লগইন রেজিস্ট্রেশন

প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে কিছু আলোচনা (২)

লিখেছেন: ' নাজনীন' @ রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১০ (১১:১১ পূর্বাহ্ণ)

প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি নিয়ে কিছু আলোচনা (১)

৪ মাধ্যমিক শিক্ষা

নবম-দ্বাদশ শ্রেণীকে মাধ্যমিক স্তর ধরা হয়েছে।

এখানে তিনটি স্তর ধরা হয়েছে – সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগিরী শিক্ষা। ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেলকে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর মূল শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। কিন্তু কেন তাদেরকে আলাদা রাখা হলো? এতে করে তারা মূল স্ট্রীমের লেখাপড়ায় আরো বেশী পিছিয়ে পড়বে বলেই আমার ধারণা। এমনিতেই আমাদের দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী তাদের সিলেবাস অনেক দুর্বল, এজন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু বিষয়ে ভর্তির ব্যাপারে মাদ্রাসার ছাত্রদের পাশাপাশি তাদেরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, বিজ্ঞান শাখাতেও তাদের খুব একটা দেখা যায় না, শুধুমাত্র আইবিএতেই কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি হয়), সেখানে তাদের আরো আলাদা করে রেখে মূলত বিচ্ছিন্নই করা হলো। আর এদেশের আলো-বাতাস, সুবিধাদি ব্যবহার করে তাদেরকে কাদের জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে। আমরা খুব ভালভাবেই জানি এই ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থীরা সামাজিকভাবে কতটা বিচ্ছিন্ন। তাই তাদেরকে মূল শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে এ দেশের সংস্কৃতির সাথে আরো বেশী করে অভ্যস্ত করা দরকার। এবং তাদের অন্যান্য পাঠ্যসূচী আপগ্রেড করার পাশাপাশি বাংলাদেশ সম্পর্কে বাংলা ভাষায় আরো বেশী করে পরিচিত করা দরকার।

এবার সরকার সামাজিক বিজ্ঞান/ বাংলাদেশ স্টাডিজকে মোটামুটি একেবারে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করেছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। তবে এক্ষেত্রে আমার অনুরোধ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ স্টাডিজ আছে দেখেছি, সেখানে দেখা যায় কোন রকম কয়েক সরকার আমলের পর্যালোচনা ছাড়া, এ যেমন – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আমল, জিয়ার আমল, এরশাদের আমল, হাসিনার আমল, খালেদার আমল , আর তেমন কিছুই পড়ানো হয় না। এ রকমের কিছু গৎবাঁধা সিলেবাস যেন স্কুলগুলোতে না হয়, ছেলেমেয়েরা যেন শুধু চোথা মেরে কোনরকম দায়সারাভাবে পাশ করার চিন্তা না করে, মানে শিক্ষার সাথে আনন্দ (মুখস্থবিদ্যা যেন না হয়), সচেতনতা, দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, মমত্ববোধ যেন তৈরী হয়, সে রকম সিলেবাস প্রণয়নের প্রয়োজন আছে, আর বিভিন্ন শ্রেণীতে যেন একই সিলেবাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে দিকেও খেয়াল রাখা দরকার।

সংযোজনী-৩ -এ এ স্তরের বিষয়গুলো বলা আছে।

৯ম-১০ম শ্রেণীঃ

সাধারণ ও ভোকেশনালে সামাজিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা হলেও মাদ্রাসায় করা হয়নি। আমার মনে হয় মাদ্রাসায় অন্তত তথ্যপ্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা দরকার ছিল।

তবে বাংলা, ইংরেজী, গণিতকে সব শাখায় একইমানের করা হয়েছে, এটা একটা ভাল দিক, যদি সবার সিলেবাস এক থাকে তাহলে আর কোন বৈষম্য থাকবে না।

