লগইন রেজিস্ট্রেশন

আশুরা’র শিক্ষা

লিখেছেন: ' sayedalihasan' @ রবিবার, জুন ১৯, ২০১১ (৩:৫৮ অপরাহ্ণ)

শহীদগণের নেতা হযরত আবা আবদিল্লাহ্‌ আল্‌-হোসাইন (আ.)-এর শোকাবহ স্মরণ দিবস সমূহের আগমনে শেষ যুগের ইমাম হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) (তাঁর জন্য আমাদের প্রাণ উৎসর্গিত হোক), মহান রাহ্‌বার (ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা), মার্‌জা‘এ তাক্বলীদগণ ও আহ্‌লে বাইতের আদর্শের প্রেমিক সকলের প্রতি শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং মহান আল্লাহ্‌র নিকট আবেদন করছি যে, এ দুনিয়ায় ও আখেরাতে ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর সাথে আমাদের সম্পর্ককে যেন কখনো দুর্বল হতে না দেন।

প্রশ্ন হলো এই যে, কেন আমরা মহররমে বা অন্য কোন দিবসে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জন্য শোক প্রকাশ করবো? কিন্তু এ প্রশ্নের জবাব একটি পূর্ব ধারণার ভিত্তিতে দেয়া হয়। তা হচ্ছে এই যে, কারবালার ঘটনা যদি ইসলামের ইতিহাসে গতিধারা নির্ধারক বা দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে থাকে তাহলে তার স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখা হলে তা আমাদের ভবিষ্যত বিনির্মাণে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে পারে।

আলোচনাটি হলো ‘যদি’র ওপরে ভিত্তিশীল অর্থাৎ কারবালার ঘটনা যদি ইসলামের ইতিহাসে গতিধারা নির্ধারক বা দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু আমাদের তরুণরা যদি আমাদের কাছে প্রশ্ন করে যে, আমরা কী করে বলছি, ইসলামের অগ্রগতিতে, ইসলামের টিকে থাকার ক্ষেত্রে ও চূড়ান্ত পর্যায়ে মানুষের সৌভাগ্য নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে কারবালার ঘটনা এরূপ গতিধারা নির্ধারক বা দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছে এবং পালন করতে পারে? এখানে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো।

শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলেই যে ব্যাপারে একমত যে, কারবালার ঘটনা মানব ইতিহাসের একমাত্র ব্যতিক্রমী ঘটনা না হলেও এ ঘটনা মানব জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা সমূহের অন্যতম।

অবশ্য আমরা যেহেতু নিষ্পাপ(মাসুম) ইমামগণের (আঃ) মাধ্যমে এ ঘটনার বর্ণনা পেয়েছি সে হিসেবে একে আমরা একক বা অনন্য বা ব্যতিক্রম ঘটনা বলে মনে করি এবং আমরা মনে করি যে, অতীতে এ ধরনের অন্য কোনো ঘটনা সংঘটিত হয় নি; অতীতে এ ধরনের ঘটনার আদৌ কোনো নজির নেই এবং ভবিষ্যতেও এর কোনো নজির পাওয়া যাবে না। কিন্তু যেহেতু আমরা এমন অনেক লোকেরও মুখোমুখি হই যারা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের নিকট দলীল-প্রমাণ দাবী করে সেহেতু সতর্কতার খাতিরে তথা বিষয়টি আমাদের অন্ধ দাবী হওয়ার অভিযোগ এড়াবার লক্ষ্যে সমস্ত ঐতিহাসিকের ও ইতিহাস বিশারদের মতৈক্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করতে চাই যে, আশূরার ঘটনা যদি কোনো একক, অনন্য ও নজির বিহীন ঘটনা না-ও হয়ে থাকে তথাপি তা মানব জাতির ইতিহাসে একান্ত বিরল ঘটনা সমূহের অন্যতম।

ঘটনার ধরন, বিপদের ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা এবং মানুষের মধ্যে তা টিকে থাকা ও তার সামাজিক প্রভাবের বিচারে অন্য কোনো ঘটনাই এ ঘটনার সাথে তুলনীয় নয়। বিভিন্ন দেশে আমরা এ ঘটনার স্মরণে শোকানুষ্ঠানসমূহের যে পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই, তা-ই আমাদেরকে এ সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট যে, অন্য কোনো ঘটনাই এ ঘটনার সাথে তুলনীয় নয়। এ সব শোকানুষ্ঠানে যে এত সময় ব্যয় করা হয়, এর পিছনে যে এত অর্থ খরচ করা হয়, এত যে অশ্রু বিসর্জন দেয়া হয়, এমনটি অন্য কোন্‌ কাজের জন্য, অন্য কোন্‌ ঘটনার স্মরণে করা হয় এবং এদিক থেকে অন্য কোন্‌ বিয়োগান্তক ঘটনাকে এর সাথে তুলনা করা যায়?

হ্যা, আমরা যদি আরো এক ধাপ এগিয়ে লক্ষ্য করি, আমাদের নিজেদের শহর ও আমাদের নিজেদের দেশের বাইরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমরা আশূরার দিনগুলোতে কী দেখতে পাই? হয়তো অনেকে মনে করে থাকবে যে, এ ধরনের শোকানুষ্ঠান কেবল আমাদের শহরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমি আপনাদেরকে জানাতে চাই যে, বিশ্বের সর্বত্রই মহর্‌রমের দিনগুলোতে, বিশেষ করে আশূরার দিনে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ঠিক যে ধরনের অনুষ্ঠান আপনারা আপনাদের নিজেদের শহরে করছেন।

নিউ ইয়র্ক হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শহর। আপনারা জানেন যে, জাতিসংঘের সদর দফতর এই নিউ ইয়র্কে অবস্থিত। আশূরার দিনে এই নিউ ইয়র্ক শহরে দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে মাতম করে। পাকিস্থানী, ইরানী, ইরাকী, লেবাননীসহ আরো অনেক দেশের নাগরিকরা একত্রে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিউ ইয়র্কের সব চেয়ে বড় সড়কে এত লোক সমাগম হয় যে, এর ফলে সেখানে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ হলো শিয়াদের কথা। কিন্তু সুন্নী অধ্যুষিত অনেক দেশেই আশূরার দিনগুলোতে ঠিক এ ধরনের অনুষ্ঠানই হয়ে থাকে। অথবা এসব দেশে যদি শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ বিভিন্ন জলসার আয়োজন করেন তো আহ্‌লে সুন্নাতের অনুসারী ভাইয়েরাও এসব জলসায় অংশগ্রহণ করাকে নিজেদের জন্য জরুরী মনে করেন। ভারত উপমহাদেশে আমাদের আহ্‌লে সুন্নাতের ভাইয়েরা -যাদের জনসংখ্যা আমাদের জনসংখ্যার কয়েক গুণ আর পাকিস্থান তো বিশেষ অবস্থানের অধিকারী; এসব দেশের সুন্নী ভাইদের অনেকেই রিসালাতের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতির কারণে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠান সমূহে অংশগ্রহণকে নিজেদের জন্য অপরিহার্য গণ্য করেন।

যেহেতু কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছেঃ
قل لا اسئلکم عليه اجراٌ الا المودة فی القربی.
“(হে রাসূল!) বলুন, আমি তোমাদের নিকট এ জন্য (এই রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য) আমার ঘনিষ্ঠ জনদের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত অন্য কোনো প্রতিদান চাই না।” তাই তাঁরা আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশকে রিসালাতের বিনিময় বলে মনে করেন এবং তা আদায় করাকে অপরিহার্য গণ্য করেন। এ কারণেই, সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর স্মরণে যখন শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় তখন তাঁরা আহ্‌লে বাইতের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসা প্রকাশ এবং দ্বীনী দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে এতে অংশগ্রহণ করেন।

এর চেয়েও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার এই যে, এমনকি মূর্তিপূজারীরা -যারা ইসলামী শরীয়তে বিশ্বাসী নয়, তারা সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর শোকানুষ্ঠানের যে বরকত লক্ষ্য করেছে সে কারণে তাদেরও অনেকে আশূরার শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং এ উপলক্ষ্যে অনেক মানত করে থাকে।

হ্যা, এগুলো হচ্ছে এমন ব্যাপার যা সারা দুনিয়ায় লক্ষ্য করা যায়। অমুসলিমরাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত, কারণ এতে অনেক কিছু ব্যতিক্রমী বিষয় আছে। আপনারা সারা দুনিয়ায় এ ধরনের অন্য কোনো ঘটনাই দেখাতে পারবেন না যার প্রভাবের আওতা এত ব্যাপক বিস্তৃত এবং যা এভাবে বিভিন্ন জাতিকে প্রভাবিত করেছে।

আমরা যদি এ ঘটনার প্রভাবের কালগত দিকটি বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে, দীর্ঘ তের শতাব্দী কাল যাবত এ ঘটনা এমন জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়ে আছে যে, মনে হয় যেন এটা এই গতকালেরই ঘটনা। এ ঘটনার স্মরণে মানুষ এমনই আবেগে উদ্বেলিত হয়ে যায় ও বেদনার্ত হয়ে পড়ে যে, তারা ক্রন্দন করে এবং নিজেদের শিরে ও বক্ষে করাঘাত হানে।

