লগইন রেজিস্ট্রেশন

কুরআনের আলোকে জান্নাতী দশ যুবক – পর্ব ০১

লিখেছেন: ' Tarek000' @ শনিবার, মার্চ ১০, ২০১২ (৩:৫৫ অপরাহ্ণ)

মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমূদুল হাসান দা. বা.

ইসলাম ও যুব সমাজ

যুবকদের গুরুত্ব

স্থান-কাল নির্বিশেষে মানবতার উৎকর্ষ সাধনে যুবকদের অবস্থান ও গুরুত্ব অপরিসীম। যে কোন জাতির উত্থান-পতন, জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-সভ্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা, উন্নতি অগ্রগতি ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে যুব সমাজই হচ্ছে নিয়ামক শক্তি। তাদের উপরই নির্ভর করে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। একথা সর্বজন স্বীকৃত।

বুখারী শরীফের হাদীসে বলা হয়েছে- “কিয়ামতের কঠিন ময়দানে সাত প্রকার লোক নিরাপদে থাকবে এবং অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে আরশের নীচে রহমতের শীতল ছায়া লাভে সৌভাগ্যবান হবে। তাদের মধ্যে অন্যতম হবে ঐ সমস্ত যুবকগণ, যার যৌবনের তাড়না সংযত রেখে বস্তু ও জড়বাদী বন্ধন ছিন্ন করে ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ, যারা যৌবনকালে অত্যন্ত একগ্রতা ও মনোযোগের সাথে নিজেদেরকে আল্লাহ পাকের ইবাদত ও রিয়াজতে নিমগ্ন রেখেছে।

মুসলিম যুবকরা কেবল আখেরাতের উচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য তাই নয়; বরং ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা ও কৃষ্টি-সভ্যতার প্রচার-প্রসার, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও মুসলিম যুবকদের ইতিহাস অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সমৃদ্ধ।

যুদ্ধে যুবশক্তির ভূমিকা

ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে মুসলিম যুবকেরা যে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে তা অদ্যাবধি মুসলিম ইতিহাসে অলংকৃত হয়ে আছে। ইসলামের প্রথম যুগে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি দৃঢ় ঈমান স্থাপন ও বিশ্বনবীকে সাহায্য সহযোগীতার ক্ষেত্রে যেমন বয়োজ্যেষ্ঠদের অবদান রয়েছে, তেমনি রয়েছে যুবকদের ঐতিহাসিক অবদান। হযরত আলী (রাঃ), হযরত বেলাল (রাঃ) ও যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)-এর মত মুসলিম যুবকরে কথা বিশ্বনবী প্রায়ই উল্লেখ করতেন, স্মরণ করতেন এবং প্রশংসা করতেন। আল্লাহ-রাসূল ও ইসলামের চরম শত্র“ আবু জাহেলের পতনও বদরের যুদ্ধে হযরত মুয়াউয়াজ ও হযরত মুআজের মত মুসলিম যুবকের হাতেই রয়েছে।

পবিত্র কুরআন ও হাদীস সংরক্ষণ

ইসলামের মূল উৎস দুটি। এক. আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন, অপরটি হচ্ছে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস। এই দুটি বিষয়ের হেফাযত, সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও মুসলিম যুবকদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত, হযরত আলী ও হযরত মুআবিয়ার মত যুবকদেরই হযরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কুরআন সংকলনের দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের তফসীরের ক্ষেত্রে হযরত ইবনে আব্বাসকে সর্বশ্রেষ্ঠ তথা রঈসুল মুফাসসিরীন বলা হয়ে থাকে। তিনিও ছিলেন অল্প বয়সের যুবক। অপরদিকে হাদীস সংকলনের বিরাট দায়িত্ব পালন করেছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর। তার সংকলিত হাদীসের কিতাব “আচ্ছাদিকাহ” রাসূলে পাকের নির্দেশে রাসূলে পাকের যুগেই সর্বপ্রথম সংকলিত হয়। তিনিও ছিলেন একজন যুবক। মোটকথা পবিত্র কুরআন ও হাদীস সংরক্ষণে মুসলিম যুবকদের অবদানের বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃত।

