লগইন রেজিস্ট্রেশন

আল কুরআন ও সহীহ হাদিসের সরল অনুবাদ পড়ার আরও কিছু কল্যাণকর দিক। (নাবী- রাসুলগণের প্রকৃত উত্তরাধিকারী আ’লিম কারা? – ৭)

লিখেছেন: ' taalibul_ilm2011' @ সোমবার, মে ২১, ২০১২ (১২:০৭ অপরাহ্ণ)

প্রথমতঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কি কি আদেশ-নিষেধ দিয়েছেন? একজন মুসলিমের কাছে তাঁদের চাহিদা কি? অনুবাদ পড়ে একজন সাধারণ মুসলিম এসব বিষয় সাধারণভাবে জানতে পারবেন। তবে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জনের জন্য তাকে আ’লিমদের কাছে যেতে হবে। যেমন :

(ক) আল্লাহ বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ . فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ (سورة المائدة 525: 51-)
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদ ও নাসারাদেরকে আউলিয়া (বন্ধু, অভিভাবক, রক্ষক ইত্যাদি) হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের আউলিয়া। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে আউলিয়ারূপে গ্রহণ করলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তাদেরকে দেখবে সত্বর তারা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহূদী, নাসারা মুশরিকদের) মাঝে গিয়ে বলবে, আমাদের ভয় হয় আমরা বিপদের চক্করে পড়ে না যাই। হয়তো আল্লাহ বিজয় দান করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু দিবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিল তার কারণে লজ্জিত হবে। (সূরাহ্ আল-মায়িদাহ ৫ : ৫১-৫২)

এই আয়াত পড়ে একজন সাধারণ মুসলিম জানতে পারবেন যে, ইহুদী খ্রিস্টানদের সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে, অভিভাবক, রক্ষক হিসেবে নেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ কিছু কঠিন কথা বলেছেন। যেহেতু আল্লাহ বলেছেন, ‘সে তাদেরই একজন’ তাই কোন কোন সম্পর্ক ঈমান ভঙ্গের কারণ হতে পারে? – এ ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে জানতে তিনি আ’লিমদের স্মরণাপন্ন হবেন।

(খ) আল্লাহ বলেন :
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ (سورة الزمر 6539: )
কিন্তু তোমার কাছে আর তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, তুমি যদি (আল্লাহ্র) শারীক স্থির কর, তাহলে তোমার কর্ম অবশ্য অবশ্যই নিস্ফল হয়ে যাবে, আর তুমি অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরাহ্ আয্-যুমার ৩৯ : ৬৫)

এ আয়াত পড়ে একজন সাধারণ মুসলিম জানতে পারবেন, নাবীরা শিরক করলেও আল্লাহ মাফ করবেন না, তাঁদের সকল আমাল নষ্ট হয়ে যাবে বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। এখন তিনি এ ব্যাপারে আ’লিমদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারবেন – কি কি কাজে শিরক হয়? কথার মাধ্যমে শিরক হয় কি? আমাদের সমাজে কোন কোন শিরকের প্রচলন রয়েছে? ইত্যাদি।

(গ) আল্লাহ বলেন :
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (سورة البقرة 2172: )
এবং তোমাদের যে কেউ নিজের দ্বীন হতে ফিরে যায়, অতঃপর সেই ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মারা যায়, তবে এমন লোকের কর্ম দুনিয়াতে এবং আখিরাতে ব্যর্থ হয়ে যাবে। আর এরা অগ্নিবাসী, চিরকালই তাতে থাকবে। (সূরাহ্ আল-বাক্বারাহ্ ২:২১৭)

আল্লাহ আরো বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (سورة المائدة 545:)
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য হতে কেউ তার দ্বীন হতে ফিরে গেলে সত্বর আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসেন আর তারাও তাঁকে ভালবাসবে, তারা মু’মিনদের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাকে তারা ভয় করবে না, এটা আল্লাহ্র অনুগ্রহ- যাকে ইচ্ছে তিনি দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যের অধিকারী, সর্বজ্ঞ। (সূরাহ্ আল-মায়িদাহ ৫:৫৪)

রসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
عن ابن مسعود رضي الله عنه، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : { لا يحل دم امرىء مسلم إلا بإحدى ثلاث : الثيب الزاني ، والنفس بالنفس ، والتارك لدينه المفارق لجماعته } ]أخرجه عبد الرزاق (10/167 ، رقم 18704) ، وأحمد (1/382 ، رقم 3621) ، وابن أبى شيبة (7/321 ، رقم 36492) ، والبخارى (6/2521 ، رقم 6484) ، ومسلم (3/1302 ، رقم 1676) ، وأبو داود (4/126 ، رقم 4352) ، والترمذى (4/19 رقم 1402) وقال : حسن صحيح . والنسائى (7/90 ، رقم 4016) ، وابن ماجه (2/847 ، رقم 2534)[
‘তিনটি কারণ ব্যতীত একজন মুসলিমকে হত্যা করা হবে না : বিবাহিত জ্বিনাকারী, প্রাণের বদলে প্রাণ এবং যে ব্যক্তি তাঁর দ্বীন (ইসলাম) বদলে ফেলে আল-জামায়াত ছেড়ে চলে যায়।’ (সহীহ বুখারী-৬৪৮৪, সহীহ মুসলিম-১৬৭৬, মুসনাদে আহমাদ ু ৩৬২১, সুনান আবু দাউদ ু ৪৩৫২, সুনান তিরমিযী ু ১৪০২, সুনান নাসায়ী ু ৪০১৬, সুনান ইবনে মাজাহ - ২৫৩৪)

এ রকম আয়াত ও হাদিস সমূহ পড়ে একজন সাধারণ মুসলিম জানতে পারবেন যে ঈমান আনার পর আবার কাফির (মুর্তাদ) হওয়া সম্ভব। বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই এখন আ’লিমদের কাছে গিয়ে জরুরী ভিত্তিতে জেনে নিবেন কি কি কাজ করলে একজন মুসলিম ইসলাম থেকে বহিস্কৃত হয়ে কাফির-মরুতাদে পরিণত হয়? ইসলাম বিনষ্টকারী এসব বিষয় কি শুধু বাহ্যিক কর্মকান্ড না কি মৌখিক কোন কথা কিংবা অন্তরে কোন বিশ্বাসও তাকে ইসলাম হতে বহিস্কৃত করতে পারে? আমাদের সমাজে এসব কাজের বাস্তব উদাহরণ কি কি? উল্লেখ্য ইমাম শাফিই (রহ.) তাঁর ওআল উম্মহ (الأم) গ্রন্থে আড়াইশ এর বেশি কারণ উল্লেখ করেছেন ??? যা বিশ্বাস করলে, বললে অথবা করলে একজন সাধারণ মুসলিম ইসলাম থেকে বহির্ভূত হয়ে কাফিরে পরিণত হয়।
এছাড়া প্রায় সকল ফিকহ-শাস্ত্রের বড় গ্রন্থ কিংবা হাদিস গ্রন্থেই মুরতাদ এর ব্যাপারে আলাদা অধ্যায় রয়েছে। যেমনঃ সহীহ বুখারীতে (باب حكم المرتد والمرتدة واستتابتهم) অর্থাৎ ‘মুরতাদ পুরুষ ও মহিলার ব্যাপারে হুকুম এবং তাদের তাওবা’; সুনান ইবনে মাজাহ্‌তে (باب المرتد عن دينه) ‘দ্বীন থেকে প্রত্যাবর্তনকারীদের (মুরতাদের) হুকুম’। হানাফী মাজহাবের বিখ্যাত ফিকাহগ্রন্থ আল-মাবসুতে (باب نكاح المرتد) অর্থাৎ ‘মুরতাদের বিয়ের অধ্যায়’, শাফেয়ী মাজহাবের বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ ইমাম নববী রচিত ‘রওদাতুত্‌ তালেবীনে’ (فرع توكيل المرتد في التصرفات المالية) অর্থাৎ ‘আর্থিক লেনদেনের দায়িত্ব মুরতাদের কাছে হস্তান্তরের আলোচনা’ ইত্যাদি।

(ঘ) আল্লাহ বলেন :
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (سورة النساء 654:)
কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না, যে পর্যন্ত তারা তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে। (সূরাহ্ আন্-নিসা ৪:৬৫)