হয়তো এমন কোনো কোনো শোকানুষ্ঠান আছে যা কালগত দৈর্ঘ্যের বিচারে আশূরার ঘটনার চেয়েও প্রাচীন। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে আমি প্রাচীনত্বের বিচারে হযরত ঈসা (আঃ)-এর স্মরণে খৃস্টানদের শোকানুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করতে চাই। তারা বসন্তকালে এ শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে।

খৃস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো; এ ঘটনার বার্ষিকীতে তারা শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। অবশ্য আমরা বিশ্বাস করি যে, হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়ানো হয় নি এবং হত্যাও করা হয় নি। কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে:

و ما قتلوه و ما صلبوه و لکن شبه لهم
“তারা তাকে হত্যাও করে নি এবং তারা তাকে শূলেও চড়ায় নি, বরং তাদের কাছে বিষয়টি সংশয়াপন্ন প্রতিভাত হয়েছিলো।” কিন্তু তারা বিশ্বাস করে যে, হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়ানো হয়েছিলো এরপর তাঁকে কবর দেয়া হয়েছিলো, তবে এর তিন দিন পর তিনি তাঁর কবর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং আসমানে চলে যান।

তারা হযরত ঈসা (আঃ)কে শূলে চড়ানোর বার্ষিকীতে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি এক বার রোমে ছিলাম এবং ঘটনাক্রমে হযরত ঈসা (আঃ)-এর স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানের রাতে ভ্যাটিকানে ছিলাম। ঐ সময় রোমের বৃহত্তম গীর্জা সেন্ট পিটার্স গীর্জায় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো এবং স্বয়ং পোপ তাতে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে উপস্থিত থাকায় আমিও ঐ অনুষ্ঠানে অংশ নিই।

এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো যে, পোপের ন্যায় এত বড় বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব সেখানে উপস্থিত থাকবেন এটা জানতে পেরে তাঁকে এক নযর দেখার জন্য সারা দুনিয়া থেকে খৃস্টানরা সেখানে এসে জমায়েত হয়েছিলেন। তা-ও আবার বিশ্বের বৃহত্তম গীর্জায়। বোঝাই যাচ্ছিলো যে, কত বড় অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। সকলেই কালো পোশাক পরিধান করেছিলেন এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন, আর আমরা যেসব শোকগীতি গেয়ে থাকি তাঁরা অনেকটা সে ধরনেরই শোকসঙ্গীত গাইছিলেন। এমন একটি বিরাট অনুষ্ঠান হলো, কিন্তু আমাদের কোনো বড় আলেমের ইন্তেকালে যে দোয়ার মজলিস হয় তাতে যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস দেখা যায় এ পুরো অনুষ্ঠানেও সেরূপ আবেগ ও উচ্ছ্বাস দেখা গেলো না।

অবশ্য যে ঘটনার স্মরণে উক্ত অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় তা দু’হাজার বছরের প্রাচীন এবং এ অনুষ্ঠান একইভাবে চলে আসছে। কবে কখন কীভাবে এ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় আমরা তা জানি না, তবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মের পর দুই হাজার বছর পার হয়ে গেছে। তাই আমরা বলতে পারি যে, এ অনুষ্ঠানটি প্রায় দীর্ঘ দুই হাজার বছর যাবত লোকদের মাঝে টিকে আছে। কিন্তু অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাধারণ ও সাদামাটাভাবে পালিত হয়ে থাকে এবং এভাবেই এর মাধ্যমে হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

এবার আপনারা, কোম বা তেহরানে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর স্মরণে যে সব শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তার যে কোনো একটির সাথে উক্ত অনুষ্ঠানের তুলনা করুন। তাহলে আপনারা দেখতে পাবেন যে, মুসলমানগণ, বিশেষ করে শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর প্রতি যে আন্তরিক ভালোবাসা প্রকাশ করছেন তার সাথে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সমপ্রদায়ের অনুসারী খৃস্টানগণ কর্তৃক -যাদের এত সব বিশাল প্রতিষ্ঠানিক আয়োজন রয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের কতখানি পার্থক্য রয়েছে।

মোদ্দা কথা, কালগত দৈর্ঘ্যের বিচারে এবং ধরনের বিচারে – ধরনের বিষয়টি আপনারা নিজেরা যথেষ্ট ভালোভাবেই অনুভব করতে সক্ষম – এ দুই দিকের বিচারে আশূরার ঘটনাকে অন্য কোনো ঘটনার সাথেই তুলনা করা যেতে পারে না। আর আশূরার ঘটনার স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানকে অন্য কোনো শোকানুষ্ঠানের সাথেই তুলনা করা সম্ভব নয়। আযাদারী বা শোকানুষ্ঠানের রেওয়াজ প্রচলন করার জন্য এবং ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর রওজা শরীফ জিয়ারতের জন্য অবারিত করতে শিয়া মুসলমানদের আত্মত্যাগ উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ।

এ কাজটি অতীতে খুব সহজ ছিল না। অবশ্য এখনো যে খুব সহজ তা নয়। তবে এমন একটা সময় ছিলো যখন কেউ সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কবর যিয়ারতের জন্য যেতে চাইলে তাকে তার প্রাণটা হাতের তালুতে নিয়ে যিয়ারত করতে যেতে হতো।

আব্বাসী শাসনামলে, বিশেষ করে মুতাওয়াক্কিলের শাসনামলে কেউ যাতে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কবরের কাছে না যায় সে উদ্দেশ্যে সরকারী পুলিশ খুবই কঠোর আচরণ করতো। শেষ পর্যন্ত তারা সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কবর ধ্বংস করে ফেললো, তার ওপরে পানি প্রবাহিত করে দিলো, এরপর তার ওপরে লাঙ্গল চালালো -যাতে তাঁর কবরের নিদর্শন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ দূর থেকে হলেও সাইয়েদুশ শুহাদা ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কবরস্থলকে দেখার জন্য, সেখানে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তারা হাত-পা হারানোর, এমনকি জীবন হারানোর ঝুঁকি নিয়েও কাছে গিয়ে সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)কে সালাম করার চেষ্টা করেন। নিঃসন্দেহে মানব জাতির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনার দ্বিতীয় কোনো নজির পাওয়া যাবে না। যদি এমন অন্য কোনো ঘটনা পাওয়া যায় অন্য সকল দিক থেকেই যার আশূরার ঘটনার সাথে মিল আছে, অন-তঃ এই একটি দিক থেকে অন্য কোনো ঘটনারই এর সাথে মিল নেই; অন্য কোনো ঘটনাকেই এর সাথে তুলনা করা যাবে না।

এ হলো এ ঘটনার বৈশিষ্ট্য সমূহের এক দিক। অবশ্য এতে সন্দেহ নেই যে, এটা কোনো ঘটনাক্রমের ব্যাপার নয়। বরং স্বয়ং আল্লাহ্‌ তা‘আলাই মু’মিনদের অন্তকরণে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জন্য ভালোবাসা তৈরী করে দিয়েছেন। অতএব, এখানে একটি গায়েবী ব্যাপারেরও অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ্‌ তা‘আলার কাজও সাধারণতঃ বাহ্যিক কারণ বা উপায়-উপকরণ ব্যতীত ঘটে না। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাহ্যিক কারণ বা উপকরণ ব্যতীতই একটি কাজ সংঘটিত হয়। তবে এটা কোনো ঘটনাক্রমের ব্যাপার নয় যে, শিয়াগণ, এমনকি আহ্‌লে সুন্নাতের লোকেরা এ ঘটনার প্রতি এভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এমনকি মূর্তিপূজারীরা পর্যন্ত এ ঘটনার বরকত ও প্রভাব লক্ষ্য করেছে।

তবে সম্ভবতঃ এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) এবং তাঁর পরে পর্যায়ক্রমে আহ্‌লে বাইতের নিষ্পাপ ইমামগণ (আঃ) সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জিয়ারত, তাঁকে স্মরণ ও সম্মান প্রদর্শণ এবং তাঁর জন্য শোক প্রকাশ, ক্রন্দন ও মাতমের অনুষ্ঠান করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন। তাঁরা বিস্ময়করভাবে এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বর্ণিত হয়েছে যে, সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর প্রতি একবার সালাম প্রেরণ করলে তাতে একবার ওমরা হজ্জ পালন করার সওয়াব রয়েছে, আর যদি হুযুরী ক্বলব ও অন্তরের অন্তর্স্থল থেকে একবার সালাম প্রেরণ করা হয় তাহলে তাতে একবার হজ্ব করার সওয়াব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর জিয়ারাতের ফজিলত সম্বন্ধে এতই বর্ণনা বা হাদীস রয়েছে যে, সেগুলো একত্রিত করা হলে একাধিক খণ্ড বিশিষ্ট বিশাল গ্রন্থে পরিণত হবে এবং ইতিমধ্যেই এ ধরনের গ্রন্থ রচিতও হয়েছে।