সাধারণ বিজ্ঞান ও ব্যবসা শিক্ষায় ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে অনর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি ঐচ্ছিক হিসেবেও না। শুধু আরবী/পালি/সংস্কৃত ঐচ্ছিকভাবে আছে।

আমার কাছে মনে হয়, ধর্ম, নৈতিক শিক্ষা এবং কোরআনিক আরবী/ (প্রয়োজনে পালি/সংস্কৃত) (মুসলমানদের জন্য উসুলে ফিকাহও পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা)– এ তিনের মিশ্রণে একটি বিষয় ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে শুরু করে গ্রাজুয়েট পর্যন্ত সব শিক্ষাস্তরেই থাকা দরকার। এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ইসলামী আইন বোঝা, ফতোয়া সম্পর্কে জানা, কোরআনকে বোঝার জন্য খুবই দরকার, অন্যান্য যার যার ধর্মের জন্যও উপকারী হতে পারে। আর এতে করে মাদ্রাসা পাশ করা ছাত্রদের জন্য একটা কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। আর আমাদের দেশের অধিকাংশ গরীব সাধারণের পক্ষে নিজস্ব ব্যবস্থায় এসব বিষয়ের উপর পড়াশোনা করার সুযোগ অনেক কম, তাদের সচেতনতাও কম। তাই ছেলেমেয়েরা বেড়ে উঠছে ধর্ম সম্পর্কে খুবই সংকীর্ণ আচার-সর্বস্ব জ্ঞান নিয়ে।

১১শ-১২শ শ্রেণীঃ

এ পর্যায়ে সামাজিক বিজ্ঞানকে মাদ্রাসার জন্য আবারো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেটা ৯ম-১০ম এ ছিল না। আমার মনে হয় এটাকে ঐচ্ছিকে রেখে ফিক্‌হ/ উসুলে ফিক্‌হ কে বাধ্যতামূলক করা দরকার। কারণ তাদের দ্বীন বিষয়ক লেখাপড়াটা বেশী দরকার। অথবা ১০০ নম্বরের ফিক্‌হ/উসুলে ফিক্‌হ নৈর্বাচনিক আর বাকী ১০০ নম্বর ঐচ্ছিক বিষয় রাখা যেত।

আমাদের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের ইংরেজী সিলেবাস হওয়া উচিত চারটি ভাগে, অনেকটা আইইএলটিএস বা টোফেলের মতো – পড়ন, লিখন, শ্রুতি ও বলা। এতে করে শিক্ষার্থীদের ইংরেজীতে দক্ষতা আরো বাড়বে আশা করি।

শিক্ষার্থী মূল্যায়নঃ

দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত চারটি সমাপনী পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে ৫ম আর ১০ম শ্রেণীরটা আঞ্চলিক, আর অষ্টম এবং দ্বাদশ শ্রেণীরগুলো পাবলিক। এখানে আঞ্চলিক পরীক্ষাগুলো জটিলতা এড়ানোর জন্য একেবারে ইউনিয়ন লেভেলে না গিয়ে জেলাভিত্তিক হতে পারে। আর বর্তমানে যে দুটো পাব্লিক পরীক্ষা আছে, তাতে যে পরিমাণ সময় নষ্ট হয়, চারবার পরীক্ষা নিতে, রেজাল্ট দিতে কেমন সময় লাগবে এটা খুবই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাবা দরকার। আর এসব পরীক্ষাতেই যদি শিক্ষার্থিদের আলাদা করে ফি দিতে হয়, সেটাও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের উপর একটা বাড়তি চাপ তৈরী করবে। আমার মনে হয় এখন যেমন প্রিটেস্ট – টেস্ট – শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোচিং –অনেক প্রতিষ্ঠানে ফাইনাল পরীক্ষার আগে আবারো টেস্ট – পাবলিক পরীক্ষা —— অনেক সময় এবং পরিশ্রমযায় শিক্ষার্থীদের, আমার মনে হয় এ বাড়তি চাপ কমানো দরকার। বিশাল হ্যাপা, আর এ নিয়ে কোচিং সেন্টারগুলো আর প্রাইভেট টিউশনের ব্যবসাও আরো রমরমে হবে, অভিভাবকদের হবে শুধু গচ্ছা। এছাড়া এ জন্য শিক্ষাবোর্ড আর জেলাপ্রশাসনগুলোতে আরো লোকবল দরকার।