শত্রুদের ষড়যন্ত্র

মুসলিম যুবকদের এই অবদানের মূলে ছিল তাদের ঈমানী চেতনা, শরীয়তের পুরোপুরি অনুশীলন ও দ্বীনী ইলম শিক্ষার অদম্য স্পৃহা। ইসলামের দ্রুত উন্নতির কারণও ছিল এটাই। পরবর্তী সময়ে বিশেষ দুটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয় যুব সমাজ।

ক) ইসলাম ও ইসলামের চিরশত্রু ইহুদী-খ্রিষ্টানরা মুসলিম যুব সমাজের ইসলামী মূল্যবোধ ও চেতনাকে দমিয়ে রাখার জন্য কূট কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রশাসনিক কূট পলিসির মাধ্যমে শিক্ষাগত ধারায় পরিবর্তন সাধন করে মুসলমান যুবকদের বিভ্রান্তির শিকারে পরিণত করা হয়।

খ) যৌবনকালে একদিকে যেমন উন্নতি ও অগ্রগতির উপযুক্ত সময়, তেমনি অবনতি ও ধ্বংসেরও প্রথম সিড়ি। এ সময় ঈমান-আকীদায় দৃঢ়তা না আসলে, আখলাক ও চরিত্রগত পরিশুদ্ধি অর্জিত না হলে জীবনের উৎকর্ষ সাধন খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মুসলিম যুবকের ঈমানী চেতনার মূলে কুঠারাঘাত হেনে, তাদেরকে চারিত্রিক অধঃপতনের অতল গহ্বরে তলিয়ে দিতে পাকাপাকি ব্যবস্থা করে ইহুদী-খ্রিষ্টান শত্রুদল। অপরদিকে অভিভাবক মণ্ডলীর মূর্খতা, তাদের বাস্তুবাদী মোহ, অদুরদর্শীতা ও অবহেলার কারণে যুব সমাজ ক্রমান্বয়ে যৌবনের উত্তাল তরঙ্গে ভেসে যেতে শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় মুসলিম যুব সমাজে চরিত্রহীনতা, নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহীতার কালো অধ্যায়। যে কারণে আজ মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা, কৃষ্টি-সভ্যতা, ঐতিহ্য ও জাতীয় ঐক্য সবকিছুই ধ্বংস্তুপে পরিণত হতে চলেছে। এটা কেবল শত্রুদের দ্বারাই হচ্ছে না, মুসলমানদের নিজেদের অযোগ্যতা ও অসচেতনতার কারণেও ঘটেছে।

মুসলমানদের কর্তব্য

তাই মুসলমানদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল প্রদর্শিত আদর্শের পুণঃর্জীবন দান করার লক্ষ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। কেবল বস্তুগত সাফল্য ও কামিয়াবীর তাগিদে নয়, বরং ইহকাল ও পরকালের উন্নতি ও সফলতার তাগিদে, আপন অস্তিত্ব এবং ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদেই এটি করতে হবে। মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য তাদের অধঃপতনের কারণসমূহ নির্ণয় করা এবং সেসব নিরসনের পথ খুঁজে বের করা। এ উদ্দেশ্যেই যুবশক্তিকে সুসংহত ও সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। এর জন্য শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়।

