লগইন রেজিস্ট্রেশন

“কাবীরা গুনাহ থেকে সাবধান! ও তাওবার সঠিক পদ্ধতি”

লিখেছেন: ' শাহরিয়ার' @ শুক্রবার, জানুয়ারি ৮, ২০১০ (১২:৩১ অপরাহ্ণ)

কবীরা গুনাহের আভিধানিক অর্থ বড় গুনাহ অর্থ বড় গুনাহ। আর শারী’আতের পরিভাষায় আল্লাহ ও তাঁর রসূল যে সকল কাজ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং সে সকল কাজের জন্য শাস্তির বিধান অথবা আল্লাহর রাগের কথা ঘোষণা রয়েছে, তাকে কাবীরা গুনাহ বলা হয়।

কাবীরা গুনাহ কোন ‘ইবাদাতের দ্বারা মাফ হয় না এবং এর জন্য তাওবাহ করা আবশ্যক। আর সাগীরা গুনাহ (ছোট গুনাহ) নেক ‘আমাল দ্বারাও মাফ হয়ে যায়। উলামায়ি কিরামের মতে সাগীরা গুনাহ যদি বেপরোয়া ও ঔদ্ধত্বের সাথে বারবার করা হয়, তবে তাও কাবীরা গুনাহের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়।

ইমাম হাসান বসরী ও ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেছেন, যে সকল গুনাহের কারণে আল্লাহ তা’আলা জাহান্নাম, লা’নত, আযাব ইত্যাদি দ্বারা ভীতি প্রদর্শন করেছেন, সেগুলো কাবীরা গুনাহ। অন্যান্যগুলো সাগীরা গুনাহ।

গুনাহ দু’ভাগে বিভক্ত- প্রথমত কাবীরা; দ্বিতীয়ত সাগীরা। কেউ কেউ বলেছেন, মূলত সব গুনাহই- গুনাহ, এর কোন বিভাগ নেই। তবে মুহাক্কিক উলামায়ি কিরামের মতে গুনাহ দু’প্রকার। সাগীরা গুনাহ ও কাবীরা গুনাহ।

যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ
“যদি তোমরা গুরতর নিষিদ্ধ কর্ম হতে বিরত থাক, তবে তোমাদের লঘুতর পাপগুলো আমি মোচন করে দেব; আর তোমাদেরকে সম্মানিত স্থানে দাখিল করব।” (সূরা আন-নিসা-৩১)

কবীরা গুনাহসমূহের সংখ্যা
কুরআন ও হাদীসে কাবীরা গুনাহের পূর্ণ সংখ্যার বর্ণনা এক সাথে উল্লেখ নেই। তবে কুরআনে ও হাদীসে যে সকল গুনাহকে কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, উলামায়ি কিরাম এর সংখ্যা ৭০টি বলে বর্ণনা করেছেন। আবার তাঁদের কেউ কেউ তার সংখ্যা এর চেয়ে অধিক বলেও উল্লেখ করেছেন। এসকল কাবীরা গুনাহের মধ্যে কোনটি কোনটির চেয়ে অপেক্ষাকৃত অধিক গুরুতর।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং সাহাবায়ি কিরাম (রাঃ) যে সকল অপরাধের কাজকে কাবীরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সে সম্পর্কে আয়াত ও হাদীসের উদ্বৃতি দেয়া হলো-

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে মা’বূদ বলে ডাকে না, আল্লাহ যাকে হত্যা করা হরাম করে দিয়েছেন তাকে আইনের বিধান ব্যতীত হত্যা করে না এবং যিনায় লিপ্ত হয় না।” (সূরা আল-ফুরক্বান-৬৮)

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেনঃ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)- কে জিজ্ঞেসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা’আলার নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তোমার সন্তান তোমার সাথে খাবে এ ভয়ে তাকে হত্যা করা। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কোনটি? রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেন, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।”(বুখারী, আঃপ্রঃ, হাদীস নং- ৭০০১)

