লগইন রেজিস্ট্রেশন

মুসলিম জীবনে ‘সময়’ – ১

লিখেছেন: ' মুসলিম৫৫' @ শনিবার, এপ্রিল ১৭, ২০১০ (৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
السلام عليكم ورحمة الله و بركاته

কলেজ জীবন শেষে, আমরা, অর্থাৎ জাহাজের যাযাবর জীবন বেছে নেয়া তরুণেরা, মেরিন একাডেমীতে নিজেদের স্থান করে নিই। যারা মেরিন একাডেমীতে গেছেন, তারা হয়তো মনে করতে পারবেন যে, কর্ণফুলী নদী থেকে মেরিন একাডেমীতে যাবার জন্য প্রায় পোয়া মাইল দীর্ঘ সেতুর মত রেলিং দেয়া একটা রাস্তা রয়েছে – যা স্থলভাগকে জেটির সাথে সংযুক্ত করে। জোয়ারে এবং ভাটায়, উভয় অবস্থায় যেন মানব বহনকারী কোন জলযান সহজে ঐ জেটিতে ভিড়তে পারে, সেজন্য এই আয়োজন। জলযান-ভেড়া ঐ জেটিকে, আমরা বলতাম ‘জেটি-হেড’।

যাহোক, মেরিন একাডেমীর অপোকৃত নিঃসঙ্গ জীবনে আমাদের চিত্ত-বিনোদনের একটা ব্যাপার ছিল, বিকেলে খাবার পরে (যা সাধারণত বিকাল ৬ টার দিকে সমাধা হয়ে যেত) হেঁটে হেঁটে ‘জেটি-হেডে’ যাওয়া। এই হাঁটতে যাওয়ার পর্বটা, শীতের দিনে হয়তো খাবার আগে এবং দৈনিক গোসলের পরেই সারতে হতো – কারণ, সূর্যাস্তের পরে ওখানে যাবার কোন মানে হয় না। ঐ জেটিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্র ও সমুদ্রে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যেত। আমি খেয়াল করতাম যে, ওখানে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে গিয়ে, প্রতিটি সূর্যাস্তেই আমি কেমন বিষন্ন বোধ করতাম – যদিও তখনও এর গূঢ় মনস্তাত্ত্বিক বা নৈতিক দিক নিয়ে ভাবার তেমন চেষ্টা করিনি অথবা বলা যায় তেমন অবকাশও ছিল না। সব সূর্যাস্তই হচ্ছে একটা দিনের অবসান, আর সে দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষের আগের দিনের সূর্যাস্ত বা অন্য কোন বিশেষ দিনের সূর্যাস্ত ভিন্ন কিছু নয়। তবু, নববর্ষকে আমরা যেহেতু দিন পঞ্জিকায় বিশেষভাবে স্থান দিয়েছি এবং একটা বছর পার হওয়াকে আমরা যেহেতু সময়কালের একটা মাপ হিসেবে অনুভব করতে শুরু করেছি – একটা বছর শেষ হওয়াকে হিসেব তো করতে হয়ই আমাদের জীবনে। নিজের জন্মদিন অথবা নববর্ষ – দুটোর কোনটাতেই আমি কখনো উৎফুল্ল বোধ করিনি। তবে নববর্ষের আগের সন্ধ্যায়, মেরিন একাডেমীর জেটি-হেডে দাঁড়িয়ে, সূর্যটাকে টুপ করে সমুদ্রে হারিয়ে যেতে দেখে আমার হৃদয় ব্যথায় নীল হয়ে উঠেছে।

