরিক্ষা দিয়ে কি তুমি ফুল এনসার করতে পারবে?
    এই উদাহরণটুকু আমার হৃদয়ে দাগ কেটেছিলো, আর মনেহয় তখন থেকেই ভাবতে শুরু করেছিলাম।

    আল্লাহ পাক আমাদেরকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। আল্লাহ পাক আমাদের তৌফিক দিন। আমিন।

    মুসলিম৫৫

    @দ্য মুসলিম, (F)

  3. আসসালামু আলাইকুম ভাই,
    মাশাল্লাহ, লেখাটি পড়ে অনেক কিছু শিখতে পেড়েছি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।

    মুসলিম৫৫

    @manwithamission, ওয়া আলাইকাস সালাম! (F)
    আমীন!!

  4. ঈমানবিহীন কোন কাজই ইসলামের দৃষ্টিতে ‘সৎকাজ’ বলে পরিগণিত হতে পারে না

  5. আসসালামু আলাইকুম,
    আপনার লেখাগুলি সব পড়েছি।
    আলহামদুলিল্লাহ!অনেক গুছিয়ে লিখা।
    দোআ রইল আপনার পরিবারের জন্য।

    মুসলিম৫৫

    @anisa, আমীন! Jazakillahu Khair!!