পরীক্ষাপদ্ধতিতে সৃজনশীল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ।

৬ মাদ্রাসা শিক্ষা

এ শিক্ষানীতিতে ইবতেদায়ি আট বছর, দাখিল চার বছর করা হবে। ফাযিলকে তিন/চার বছর, কামিলকে দুই/এক বছর মেয়াদি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা অবশ্যই ভাল হবে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রীর সমতা আনয়নের ক্ষেত্রে। এছাড়া উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমকে ইংরেজী করা যেতে পারে, যাতে করে তারা যেন পরবর্তীতে বিদেশ থেকে উচ্চতর শিক্ষাও নিতে পারে, অথবা বাংলাদেশে বসেই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা করতে পারে, তাই তাদের জন্যও আরো বিশ্ববিদ্যালয় করা দরকার। আর ইসলামিক বিষয়ক বর্তমানে আধুনিক যেসব গবেষণা হচ্ছে, যেসব জার্নাল প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোর সাবস্ক্রিপশনও থাকা দরকার।

৭ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা

এখানে যার যার ধর্মের উপর এবং সেসাথে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। আমি মনে করি এটা একেবারে শিক্ষার প্রথম পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত থাকা দরকার। আর সে সাথে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কোরআনিক আরবী এবং উচ্চতর পর্যায়ে উসুল ফিকাহ সম্বন্ধে শিক্ষাদান জরুরী।

৮ উচ্চশিক্ষা

বলা হচ্ছে সমাপনী ডিগ্রী চার বছরের স্নাতক। আর কেউ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষকতা পেশায় যেতে চাইলে মাস্টার্স ডিগ্রী লাগবে। কথা হলো এখন যারা ইন্টারমিডিয়েট কলেজগুলোতে আছেন তারাও বিসিএস ক্যাডারের। যখন সেটা মাধ্যমিক স্তরের অন্তর্ভুক্ত হবে, তখন সেখানে শিক্ষক নিয়োগ হবে কিভাবে, যোগ্যতা কি হবে? সেটা কি স্নাতক ডিগ্রীই হবে নাকি মাস্টার্স ডিগ্রী হবে?বিসিএস নাকি হাই স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে? আগে দেখেছি মাস্টার্স পাশ কেউ প্রথমে হয়তো স্কুলে জয়েন করেছে, পরে হয়তো বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে কলেজে জয়েন করছে বা নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে বেসরকারী কলেজে ঢুকছেন। আবার কারো রেজাল্ট বেশী ভাল হলে কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করছেন। এখন এখানে যদি সবার সমাপনী ডিগ্রী সমান না হয়, তাহলে এ চাকুরী পরিবর্তন কিভাবে হতে পারে? আর চাকুরীর পাশাপাশি মাস্টার্স করাও অনেক পরিশ্রমসাধ্য ব্যাপার হয়ে যায়।

আর বাইরের দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও বিষয়ভিত্তিক মাস্টার্স চালু করা দরকার, যেটা কিছুটা আছে বুয়েটে। কিন্তু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে সাধারণ বিভাগভিত্তিক মাস্টার্স সেটা আসলে এক ধরণের খিচুড়ী টাইপ ব্যাপার, যেটা খুব একটা ফলপ্রসূ না।

আর সেশনজট কমানোর জন্য একাডেমিক ক্যালেন্ডার কঠোরভাবে ফলো করা দরকার যেটার কথা শিক্ষানীতিতে বলা আছে।