আমাদের প্রজন্মের নববর্ষ উদ্যাপন করা বলতে তেমন কিছু ছিল না – অন্তত আমরা আমাদের মধ্যবিত্ত পটভূমিতে তা কখনোই টের পাই নি (আমি আমার কৈশোরের শেষ দিকের এবং যৌবনের প্রারম্ভের দিনগুলোর কথা বলছি)। তবু, তারুণ্য বোধকরি তখনো নতুন বছরের আগমনীতে নতুন কিছু আশা করতো – কি জানি? হয়তো বা! আমি, আমার অত্যন্ত কাছের সুহৃদ-জনদেরও কখনো বোঝাতে পারিনি যে আমার কেমন লাগতো, কতটুকু কষ্ট হতো বা কেন কষ্ট হতো। অন্যদের ভিতর নতুন বছরের জন্য যে উচ্ছ্বাসটুকু দেখা যেতো, বা জন্মদিনে কেউ একটা কার্ড পাঠালে যে আনন্দের অভিব্যক্তি দেখা যেতো – নিজের ভিতরে তেমনটা অনুভব না করাতে আমি অনেক সময়ই নিজেকে নৈরাশ্যবাদী বলে সন্দেহ করেছি। কিন্তু অন্য সকল ব্যাপারে আমার মাত্রাতিরিক্ত উদ্যম দেখে নিজেকে কখনোই নৈরাশ্যবাদী বলে মেনে নিতে পারিনি। অল্প বয়সের নানা আবেগের ভিতর মনে হয়েছে, “আমি বোধহয় মানুষ নই…।” অশীতিপর কেউ ভাবতে পারে, নতুন সূর্যোদয়ে তার জন্যে কিছু নেই, কিন্তু ১৯ বছরের কাউকে তা ভাবা মানায়? আমি তখনো দ্বীন ইসলাম সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না বলতে গেলে। আমি এও জানতাম না যে, কোন মুসলিম কখনোই Passage of time সেলিব্রেট করতে পারে না!! তবু আল্লাহ্ প্রদত্ত ‘ফিতরা’ বা সহজাত বোধ থেকেই হয়তো আমার তেমন লাগতো – অথবা এও হতে পারে যে, বয়সের তুলনায় আমি তখনো অপরিপক্ক ছিলাম। প্রতিটি শিশুই নাকি মুসলিমের ‘ফিতরা’ নিয়ে জন্মায় – মা-বাবা বা পরিবেশ তাকে ইহুদী, খৃষ্টান বা কাফির বানায়।

বহু বছর পরে ২০০৪ সালের ১ লা জানুয়ারীতে আমি দেশে ছিলাম, ঢাকায় ছিলাম। আত্মীয় স্বজনের মন্তব্য থেকে বুঝেছি যে, নববর্ষের রাতে কাফির নিয়ন্ত্রিত IMF ও World Bank-এর ভিক্ষার উপর নির্ভর করা পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের একটি এবং দুর্নীতিতে পর পর তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া আমার এই হতভাগ্য দেশের মহানগরীতে, প্রলয় কাণ্ড ঘটে থাকে। নববর্ষের সময়কার ঢাকা সম্বন্ধে তাদের সেসব মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের দেশের ‘কাফিরায়ন’ প্রক্রিয়া এখন বেশ পরিণত পর্যায়ে রয়েছে। বন্ধুর বরের সাথে নববর্ষের তামাশা দেখতে আসা জনৈকা বাঁধনের ‘বস্ত্রের বাঁধন’ যে নববর্ষ উদযাপনকারীরা আলগা করেছে, তা দেশে ফিরে লোকমুখে শুনেছি। ২০০৩-এর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে প্রলয়ঙ্করী পটকা ফুটানো এবং ছেলে-মেয়েদের মিশ্র চিৎকার শুনে বুঝেছি যে “এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই।” মাননীয় পাঠক, আমি মধ্যবিত্ত পল্লীতে বাস করি। সেখানেই এমন অবস্থা হলে, আমি অনুমান করতে পারি যে, নববর্ষ উপলক্ষে পত্রিকান্তরে ধনীর দুলাল-দুলালীদের উন্মত্ততায় যে Near pornographic বর্ণনা প্রকাশিত হয় – তাদের পরিবেশ-প্রতিবেশের অবস্থা কি! ঘুমাতে না পেরে বিরক্ত ও বীতশ্রদ্ধ চিত্তে আমি ভাবছিলাম যে, ঐ পটকার টাকা দিয়েই হয়তো সেবারকার প্রচণ্ড শীতে ঢাকার ফুটপাতে, রেল-স্টেশনে রাত্রি যাপনকারী হাড্ডিসার মানুষগুলোর হাড্ডির কাঁপুনী অনেকটা নিরসন হতে পারতো। আমি আরো ভাবছিলাম বেশ ক’বছর আগে শোনা একটা গল্পের কথা। বেশ অনেক বছর আগে এক পরিচিতির মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের শ্যামলী ফরেস্ট রেঞ্জে গিয়েছিলাম তথাকথিত বনভোজনে। সেখান থেকে ফেরার পথে, ঐ বনভোজী বিরাট গ্রুপের একজন – “মৌলবীর বাগান” নামক এক চা বাগানের ম্যানেজার – সবাইকে তার বাঙ্গলোয় বিকালের চা খাবার আমন্ত্রণ জানালেন। ঐ চা বাগানের ম্যানেজারের বাঙ্গলোয় চা খেতে খেতে গল্প শুনলাম যে, ঐ বাগানে নাকি এক ‘সাদা-চামড়া’ সাহেব ম্যানেজার ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। ঐ সময়কার সংশয়পূর্ণ বাস্তবতায়, বহুদিন ধরে অত্যাচারিত কুলীরা নাকি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং আক্ষরিক অর্থেই, প্রতিহিংসাবশত, তার চামড়া তুলে ফেলে। ম্যানেজার দেখালেন যে, তার বাঙ্গলোর নির্ধারিত শোবার ঘরখানি কাঠের বর্গা ও পেরেক দিয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখা – কারণ ওখানে কেউ ঘুমাতে পারে না। চামড়া তুলে নেয়া সাহেবের প্রেতাত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায়। সত্যি মিথ্যা – আল্লাহু ‘আলাম (ইসলামে কিন্তু প্রেতাত্মার কোন concept নেই) । আমাদের দেশে যারা কাফির-সৃষ্ট নববর্ষ উদ্যাপন করতে গিয়ে, উন্মাদনায় মত্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি টাকা ড্রেনে প্রবাহিত করেন – আমাদের দেশের শ্রমিক পিঁপড়া শ্রেণীর হাড্ডিসার মানুষেরা যদি কখনো বুঝতে পারে যে, ঐ পয়সা আসলে তাদের মজ্জা নিংড়ানো, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থকে কোন না কোনভাবে আত্মসাত করা থেকে এসেছে এবং তারা যদি তখন ঐ সব নির্লজ্জ ও বেহায়া মানুষকে জানোয়ার ভেবে তাদের চামড়ায় জুতা বানিয়ে পরতে চান ; তবে তাদের কি বিশেষ দোষ দেয়া যাবে?