আহ্‌লে বাইতের মা‘সুম ইমামগণ (আঃ) স্বয়ং এ ব্যাপারে যে আচরণ করেছেন তা-ও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। যারা সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর স্মরণে মর্সিয়া গাইতেন, কবিতা পাঠ করতেন, ইমামগণ তাদেরকে প্রচুর পরিমাণে অর্থ দিতেন এবং তাদের খুবই প্রশংসা করতেন, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন। শোকানুষ্ঠানের দিনগুলোতে ইমামগণ (আঃ) নিজেরা তাঁদের বাড়ীতে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। এরূপ অনুষ্ঠানে তাঁরা কোনো কবিকে দাওয়াত করতেন এবং কবি এসে মর্সিয়া গাইতেন। তাঁরা যেমন তাঁদের মৌখিক উপদেশ বাণীতে তেমনি তাঁদের লেখায় ও কাজে-কর্মে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জিয়ারত ও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য, তাঁর স্মরণে শোকানুষ্ঠানের জন্য প্রচুর সওয়াবের কথা উল্লেখ করেছেন। সর্বোপরি আল্লাহ্‌ তা‘আলা মু’মিনদের পবিত্র হৃদয়সমূহে তাঁর জন্য যে ভালোবাসা তৈরী করে দিয়েছেন তার ফলে কারবালার ঘটনা মানব জাতির ইতিহাসে একক ও অনন্যসাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

বেশ, এবার আমরা দেখবো এ ঘটনা মানব জীবনে কী প্রভাব বিস্তার করেছে?

আমাদের ‘আক্বিদাহ্‌ বা বিশ্বাস এই যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর মর্যাদা আহ্‌লে বাইতের মা’সুম ইমামগণ (আঃ)-এর মর্যাদার চেয়ে উর্ধ্বে। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তাহলে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওফাত দিবসে কেন আমরা এ ধরনের শোক পালন করি না? তাঁর জিয়ারত ও তাঁর স্মরণে শোকানুষ্ঠান করার জন্য তো এভাবে নসিহত করা হয় নি, যদিও হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর মর্যাদা মা’সুম ইমামগণ (আঃ)-এর মর্যাদার ওপরে।

এছাড়া আমরা তো বারোজন ইমামের উপর বিশ্বাসী এবং তাঁদের নিজেদের উক্তি অনুযায়ী আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ)-এর মর্যাদা সকলের ওপরে। সন্দেহ নেই যে, আমরা আমীরুল মু’মিনীন (আঃ)-এর শাহাদাত স্মরণেও অনেক শোক প্রকাশ করি ও শোকানুষ্ঠান করি। কিন্তু সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জন্য যে শোক প্রকাশ করা হয় তার সাথে অন্য সব শোকানুষ্ঠানের কোনোভাবেই তুলনা করা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর বিপদের এমন কি বৈশিষ্ট্য ছিলো যে, তাঁর স্মরণে শোক প্রকাশের ওপর এত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং এত নসিহত করা হয়েছে?

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, হযরত আদম (আঃ)-এর যুগ হতে শুরু করেই হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কথা স্মরণ করা হয়েছে এবং তাঁর মুসিবতের জন্য ক্রন্দন করা হয়েছে। এ মর্মে বহু রেওয়ায়েত বা হাদীস রয়েছে যে, সকল নবী-রাসূল (আঃ), আল্লাহ্‌র সকল ওলী এবং আসমানের ফেরেশতারাও সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর জন্য ক্রন্দন করেছেন। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্য ছিলো এমনই।

হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) এরশাদ করেনঃ

حسين منی و انا من حسين.

“হোসাইন আমা হতে এবং আমি হোসাইন হতে।” হ্যা, তিনি যে বলেছেনঃ
حسين منی
“হোসাইন আমা হতে” -এ কথার অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কিন্তু
انا من حسين
“ আমি হোসাইন হতে” কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোসাইনীয়্যাহ্‌ বা হোসাইনী দালান সমূহের দেয়ালে সাধারণতঃ যে হাদিসটি লিপিবদ্ধ করা হয় তা হচ্ছেঃ

ان الحسين مصباح الهدی و سفينة النجاة.

“নিঃসন্দেহে হোসাইন হচ্ছে হেদায়াতের প্রদ্বীপ ও মুক্তির তরণী।”

অবশ্য আমাদের ইমামগণের (আঃ) সকলেই হেদায়াতের প্রদীপ ও মুক্তির তরণী। সামগ্রিকভাবে তাঁদের সকলের জিয়ারতের জন্য আমরা যে দো‘আ পড়ি তাতে বলি যে, “আপনারা সকলেই মুক্তির তরণী; যে কেউ আপনাদেরকে আঁকড়ে ধরে সে মুক্তি লাভ করে। যে কেউ আপনাদের থেকে দূরে থাকে, পিছিয়ে থাকে, সে ধ্বংস হয়ে যায়।” আহ্‌লে বাইতের সকলের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হোসাইনের (আঃ) এমন কী বৈশিষ্ট্য যে, তাঁকে আলাদা দৃষ্টিতে দেখা হয়?

নিঃসন্দেহে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর জীবনে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাঁর জীবনকে, বিশেষ করে তাঁর শাহাদাতকে এমন এক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন যে, তা থেকেই এর বরকত উদ্ভূত হতে পারতো। তা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বাস করি যে, পবিত্র ইমামগণ (আঃ) সকলেই হচ্ছেন অভিন্ন নূর। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর স্থলে অন্য যে কোনো ইমাম থাকলে তাঁর জন্যও আমাদেরকে অভিন্ন কর্মসূচীই বাস্তবায়ন করতে হতো।

ইমামগণের (আঃ) আচরণে তাঁদের কারো কারো মধ্যে কোনো বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, হযরত ইমাম হাসান (আঃ) প্রথমে যুদ্ধ করেন ও পরে সন্ধি করেন। হযরত ইমাম হাসান (আঃ) তাঁর এ ভূমিকার কারণে শান্তির প্রতীক হিসেবে খ্যাত। তাঁকে যদি সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর সাথে তুলনা করি তাহলে তার মানে এই নয় যে, তাঁরা দুই ধরনের কর্মনীতি অনুসরণ করতেন, তাঁরা ইসলামকে দুইভাবে দেখেছেনঃ একজন শান্তির সন্ধানী ছিলেন আর একজন সহিংসতার পক্ষপাতী ছিলেন। না, এমন নয়। আমরা বিশ্বাস করি, হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) যদি হযরত ইমাম হাসান (আঃ)-এর জায়গায় থাকতেন তাহলে ইমাম হাসান (আঃ) যে ভূমিকা পালন করেছেন তিনিও সে ভূমিকাই পালন করতেন। অন্যদিকে ইমাম হাসান (আঃ) যদি ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জায়গায় থাকতেন তাহলে তিনিও ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর ভূমিকাই পালন করতেন। অন্যান্য ইমামের (আঃ) ক্ষেত্রেও একই কথা।

মা‘সুম ইমামগণ (আঃ)-এর ভূমিকা ও কর্মনীতিতে যে পার্থক্য দেখা যায় তা তাঁদের সমকালীন বিশেষ সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ছিলো। সমকালীন পরিস্থিতিই তাঁদের কাছ থেকে অনুরূপ ভূমিকা দাবী করে।

অতএব, আবা আবদিল্লাহ্‌ আল্‌-হোসাইন (আঃ)-এর সামনে যে বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা-ই তাঁর জন্য মানব জাতির ইতিহাসে তাঁর এ বিশেষ ভূমিকা পালনের ও মানব জাতিকে পথপ্রদর্শনের জন্য ক্ষেত্র প্রস’ত করে এবং তিনি এমন এক ভূমিকা পালন করেন যা পালন করা আর কারো পক্ষেই সম্ভব ছিলো না। এ পরিস্থিতিই তাঁর জন্য এ ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয়। অথবা ইসলামী পরিভাষায় বলুন যে, আল্লাহ্‌ তা‘আলার পক্ষ থেকেই নির্ধারিত ছিলো এবং আল্লাহ্‌ তা‘আলারই ইচ্ছা ছিলো যে, তিনিই এ ভূমিকা পালন করবেন। কারণ, একমাত্র আল্লাহ্‌ তা‘আলাই পারেন সামাজিক পরিস্থিতির সকল দিককে নিয়ন্ত্রণ করতে।

বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ তা‘আলার ইচ্ছায় এ দু’টি বিষয় একই মুদ্রার দুই পিঠ মাত্র। কারণ, আমরা বলতে পারি যে, আল্লাহ্‌ তা‘আলাই হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে এ বৈশিষ্ট্য প্রদান করেন অথবা বলবো যে, আবা আবদিল্লাহ্‌ আল্‌-হোসাইন (আঃ)-এর জীবনকালের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই দাবী করছিলো যে, তিনি এ ভূমিকা পালন করবেন। কারণ, এ পরিস্থিতিও আল্লাহ্‌ তা‘আলার ইচ্ছার আওতায় ও তাঁর নির্ধারণের ফলে তৈরী হয়েছিলো।

এবার আমরা পর্যালোচনা করে দেখবো যে, কীভাবে সাইয়েদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হলেন যে কারণে তিনি এ বরকতের অধিকারী হলেন এবং মানুষ তাঁর জন্য শোক প্রকাশের ছায়াতলে তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ, বিশেষ করে আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারছে। কারণ, মু’মিনের জন্য দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের জীবনের পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্র। আসল জায়গা তো সেই জায়গাই; এ জায়গার জীবন তো ভ্রূণের মাতৃগর্ভে অবস্থানকালের সমতুল্য – যে সময়টা পার হয়ে আমরা মৃত্যুর মাধ্যমে প্রকৃত জীবন শুরু করবো।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা এরশাদ করেনঃ

و ان الدار الاخرة لهی الحيوان.