এখানে আরো যে ভালো প্রস্তাবনাগুলো আছে সেগুলো হলো শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য কোটা পদ্ধতি বা অন্য কারণে ন্যুনতম যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হবে না, মৌলিক গবেষণাকাজে গুরুত্ব প্রদান, ফেলোশীপের ব্যবস্থা করার কথা বলা যেটা খুবই দরকার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, ই-জার্নাল সংগ্রহ, বিভিন্ন বই ও জার্নালের সফট কপি এবং আরো অন্যান্য।

তবে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বেশী বেশী করে দক্ষ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দেশী-বিদেশী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা। [ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যাপারটি মাধ্যমিক পর্যায় থেকে শুরু করা যেতে পারে।] এবং প্রতি বছর বা ২/৩ বছর পরপর শিক্ষকদের চাকুরী পুনর্মূল্যায়ন করা। তাদেরকে পাবলিকেশন এবং সুপারভাইজিং-এর উপর মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এতে করে শিক্ষকদের মধ্যে একটা প্রফেশনালিজম কাজ করবে, এবং শিক্ষাদান ও শিক্ষার মানের আরো উন্নতি ঘটবে। এর সাথে যেটা দরকার সেটা হলো শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, আলাদা সম্মানজনক বেতন কাঠামো ইত্যাদি।

আর সবচেয়ে বেশী দরকার শিক্ষাঙ্গন থেকে ছাত্র-শিক্ষক যে কোন ধরণের রাজনীতি বন্ধ করা। ছাত্র-শিক্ষকরা শুধু তাদের শিক্ষা ও পেশা সংক্রান্ত ব্যাপারে আন্দোলন করতে পারে, দেশের মূল রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

আর দিনে দিনে ছাত্র-ছাত্রীর ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে বলে প্রয়োজনীয় আবাসিক ও পরিবহন ব্যবস্থাও আরো বাড়ানো দরকার।

শিক্ষানীতিতে ছাত্রদের বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকের সচ্ছলতার প্রত্যয়ন পত্রের উপর নির্ভর করার কথা বলা হচ্ছে। এটা কতটা কার্যকরী সিদ্ধান্ত, এ নিয়ে সন্দেহ আছে। কে চাইবে তার বেশী আয় দেখাতে? এর চেয়ে বরং ধাপে ধাপে ছাত্রদের বেতন বাড়াতে হবে এবং সেটা ভর্তিপরীক্ষার আগেই অভিভাবকদের জানা থাকতে হবে। মাঝখান থেকে হুট করে বাড়ালে অধ্যয়নরত ছাত্রদের উপর চাপ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করবে। তবে মেধাবীদের ভালো পরিমাণ বৃত্তির ব্যবস্থা করা জরুরী। আর যে মেধাভিত্তিক ব্যাংক ঋণের কথা বলা হয়েছে, সেটা ছাত্র-ছাত্রীরা শোধ করবে কিভাবে? বাইরের দেশে যেমন চাকুরী পাবার পর অনেক বছর ধরে শোধ করতে পারে, সেরকম কিছু ব্যবস্থা করা দরকার। তা না হলে ছাত্রদের ঋণ শোধ করতে গিয়ে আবার পার্ট-টাইম জবের ব্যবস্থা করতে হবে, সেটার সুযোগ আমাদের দেশে কতটুকু? আর শিক্ষানীতিতে প্রাইভেট টিউশনকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

৯ প্রকৌশল শিক্ষা

এক্ষেত্রে ২ আর ৫ নং পয়েন্ট সবচেয়ে ভাল লেগেছে। দেশের শিল্প সমস্যা সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রমকে উ\সাহিত করা আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের সংযোগ স্থাপনের উপর জোরদান। এ দুটো কাজ যত বেশী করা যাবে ততই মঙ্গল।

