লগইন রেজিস্ট্রেশন

কোরআনের কথা;-৯ সুরা বাক্বারা;১-৫

লিখেছেন: ' Abdus Samad' @ রবিবার, অক্টোবর ২, ২০১১ (৯:১৪ অপরাহ্ণ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সুরা আল-বাক্বারা কোরানের সবচেয়ে বড় সুরা। এতে ২৮৬টি আয়াত রয়েছে। রসুল সঃ এর মদীনা জীবনে অবতীর্ণ বলে একে মাদানী সুরা বলাহয়। স্মরণ করা যেতে পারে, রসুল সঃ এর আবাসের উপর ভিত্তি করে, কোরানের সুরাগুলিকে মক্কি ও মাদানী নামে বিশেষীত করা হয়েছে। যদিও এ নিয়মের কিছু ব্যাতিক্রম ও আছে। যেমন, ৪৮ নং আয়াতটি দশম হীজরীতে বিদায় হজ্জের সময় আরাফাতের ময়দানে রসুলের অবস্থান কালে অবতীর্ণ হয়, শেষের বিখ্যাত দোয়ার আয়াত দুটি (২৮৫,২৮৬) মেরাজের রাতে রসুল সঃ আসমানে ভ্রমন কালে পেয়েছিলেন বলে বলা হয়েছে। রসুল সঃ বলেছেন;- “লে কুল্লে শাইঈন সানামুন” অর্থাৎ প্রতিটি জিনিষের একটি শিখর বা শ্রেষ্ঠাংশ রয়েছে। সুরা বাক্বারা, কোরানের সেই শিখর। বিখ্যাত আয়াতুল কূরসী আয়াতটি এ সুরাতেই অবস্থিত। এই সুরায় ৪০টি রুকু আছে। আলোচনার বিষয় বস্তুর ভিত্তিতে সুরাটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমাংশে ১৮ রুকু, আয়াত সংখ্যা ১৫২। এই অংশে সাবেকা উম্মত মোহাম্মদী সঃ অর্থাৎ মোহাম্মদ সঃ এর পূর্ববর্ত্তী উম্মতগনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আবার উক্ত ১৮ রুকুকে তিন ভাগ করা হয়েছে,যথা;-৪+১০+৪। প্রথম চার রুকুতে রসুল সঃ এর মক্কাজীবনে অবতীর্ণ, মক্কী কোরানের সারাংশ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য ১২/১৩ বছরের মক্কাবাসে পবিত্র কোরানের ২/৩ অংশ নাজিল হয়েগিয়েছিল। পরবর্ত্তী ১০ রুকুতে সাবেকা উম্মত, ইহুদী-নাসারা গনের প্রতি আল্লার বদান্নতা ও তার প্রতিদানের আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম রুকুতে আল্লাহ অতি নরম সুরে, মোহাম্মদের সঃ উপর ইমান আনার আহবান করেছেন ও পরের ৯ রুকুতে কঠোর স্বরে আল্লাহর অবদানের প্রতি অকৃতজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অবশিষ্ট ৪ রুকুতে, নূতন উম্মত, উম্মতে মোহাম্মীদর সঃ স্বীকৃতি দান ও আলামত স্বরূপ বাইতুল মোকাদ্দসের বদলে ক্বাবাকে কেবলার ঘোষনা করা হয়েছে। দ্বতীয়াংশে ২২ রুকু, আয়াত ১৩৪। প্রথম অংশে রুকু কম,আয়াত বেশী। দ্বতীয় অংশে, রুকু বেশী আয়াত কম। এ ভাবেই সমতা বজায় রাখা হয়েছে।

সুরা বাক্বারার প্রথম আয়াতটি তিনটি হরফেই সম্পন্ন হয়েছে। এই হরফ গুলোকে হরফে মোকাত্তায়াত বলাহয়। আরবী বর্ণমালায় ২৯টি মতভেদে ২৮টি হরফ রয়েছে। আবার পবিত্র কোরানের ১১৪টি সুরার মধ্যে ২৯টি সুরায় হরফে মোকত্তায়াত রয়েছে। বর্ণ মালার হরফগুলির তিন ভাগের প্রথম ভাগ হতে অল্প সংখ্যক হরফ মোকাত্তায়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। মধ্যম ভাগের নোকতা বিহীন কিছু ও শেষ ভাগের প্রায় সব হরফ গুলোই মোকাত্তায়াত রূপে ব্যবহার করা হয়েছে। কোন কোন সুরায় মাত্র একটি আবার কোন