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঘোষনা, গুরুতর কাবীরা গুনাহ হচ্ছে-আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হ্ত্যা করা, মিথ্যা কথা বলা বা স্বাক্ষ্য দেয়া।” (মুসলিম হাঃ ১৬৯)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ৭টি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে তোমরা দূরে থাকবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে ৭টি কাজ কি কি? তিনি বললেনঃ (১) আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা; (২) যাদু করা; (৩) শারী’আতের বিধান ছাড়া কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করেছেন; (৪) ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা; (৫) সুদ খাওয়া; (৬) জিহাদের ময়দান থেকে পালায়ন করা; (৭) নিরাপরাধ ও পবিত্র মুসলিম মহিলাদের নামে যিনার অপবাদ রটানো। (বুখারী, মুসলিম হাঃ ১৭০ ইঃসেঃ)

কাবীরা গুনাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়ঃ

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

“আপনি বলুন, হে বান্দাহরা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমাত হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব পাপ ক্ষমা করে দিবেন, তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আযযুমার-৫৩)

মূলত একনিষ্ঠ তাওবাহর মাধ্যমে সকল গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ করা যায় তবে এ জন্য চারটি শর্ত রয়েছে। যেমন, (১) আন্তরিকভাবে খালিস নিয়্যতের সহিত অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া; (২) ভবিষ্যতে আর ঐ গুনাহ না করার ওয়াদাহ করা; (৩) অবিলম্বেউক্ত গুনাহ একেবারেই ত্যাগ করা; (৪) গুনাহর সাথে মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি জীবিত থাকে তবে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া এবং প্রয়োজনে তাকে বা তার উত্তরাধিকারীদেরকে সন্তোষজনক ক্ষতিপূরণ দান। এই চারটি শর্ত পালনপূর্বক ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কাবীরা গুনাহ মুক্ত জীবন-যাপনকারীর মর্যাদাঃ

আল্লাহ তা’আলা কাবীরা গুনাহ মুক্ত জীবন-যাপনকারীদের সম্পর্কে বলেনঃ
“যারা সাধারণ পাপ ছাড়া মহাপাপ (কাবীরা গুনাহ) ও অশ্লীল কাজ করা হতে বিরত থাকে, নিশ্চয়ই আপনার রবের ক্ষমা বড়ই বিস্তৃত, তোমাদের ব্যাপারে জানেন।” (সূরা আন-নাজম-৩২)

“যারা মাহপাপী ও অশ্লীল কাজ হতে দূরে থাকে, আর ক্রোধের সময় মার্জনা (ক্ষমা) করে দেয়।” (সূরা শুরা-৩৭)

সাগীরা গুনাহ থেকেও সাবধান!
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, হে লোকসকল! তোমরা এমন সমস্ত কাজ করে থাক যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চাইতেও সূক্ষ্ণ। অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সময়ে আমরা সেগুলোকে ধ্বংসাত্নক মনে করতাম। (বুখারী, মিশকাত হাঃ ৫১২৩)

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, হে আয়িশাহ! তুমি ঐসব গুনাহ থেকে বেঁচে থাক যেগুলোকে ক্ষুদ্র ধারণা করা হয়। কেননা, এ সমস্ত ছোট ছোট গুনাহগুলোর খোঁজ রাখার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে (মালাইকা) নিয়োজিত রয়েছেন। (ইবনু মাজাহ, দারেমী ও বায়হাকী, মিশকাত হাঃ ৫১২৪)