“আর নিঃসন্দেহে আখেরাতের জগত হচ্ছে প্রাণশীল।” বস্তুতঃ প্রকৃত জীবন হচ্ছে এ জগতের পরবর্তী জগত।

সে যা-ই হোক, আমাদের পার্থিব কল্যাণ ও পরকালীন কল্যাণ উভয়ই সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)কে আঁকড়ে ধরার ও তাঁর প্রতি মনোনিবেশের ছায়াতলে নিহিত; তাঁর জন্য শোক প্রকাশ, তাঁর জন্য ক্রন্দন, তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণ ও প্রকাশের মধ্যে নিহিত।

সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর শোকানুষ্ঠান সমূহকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় যে সব অলৌকিক ঘটনা বা কারামত প্রকাশিত হয়েছে সে সব ঘটনা আপনারা এতই শুনেছেন যে, এ ব্যাপারে আমি যা কিছু বলবো তা কেরমানে জিরা নিয়ে যাবার সমতুল্য হবে। তাই আমি এ বিষয়ে আলোচনা করবো না। কেবল আপনাদের জানা দু’একটি ঘটনার প্রতি স্রেফ ইঙ্গিত করছি।

আপনারা সকলেই শুনছেন যে, হযরত আয়াতুল্লাহ্‌ ওযমা বোরুজার্দী (রহ্ঃ) সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর স্মরণে শোক প্রকাশকারীদের মাথার কাদা স্বীয় চেহারায় মেখেছিলেন এবং এর ফলে তাঁর চোখের অসুখ ভালো হয়ে গিয়েছিলো।

তিনি তখন বোরূজার্দে ছিলেন এবং তাঁর চোখ ব্যথা করছিলো; চিকিৎসায় তা ভালো হচ্ছিলো না। ইতিমধ্যে আশূরা এসে গেলো। বক্ষে করাঘাত হেনে শোক প্রকাশকারী একটি দল তাঁর বাড়ীতে এলো। তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো যে, তারা শোক প্রকাশের সময় নিজেদের মাথায় ও চেহারায় কাদা মাখাতো। এদের থেকে কিছুটা কাদা নীচে পড়ে গিয়েছিলো। ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জন্য শোক প্রকাশকারীদের মাথা ও চেহারা থেকে যে কাদা পড়ে গিয়েছিলো আয়াতুল্লাহ্‌ বোরুজার্দী তা থেকে কিছুটা কাদা তুলে নিয়ে তাঁর চেহারা ও চোখে মাখেন। ফলে তাঁর চোখের ব্যথা ভালো হয়ে যায়। এরপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আর তাঁর চোখে কোনো রকমের সমস্যা দেখা দেয় নি। শুধু তা-ই নয়, তিনি চশমা ছাড়াই সবচেয়ে ছোট অক্ষরের লেখাও পড়তে পারতেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিলো ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর জন্য শোক প্রকাশকারীদের শরীর থেকে পড়ে যাওয়া কাদার বরকতে।

এ ছিলো একটি কারামত ও আল্লাহ্‌ তা‘আলার পক্ষ থেকে একটি অলৌকিক(কারামত)ঘটনা। আর আল্লাহ্‌ যা চান তা-ই হয়। আপনারা সকলে এ অনুষ্ঠানে যে অশ্রুপাত করছেন তার নূরানী অবস্থা সর্বাগ্রে আপনারা নিজেরাই অনুভব করতে পারছেন। এছাড়া এর বরকতেই আপনাদের অনেকের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায় এবং অনেক রোগ-ব্যাধি ও বালা-মুসিবত দূর হয়ে যায় – যা হয়তো অপনারা বুঝতেই পারছেন না।

এ হলো এমন একটি বিষয় যা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করলাম। আর বিভিন্ন দো‘আয় এ ব্যাপারে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আমরা সাধারণতঃ প্রয়োজন পূরণের জন্য সরাসরি আল্লাহ্‌ তা‘আলার নিকট আবেদন করি এবং অনেক সময় তা পূরণ হয়ে যায়। কিন’ আমরা জানি না যে, আমাদের ওপর আরো কী বিপদ-মুসিবত আপতিত হতে যাচ্ছিলো এবং আল্লাহ্‌ তা‘আলা তা দূর করে দিয়েছেন। আমরা সেগুলোর খবর রাখি না। আমরা বাহ্যতঃ যে সব বিপদ-মুসিবত দূর হয়ে যেতে দেখি তার চেয়ে বহু গুণ বেশী রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-মুসিবত আমাদের ওপর আপতিত হতে গিয়েও সাইয়েদুশ শুহাদা (আঃ)-এর নামের বরকতে তা তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু আমরা তার খবর রাখি না। আমরা যদি তার খবর রাখতাম তাহলে মানুষকে এত কষ্টের শিকার হতে হতো না। অতএব, বিষয়টি ‘যদি’র সাথে সংশ্লিষ্ট।

এ বিরাট ঘটনার ও দীর্ঘ তের শতাব্দী কালেরও বেশী কাল ধরে সমাজের ওপর এর প্রভাবের গুরুত্বের এ হলো একটি দিক – যে বিষয়টির প্রতি আমরা মনোযোগ দিয়েছি এবং পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। আপনারা পূর্বেও বিষয়টি জানতেন, আমরা তা-ই পুনরায় নিবেদন করলাম। স্মরণ করিয়ে দেয়া ছাড়া নতুন কিছুই করি নি।

এটা কোন্‌ ভূমিকা ছিলো যে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) পালন করেছেন কিন্তু অন্যদের সে ভূমিকা ছিলো না? নিঃসন্দেহে আপনারা আমাদের বুযুর্গানের কাছ থেকে, আমাদের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনী ব্যক্তিত্ববর্গের কাছ থেকে আর মর্সিয়া গায়কদের ও ওয়ায়েজদের (যারা ওয়াজ করেন) কাছ থেকে শুনেছেন। তা সত্ত্বেও অধম পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে চাই যে, আপনারা যদি যে কোনো সময় নবী-রাসূলগণ (আঃ) ও আল্লাহ্‌র ওলীগণের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, তাঁদের নিজেদের যুগে তাঁদের ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে, তাঁদের আচরণ সম্বন্ধে ও তাঁদের বক্তব্য সম্বন্ধে এক ধরনের অস্পষ্টতা বা দুর্বোধ্যতা বিদ্যমান ছিলো, আর তাঁদের ওফাতের পর সে অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।

অন্যান্য নবী-রাসূলগণের (আঃ) ন্যায় স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) সম্বন্ধেও অত্যন্ত আপত্তিকর মিথ্যা দোষারোপ করা হয়। কাফেররা বলতোঃ ‘তার বিচারবুদ্ধি নষ্ট হয়ে গেছে, সে একজন পাগল, অতএব, কেউ তার কথা শুনো না।’ তারা বলতোঃ ‘সে একজন জাদুকর; লোকদেরকে জাদু করছে।’ তারা যুবকদেরকে উপদেশ দিতোঃ ‘তাকে যখন কথা বলতে দেখবে তখন তোমরা কানে আঙ্গুল দিয়ে রাখবে অথবা তুলা পুরে দেবে যাতে তোমরা তার কথা শুনতে না পাও। কারণ, সে তোমাদেরকে জাদু করবে; সে একজন জাদুকর।’

হ্যাঁ, এগুলো তো আমরা সকলেই জানি। তারা হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওপর এতসব মিথ্যা দোষারোপ করেছিলো। এ প্রেক্ষিতে স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, তাঁর ওফাতের পরে তাঁর ওপর অনেক মিথ্যা আরোপ করা হবে, আর তা দুশমনরা করবে না – সেই কাফের দুশমনরা করবে না, বরং তাঁর তথাকথিত অনুসারীরা – যারা বলতো যে, ‘আমরা তাঁর ওপর ঈমান এনেছি’, তারাই করবে। আর শেষ পর্যন্ত তা-ই ঘটে। রাসূলে আকরাম (সাঃ) এরশাদ করেন:

ستکثر علی بعدی القال.