যুবকদের কর্তব্য ও দায়িত্ব

একই সাথে যুবকদেরকে তাদের জীবনের গুরুত্ব অনুধাবনে সচেতন হতে হবে। শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কালো হাত ভেঙ্গে দিয়ে উদ্ধার করতে হবে তাদের সোনালী ঐতিহ্য ও আদর্শ; যাতে তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হয়, দূরীভুত হয় মুসলিম যুব সমাজে উপর থেকে কলংকের ছাপ। ইহকালের সাথে সাথে পরকালও যেন সাফল্যমণ্ডিত হয় সেজন্য তাদেরকে পুনরায় ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত এবং ইসলামী চরিত্রে চরিত্রবান হতে হবে। বেদ্বীনী আচরণ ও পাপাচার থেকে মুক্ত হয়ে সৎ, সরল, কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্বশীল হতে হবে। এজন্য তাদেরকে একাগ্রচিত্তে নিষ্ঠার সাথে অধ্যয়ন করতে হবে আদর্শবান মুসলিম যুবকদের ইতিহাস। পড়াশোনা করতে হবে তাদের জীবনাদর্শ। যুব সমাজ যাতে নিজেদের জীবনের মূল্যায়নে সক্ষম হয়, ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য নিজেরে আদর্শরূপে গড়ে তুলতে পারে, বস্তু ও জড়বাদী জাল ছিন্ন করে হযরত হাসান-হুসাইনের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয় এবং তাদের দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবন সাফল্যমণ্ডিত হয়- এ মহান উদ্দেশ্যেই আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে এটাই আমার প্রার্থনা। প্রকৃত প্রশংসার মালিক তিনিই। তিনিই হৃদয়ের আকুতি কবুল করার মালিক।

এক. মহান যুবক আব্দুল্লাহ ইবনে আমর

যাদু শিক্ষা

মুফাসসিরীন ও ঐতিহাসিকগণ সূরায়ে বুরূজের চার নং আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে সিরিয়ার একজন প্রতাপশালী পাপাচারী জালিম বাদশার পক্ষ থেকে গর্ত খনন এবং ঈমানদার নর-নারী ও যুবক-যুবতীদেরকে ঐ গর্তে নিক্ষেপ করে অগ্নিদগ্ধ করণের করুণ ঘটনার অবতারনা করেছেন। প্রতাপশালী ঐ বাদশার ছিল স্বীয় প্রয়োজনে নিজের কাছে যাদুকর রাখার প্রবণতা। শাহী যাদুকর তার বৃদ্ধ বয়সে যাদুবিদ্যা শিক্ষার জন্য একজন মেধাবী যুবক নিযুক্ত করার কথা বাদশাহকে জানালে বাদশাহ একজন মেধাবী যুবককে যাদু শিক্ষার কাজের জন্য নিযুক্ত করে।

বুযুর্গের পরিচয় লাভ ও যুবকের ইসলাম গ্রহণ

বুযুর্গের পরিচয় লাভ

যুবকটি যথারীতি যাদুবিদ্যা শিক্ষার জন্য যাদুকরের নিকট আসা-যাওয়া শুরু করে। যুগটি ছিল হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের নবুওয়াতের যুগ। যুবকের যাতায়াতের পথে হযরত ঈসার নবুওয়তে বিশ্বাসী ইঞ্জিলের বিশিষ্ট আলেম এবং সমকালের এক শ্রেষ্ঠ বুযুর্গের খানকাহ ছিল। যেখানে অনেক লোকের সমাগম হত। লোকেরা ঐ বুযুর্গের সান্নিধ্যে দ্বীনী শিক্ষা অর্জন এবং আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ করত। খানকাহে অনেক লোকের সমাগম দেখে যুবক লোকজনকে জিজ্ঞাসা করল যে, এখানে এত লোকের সমাগম কেন? লোকেরা জানালো যে, এখানে আল্লাহর একজন বিরাট ওলী থাকেন। তিনি আল্লাহর সত্য নবী হযরত ঈসা ও আল্লাহর সত্য কিতাব ইঞ্জিলের হুকুম-আহকামের উপর নিজেও আমল করেন এবং অন্য লোকদেরও তা শিক্ষা দেন। তিনি মানুষকে বস্তু জগতের সহায়-সম্পদের মায়া ও ক্ষমতার লোভ বর্জন করে আল্লাহর ইবাদত ও আখেরাতের প্রতি মনোযোগী করে তোলেন।