১০ বিজ্ঞান শিক্ষা

৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে স্বাস্থ্য ও প্রজনন শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মাধ্যমিক থেকে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের উপর জোর দেয়া হয়েছে বিশেষ করে গণিতে। উচ্চতর গবেষণাকাজে স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখা জন্য পিএইচডি প্রোগ্রামেও গবেষণার পাশাপাশি কোর্সওয়ার্ক চালু করা দরকার। মাস্টার্সের মতো একই কোর্স বা একটু বিশেষ কোর্স। মাস্টার্সে অল্প পরিসরে গবেষণা, পিএইচডিতে বড় পরিসরে। আর এক্ষেত্রে ফেলোশিপগুলো এমন হওয়া দরকার যাতে একজন শিক্ষার্থী তার পরিবার চালাতে পারে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী এ সময় অনেককে স্টাডি লিভে থাকতে হয় এবং স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থীর যে বয়স থাকে তাতে করে আমাদেরদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি একজন বিবাহিত হতে পারেন বা তার চাকুরীর প্রয়োজন থাকতে পারে।

১২ তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা

৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকেই শুরু হবে। এর সিলেবাস আকর্ষণীয় করা দরকার এবং ক্রিয়েটিভ হওয়া দরকার। ৯ম-১২শ শ্রেণীতে বাস্তব ছোট-খাট সমস্যা সমাধান করার মতো ছোট ছোট প্রোগ্রাম করানো যেতে পারে।

১৬ নারীশিক্ষা

সামগ্রিকভাবে নারীরা যেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠতে পারে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা সেরকমই হওয়া দরকার। আমাদের সিলেবাসগুলোতে নারীর প্রতি যেন কোন বৈষম্য প্রদর্শন না করে। এছাড়া ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাতেও পারিবারিক বা সামাজিক মন্ডলে নারী-পুরুষের পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, কর্তব্য এসব সম্বন্ধে ব্যপক আলোচনা থাকা জরুরী। সমাজে নারীদের প্রতি যেসব সামাজিক বা ধর্মীয় বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে সেসব ব্যাপারে শিক্ষার্থীদেরকে সচেতন করা এবং এ সংক্রান্ত করণীয়গুলো বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা দরকার। বিশেষ করে ইভ টিজিং, ধর্ষণ, একপেশে ফতোয়ার স্বীকার, এসিড সন্ত্রাস এসব ব্যাপারে শিক্ষার্থীদেরকে সচেতন করা ও সুস্থ নৈতিকতা গড়ে তোলা দরকার। আর পরিবার বা সমাজে যে কোন ধরণের নীতি-নির্ধারণী কাজে নারীদের অংশগ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষায়, গণিতে, ব্যবসায়, অর্থনীতিতে, প্রকৌশলীতে নারীরা যেন আরো বেশী করে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দেয়া দরকার।

১৮ক প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা

তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থাসহ তাদের থাকার জন্য বিশেষ ধরণের হোস্টেলের ব্যবস্থা করা দরকার। এছাড়া তারা যেন পথে ঘাটে নিরাপদে চলতে পারে তার জন্যও বিশেষভাবে রাস্তা তৈরী করা দরকার, এছাড়া বিভিন্ন ধরণের সহায়ক সামগ্রী যা দিয়ে তার বিভিন্ন কাজকর্ম সহজে করা যাবে, সেগুলো দেশে সহজলভ্য হওয়া দরকার। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্নরকমের বৃত্তিরও ব্যবস্থা করা দরকার। আর সমাজে তাদেরকে যেন কেউ হেয় দৃষ্টিতে না দেখে, সে ব্যাপারে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিকতা গড়ে তোলা দরকার। আর যারা প্রতিবন্ধীদের শিক্ষক হবেন, তাদেরও ভাল প্রশিক্ষণ দরকার। অনেক ভাল ভাল উদ্যোগের কথা শিক্ষানীতিতে বলা আছে, সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, করা হবে সেটাই আসল ব্যাপার।