কাবীরা গুনাহের বিবরণঃ

০১) শির্ক বা আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা
০২) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা
০৩) সালাত পরিত্যাগ করা
০৪) বিনা ওজরে রমাযানের সিয়াম পালন না করা
০৫) যাকাত আদায় না করা
০৬) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হাজ্জ না করা
০৭) জিহাদের ময়দান থেকে পালায়ন করা
০৮) আত্মহত্যা করা
০৯) যিনা বা ব্যভিচার করা
১০) সুদের আদান প্রদান করা
১১) মাতা-পিতার নাফারমানী করা
১২) মদ পান করা বা নেশাদ্রব্য ব্যবহার
১৩) আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা
১৪) চুরি করা
১৫) ডাকাতি করা
১৬) যাদু টোনা করা
১৭) ইয়াতীমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা
১৮) ইমাম বা নেতা কর্তৃক প্রজাদের ধোঁকা দেয়া এবং তাদের উপর যুলম করা
১৯) অহংকার করা
২০) মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেয়া
২১) জুয়া খেলা
২২) সমকামিতা বা পুরুষে পুরুষে বা মহিলা মহিলা যিনা (ব্যভিচার) করা
২৩) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি মিথ্যারোপ করা
২৪) সত্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া
২৫) রাষ্ট্রীয় সম্পদ (গানীমাতের মাল) আত্মসাৎ করা
২৬) রিয়া বা লোক দেখানো কাজ
২৭) দুনইয়ার উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন এবং ইলম গোপন করা
২৮) খিয়ানত বা বিশ্বাঘাতকতা করা
২৯) মিথ্যা ক্বসম খাওয়া
৩০) মিথ্যা বলা
৩১) হারাম খাওয়া এবং হারাম উপার্জন করা
৩২) অন্যায় জরিমানা আদায় করা
৩৩) দুর্ণীতি পরায়ণ বিচারক
৩৪) ঘুষ আদান প্রদান
৩৫) নারীদের পুরুষের বেশ এবং পুরুষদের নারী বেশ ধারণ করা
৩৬) দাইয়ূস
৩৭) হালালাকারী ও যার জন্য হিলা করা হয়
৩৮) প্রস্রাব থেকে বেঁচে না থাকা
৩৯) উপকার করে খোঁটা দেয়া
৪০) তাক্বদীরের প্রতি অবিশ্বাস করা
৪১) অন্য লোকদের গোপন কথা শুনা
৪২) চোগলখোরী করা
৪৩) গীবাত করা
৪৪) ওয়াদা করে তা রক্ষা না করা
৪৫) গণক বা জ্যোতির্ষীর কথা বিশ্বাস করা
৪৬) ফটো বা ছবি বানানো
৪৭) বিদ্রোহ ও ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা
৪৮) যুলম অত্যাচার করা
৪৯) পায়ের টাখনুর নীচে কাপড় লটকিয়ে পরিধান করা
৫০) পুরুষের রেশমী বস্ত্র ও স্বর্ণালংকার পরিধান করা
৫১) যে পিতা নয় তাকে জেনে-শুনে পিতা বলে পরিচয় দেয়া
৫২) সত্যের বিরোধিতা করা অকারণে বিতর্ক ও ঝগড়া করা
৫৩) মাপে বা ওজনে কম দেয়া
৫৪) আল্লাহর দেয়া অবকাশকে নিরাপদ মনে না করা
৫৫) আল্লাহর ওলীগণকে কষ্ট দেয়া
৫৬) বিনা ওযরে জামা’আত ত্যাগ করে একা সালাত আদায় করা
৫৭) ওযর ব্যতীত জুমু’আর জামা’আত ত্যাগ করা
৫৮) ওয়াসীয়্যাত দ্বারা অনিষ্ট করা
৫৯) প্রতারনা ও ধোঁকাবাজি করা
৬০) সাহাবীদের গালি দেয়া
৬১) প্রতিবেশীকে ক্ষ্ট দেয়া
৬২) মুসলিমদের ক্ষ্ট দেয়া
৬৩) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবেহ করা
৬৪) মুসলিমদের দোষ-ত্রুটি গোপনীয়তা অনুসন্ধান করা এবং ফাঁস করে দেয়া
৬৫) লা’নত বা অভিশাপ দেয়া
৬৬) আশু বিপদে অধৈর্য হওয়া
৬৭) ক্রীতদাসের পলায়ন
৬৮) দুর্বলের (দাস-দাসী) প্রতি কঠোর হওয়া
৬৯) প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অন্যকে না দেয়া
৭০) আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হওয়া।

এই লেখাটা টাইপ করার পরে ভীষন খারপ লাগছে, কেননা আমি নিজে কত বড় পাপী! তা অনুধাবন করছি। এই সত্তরটা কাবীরা গুনাহের বেশ কিছু নিজের অজান্তে ঘটে গেছে আবার জেনেশুনে বার বার সেই ভুল গুলো করে যাচ্ছি। যেমন মিথ্যা কথা বলা, ঘুষ প্রদান, অহরহ গীবত গাওয়া, বিপদে অধৈর্য হওয়া, মুসলিমদের কষ্ট দেওয়া, টাখনুর নীচে কাপড় পরা ইত্যাদি ইত্যাদি। আল্লাহ কি আমার মতো পাপীকে ক্ষমা করবেন?
আসুন আমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করি যেন তিনি আমাদের সকল গুনাহখাতা মাফ করে দেন। আমীন…………………….

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১,৪৭৭ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)