যুবকের ইসলাম গ্রহণ

যুবক তাদের কথা শুনে মনে মনে বুযুর্গের সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। একদিন সময়-সুযোগে বুযুর্গের দরবারে সে হাজির হয়। কিছুক্ষণ বুযুর্গের সান্নিধ্যে বসে তার কথাবার্তা ও উপদেশ শ্রবণ করার ফলে যুবকের মনে ঐ বুযুর্গ এবং তার ধর্মের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। পরিশেষে বুযুর্গের হাতে তার ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে যুবকটি মুসলমান হয়ে যায়।

যুবকের যাদু বিদ্যার প্রতি অনীহা ও যুবকের কারামত

যুবকের যাদু বিদ্যার প্রতি অনীহা

ইসলাম গ্রহণের পর যুবকের যাদু বিদ্যা শিক্ষার প্রতি অনীহা এবং দ্বীনী শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এ কারণে প্রতিদিন যাদুকরের নিকট যাওয়ার সময় যুবকটি বুযুর্গের সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটায়। ফলে যাদুকরের নিকট যেতে বিলম্ব হয়। এজন্য যাদুকর তাকে নানা ধরণের ভর্ৎসনা করে এবং ধমক দেয়। শেষ পর্যন্ত যাদুকর বাদশাহকে যাদুবিদ্যার প্রতি যুবকের অবহেলা ও বিলম্বের কথা জানায়। বাদশাহ যুবককে সঠিক মনোযোগের সাথে যাদুবিদ্যা শিক্ষা করার জন্য তাগিদ করে। কিন্তু যুবকরে মন বুযুর্গের সাথে লেগে যাওয়ার ফলে গোপনে তার সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে এবং দ্বীনী শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলনে আত্মনিয়োগ করে আধ্যাত্মিকতায় যথেষ্ট উন্নতি লাভে ধন্য হয়।

যুবকের কারামত

একদিন বাড়ী ফিরবার সময় যুবকটি দেখল যে, একটি বিরাট সাপ রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে আর মানুষ অস্থির হয়ে ছুটাছুটি ও দৌড়াদৌড়ি করছে, কিন্তু কোনভাবেই সাপটিকে হটানো সম্ভব হচ্ছে না। এমন সময় যুবকটি একটি পাথর হাতে নিয়ে এই বলে সাপের দিকে নিক্ষেপ করল যে, “হে পালনকর্তা! হে আমার মাতা-পিতা ও সমগ্র পৃথিবীর পালনকর্তা! যদি যাদুবিদ্যা ও যাদুকরের তুলনায় ইঞ্জিল ও ইঞ্জিলের শিক্ষাদাতা বুযুর্গ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রমাণস্বরূপ পাথরের আঘাতে সাপটিকে ধ্বংস করে লোকদের বিপদমুক্ত কর।” এই বলে যুবক পাথর নিক্ষেপ করার সাথে সাথে পাথরের আঘাতে সাপটি মারা যায়। ফলে লোকেরা বিপদমুক্ত হয়।

যুবকের প্রতি নসীহত

এই ঘটনার পর লোকজনের মধ্যে যুবকের কারামত ও আধ্যাত্মিক শক্তির কথা ছড়িয়ে পড়ে। স্বয়ং যুবকও এই আশ্চর্য ঘটনার কথা স্বীয় মুর্শিদ বুযুর্গের নিকট ব্যক্ত করে। যুবকের বক্তব্য শুনে বুযুর্গ বললেনঃ আল্লাহর সত্য কিতাব ইঞ্জিল ও ইঞ্জিলের নবীর প্রতি ঈমান, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং শরীয়তের উপর আমল ও অনুশীলনের বদৌলতে তোমাকে আল্লাহ পাক উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করেছেন। তবে এই মকামে সমাসীন হলে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিপদের সম্মুখীন হতে হয় এবং তখন অবিচল থাকতে হয়, ধৈর্য ধারণ করতে হয়। তাই তুমি সর্বদা আল্লাহ পাকের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে সুদৃঢ় থাকবে। সাবধান! আমার কথা ও আমার নাম কখনও কারো কাছে প্রকাশ করবে না। কেননা নাম আর প্রসিদ্ধি মূল জিনিস নয়, মূল জিনিস হচ্ছে আমল।