এ আয়াত পড়ার পর একজন সাধারণ মুসলিম আ’লিমদের কাছে জেনে নিতে পারবেন, শুধু কি ইবাদাত-বন্দেগীতে মতবিরোধের ক্ষেত্রে রসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিচারক না নিলে এ আয়াত প্রযোজ্য নাকি অন্যান্য ক্ষেত্রেও? অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর শেখানো নিয়ম-কানুন, বিচার-ফায়সালা বাদ দিয়ে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের কোন অর্থনীতিবিদের দেয়া থিওরি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে কি মুমিন থাকা যাবে? সামাজিক কিংবা পারিবারিক ক্ষেত্রে তাঁর বিচার-ফায়সালা কি এই আয়াতের আওতাধীন? রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অথবা বিচার-ফায়সালার ক্ষেত্রে কেউ যদি অন্য কারো সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তুষ্ট হয়, অন্য কারো মতবাদের প্রচার ও প্রসার করে বেড়ায়, সেই মতবাদের জন্য সংগ্রাম করে, সে কি আদৌ মুমিন থাকবে?
এই আয়াতগুলির অনুবাদ না পড়লে এইসব প্রশ্ন কখনোই তার মনে আসবে না।

(ঙ) আল্লাহ বলেন :
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (سورة البقرة 2162:)
তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেয়া হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপ্রিয় কিন্তু তোমরা কোন কিছু অপছন্দ কর সম্ভবতঃ তোমাদের জন্য তা কল্যাণকর এবং সম্ভবতঃ কোন কিছু তোমাদের কাছে প্রিয় অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহ্ই জানেন, তোমরা জান না। (সূরাহ্ আল-বাক্বারাহ্ ২:২১৬)

তিনি আরো বলেন :
وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا لَوْلَا نُزِّلَتْ سُورَةٌ فَإِذَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ مُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِيِّ عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ (سورة محمد 2047:)
মু’মিনরা বলে- একটি সূরাহ্ নাযিল হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন সুস্পষ্ট অর্থবোধক সূরাহ্ অবতীর্ণ হয় আর তাতে যুদ্ধের কথা উল্লেখ থাকে, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে তুমি তাদেরকে দেখবে মৃত্যুর ভয়ে জ্ঞানহারা লোকের মত তোমার দিকে তাকাচ্ছে। কাজেই ধ্বংস তাদের জন্য। (সূরাহ্ মুহাম্মাদ ৪৭ : ২০)

এসব আয়াত পড়ে একজন মুসলিম সাদামাটাভাবে জানতে পারবেন, ইসলামে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। এখন তিনি একজন আ’লিমের কাছে গেলে জানতে পারবেন, এর ইসলামী পরিভাষাগত সংজ্ঞা কি? এটা কি ফরজ না নফল? ফরজ হলে ফরজে কিফায়া নাকি ফরজে আইন? এর শর্তসমূহ কি কি? ইত্যাদি।

কিন্তু আল-কুরআন কিংবা সহীহ হাদিসের সরল অনুবাদ না পড়লে তিনি জানতেই পারবেন না যে ইহুদী খ্রিস্টানদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে, শিরক কিংবা জিহাদের ব্যাপারে ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ আদেশ নিষেধ রয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ আল-কুরআন ও সহীহ হাদীস এর সরল বাংলা অনুবাদ পড়লে, একজন সাধারণ মুসলিমকে যা ইচ্ছা বুঝিয়ে সহজেই কেউ বিপদগামী করতে পারবে না। সরল অনুবাদ না পড়া একজন মুসলিমকে যত সহজে বিপদগামী করা যায়, আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসের অনুবাদ পড়া একজন মুসলিমকে তত সহজে কোন ভুল শিক্ষা দিয়ে, কেউ পার পেয়ে যাবে না। যেমন : কোন পীর তার হুজুরের দুহাই দিয়ে মাজারে টাকা দিতে বললে, অনুবাদ পড়া একজন মুসলিম সহজেই তাকে কবর পাকা করার নিষেধাজ্ঞার হাদিস উল্লেখ করে প্রশ্ন করতে পারেন যে, এটা কেন পাকা করা হলো, কিংবা উপরে গম্বুজ কিংবা স্থাপনা (building) তৈরি করা হলো? ফলে ঐ পীর তাকে কোন সদুত্তর দিতে পারবে না।
কিংবা কেউ তাকে তাবিজ দিতে চাইলে, ঐ মুসলিম সহজেই ‘তাবিজ ঝুলানো শিরক’ এর হাদিস উল্লেখ করে তাকে প্রশ্ন করতে পারবেন। কারণ নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
من علق تميمة فقد أشرك] أخرجه أحمد (4/156 ، رقم 17458) قال الهيثمى (5/103) : رجاله ثقات . والحاكم (4/243 ، رقم 7513)[
যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। (মুসনাদে আহমাদ – ১৭৪৫৮, মুস্‌তাদরাক আল হাকিম – ৭৫১৩, মুহাদ্দিস ইমাম হাইসামী (রঃ) বলেন, এর বর্ণনাকারীগণ ‘সিকাহ’, আলবানীর মতে সহীহ, দেখুনঃ সিলসিলা আস সাহীহা - ৪৯২)

এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি তাকে ঐ হাদিসের অন্য কোন ব্যাখ্যা জানালে তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে হাকিমের (রা.) মৃত্যুকালীন ঘটনা উল্লেখ করে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন। কারণ
وعن عيسى بن حمزة قال دخلت على عبد الله بن حكيم وبه حمرة فقلت ألا تعلق تميمة فقال نعوذ بالله من ذلك قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من علق شيئا وكل إليه ]أخرجه الطبرانى (22/385 ، رقم 960) رواه أبو داود والترمذي [
আব্দুল্লাহ বিন হাকিমকে মৃত্যুর সময় তাবিজ ঝুলাতে বললে তিনি বলেছিলেন, আমরা আল্লাহর কাছে সেটা থেকে আশ্রয় চাই। রসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন কিছু ঝুলাবে, তাকে ঐ জিনিসের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হবে’। (সুনান আবু দাউদ, সুনান তিরমিযী – ২০৭২, তাবরানী – ৯৬০, আলবানীর মতে হাসান লি গাইরিহী, দেখুনঃ সহীহ তারগীব ওয়া তারহীব – ৩৪৫৬)

এখন প্রশ্ন হলো, একজন সাহাবীকে তাঁর মৃত্যুর সময় কে জাহিলী যুগের শিরক-কুফর মিশ্রিত তাবিজ ঝুলাতে বলবে? সুতরাং এই হাদিস থেকে ‘তাবিজ’ শব্দ দ্বারা সাহাবীরা কি বুঝতেন, তা বুঝা যায়। কেউ কেউ উপরে উল্লেখিত হাদিসের তাবিজকে শুধু মাত্র শিরক-কুফর মিশ্রিত জাহেলী যুগের ‘তাবিজ’কে বুঝাতে চান। যা সঠিক নয় বলে উপরুক্ত ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়।
তাছাড়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, তিনি যদি নাবী রসুলদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী একজন আ’লিমকে জিজ্ঞেস করে একই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চান, তবে দুনিয়ালোভী ঐ আ’লিমের সকল ছল-চাতুরী ধরা পড়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

তৃতীয়তঃ কোন আ’লিমের কাছে আমরা দ্বীন শিখবো? কে নাবী-রসুলদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী? আর কে জাহান্নামের দিকে আহবানকারী? তা সনাক্ত করাও অনুবাদ পড়া একজন মুসলিমের জন্য অনেক সহজ হবে। বিশেষতঃ যে মোটেই অনুবাদ পড়েনি, তার তুলনায়। (কিভাবে এই দুই শ্রেণীর আ’লিম সনাক্ত করা যাবে, তা একটু পরেই আলোচনা হবে, ইনশাআল্লাহ) কিন্তু, সরল অনুবাদ না পড়া একজন মুসলিমের জন্য শুধু মানুষের মুখের কথার উপর নির্ভর করে আলিমকে চিনতে হবে। তার জন্য এক্ষেত্রে আল-কুরআন ও সুন্নাহর কোন অবদান থাকবেনা। অথচ আল্লাহ আল-কুরআন ও তার ব্যাখ্যা স্বরূপ সুন্নাহকে প্রেরণ করেছেন, মানুষের জন্য পথ নির্দেশিকা হিসেবে।

চতুর্থতঃ কোন কোন ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মুসলিমের প্রশ্নে উল্লেখিত আয়াত কিংবা হাদিস একজন আ’লিমকে ঐ ব্যাপারে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় যেতে বাধ্য করে, ফলশ্রুতিতে তিনিও সঠিক বিধানটি জানতে পারেন।

পঞ্চমতঃ কোন আলিমের কথা সরাসরি আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসের বিরোধী প্রতীয়মান হলে, অনুবাদ পড়া একজন মুসলিম উনাকে অথবা অন্য কোন যোগ্যতাসম্পন্ন আ’লিমকে জিজ্ঞেস করে সঠিক ব্যাপারটি জানার সুযোগ পাবেন। কিন্তু অনুবাদ না পড়া একজন মুসলিমের মনে এই প্রশ্নই দেখা দিবে না।