সুরায় ৫টি হরফ ও হরফে মোকাত্তায়াত রূপে দেখা যায়। হরফে মোকাত্তায়াত হরকত বিহীন পড়তে হয়। এ গুলির অর্থ, তথ্য বা মাহাত্ব একমাত্র আল্লাহ ও তার রসুলই জানেন। হরফে মোকাত্তায়াত বিশিষ্ট আয়াতগুলি আয়াতে মোতাশাবেহাতের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাক্বারার হরফে মোকাত্তায়াত-ত আলিফ লাম মীম, এর ব্যাপারে, সাহাবী হজরত আব্দুল্লা ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, এটা আনাল্লাহু আ-লামো বাক্যটির সংক্ষেপীত রূপ। প্রথম শব্দ-আনা’র প্রথম হরফ আলিফ, মাঝের শব্দ আল্লাহ’র মাঝের হরফ লাম ও শেষের শব্দ আ-লামো’র শেষের হরফ মীম। সংক্ষেপে আলিফ লাম মীম। বাক্যটির অর্থ;- “আমি আল্লাহ অধিক জানি”। যদিও উক্ত সাহাবীকে হীবরুল উম্মত বলা হয়, কিন্তু তাঁর এ মত গ্রহন যোগ্যতা পায় নাই। বাস্তবিকই আল্লাহই অধিক জানেন। আমরা জেনেছি রসুল সঃ কোরানকে সাতটি মঞ্জিলে ভাগ করেছেন। সুরা বাক্বারার সাথে পবিত্র কোরানের প্রথম মঞ্জিল শুরু হল। সেই সঙ্গে শুরুহল মক্কী ও মাদানী সুরার মিলিত গ্রুপ। প্রথম মঞ্জিলে তিনটি সুরা এবং প্রথম গ্রুপে চারটি মাদানী ও একটি মক্কী সুরা (আল ফাতেহা )রয়েছে। বিষয়ের সামঞ্জস্যতার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কোরানের সুরাগুলি জোড়ায় জোড়ায় পরিলক্ষিত হয়। সুরা আলবাক্বারা ও সুরা আল ইমরান প্রথম জো
ড়া। এ জোড়াটিকে রসুল সঃ ‘আজজাহরাওয়াইন’ ,জ্যোতিস্মান সুরাদ্বয় নামে আখ্যায়ীত করেছেন।
بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
১/ الم অর্থাৎ;-(হরফে মুকাত্তায়াত অর্থ অজানা)
ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
অর্থাৎ; এই সেই কিতাব(গ্রন্থ) যাতে কোন সন্দেহ নেই এতে রয়েছ মুত্তাকীগনের পথ নির্দেশনা। জালিকা শব্দ দ্বারা দূরবর্ত্তী কিছুকে নির্দেশ করা হয়। এখানে দুইটি বিষয়ের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হচ্ছে, প্রথমতঃ সুরা ফাতেহায় প্র্রার্থীত সীরাতাল মুস্তাকীমই এই কিতাব এতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বিতীয়তঃ-এই সেই কিতাব,যার বর্ণনা তাওরাত ও ইঞ্জীলে রয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। মুত্তাকীগনকে এই কিতাব পথ দেখাবে। মুত্তাকী একটি চারিত্রীক বৈশিষ্ট। যার ব্যাখ্যা পরের আয়াতগুলোতে দেওয়া হয়েছে। কোরানের অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াতে করা হয়ে থাকে।
৩/الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
৪/ والَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
৫/ والَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