২০ গ্রন্থাগার

এ শিক্ষানীতিতে স্কুল-কলেজগুলোতে আধুনিক ও উন্নত মানের গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়া আছে। সে সাথে শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্রাউজিং-এর সুবিধাও রাখা দরকার। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বই পড়ার ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহ দিতে হবে। শিক্ষকদেরকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আর বিভিন্ন রকমের বাংলা ভাষার বই (পাঠ্য পুস্তক বা গল্প-উপন্যাস), আইন-কানুন, স্বাস্থ্য পরামর্শ, ট্রাফিক-আইন, ট্যাক্স, সংবিধান, ধর্মীয় বিধান এবং জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক বিষয়েরই অনলাইন সংস্করণ গড়ে তোলা দরকার।

২৩ শিক্ষার্থী ভর্তি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নির্বাচনী পরীক্ষার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এটা করতে পারলে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হয়রানি এবং পয়সার অপচয় অনেক কমে যেত কোণ সন্দেহ নাই। কিন্তু বাস্তবে এটা করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজী হবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন। কেন্দ্রীয়ভাবে একই ফর্মে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় পছন্দের ক্রমানুসারে যদি লেখা যায় এবং মেধার ভিত্তিতে এবং সীট খালি থাকার ভিত্তিতে নির্বাচন করলে ভাল হবে। কিন্তু এ নির্বাচনী পরীক্ষার সমন্বয় ও পরিচালনা কিভাবে করা হবে সেটা হচ্ছে আসল ব্যাপার। এখনকার মতো বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ নিজ ইউনিট ছাড়াও যাতে অন্য ইউনিটের কিছু বিষয় নির্বাচন করা যায় সে অপশনও রাখতে হবে (ঢাবির ঘ ইউনিটের মতো)।

বলা হচ্ছে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য নির্বাচনী পরীক্ষা থাকবে না। তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের কেমন করে ভর্তি করা হবে সে ব্যাপারে কোন নির্দেশনা নেই। ঢাকা ও জেলাশহরগুলোর ভাল ভাল স্কুলগুলোতে ভর্তির সময় আসন সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী ছাত্র-ছাত্রীদের যে ভিড় হয়, এটা কিভাবে বন্ধ হবে সে ব্যাপারে কিছু বলা নাই।

২৪ শিক্ষক প্রশিক্ষণ

শিক্ষাদান পদ্ধতি যেন আনন্দদায়ক করা যায় এ ব্যাপারে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা খুব দরকার। এছাড়া সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরীর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দরকার।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব বাড়ানোর জন্য প্রতি পাঁচ বছর পরপর একটি মানযাচাই পরীক্ষা থাকতে পারে, যেখানে শিক্ষকরা যার যার বিষয়ের উপর ক্লাশ নিবেন, পরীক্ষা নিবেন, খাতা মূল্যায়ন করবেন, সেটা জেলা বা থানা শিক্ষা অফিসারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হবে, অফিসাররা মূল্যায়ন করবেন কোন শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতি কেমন হলো, ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিতে পারেন — এভাবে একজন শিক্ষকের প্রমোশন বা ইনক্রিমেন্ট তার যোগ্যতা অনুযায়ী হতে পারে, শুধু মাত্র বছরের ভিত্তিতে নয়।

২৫ শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব

শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন গ্রেড বাড়ানোর বিভিন্ন প্রস্তাব এতে রাখা হয়েছে। শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই দরকারী। অন্যদিকে শিক্ষকদেরকেও তাদের নিজ নিজ দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে। যেকোন ধরণের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি পরিহার করা উচিত। জাতিকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেয়ার ব্যাপারে এবং জাতি গঠনের কাজে একজন শিক্ষক সরাসরি যেমন ভূমিকা নিতে পারেন, সেটা আর কোন পেশায় সম্ভব নয়। কারণ, একটি দেশের সব শিক্ষিত, অল্প-শিক্ষিত সব মানুষকে কোন না কোন শিক্ষকের সংস্পর্শে আসতেই হয়। তাই দেশের ভবিষ্যত নাগরিকদের যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্নভাবে গড়ে তোলা অনেকটা শিক্ষকদেরই দায়িত্ব। শিক্ষকদের নিজেকেও সৎ থাকতে হবে, ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও সৎ হবার শিক্ষা দিবেন, এটাই সবার কাম্য।

