লগইন রেজিস্ট্রেশন

পবিত্রতার তাৎপর্যঃ ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)- ১

লিখেছেন: ' দ্য মুসলিম' @ বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২১, ২০১০ (১২:৫৪ অপরাহ্ণ)

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
সুত্রঃ এহইয়াউ উলুমুদ্দিন, ভলিউম-১,পৃষ্ঠা-২৪০। ইমাম গাজ্জালী রহঃ।

প্রকাশ থাকে যে, পবিত্রতার শ্রষ্ঠত্ব নিম্নোদ্ধৃত হাদীস ও আয়াত দ্বারা প্রমাণিত্ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ধর্ম পরিচ্ছন্নতার উপর প্রতিষ্ঠিত। নামাজের চাবি পবিত্রতা।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “এ মসজিদে এমন লোক রয়েছে, যারা পবিত্র থাকা পছন্দ করে। আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ পবিত্রতা অর্ধেক ঈমান।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের উপর কোন অসুবিধা রাখতে চান না, কিন্তু তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান।”
অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী আলেমগন এসব রেওয়ায়েত থেকে এ তথ্য উদঘাটন করেছেন যে, মানুষের অভ্যন্তরকে পবিত্র করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, “পবিত্রতা অর্ধেক ঈমান।” এ বাক্যের উদ্দেশ্য এরূপ হওয়া অবান্তর যে, মানুষ তার বাহ্যিক অঙ্গে পানি ঢেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নেবে আর তার অভ্যন্তরীন অঙ্গ ময়লা অপবিত্রতা দ্বারা কলুষিত থাকবে। বরং উদ্দেশ্য, পবিত্রতা সম্পর্কিত কাজ। অপবিত্রতার প্রকার চতুষ্টয় এইঃ
১) বাহ্যিক দেহ ইত্যাদিকে বেওযুজনিত অপবিত্রতা ও আবর্জনা থেকে পাক করা।
২) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গোনাহ ও পাপ থেকে পাক করা।
৩) অন্তরকে অসচ্চরিত্রতা ও কুঅভ্যাস থেকে পাক করা এবং
৪) বাতেন তথা অভ্যন্তরকে আল্লাহ ব্যতীত সব কিছু থেকে পাক করা।
এ শেষোক্ত প্রকারটি যে অর্ধেক কাজ পবিত্রতা, তা এভাবে যে, চতুর্থ প্রকারের চরম লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার মাহাত্ম মহিমা মানুষের সামনে উম্মেচিত হয়ে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে খোদায়ী মারেফত অন্তরে কখনও অনুপ্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত না আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছু অন্তর থেকে বের হয়ে যাবে। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “বলুন আল্লাহ। এরপর তাদেরকে তাদের ধ্যান-ধারণায় খেলা করতে দিন।”
কেননা, এ উভয়টি এক অন্তরে একত্রিত হয় না। কোন মানুষের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা দু’অন্তর সৃষ্টি করেননি যে, একটির মধ্যে খোদায়ী মারেফত থাকবে আর অপরটির মধ্যে গায়রুল্লাহ তথা অন্য কিছু থাকবে। সুতরাং অন্তর অন্য কিছু থেকে পাক করা এবং খোদায়ী মারেফত আসা দু’টি কাজ, যার অর্ধেক হল অন্তরকে পাক করা।
অনুরূপ ভাবে তৃতীয় প্রকারের চূড়ান্ত প্রকারের লক্ষ্য হচ্ছে, অন্তরের প্রশংসনীয় চরিত্র ও শরীয়তী বিশ্বাস দ্বারা পরিপূর্ণ হওয়া। বলাবাহুল্য, অন্তর এগুলো দ্বারা ততক্ষন পর্যন্ত পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ বিপরীত কুচরিত্র ও মন্দ বিশ্বাস থেকে পাক না হবে। সুতরাং এখানেও দু’টি বিষয় হল, যার অর্ধেক অন্তরকে পাক করা।
এমনিভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে পাক করা এক কথা এবং এবাদত ও আনুগত্য দ্বারা পূর্ণ করা অন্য কথা। সুতরাং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাক করা হল সেই আমলের অর্ধেক, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা হওয়া উচিত। বাহ্যিক পবিত্রতাকেও এর মতই মনে করা উচিত। এভাবেই পবিত্রতাকে অর্ধেক ঈমান বলা হয়েছে।
মোট কথা, এগুলো হচ্ছে ঈমানের বিভিন্ন মকাম বা স্তর। প্রত্যেক মকামের একটি পর্যায় আছে। বান্দা নীচের পর্যায় অতিক্রম না করা পর্যন্ত উপরের পর্যায়ে কিছুতেই পৌছাতে পারেনা। উদাহরণঃঅন্তরকে নিন্দনীয় চরিত্র থেকে পাক করা এবং প্রশংসনীয় চরিত্র দ্বারা পূর্ণ করার পর্যায়ে পৌছা যাবে না, যে পর্যন্ত না নিন্দনীয় চরিত্র থেকে অন্তরকে পবিত্র করা হবে। আর যেব্যক্তি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে পাক করে এবাদত ব্যাপৃত না করবে, সে অন্তরের পবিত্রতার পর্যায়ে পৌছাতে পারবেনা। উদ্দেশ্য যত প্রিয় ও শুভ হয়, তার পথ ততই কঠিন ও দীর্ঘ হয় তাতে অনেক দূর্গম ঘাঁটি থাকে। তোমার এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, এসব বিষয় আকাঙ্খা দ্বারা অর্জিত হয় এবং অধ্যবসায় ছাড়াই লাভ করা যায়। যার অন্তর্দৃষ্টি এসব পর্যায় দেখার ব্যাপারে অন্ধ, সে কেবল বাহ্যিক পবিত্রতাকেই পবিত্রতা মনে করে। সে একেই লক্ষ্য ও উদ্দিষ্ট মনে করে, এ নিয়ে খুব চিন্তা ভাবনা করে এবং এর পদ্ধতিতে বাড়াবাড়ি করে। সে তার সমস্ত সময় এস্তেন্জা, কাপড় ধোষা, বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যাপ্ত প্রবাহিত পানির সন্ধানে ব্যয় করে দেয়। সে জানে না, পূর্ববর্তী মনীষীগণ তাঁদের সমস্ত শক্তি ও চিন্তা অন্তর পবিত্র করার কাজে ব্যাপৃত রাখতেন এবং বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব প্রদর্শন করতেন না। কাজেই হযরত ওমর রাঃ বিশেষ উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও জনৈক খৃষ্টান মহিলার কলসী থেকে পানি নিয়ে ওযু করেছিলেন। তারা মসজিদে ফরাশ ছাড়া নামায পড়তেন এবং খালি পায়ে পথ চলতেন। যিনি কিছু না বিছিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়তেন, তিনি শীর্ষস্হানীয় বুযুর্গ বলে গণ্য হতেন। তারা কেবল ঢিলা দ্বারা এস্তেন্জা করতেন। হযরত আবু হোরায়রা ও অন্যান্য সফফাবাসী সাহাবী বলেনঃ আমরা ভাজা করা গোশত খেতাম এবং নামাযের তকবীর হয়ে গেলে কংকরের মধ্যে অঙ্গুলি ঘসে নিয়ে নামাযে শরীক হয়ে যেতাম। হযরত ওমর রাঃ বলেনঃ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র আমলে আমরা “উশনান” (সাবান জাতীয় ঘাস) কি জিনিস , জানতাম না। আমাদের পায়ের তলা হত আমাদের রুমাল। চর্বিযুক্ত কিছু খেলে পায়ের তালুতে হাত ঘষে নিতাম। কথিত আছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমলের প্রথমে চারটি বস্তু আবিষ্কৃত হয়- চালনি, উশনান, দস্তরখান ও পেট ভরে আহার।
মোট কথা, পূর্ববর্তীদের মনোযোগ কেবল অন্তরের পরিচ্ছন্নতার দিকে ছিল। তাঁদের কেউ কেউ এমনও বলেন যে, জুতা পায়ে রেখে নামাজ পড়া উত্তম। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন জুতা খুলে নামায পড়েছিলেন, যখন জিব্রাইল আঃ এসে জুতার মধ্যে নাপাকী লেগে থাকার সংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁকে জুতা খুলতে দেখে যখন মুসল্লীরাও জুতা খুলতে শুরু করে, তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ তোমরা জুতা খুললে কেন? এসব বাহ্যিক বিষয় সমূহের ব্যাপারে পূর্ববর্তীরাও কড়াকড়ির পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু আজকাল ঔদ্ধত্যের নাম রাখা হয়েছে পরিচ্ছন্নতা। এখন একেই ধর্মের ভিত্তি বলা হয়। অথচ অন্তর অহংকার, আত্মম্ভরিতা, রিয় ও নেফাকের আবর্জনায় পরিপূর্ণ। এগুলোকে খারাপ মনেকরা হয় না। যদি কোন ব্যক্তি কেবল ঢিলা দ্বারা এস্তেন্জা করে অথবা খালি পায়ে পথ চলে অথবা মসজিদের মাটিতে জায়নামায ছাড়াই নামায পড়ে, তবে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় এবং তাবে অপবিত্র আখ্যা দেয়া হয়। সোবহানাল্লাহ, বিনয় ও আড়ম্বরহীনতা-যা ঈমানের অঙ্গ, তাকে বলা হয় নাপাকী আর গর্ব ও ঔদ্ধতকে বলা হয় পবিত্রতা।