কারো চামড়ায় জুতা পরতে চাইবার প্রসঙ্গে আরেকটা গল্প মনে পড়লো। এই তো সেদিন, আমার গ্রামের দিন মজুর এখলাস আলী আমাকে তার দুঃখের কথা বললেন। কাজ করতে গিয়ে একটা বাঁশের চটার বাড়ি খেয়ে, তিনি চোখ হারাতে বসেছিলেন। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল ও পরে সেখান থেকে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে যেতে হয় তাকে। দায়-সারা চিকিৎসা সত্ত্বেও, আল্লাহর রহমতে তার চোখ রক্ষা পায়। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি বোঝেন যে, তার সেই চোখে তিনি ঝাপসা দেখেন। এ ব্যাপারে আবার সরকারী হাসপাতালে গেলে ‘ডাক্তর সাব’ তাকে বলেন যে, ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখা প্রয়োজন (অর্থাৎ তার চাকুরীর আওতায় যে ভাবে দেখা সম্ভব, তা পর্যাপ্ত নয়) – সুতরাং এখলাস আলী যেন তার ‘চেম্বারে’ যান। আমাদের এখলাস আলী একদিন সকাল-সন্ধ্যা কাজ করলে বর্তমানে ১৫০ টাকা পান। এবছর দেশে ভালো ডাক্তাররা তাদের ফি ধার্য করেছেন ৪০০-৫০০ টাকা। এখলাস আলীর মাথায় এই জটিল সমীকরণ ঢোকে না যে, ঐ সব ‘ডাক্তর সাবরা’ তার মত দিন মজুরের পয়সায় পরিচালিত মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করে তবে ডাক্তার হয়েছেন। আজো তারা নামের সাথে যে প্রফেসর বা সার্জন পদবী লেখেন, তাও ঐ সব সংস্থার চাকুরীর কারণে। এই জটিল সমীকরণ যদি কেউ একবার এখলাস আলীদের বুঝিয়ে দেয়, তবে হয়তো তারা ডাক্তার সাহেবদের চামড়ায় জুতা পরতে চাইতেও পারেন!