“অচিরেই আমার নামে কথা বলার লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।” অর্থাৎ তারা আমার নামে মিথ্যা হাদীস বলবে এবং এর ভিত্তিতে মানদণ্ড তৈরী করবে। ‘অতএব, এসব হাদীসের মধ্যে কোন্‌টি সত্য আর কোন্‌টি মিথ্যা তা নির্ণয়ের জন্য এগুলোকে কোরআনে করীমের মানদণ্ডে যাচাই করবে। যদি দেখো যে, তা কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তাহলে জেনে রাখবে যে, আমি তা বলি নি।’

এছাড়া মা’সুম ইমামগণ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহিম্‌ আজ্‌মা‘ঈন্‌) খোদায়ী বিশেষজ্ঞ হিসেবে বার বার অন্যদের বর্ণিত হাদীস সমূহ সংশোধন করেন। হযরত ইমাম রেযা (আঃ)-এর সময় ‘উয়ুনু আখ্‌বারির্‌ রিযা নামে একটি হাদীস সংকলন তৈরী করা হয়; এতে সেই সব হাদীস স্থানলাভ করে যা হযরত ইমাম রেযা (আঃ) সংশোধন করেছিলেন বা উদ্ধৃত করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গীসাথীগণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

এর আগে হযরত ইমাম সাদেক (আঃ)-এর সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিলো। তখন আবুল খাত্তাব ও আরো কয়েক ব্যক্তি মিথ্যা হাদীস রচনা করে। ইমাম (আঃ) বাছাই করে সেগুলো বাদ দেন এবং সহীহ্‌ হাদীসগুলোকে চিহ্নিত করে দেন।

মোদ্দা কথা, এখন আপনারা যদি ইসলামী জাহানে চান যে, সেই সব হাদীস চিহ্নিত করবেন যা অকাট্যভাবেই হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁর উক্তি হিসেবে যা সকল মুসলমানই স্বীকার করে, তাহলে এ ধরনের হাদীসের সংখ্যা খুব বেশী হবে না। অবশ্য কেউ কেউ হয়তো এগিয়ে আসবে ও একেকটি সংখ্যা বলবে, কিন্তু যে সব হাদীস অকাট্যভাবেই হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) থেকে বর্ণিত তার সংখ্যা বেশী নয়। অন্যদিকে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর নামে রচিত জাল (মিথ্যা) হাদীসের সংখ্যা অনেক; এ ব্যাপারে শিয়া ও সুন্নী উভয় সূত্রে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর জীবনে একটি বিষয় প্রকাশ্য দিবালোকের মতোই সুস্পষ্ট। অনেকে হয়তো এ ব্যাপারে অন্ধ বিশ্বাসের আশ্রয় নেবেন। কিন্তু কী আর করা! এর চেয়ে সুস্পষ্ট বিষয় আর কী হতে পারে যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) যেদিন প্রকাশ্যে তাঁর দাওয়াতের কাজ শুরু করলেন সেদিনই তিনি হযরত আলী (আঃ)কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করলেন।

রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) সেদিন দুম্বা জবাই করে কোরআন মজীদের নির্দেশ অনুযায়ী স্বীয় চাচা, চাচাতো ভাই, আত্মীয়-স্বজন ও কওমের লোকদেরকে – কোরআনের ভাষায়

عشيرتک الاقربين

নিকটাত্মীয়দেরকে দাওয়াত করলেন। তিনি বললেনঃ “সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি আমার ওপর ঈমান আনয়ন করবে সে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে।” কিন্তু একমাত্র দশ বছর বা মতান্তরে তের বছর বয়সী একজন বালক ছাড়া কেউই তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করলো না। আর এই বালক ছিলেন আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ)।

সেখানে রাসূলুল্লাহ্‌র (সাঃ) চাচারা তথা আবু লাহাব, আবু জেহেল্‌ ও অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলো। আলীর (আঃ) ঈমানের ঘোষণায় তারা আবু তালেবের দিকে তাকালো ও উপহাসের হাসি হেসে বললোঃ “খুব শীঘ্রই তুমি তোমার শিশু পুত্রের অধীন ও অনুসরণকারী হবে।” অর্থাৎ সে হবে তোমার নেতা আর তুমি হবে তার অনুসারী, কারণ সে নবীর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। তারা বিদ্রূপ করলো।

হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর জীবনে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ও বিভিন্নভাবে বহু বার এ ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটে। তিনি হযরত আলী (আঃ)কে বলেনঃ

انت منی بمنزلة هارون من موسی الا انه لا نبی بعدی.

“তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হারূনের সাথে মূসার সম্পর্কের ন্যায়, তবে আমার পরে আর কোনো নবী নেই।”

আর শিয়া ও সুন্নী নির্বিশেষে মুসলানদের গ্রন্থাবলীতে অন্য যে একটি হাদীস ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে তা হচ্ছে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) কর্তৃক তাঁর ওফাতের সত্তর দিন পূর্বে গাদীর নামক স্থানে তাঁর পক্ষ থেকে প্রদত্ত ঘোষণা।

সেখানে সংঘটিত ঘটনাটি সকলেরই জানা আছে; রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) সেখানকার সেই দগ্ধকারী রৌদ্রের মধ্যে মুসলমানদেরকে জমায়েত করলেন এবং আলীর হাত উঁচু করে তুলে ধরে বললেনঃ এই হচ্ছে আমার স্থলাভিষিক্ত। তিনি বললেনঃ

من کنت مولاه فهذا علی مولاه.

“আমি যার মাওলা (অভিভাবক) অতঃপর এই আলী তার মাওলা (অভিভাবক)।”

হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) দীর্ঘ বিশ বছর যাবত বিভিন্নভাবে আলীকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেন। আর তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি এভাবে এক ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা করে তাঁকে পুনরায় পরিচিত করিয়ে দেন। অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন; তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না যে, প্রচণ্ড গরমের মধ্য দুপুর বেলা হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) কেন তাঁদেরকে সমবেত করলেন।

এরপর সত্তর দিন গত হলো, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। তখন এই মুসলমানগণ – বদর ও হুনাইনের সাহাবীগণ হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত বা খলীফা নির্ধারণের জন্য একত্রিত হলেন। কেউ কেউ বললেনঃ খলীফা মুহাজিরদের মধ্য থেকে হতে হবে। কেউ কেউ বললেনঃ আনসারদের মধ্য থেকে হতে হবে। আবার কেউ বা বললেনঃ দু’জন আমীর নির্বাচন করতে হবে;

منا امير و منکم امير.

“আমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর আর তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর।” কিন্তু যে বিষয়টি উপস্থাপিত হলো না ও যা বিবেচিত হলো না তা হচ্ছে সেই বিষয়টি যা সত্তর দিন আগে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেছিলেন।

সেদিন লোকদেরকে গাদীরে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে সকলে বিস্মিত হয়েছিলেন যে, এই গরমের মধ্যে আমাদেরকে সমবেত করার উদ্দেশ্য কী? তারপর তিনি আলীকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পরিচিত করিয়ে দিলেন। আর এর আগে দীর্ঘ বিশ বছর যাবত বার বার তিনি আলীকে পরিচিত করিয়ে দেন। কিন্তু তা উপেক্ষিত থেকে যায়।

হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর কথাকে যেমন বিকৃত করা হয়েছে, তেমনি তাঁর আচরণের বর্ণনাকেও বিকৃত করা হয়েছে। তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করা হয়েছে, এমনকি তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকেও। আপনারা সূরা আত্‌-তাহ্‌রীম্‌ পড়ে দেখুন। দেখবেন যে, কোরআন মজীদ হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর কোনো কোনো স্ত্রী সম্পর্কে কোন্‌ ভাষায় কথা বলেছে।

পূর্ববর্তী আলোচনায় আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ) সম্পর্কে সামান্য আভাস দিয়েছিলাম। আর আপনারা বহু বার শুনেছেন যে, দু’টি বৈশিষ্ট্যের কারণে আলী (আঃ) সমগ্র বিশ্বে সুপরিচিত। যেখানেই আলীর (আঃ) কথা ওঠে সেখানেই তাঁর ন্যায়বিচারের কথা ও তাঁর ইবাদতের কথা স্মরণে আসে। তিনি ছিলেন সর্বাধিক ইবাদতকারীদের অন্যতম, তেমনি তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠতম ন্যায়বিচারকদের অন্যতম। আলী (আঃ) বেলচা নিয়ে কৃষিক্ষেতে কাজ করার সময়ও নফল নামায পড়তেন। এমনকি কখনো কখনো তিনি দিনে-রাতে শত শত রাকাত নফল নামায আদায় করতেন। এ জন্য তিনি সকলের কাছেই সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে এমনই বিকৃত প্রচারণা চালানো হয়েছিলো যে, তাঁর শাহাদাতের পর যখন শামে (সিরিয়ায়) খবর পৌঁছলো যে, কুফায় মসজিদে নামাযরত অবস্থায় আঘাত করায় আলী (আঃ) শহীদ হয়েছেন, তখন শামের লোকেরা বিস্মিত হয়েছিলো এবং বলেছিলোঃ “আলীও নামায পড়তো নাকি?”