ষষ্ঠতঃ এছাড়াও আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসের অনুবাদ পড়া একজন সাধারণ মুসলিম, বিস্তারিতভাবে ইলম অর্জন করে, আ’লিমদের সান্নিধ্যে থেকে আলিম হওয়ার সুযোগ পাবেন। যুগে যুগে আলিম তৈরী হয়েছেন – হচ্ছেন – হবেন সাধারণ মুসলিমদের মধ্য থেকেই। ফেরেশতারা এসে তো আলিম হবেন না। তাই আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসের অনুবাদ পড়া একজন সাধারণ মুসলিম, ইলম অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে গেলে, আ’লিমদের সান্নিধ্যে থেকে আল্লাহর ইচ্ছাই এক সময় আলিম হতে পারবেন। আল্লাহ নিজে মানুষকে ইলম বৃদ্ধির দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেনঃ
وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا (سورة طه 11420:)
আর বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! জ্ঞানে আমায় সমৃদ্ধি দান করুন।’ (সূরাহ্ ত্ব-হা ২০:১১৪)

সপ্তমতঃ তাছাড়া সমাজে সাধারণ মুসলিমরা ব্যাপকভাবে আল-কুরআন ও হাদিসের অনুবাদ পড়লে এর ফলশ্রুতিতে আলিমদের মান আরো বৃদ্ধি পাবে। কারণ তখন তাঁদেরকে সাধারণ মুসলিমদের বিভিন্ন প্রশ্ন-উত্তর দিতে হবে আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে (যা আমরা বর্তমানে কিছুটা দেখতে পাচ্ছি)। তখন ঐ আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবী, তাবেয়ীনগণ কি বলেছেন, কি করেছেন, হাদিসটি সহীহ কিনা, এর সমন্বয় কিভাবে হচ্ছে, ঐ হাদিসের ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী আলিমগণ কি ব্যাখ্যা করেছেন-এসব বিষয় তাঁদেরকে নিয়মিত বিস্তারিতভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। ফলশ্রুতিতে, পুরো মুসলিম সমাজ আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসের আরো কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাবে।

অষ্টমতঃ অবশ্য কয়েকটি আয়াত কিংবা কয়েকটি হাদিস পড়া কোন কোন অর্বাচীন মুসলিম কর্তৃক কোন কোন সময় প্রকৃত আলিমদের সাথে অযাচিত বিতর্কের সম্ভাবনা ফেলে দেওয়া যায় না। কিন্তু সার্বিক কল্যাণের কথা চিন্তা করলে, এটা কোন বড় সমস্যা না। এই ছোট্ট ক্ষতির তুলনায় এর লাভ অনেক বেশি। তাছাড়া ঐ আলিম যদি ভালো মানের হয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই তিনি আল-কুরআন, সহীহ হাদিস ও প্রথম তিন প্রজন্মের ব্যাখ্যার মাধ্যমে সহজেই বিতর্কে আসা সাধারণ মুসলিমকে সঠিক ব্যাপারটি বুঝিয়ে দিতে পারবেন। সমস্যা হবে শুধু তাদের জন্য যারা নিজেরা ইলমে দুর্বল। আর কেউ যদি নফসের অনুসরণ করে, তবে উভয় অবস্থায়ই তার জন্য সমান হবে। অনুবাদ পড়া কিংবা না পড়ায় তার কোন পার্থক্য হবে না। সে সব সময়ই মনের খেয়াল খুশি অনুযায়ী চলবে এবং বিতর্ক করে বেড়াবে।

নবমতঃ সর্বোপরি, স্বয়ং ‘আল্লাহর কথা’ ‘আল-কুরআন’ ও নাবীর সুন্নাহর অর্থ ও ব্যাখ্যা বুঝার চেষ্টা করা, সেগুলো বারবার অধ্যয়ন করা থেকে সাধারণ মুসলিমদেরকে বিরত রাখবে, এমন দুঃসাহস কার আছে? আললাহ বলেন :
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ (سورة فصلت 2641:)
কাফিররা বলে, এ কুরআন শুনো না, আর তা পড়ার কালে শোরগোল কর যাতে তোমরা বিজয়ী হতে পার। (সূরাহ্ ফুসসিলাত ৪১:২৬)
আল্লাহতো আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছেন সমস্ত মানবজাতির জন্য, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতো প্রেরিত হয়েছিলেন কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষ ও জ্বীন জাতির জন্য। তাই আল-কুরআন ও হাদিসের অধ্যয়ন থেকে বিপথগামী ছাড়া অন্য কেউ মানুষকে বিরত থাকতে বলতে পারে না।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
২১৩ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (ভোট, গড়: ৫.০০)