যুবকের দরবারে মন্ত্রী ও মন্ত্রীর ঈমান গ্রহণ

যুবকের দরবারে মন্ত্রী

অল্প সময়ের মধ্যে যুবকের আধ্যাত্মিক শক্তির সুখ্যাতি সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ায় লোকেরা তাদের নানাবিধ সমস্যার সমাধান ও রোগ থেকে আরোগ্যের উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে তার নিকট যাতায়াত শুরু করে। যুবকরে দোয়ার বরকতে অনেক কুষ্ঠ রোগী আরোগ্য লাভ করে, অনেক অন্ধ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। বাদশাহর এক মন্ত্রী অন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অবসর জীবন যাপন করছিল। সেও যুবকের দরবারে হাজির হয়ে বিরাট অংকের নজরানা পেশ করে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য দোয়া কামনা করে।

মন্ত্রীর ঈমান গ্রহণ

মন্ত্রীকের উদ্দেশ্য করে যুবক বললঃ চক্ষু ভালো করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। এই ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ পাকের, যিনি আমার-আপনার এবং সমস্ত সৃষ্টির পালনকর্তা। যদি আপনি তার প্রতি ঈমান স্থাপন করেন, একত্ববাদের স্বীকৃতি দেন, আগুন ও মূর্তির উপাসনা বর্জন করেন, তাহলে আমি আপনার জন্য তাঁর মহান দরবারে মুনাজাত করতে পারি। তিনি আপনাকে দৃষ্টিশক্তি দান করতে পারেন। টাকা-পয়সার নজরানার কোন প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হচ্ছে ঈমান গ্রহণের, আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের। যুবকের নসীহত শুনে মন্ত্রী ঐ মজলিসেই ঈমান গ্রহণ করে এবং খাঁটি মনে তওবা করে মুসলমান হয়ে যায়। ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে বরকত প্রকাশ পায়। যুবকের দোয়ায় মন্ত্রী তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় এবং পুনরায় মন্ত্রী পদে যোগদান করা সুযোগ লাভ করে।

বাদশাহর দরবারে মন্ত্রী ও মন্ত্রী গ্রেফতার

বাদশাহর দরবারে মন্ত্রী

বাদশাহ আশ্চর্য হয়ে মন্ত্রীকে প্রশ্ন করল যে, আপনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন কি করে? উত্তরে মন্ত্রী বলল, “আমার প্রভু আমাকে বিনা ঔষধে দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন।” বাদশাহ আরো অধিক আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল- “আপনার প্রভু তো আমি, তবে কি আমি আপনাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেছি?” মন্ত্রী বলল- না, আপনি না। আমার এবং আপনার উভয়ের যিনি প্রভু, তিনি আমাকে ভালো করেছেন এবং দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন। বাদশাহ বলল, “তবে কি আমি ব্যতীত আপনার আরও একজন প্রভু আছে?” মন্ত্রী বলল, আপনি আমার প্রভু নন, বরং আপনি এবং আমি উভয়ই এক মহান প্রভুর গোলামীতে আবদ্ধ। তিনিই বিশ্ব জগতের একমাত্র পালনকর্তা।