মোদ্দা কথা, মা’সুম ইমামগণ (আঃ) ও বুযুর্গানে দ্বীনের প্রত্যেকেই একেকভাবে হুজ্জাত ছিলেন। কিন্তু সমস্ত মানুষের জন্য সর্বোচ্চ হুজ্জাত হচ্ছে কোরআনে করীম। হযরত আদম (আঃ)কে যেদিন সৃষ্টি করা হয় সেদিন থেকে শুরু করে ধরণীর বুকে মানব প্রজাতির জীবনকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোরআন মজীদের চেয়ে সুস্পষ্টতর ও প্রোজ্জ্বলতর হুজ্জাত এবং পথ প্রদর্শনকারী আর হবে না। কিন্তু এই কোরআন মজীদেরও ভ্রান- তাফসীর করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে।

বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে যে সব মতপার্থক্য রয়েছে তদসহই প্রতিটি গোষ্ঠীই কোনো না কোনোভাবে কোরআন মজীদের আয়াতের আশ্রয় গ্রহণ করে, আর কোনো বিষয়ের একটি সূক্ষ্ম দিক নিয়ে বিতর্ক করে; এক পক্ষ বলে এটা আছে এবং অপর পক্ষ বলে নেই। যে পক্ষ বলে আছে সে-ও কোরআনের দলীল পেশ করে, যে পক্ষ বলে নেই সে-ও কোরআনের দলীল পেশ করে। যারা জাব্‌র্‌ বা অদৃষ্টবাদের প্রবক্তা তারা কোরআনের আশ্রয় গ্রহণ করে, আর যারা নিরঙ্কুশ এখতিয়ার তত্ত্বে বিশ্বাসী তারাও কোরআনের আয়াতের আশ্রয় গ্রহণ করে। অর্থাৎ এভাবে কোরআন মজীদকে অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য প্রতিপন্ন করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমনটা কেন হলো?

কেন কোরআন মজীদের বিভিন্ন তাফসীর হচ্ছে তা একটি স্বতন্ত্র আলোচ্য বিষয়; এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে অকাট্যভাবে বলা চলে যে, এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ব্যাপারও আছে। অর্থাৎ এমন লোকও আছে যারা স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে কোরআন মজীদকে নিজেদের খেয়ালখুশী মোতাবেক তাফসীর করে থাকে। সবাই অজ্ঞতাবশতঃ ভুল তাফসীর করে না।

এভাবে যে তাৎপর্যগত বিকৃতি ঘটানো হয় তার ফলে ব্যক্তিত্ববর্গের প্রকৃত অবস্থাকে মিথ্যা দোষারোপ দ্বারা আবৃত করে দেয়া হয়। আল্লাহ্‌ তা‘আলার সমস্ত হুজ্জাতের ক্ষেত্রেই এ কাজ করা হয়। বলা বাহুল্য যে, কোরআন মজীদ হচ্ছে সমুজ্জ্বলতম হুজ্জাত এবং তা সত্ত্বেও তাতে এসব অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা আরোপ করা হয়েছে।

সকল নবী-রাসূলের (আঃ) মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ও মানব জাতির শ্রেষ্ঠতম পথপ্রদর্শক ছিলেন হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)। তাঁর সম্পর্কে অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আমীরুল মু’মনীন হযরত আলী (আঃ) সম্পকের্ও একইভাবে অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা তৈরী করা হয়।

হ্যা, আপনারা জানেন যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ওফাতের পর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত হলে যখন লোকেরা হযরত আলী (আঃ)-এর অনুকূলে বাই‘আত হলো, তখন সর্বপ্রথম যারা বাই‘আত হলেন তাঁরা ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম অনুসারীগণ এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যকার অনেকে।

যুবাইর ছিলেন হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) ও হযরত আলী (আঃ)-এর চাচাতো ভাই। এরা ছিলেন সেই ব্যক্তিবর্গ যারা সবার আগে হযরত আলী (আঃ)-এর অনুকূলে বাই‘আত হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পর তাঁরা এসে বললেনঃ “আলী ওসমানের হত্যাকারী।” তাঁরা ওসমানের খুনের বদলা নেয়ার বাহানায় হযরত আলী (আঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। তাঁরা অনেক মানুষকে ভুলের মধ্যে নিক্ষেপ করলেন এবং তাদেরকে বুঝালেন যে, আলী ওসমানকে হত্যা করেছেন, অতএব, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।

যারা তাঁর অনুকূলে বাই‘আত হয়েছিলেন সেই লোকেরাই প্রথমে জঙ্গে জামাল বা উটের যুদ্ধের সূচনা করলেন। এরপর তাঁরা অন্যান্য যুদ্ধ বাধালেন।

আজকে যদি আমরা আহ্‌লে সুন্নাতের ভাইদের সাথে ইসলাম সম্পর্কে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) সম্পর্কে এবং তাঁর কথা ও কাজ সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই, সে ক্ষেত্রে আমি একটা সাধারণ উদাহরণ দিতে চাই যা থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন যে, কী পরিমাণ অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা বিরাজ করছে।

হ্যাঁ, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) তেইশ বছর যাবত নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি জনগণকে নিয়ে চলেছেন। তিনি ছিলেন সর্বাধিক গণমুখী নবী, সর্বাধিক গণমুখী নেতা ছিলেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্যে অবস্থান করতেন। নতুন কোনো লোক যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করতো তখন তার পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হতো না যে, কোন্‌ ব্যক্তি নবী এবং কারা সাধারণ মানুষ। তিনি ছিলেন এমনই গণমুখী, জনগণের নিজেদের মধ্যকার একজন এবং এমনই মাটির মানুষ। আমাদের মতে, তাঁর সমস্ত আচরণ ও সমস্ত কাজকর্মই জনগণের চোখের সামনে ছিলো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন যে নবী, তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর যাবত যখন ওযূ করতেন তখন কি লোকেরা দেখতো না তিনি কীভাবে ওযূ করছেন? এটা কি এমন কিছু ছিলো যা জনগণের নিকট গোপন থাকতে পারে? বিশ বছর, কমপক্ষে বলুন যে, মদীনার দশ বছর কুফা ও মদীনার জনগণ দেখেছে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) কীভাবে ওযূ করেছেন। অনেক সময়ই লোকেরা এসে বরকত হিসেবে রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর ওযূর পানি নিয়ে যেতো। কিন্তু তাঁর ওফাতের কয়েক বছর পর প্রশ্ন উঠলো, ওযূ করার সময় এইভাবে পানি ঢালবো, নাকি ঐভাবে ঢালবো? কেন? তারা কি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)কে ওযূ করতে দেখে নি? এটা তো কোনো গোপন বিষয় ছিলো না। এর চাইতে সহজ ব্যাপার আর কী হতে পারে যে, লোকেরা যখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর কাজের অনুসরণ ও অনুকরণ করতে চাইবে তখন হুবহু তাঁর অনুকরণ করবে?

কিন’ এখানে এমন কতক লোকের ভূমিকা ছিলো যারা অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলো। কারণ, এদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো শয়তান। আর মানুষ শয়তানগণ তাকে সাহায্য করছিলো।

এসব ঘটনাবলীর মধ্যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর ও আল্লাহ্‌র ওলীগণের সমস্ত রকমের উক্তি ও কাজের মধ্যে যে জিনিসটিকে বিকৃত করা বা ঢেকে রাখা সম্ভব নয় এবং যার ভুল ও মিথ্যা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় তা হচ্ছে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) তাঁর নানার দ্বীনের প্রচলনের জন্য শহীদ হওয়ার ঘটনা। কঠিনভাবে অসুস্থ হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) বাদে তাঁর পরিবারের সকল পুরুষ সদস্য ও তাঁর সকল পুরুষ সঙ্গীসাথী শহীদ হন, এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুও শহীদ হন। এ ইতিহাসকে কেউ বিকৃত করতে পারে নি। এটা ছিলো এমনই সুস্পষ্ট যে, বিকৃত করা সম্ভব ছিলো না।

অবশ্য ছোটখাট ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণে মতপার্থক্য আছে। যেমন, কুফা থেকে যারা এসেছিলো তাদের সংখ্যা তিরিশ হাজার ছিলো, নাকি এক লাখ বিশ হাজার বা তার বেশী নাকি কম-এ ব্যাপারে মতপার্থক্য হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিলো। কারণ, তখন সঠিকভাবে গণনা ও পরিসংখ্যান করা সম্ভব ছিলো না। অন্যান্য বিষয়েও এভাবেই মতপার্থক্য ছিলো এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনোই মতপার্থক্য নেই যে, সমস্ত নবী-রাসূল (আঃ) ও আল্লাহ্‌র সকল ওলীর মধ্যে একমাত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)ই দ্বীনের জন্য অভ্যুত্থান করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত ওষ্ঠ নিয়ে শহীদ হয়ে যান। এরপর তাঁর পক্ষের নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করা হয়।

এ ঘটনাকে বিকৃত করা সম্ভব ছিলো না এবং বলা চলে যে, সম্ভব নয়। কেননা, কোনোভাবেই বলা সম্ভব নয় যে, তিনি দুনিয়া-পূজার উদ্দেশ্যে এ কাজ করেছিলেন। কারণ, টিকে থাকার জন্য কি এর চেয়ে অধিকতর উত্তম পন্থা ছিলো না?