২৬ শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক

এ ব্যাপারে আগেই আলোচনা করেছি, তাই আর কিছু বলছি না। মোদ্দাকথা, বাস্তব কর্মমুখী, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, জীবনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাই আমাদের সবার কাম্য, যে শিক্ষা আমাদের শুধু পরীক্ষায় পাশ করাবে না, জীবনে চলার পথে প্রতি পদক্ষেপে রাস্তা দেখাবে, জীবনকে আলোকিত করবে।

২৯ অর্থায়ন

শিক্ষাখাতে বিভিন্ন রকমের উন্নতির জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন। তাই এ শিক্ষানীতিতে জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করার জন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

শেষ

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
২১৩ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৩.০০)

৫ টি মন্তব্য

  1. যারা স্কুল কলেজে পড়তে গিয়ে রাজনীতির নামে ধংসনীতির অনুশরণ করে জন সাধারনের ক্ষতি করে, তাদের ব্যপারে কোন সুখবর আছে কি?

    নাজনীন

    @জ্ঞান পিপাষু, :) শিক্ষানীতিতে তো এ ব্যাপারে কোন কথা থাকবে না।

    জ্ঞান পিপাষু

    @নাজনীন,

    এখানেতো শিক্ষার্থীরা জরিত, তাহলে থাকবেনা কেন?
    শিক্ষা মানুষের জন্যে নাকি মানুষ শিক্ষার জন্যে?

    আপনার আলোচনাতেই আছে, শিক্ষকদের নিজেকেও সৎ থাকতে হবে, ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও সৎ হবার শিক্ষা দিবেন, এটাই সবার কাম্য।
    এটা যার যার জ্ঞান, কে কেমন হবে। দেখেন না আমাদের নেতাদের, তারা কত সৎ, জন দরদী।

    নাজনীন

    @জ্ঞান পিপাষু,দলীয় রাজনীতিতো শিক্ষাঙ্গনে বহিরাগত ব্যাপাররে ভাই। আমাদের সীমিত সম্পদ এবং সদিচ্ছার অভাবে অনেক সময় ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন যৌক্তিক দাবী-দাওয়া আদায়ের জন্যও আন্দোলন করতে হয়। অথচ প্রশাসন এ ব্যাপারে আন্তরিক হলে শুধুমাত্র লিখিত আবেদন করেই এসব ব্যাপারে সমাধান পেয়ে যাবার কথা। কিন্তু সেখানেইতো শিক্ষকরা সত এবং আন্তরিক থাকতে পারেন না।

    জ্ঞান পিপাষু

    @নাজনীন,

    ঐ বিষয়ে কথা বলে ভাল লাগছে না। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, হয়তো আর কোন প্রশ্ন করা হবে না।

    আচ্ছা আনিত একজন মেয়ে মানুষ তাই ভাল বুঝবেন ব্যপারটা। ধরেন আপ নার স্বামী আপনাকে বিরে করার পর আবার সে বিয়ে করতে চায়। এক্ষেত্রে সে আপনার অনুমতির প্রোয়জন মনে করে না। তার সম্পদ আছে বলেই সে বিয়ে করবে, একনি আপনি তা মেনে নেবেন? আপনার কি কষ্ট হবে এর জন্যে, নাকি খুশি হবেন এই ভেবে যে, ইসলাম অনুযায়ী স্ত্রীর অনুমতি নেয়ার দরকার নাই, আল্লাহ বলেছেন। দয়াকরে আপনার সুচিন্তিত মতামত জানাবেন কি?