মন্ত্রী গ্রেফতার

মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে বাদশাহ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত ও রাগান্বিত হয় এবং মন্ত্রীকে আল্লাহর প্রতি ঈমান বর্জন করে পুনরায় কুফরীতে ফিরে এসে বাদশাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আহ্বান জানায়। অন্যথায় কঠোর শাস্তির হুমকি দেয়। মন্ত্রী দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ্যে বাদশার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। এমতাবস্থায় বাদশাহ মন্ত্রীকে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি প্রদানে নির্দেশ দেয়। বাদশাহ আরও হুকুম করে- মন্ত্রী এই মন্ত্র কোথা হতে গ্রহণ করল যে, আমি ব্যতীত আরও একজন প্রভু আছে? আমিও নাকি সেই প্রভুর গোলমীতে বাধ্য! অতি সত্তর এর রহস্য খুঁজে বের করা হোক। বাদশার নির্দেশের সাথে সাথে মন্ত্রীকের গ্রেফতার করতঃ কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয়। অতঃপর অনুসন্ধান করে এই তথ্য সংগৃহীত হয় যে, মন্ত্রী একজন যুবকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ঐ যুবকের দোয়ার বরকতে মন্ত্রী দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। সব জানার পর মন্ত্রীর উপর জুলুম-অত্যাচার বাড়িয়ে দেয়া হয়। মন্ত্রী এহেন জুলুম-অত্যাচারের মধ্যেও পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, আপনারা আমাকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করতে পারেন, কিন্তু আমি কিছুতেই ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে সম্মত নই।

বাদশার দরবারে যুবক ও যুবকের প্রতি বাদশাহর নসীহত

বাদশার দরবারে যুবক

মন্ত্রীর মুখে যুবকের কথা শুনে বাদশাহ যুবককে শাহী দরবারে হাজির করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মুতাবিক যুবককে হাজির করা হলে বাদশাহ তাকে বললেনঃ আমি অবাক হয়েছি যে, তুমি নাকি যাদুর সাহায্যে অন্ধকে দৃষ্টিদান ও কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতে সক্ষম হয়ে গেছ? যুবক বলল, “এরূপ ক্ষমতা আমার নেই, তবে হ্যাঁ এরূপ ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী হচ্ছেন তিনি, যিনি আমি আপনি এবং সমস্ত মানুষের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা। আমরা সকলেই তার বান্দা এবং তারই গোলামীতে আবদ্ধ।

যুবকের প্রতি বাদশাহর নসীহত

বাদশাহ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে যুবককে বলল, তুমিতো দেখি বড় নিমকহারাম। আমি তোমাকে লালন পালন করলাম। তোমার শিক্ষা দীক্ষার জন্য শিক্ষক নিযুক্ত করলাম। তার নিকট থেকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা করে তুমি বিরাট শক্তির অধিকারী হয়েছ। অন্ধকে দৃষ্টি দান এবং কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতে সক্ষম হয়েছ। তোমার তো আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত ছিল। সেই ক্ষেত্রে তুমি আমাকে বাদ দিয়ে আর একজনকে প্রভু মেনে বসেছ? তুমি সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছ, চরম ধৃষ্টতা প্রকাশ করেছ। অতি সত্ত্বর তওবা করে আমার প্রভুত্বের প্রতি স্বীকৃতি দাও। অন্যথায় তোমাকে অবশ্যই সমীচীন শিক্ষা দেয়া হবে।

যুবকের ঈমানী শক্তি ও যুবক গ্রেফতার

যুবকের ঈমানী শক্তি ও বক্তব্য

বাদশাহর উপদেশ শুনে যুবক বলল, “হে বাদশাহ! রোগ আরোগ্যের এবং দৃষ্টিশক্তি দানের ক্ষমতা না আপনার আছে, না আমার আছে, না আছে যাদুকরের, না আছে কোন বিজ্ঞানীর। এই ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। যিনি আমার,আপনার এবং সমস্ত সৃষ্টির মালিক ও পালনকর্তা। আপনি আমাকে যা ইচ্ছা শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু আমি কোনক্রমেই ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে সম্মত নই। কোন অবস্থাতেই আমি আপানার প্রস্তাবে সম্মত হব না, হতে পারি না।