কোনো পদাধিকারী ব্যক্তি যখন দেখতে পায় যে, তার জীবন বিপন্ন তখন সে আপোসের জন্য একটি পথ বের করে নেয়। আশূরার রাতে এবং আশূরার দিনেও হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে প্রস্তাব দেয়া হয় যে, আসুন, ইয়াজিদের অনুকূলে বাই‘আত হোন, তাহলে আর অপনার কোনোই ক্ষতি করা হবে না। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাব কবুল করেন নি। তিনি বলেনঃ

هيهات منا الذلة.

“দূর হোক আমাদের থেকে লাঞ্ছনার জীবন।” এই বলে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন।

হুর্‌ (ইমাম হোসাঈনের সাথী) ও অন্যান্যের ক্ষেত্রে যা কিছু ঘটলো আপনারা যদি এই সাথে তা যোগ করেন তাহলে আমাদের বিশ্বাস এবং মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত দলীল থেকে এটা প্রমাণিত যে, বহু নিদর্শন থেকেই হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) জানতেন যে, তিনি শহীন হবেন।

আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে, ইমাম হোসাইন (আঃ) ইমামতের ‘ইল্‌মের অধিকারী ছিলেন না, কোনো রকম খোদায়ী ইল্‌হাম্‌ও লাভ করেন নি, তা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) থেকে বর্ণিত যে সব হাদীস পাওয়া যায় এবং ইমাম হোসাইন (আঃ) নিজে যেভাবে বলেছেন যে, আমি যেন দেখতে পাচ্ছি যে, মরুপ্রান্তরের বুকে হিংস্র নেকড়েরা আমার শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে, আর তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আর সেই সাথে আলী আকবরের কাহিনী তো আপনাদের জানাই আছে; এসব সহ ঘটনার শেষ পর্যন্ত সব কিছু যদি যোগ করি তাহলে এটা একটা অকাট্য নিশ্চিত ব্যাপার যে, এ ঘটনার শেষ পরিণতি হচ্ছে তাঁর শহীদ হওয়া। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি নারী ও শিশুদেরকে সাথে নিয়ে গেলেন।

অর্থ লাভের জন্য, পদমর্যাদা লাভের জন্য, প্রবৃত্তির লালসা চরিত্রার্থ করার জন্য তো কেউ মরুভূমিতে যায় না। কারবালার মরুভূমি মানুষের কোন্‌ লালসা পূরণ করতে পারে? কোনোভাবেই এ ঘটনার এমন অর্থ করা চলে না যে, দুনিয়া পাওয়ার জন্য, নেতৃত্বলোভের কারণে, ক্ষমতালোভের কারণে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর নানার দ্বীনকে পুনর্জীবিত করার জন্য নিহত হওয়া ছাড়া সেখানে তাঁর জন্য অন্য কোনো কিছুই ছিলো না।

কিছু লোক হয়তো বলবে যে, হোসাইন ভুল করেছিলেন। অবশ্য ইসলামের দাবীদার এমন কতক ধর্মান্ধ লোক আছে, হযরত আলী (আঃ)-এর অন্ধ বিরোধী কতক লোক আছে যারা বলে যে, হোসাইনের এ কাজ করার অধিকার ছিলো না। কিন্তু তিনি যে এ কাজ করেছেন তা কেবল দ্বীনের পুনরুজ্জীবনের জন্যেই করেছেন – এটা কেউই অস্বীকার করে না।

এত সব বৈশিষ্ট্য সহ এ ঘটনা অর্থাৎ যে সব বৈশিষ্ট্য মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দানে ও আত্মত্যাগের শিক্ষা দানে এতখানি প্রভাব বিস্তারকারী যে, কিয়ামত পর্যন- হোসাইনের (আঃ) সময়কার পরিস্থিতির অনুরূপ পরিসি’তির উদ্ভব হলে মুসলমানরা একই ধরনের কর্মতৎপরতা পরিচালনা করবে।

কালকের দৈনিক পত্রিকায় যেন আবার এ মর্মে খবর প্রকাশ করা না হয় যে, অমুক ব্যক্তি বলেছে যে, কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। বরং আমি বলছি যে, অনুরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হলে মুসলমানরা অনুরূপ ভূমিকা পালন করবে। হ্যা, আপনারা তো পত্রপত্রিকায় বিকৃতির এ ধরনের দৃষ্টান্ত প্রায়ই দেখে থাকেন। লোকে যখন বলে যে, দধির রং সাদা, তখন সে কথাকেও বিকৃত করা হয়। বলা হয়, অমুক ব্যক্তি সহিংসতার সমর্থক, অমুক ব্যক্তি সরকার বিরোধী, আর অমুক ব্যক্তি ঐ রকম।

মোদ্দা কথা, হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো এখানেই যে, কোনোভাবেই তাঁর আন্দোলনের বিকৃত ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিলো না। তাঁকে ঘিরে কোনো ধরনেরই অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি হয় নি যে, এই বলে অপব্যাখ্যা করা যাবে যে, তিনি দুনিয়াপূজার কারণে, নেতৃত্বের লোভের কারণে এ কাজ করেছিলেন। এ কারণেই সকলের পক্ষেই এটা লক্ষ্য করা সম্ভব হয় যে, এ ঘটনার ভিতরে হেদায়াতের জ্যোতি আলো ছড়াচ্ছে এবং এর ফলে লোকদের বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠছে, তাদের দ্বীনী ভাবাবেগ বিকশিত হচ্ছে, তাদের হৃদয়ে দায়িত্ববোধের অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছে সেই দ্বীনের জন্য যে দ্বীনের জন্য হোসাইন (আঃ) এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজনগণ, এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশু পর্যন্ত শহীদ হয়ে যান। তাহলে আমার ও আপনার কি তার মোকাবিলায় কোনোরূপ দায়িত্ব নেই? এটা কি আদৌ সম্ভব?

এ কারণেই বলা হয়েছেঃ

ان الحسين مصباح الهدی.

“নিঃসন্দেহে হোসাইন হচ্ছে হেদায়াতের প্রদীপ।” তিনি হচ্ছেন এমন এক প্রদীপ যা মানবতার শীর্ষদেশে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আলো দান করে যাচ্ছে এবং কিয়ামত দিবস পর্যন্ত যে কেউ যে কোনো জায়গা থেকে এ বাতির প্রতি দৃষ্টিপাত করবে সে পথ খুঁজে পাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনেরই অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি হবে না।

হ্যাঁ, এ হলো ঘটনার এক দিক যা আমরা দেখতে পেয়েছি। হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর শাহাদাতের পর থেকে মুসলমানরা, অন্ততঃ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর অনুসারীরা, যে তৎপরতা চালান এবং আজ পর্যন্ত যা চলে আসছে, এর সবই এ ঘটনার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। তখন থেকেই হোসাইনের (আঃ) নামে ক্রন্দন ও বিলাপ করা হয়েছে, আত্মত্যাগ করা হয়েছে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়েছে। কারবালা থেকে যখন এক চিমটি মাটি নিয়ে আসা হয় কত পবিত্রতার অনুভূতি নিয়েই না তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়! অনেক সময় দেখা যায়, কেউ এমনভাবে ব্যথা বা যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে যে কিছুতেই, কোনো চিকিৎসায়ই তা ভালো হচ্ছে না, তখন তা থেকে সুস্থতা লাভের আশায় ঐ মাটি থেকে একটা ডালের পরিমাণ মাটি ভক্ষণ করা হয়।

এ হলো ঘটনার এক দিক। এ ঘটনার অপর দিকের প্রতিও দৃষ্টি দিন। হযরত ইমাম হোসাইনের (আঃ) নামকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য কতই না চেষ্টা চালানো হয়েছে! তারা কেমন দুশমনীই না করেছে! প্রশ্ন হচ্ছে, হোসাইনের (আঃ) নাম তাদের যিন্দেগীর কী ক্ষতি করেছিলো যে, তাঁর যিয়ারতে যাতে লোকেরা না যায় সে উদ্দেশ্যে লোকদেরকে হত্যা করছিলো?

হোসাইনের (আঃ) কবরকে মাটির সাথে সমান করে দিয়ে তার ওপর পানি প্রবাহিত করে দেয়া হয় যাতে তাঁর কবরের কোনো নিদর্শন না থাকে। শুধু তা-ই নয়, কৃষিকাজ করার জন্য তার ওপর দিয়ে লাঙ্গল চালানো হয়, তারপর বীজ বুনে দেয়া হয় যাতে বুঝা না যায় যে, এ জায়গা আগে কী ছিলো। প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম করা হয় কেন? এ দুশমনদের কী ক্ষতি হয়েছিলো?

আজকে আমরা আধুনিক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী দুশমনদের সম্মুখীন – যারা নিজেদেরকে দ্বীনী বুদ্ধিজীবী বলে দাবী করে থাকে। আমার মতে, তারা দ্বীন বিহীন সংকীর্ণ চিন্তার লোক যারা না দ্বীনের জ্ঞান রাখে, না তাদের সঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। আর তারা যে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর নামের সাথে দুশমনী করে সে কেমন দুশমনী!