(চলবে)

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৭০৩ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

৯ টি মন্তব্য

  1. ভাল লাগলো।

    দ্য মুসলিম

    @বেদুইন, ধন্যবাদ। দোয়া করবেন্।

  2. @মুসলিম,

    ধন্যবাদ , আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ইমাম গাজ্জালী (রহ:) । একটি প্রশ্ন : আপনি কি সরাসরি আরবী থেকে অনুবাদ করেছেন , নাকি অনুবাদকৃত বই এর থেকে তুলে দিয়েছেন । দ্বিতীয়টি যদি হয় , তাহলে অনুবাদকের নামটিও উল্লেখ করে দিন ।

    দ্য মুসলিম

    @হাফিজ,

    অনুবাদকৃত বই থেকে লিখাটি দিয়েছি। অনুবাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান। তিনি মাসিক মদীনার সম্পাদক। ধন্যবাদ।

  3. আলহামদুলিল্লাহ।আপনাকে ধন্যবাদ এরকম সুন্দর একতা লেখা উপহার দেয়ার জন্য।

    দ্য মুসলিম

    @দেশী৪৩২,
    ধন্যবাদ। দোয়া করবেন।

  4. ধন্যবাদ আপনার সুন্দর পোষ্টের জন্য। একটা সুখবর হল আমি গত ২ বছর আগে ইমাম গাজ্জালী (র:) এর মাজার জিয়ারত করে এসেছি।