যুবক গ্রেফতার ও নির্যাতিত

যুবকের বক্তব্য শুনে বাদশাহ চরমভাবে রাগান্বিত হয়। যুবককে গ্রেফতার করতঃ কঠোর শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে এ বিষয়ে গোঁড়ার তথ্যানুসন্ধানের নির্দেশ দেয়। বাদশাহ হুকুম দিয়ে জানতে চায় যুবক এ ধরণের তন্ত্র-মন্ত্র কোথা থেকে শিক্ষা করল? মনে হচ্ছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে গোপন শত্রুদল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। ষড়যন্ত্রের এ কালো হাত প্রশাসন ও জনসাধারণের মধ্য ফাটল সৃষ্টি করে বিদ্রোহের পথ সুগম করবে। তাই যে কোন উপায়ে হোক প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতেই হবে। যাদুকরের নিকট পড়াশোনার জন্য যাতায়াতের সময় সে যে যাদুকরের কাছে দেরীতে হাজির হতো, ঠিকমত ও সময়মত হাজির হতো না, মনে হয় সেই সময় তার অন্যত্র যোগাযোগ ছিল। সুতরাং গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান করে ষড়যন্ত্রকারীদেরকে খুঁজে বের করে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে এবং রাষ্ট্র ও ধর্মদ্রোহীদেরকে চিহ্নিত করে সমীচীন শিক্ষা দিতে হবে।

বাদশাহর দরবারে আল্লাহর ওলী – বুযুর্গ ও মন্ত্রীকে হত্যার নির্দেশ

বাদশাহর দরবারে আল্লাহর ওলী

বাদশাহর নির্দেশ মুতাবিক যুবকের উপর অসহনীয় নির্যাতন ও নিপীড়ন শুরু হল। যুবকের মাধ্যমে বিশিষ্ট আল্লাহর ওলী ও বুযুর্গের সন্ধান লাভ করে বাদশাহকে অবহিত করা হলো। বাদশাহ সুনিশ্চিত হলো যে, সমস্ত বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ওখান থেকেই হয়েছে। এরই প্ররোচনায় এই যুবক ধর্মচ্যুত হয়েছে। ভাগ্যগুণে অল্পতেই শত্রু ধরা পড়েছে, অন্যথায় রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হতে চলেছিল। সুতরাং কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। বাদশাহ অতি সত্ত্বর যুবকের গুরুকে হাজির করার নির্দেশ দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঐ বুযুর্গকে হাজির করা হয়।

বুযুর্গ ও মন্ত্রীকে হত্যার নির্দেশ

বাদশাহ আল্লাহর ওলীর কথাবর্তা শুনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয় এবং তাকে একত্ববাদের আকীদা বর্জন করে বাদশার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ দেয়। অন্যথায় কঠোর শাস্তি এবং হত্যার কথা জানিয়ে দেয়। আল্লাহর ওলী একত্ববাদের উপর সুদৃঢ় থাকার কথা সুষ্পষ্টভাবে জানালে বাদশাহর নির্দেশে আল্লাহর ওলীকে করাত দিয়ে দিখণ্ডিত করা হয়। এরপর মন্ত্রীকেও বাদশাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও একত্ববাদের আকীদা বর্জনের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় তাকেও কতলের হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু এতে মন্ত্রী সন্ত্রস্ত না হয়ে ঈমানের উপর অবিচল থাকার দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করলে বাদশাহর হুকুমে তাকেও করাত দিয়ে কতল করে দেয়া হয়। এভাবে আল্লাহর ওলী এবং নওমুসলিম মন্ত্রীকে শহীদ করে দেয়া হয়। এরপর খবর নেয়া হয় যুবকের।