তারা জোর দিয়ে দাবী করে যে, হোসাইনের শাহাদাত ছিলো একটি সাধারণ ঘটনা; এটা ছিলো রাসূলুল্লাহ্‌র (সাঃ) সহিংসতার মোকাবিলায় প্রতিক্রিয়া। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বদর যুদ্ধে সহিংসতার আশ্রয় নেন। বনী উমাইয়্যার সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়েছিলো; তিনি তাদেরকে হত্যা করেন, আর এটা ছিলো সহিংসতা। যুদ্ধে তো আর হালুয়া-রুটি বণ্টন করা হয় না। সেখানে মুসলমানদের মধ্যে অনেকে শহীদ হন। তবে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ মুসলমানদেরকে বিজয়ী করেন এবং ওদের অনেক বেশী লোক নিহত হয়।

তারা বলে, যেহেতু বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্‌ বনী উমাইয়্যার সাথে সহিংসতা সহকারে আচরণ করেছিল সেহেতু তাদের বংশধররা তাঁর বংশধরদের সাথে একই আচরণ করে। এটাই ছিলো স্বাভাবিক; জীবনের প্রতিক্রিয়া। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) যদি তাদের সন্তানদের হত্যা না করতেন তাহলে তারাও তাঁর বংশধরদেরকে হত্যা করতো না। অতএব, এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়। তাই যারা আশূরার ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় তাদের উচিৎ এমনভাবে শিক্ষা গ্রহণ করা যাতে কেউ সহিংসতায় উদ্বুদ্ধ না হয়, যাতে তাদের সন্তানদের সাথে সহিংসতার আশ্রয় নেয়া না হয়। তারা বলে, এরূপ শিক্ষাই নেয়া উচিৎ।

তাদের কথার মানে দাঁড়াচ্ছে, জিহাদ, প্রতিরক্ষা, আম্‌র্‌ বিল্‌ মা‘রূফ ওয়া নাহি ‘আনিল্‌ মুন্‌কার্‌ এবং এ জাতীয় সকল কাজ বন্ধ করে দিতে হবে যাতে কারো সাথে কারো কোনো ব্যাপার না থাকে। অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তা‘আলা যে হুকুম দিয়েছেনঃ

قاتلوهم يعذبهم الله بايدیکم و يخزهم و ينصرکم عليهم و يشف صدورقوم مؤمنين.

“(হে ইমানদারগণ!) তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; আল্লাহ্‌ তোমাদের হাতে তাদেরকে শাস্তি দেবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, আর তিনি তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করবেন, আর মু’মিন জনগোষ্ঠীর অন্তর সমূহকে শান্ত করবেন।” তাকে অর্থহীন প্রতিপন্ন করতে হবে।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা মু’মিনদেরকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলেছেন এবং বলেছেনঃ

يعذبهم الله بايدیکم و يخزهم

“আল্লাহ্‌ তোমাদের হাতে তাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।” আর

ينصرکم عليهم

“তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করবেন।” আর এভাবে

يشف صدورقوم مؤمنين

“মু’মিন জনগোষ্ঠীর অন্তর সমূহকে শান্ত করবেন।”

এ হচ্ছে কোরআন; আমি কোরআনের আয়াত পড়ছি; আমি নিজের থেকে বলছি না যে বলবে, তুমি সহিংসতাবাদী, তুমি সন্ত্রাসী। যদি সহিংসতা থেকে থাকে তো সে কোরআনেরই আয়াত।

এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা বলে, অযথা বলেছে; কিছুতেই সহিংসতার আশ্রয় নেয়া যাবে না। তাহলে আল্লাহ্‌ তা‘আলা কি ভুল করেছেন? হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) যে এরূপ কাজ করেছেন – বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন; তিনি কি ভুল করেছেন? আর এর পরিণামে তারা তাঁর বংশধরকে হত্যা করলো?

কিন্তু ইয়াযীদীদেরকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করা হলো। তারা কোনো অপরাধ করে নি। কারণ, তারা তো শুধু প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কারো বাবাকে যখন হত্যা করা হয় তখন তার পুত্র এগিয়ে আসে হত্যাকারীর পুত্রকে হত্যা করে।

এই হলো মডার্ন ইসলাম; ইসলামের নতুন সংস্করণ। বহুল প্রচারিত দৈনিক জাতীয় পত্রিকায় এ কথাগুলো ছাপা হয়, আর নিরীহ তরুণদেরকে তা পড়তে দেয়া হয় যাতে তারা এরপর থেকে হোসাইনকে (আঃ) এভাবে চিনতে শেখে।

কেন তারা এভাবে হোসাইনের সাথে দুশমনী করছে? এর জবাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তা হচ্ছে, যেহেতু হোসাইন (আঃ) হচ্ছেন হেদায়াতের প্রদীপ, সেহেতু তিনি পানি ঘোলা করতে দিচ্ছেন না, পানি ঘোলা করে মানুষকে গোমরাহ্‌ করতে দিচ্ছেন না। তিনি পথকে উজ্জ্বল করে দিচ্ছেন, জনগণের দায়িত্ব-কর্তব্যকে সুস্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, তোমাদের কী করতে হবে এবং কীভাবে তোমরা তোমাদের দ্বীনের সাহায্য করবে। তিনি লোকদেরকে ঢিলেমি বশতঃ সাহসহারা হতে, কাপুরুষ হতে ও উদাসীন হতে দিচ্ছেন না। তিনি বলেনঃ

هيهات منا الذلة.

“দূর হোক আমাদের থেকে লাঞ্ছনার জীবন।” তিনি বলে দিচ্ছেন এ আদর্শের জন্য কী করতে হবে।

তারা তাঁকে লোভ দেখিয়েছিলো, বলেছিলো: “আপনাকে অনেক টাকাপয়সা দেবো।” কিন্তু হোসাইন (আঃ) কি টাকা-পয়সা গ্রহণ করেছিলেন? তিনি কি তাদের দেয়া নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন? তারা বলেছিলোঃ “এ প্রস্তাব কবুল না করলে তোমাকে হত্যা করবো।” হ্যাঁ, তিনি শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন এবং শহীদ হলেন। তিনি তাঁর শিশু সন্তানদেরকেও শহীদ হতে দিলেন।

কালো রঙের চেয়ে বড় রং তো আর নেই! অতএব, কী করতে হবে?

কেউ যদি হোসাইনের (আঃ) অনুসারী হয় তাহলে না ঐ সব প্রলোভন তার ওপরে প্রভাব ফেলতে পারে, না এসব হুমকি।

مرگ اگر مرد است گو پيش من آی

کو در آغوشش بگيرم تنگ تنگ

من ز او عمری ستانم جاودان

او ز من دلقی ستاند رنگ رنگ.

“মৃত্যু যদি বীরপুরুষ কোনো, বলো: এসো আমার কাছে

কোথায় তুমি? আলিঙ্গন করবো তোমায় অতি নিবিড়ভাবে

আমি চাই তার কাছে শুধু অবিনশ্বর যিন্দেগী

সে চায় আমার কাছে আলখেল্লা রক্তরাঙা।”

তারা মৃত্যুর সাথে প্রেমের খেলা খেলছে। আশূরার রাত যখন আসে তখন বৃদ্ধরাও ঝলমলে হয়ে ওঠেন, খেযাব লাগান। এ আদর্শের পরাজয় নেই। এ আদর্শকে পরাজিত করতে হলে একে বিকৃত করা ছাড়া পথ নেই। সুতরাং মুসলমানরা কেন হোসাইনকে (আঃ) এত ভালোবাসে তা সুস্পষ্ট। কারণ, যারা পবিত্র মাতৃদুগ্ধ পান করেছে তারা তো হালালযাদা। আর যারা হোসাইনের নামের সাথে দুশমনী করছে তাদের সে দুশমনীর কারণও সুস্পষ্ট। যেহেতু হোসাইন (আঃ) হচ্ছেন হেদায়াতের প্রদীপ, সেহেতু তিনি লোকদেরকে গোমরাহ্‌ হতে দেন না।

হে পরোয়ারদেগার! হোসাইন বিন্‌ আলীর (আঃ) উসিলায় তোমার কাছে আবেদন করছি,

আমাদের অন্তরগুলোকে হোসাইনের (আঃ) পরিচিতি ও তাঁর প্রতি মহব্বতে পরিপূর্ণ করে দাও।

আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পর্যন্ত এ মহব্বত আমাদের কাছ থেকে দূর করে দিয়ো না।

আমাদেরকে কিয়ামতের দিনে হোসাইনের (আঃ) মহব্বত সহ পুনর্জীবিত করো।

আমাদেরকে হোসাইনের (আঃ) সাথে হাশর করো।

আমাদের ওপর আমাদের মহান রাহ্‌বারের ছায়া দীর্ঘায়িত করো।

আমাদের জন্য শুভ পরিণতি নির্ধারণ করে দাও।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১০০ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)