অর্থাৎ;- যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে, আর আমার দেওয়া রিজিক্ব হতে খরচ করে। আর যারা বিশ্বাস করে আপনার উপর যা নাজিল করা হয়েছে ও আপনার পুর্ববর্ত্তীগনের উপর যা নাজিল করা হয়েছে, এবং আখেরাতের উপর দৃঢ় বিশ্বাস করে। তারাই আছে রব প্রদত্ত হেদায়েতের উপর আর তারাই হল সফলকাম। অন্তরে আল্লার ভয় ভীতি সহকারে সমস্ত অন্যায় ও গর্হীত কাজকে পাশকাটিয়ে চলাই তাকওয়া। মুত্তাকী তিনিই যার তাকওয়া আছে, যিনি অদৃশ্যে বিশ্বাস বা ইমান রাখেন, (পঞ্চ ইন্দ্রীয় গ্রাহ্য বস্তুর উপর বিশ্বাস করাকে ইমান বলেনা অদৃশ্য বস্তুতে বিশ্বাসই প্রকৃত ইমান। ইমান অন্তরে আরম্ভ হয়, আমলে পৌঁছে তা পূর্ণতা লাভ করে। অপর পক্ষে ইসলাম আমল থেকে আরম্ভ হয়ে, অন্তরে পৌঁছে তা পূর্ণতা লাভ করে। ইমান আমলে প্রকাশ নাহলে গ্রহন যোগ্য হয়না তেমনই ইসলাম বা আনুগত্য বিশ্বাস বিহীন হলে গ্রহন যোগ্য হয়না)। যিনি যথা নিয়মে, সঠিক ভাবে নামাজ আদায় করেন ও নামাজের ধারা ভংগ করেন না। আল্লার দেওয়া ধন সম্পদ হতে খরচ করেন। এখানে ইনফাক শব্দ দ্বারা অতিরিক্ত বা নফল খরচের কথা বলা হয়েছে। আবার মিম্মা শব্দ দ্বারা নিঃস্য না হওয়ার ইঙ্গীত করা হয়েছে।(কোরানে আবশ্যিক খরচের কথা জাকাত শব্দ দ্বারা বলা হয়েছে)।যিনি হজরত মোহাম্মদ সঃ এর উপর নাজিলকৃত কিতাব বা কোরানের উপর বিশ্বাস করেন, সাথে সাথে পূর্বের নবী রসুলগনের উপর নাজিলকৃত কিতাব বা যবুর, তাওরাত ইনজীলের উপরেও বিশ্বাস করেন। স্মরণ যোগ্য যে পূর্ব বর্ত্তী কিতাব সমুহের যে সব হুকুম আহকাম পবিত্র কোরান দ্বারা রহিত বা মনসূখ হয়েছে তা বাদ দিতে হবে। মনে রাখা দরকার পবিত্র কোরানে যে সমস্ত নবী রসুল গনের উল্লেখ আছে, তার পরম্পরা কোরানে নেই, তাওরাতে তা বিদ্যমান। যিনি আখেরাত বা পরবর্ত্তী জীবনের উপর দৃঢ় বিশ্বাস করেন। বিশ্বাসের অন্যান্ন বিষয় গুলি ইমান শব্দ দ্বারা ও আখেরাতের কথা ইক্বান শব্দ দ্বারা বলা হয়েছে। রসুল সঃ বলেছেন;- “আদদুনিয়ায়ু খুলেকা লাকুম অ আনতুম লিল আখেরাহ। অর্থাৎ;-তোমাদের জন্য দুনিয়া বানানো হয়েছে, আর তোমাদের বানানো হয়েছে আখেরাতের জন্য। চরিত্রের এই সমস্ত গুনাবলী যাদের আছে, তারাই মুত্তাকী। পঞ্চম আয়াত দ্বারা আল্লাহ এদেরই সফলকাম বলে ঘোষনা দিয়েছেন। ওসুলে সওয়াব বা ইসালে সওয়াবের নিমিত্ত কোরান পঠন বা যত্ন সহকারে ঘরে কোরান রক্ষন করলেই কোরানের হেদায়েত পাওয়া যায়না। কোরানের হেদায়েত প্রাপ্তির জন্য কোরানের প্রদর্শিত নীতি জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেই হবে। উপরোক্ত পাঁচটি আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর কথা স্মরন করিয়ে দিচ্ছেন, যারা মক্কায় সমূহ সংকটময় অবস্থায় অবস্থান করেও দ্বিধাহীন চিত্তে আল্লাহ ও তার রসুলের উপর ইমান এনেছেন, অত্যাচারীত হয়েও অটল থেকেছেন, সহায় সম্পদ, আত্মীয় সজ্বন, প্রীয়জন ছেড়ে মদীনায় হীজরত করতে বাধ্য হয়েছেন। এরাই শাজারায়ে কোরানের (কোরান বৃক্ষ) চাক্ষুষ ফল ফসল। আবু বকর, ওসমান, ওমর, আলী হায়দর, বিলাল, মোসহাফ। রাজি আল্লাহু আনহুম। ——-চলবে——

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
২৬৭ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)