যে কথা বলছিলাম – মুসলিম কখনো Passage of Time সেলিব্রেট করতে পারে না – মুসলিমের জন্য সময়ই জীবন। পরীক্ষার হলে বসে কেউ যদি সিনেমা পত্রিকা পড়ে সময় কাটায় এবং প্রতিটি ঘণ্টা অতিবাহিত হবার সংকেতে যদি সে আনন্দ/উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তাকে যেমন লোকে উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ ভাবার কথা, জীবনে যারা ‘সময় হারিয়ে গেছে’ বা ‘সময় কেটে গেছে’ বলে আনন্দিত বোধ করেন, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরও তেমনি উন্মাদ বলে গণ্য করার কথা। অন্য সব বাদ দিলেও, কেবল এই যুক্তিতেই মুসলিম কখনো নববর্ষ, জন্মদিন বা বিবাহ-বার্ষিকী নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে আত্মনিয়োগ করতে পারে না।

আমাদের প্রপিতামহরা, সিলেটে আমাদের বাড়ী থেকে ৫০/৬০ মাইল হেঁটে করিমগঞ্জে কোর্ট-কাচারীর কাজে গিয়েছেন। একটা সময় ছিল যখন কেউ কোন আত্মীয় বাড়ী বেড়াতে যাচ্ছেন – পথে হেঁটেই একদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। আজ সে সব দূরত্ব রকেটে নয়, বরং বাস-মিনিবাস বা মোটর গাড়ীতে করেই দিনে চারবার পরিভ্রমণ করা যায়। কি বিশাল সময়ের সাশ্রয়। একদিন আমাদের দেশ থেকে মানুষ হজ্জ্ব করতে মক্কায় গেছেন ৬ মাসের সফরে। আজ ঢাকা থেকে জেদ্দায় পৌঁছাতে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে – কি বিশাল সাশ্রয় – হজ্জ্বের এই একটি কাজের বেলায়ই ৫ মাস ২৯ দিন ১৯ ঘণ্টা সময় বেঁচে যাচ্ছে। এভাবে আপনি যদি রান্না, কাপড় কাচা বা বাজার করার মত দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে, হজ্জ্বযাত্রার মত জীবনে একবার আসা বিশেষ ব্রতগুলোর কথা ভাবেন, তাহলে দেখবেন যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনি অকল্পনীয় সময় বাঁচাতে পারছেন আজ। মাননীয় পাঠক, এভাবে চিন্তা করলে আপনার জীবনের ‘অর্জন’, আজ থেকে ১০০ বছর আগের একজন মানুষের জীবনের অর্জনের ১০ গুণ হবার কথা। সত্যি কি তাই হয়!!

(চলবে ………ইনশা’আল্লাহ্!)

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৩১৫ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)

৪ টি মন্তব্য

  1. পরীক্ষার হলে বসে কেউ যদি সিনেমা পত্রিকা পড়ে সময় কাটায় এবং প্রতিটি ঘণ্টা অতিবাহিত হবার সংকেতে যদি সে আনন্দ/উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তাকে যেমন লোকে উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ ভাবার কথা, জীবনে যারা ‘সময় হারিয়ে গেছে’ বা ‘সময় কেটে গেছে’ বলে আনন্দিত বোধ করেন, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরও তেমনি উন্মাদ বলে গণ্য করার কথা।

    সহমত।

    সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের জন্য আপনার যেমন আন্তরিক ঘৃনা এবং তরুনদের জন্য সহমর্মিতা আমারও তেমন । বিষয়টা নিয়ে আমিও ভাবি । আমারা যদি নিয়মিত এমন লিখে যাই, নিশ্চয়ই কেউ না কেউ সত্যকে গ্রহন করবে ।

    জাজাকাল্লাহ ।

    মুসলিম৫৫

    @হাফিজ, ধন্যবাদ! জাযাকাল্লাহ!!

  2. আলহামদুলিল্লাহ, এখনকার সময়ে খুব জরুরি লেখা

    মুসলিম৫৫

    @মনপবন, ধন্যবাদ! জাযাকাল্লাহু খাইর!