যুবককে হত্যার কৌশল

যুবককে বাদশাহর দরবারে হাজির করার পর বাদশাহ তাকে বলল, “তোমার প্রতি আমার অত্যন্ত স্নেহ-মমতা রয়েছে, আমি তোমাকে লালন-পালন করেছি। তুমি যুবক, তোমার ভবিষ্যত আছে। আমি তোমাকে নসীহত করছি, অকালে নিজেকে ধ্বংস করো না। দু’জনকে তো হত্যা করা হলো। কোথায় তাদের পালনকর্তা? তাদেরকে আমার হাত থেকে তাদের প্রভু রক্ষা করতে পারল কি? সুতরাং তুমি ভুয়া প্রভু তথা একত্ববাদের আকীদা বর্জন কর। নতুবা তোমার পরিণাম ঐ দুজনের চেয়েও অধিক বেদনাদায়ক হবে। ঐ দুইজনের পরিণতি তো তুমি স্বচক্ষেই দেখলে।” যুবক বাদশাহর কথা শুনে ধীর মস্তিষ্কে জবাব দিল, হে বাদশাহ! জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে আপনার হাতে নয়। যদি আল্লাহ পাকের ইচ্ছা না হয়, তাহলে আপনি আমার কিছুই করতে পারবেন না। আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন, আমি আমার ধর্ম পরিত্যাগ করতে মোটেও সম্মত নই। আমার আল্লাই আমার জন্যে যথেষ্ট, তিনি আমার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবেন।

মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

বাদশাহ কোন পন্থা না দেখে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে স্বীয় কর্মচারীদের মধ্যে থেকে কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে আদেশ করল যে, পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে ভালোভাবে বুঝাতে চেষ্টা করুন। যদি সে তার ধর্ম পরিত্যাগ করে তাহলে আমি তাকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ করব এবং একথাও তাকে অবহিত করুন, যদি সে সম্মত হয় তবে তো ভালো, অন্যথায় তাকে পাহাড়ের চূঁড়া থেকে এমনভাবে সজোরে নীচে নিক্ষেপ করবেন, যাতে সে তৎক্ষণাৎ মারা যায়, তার দেহ মাটির সাথে মিশে যায়। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এরূপ বিশ্বাস পোষণ করার সাহস না পায়। বাদশাহর নির্দেশ মুতাবিক যুবককে পাহাড়ের চূঁড়ায় নিয়ে যাওয়া হলো এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করা হলো যে, ‘বাদশাহ তোমাকে অত্যন্ত ভালোবাসে। সে তোমাকে মন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রী হয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করবে, অকালে নিজেকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিও না। সুতরাং বাদশাহর প্রতি আনুগত্য এবং একত্ববাদের আকীদা বর্জন করে মন্ত্রীত্বের আসন গ্রহণ কর।’ যুবক বললঃ আমার মন্ত্রীত্বের প্রয়োজন নেই। আমি আমার আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করি। তিনি আমার জন্য যা প্রস্তুত রেখেছেন, তা এই মন্ত্রীত্বের তুলনায় অনেক বেশী মূল্যবান। আপনারা আমার উপর বাদশাহর নির্দেশ কার্যকর করুন। দেখুন, আমার আল্লাহ অধিক শক্তিশালী, না বাদশাহ অধিক শক্তিশালী।

যুবকের মুনাজাত – কুদরতের খেলা

যুবকের মুনাজাত

তাদের প্রস্তাবের জবাব দিয়ে যুবক দু’হাত তুলো আল্লাহর দরবারে মুনাজাত শুরু করে। সে বলেঃ হে রাব্বুল আলামীন! আপনি সর্বশক্তিমান। আপনার শক্তির মুকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই। আপনি স্বীয় কুদরতে আমাকে জালিমদের হাত থেকে রক্ষা করুন এবং তাদের উপর আপনার শাস্তি বিধান কার্যকর করুন।

কুদরতের খেলা

আল্লাহ পাক যুবকের মুনাজাত কবল করলেন। ফলে পাহাড়ে ভীষণ প্রকম্পন শুরু হয়, যে কারণে বাদশার কর্মচারীরা পাহাড়ের চূঁড়া থেকে ছিটকে পড়ে সকলেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আর যুবক নিরাপদের বাদশার দরবারে ফিরে আসে। বাদশাহ যুবককে দেখে হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করে, সেকি তুমি জীবিত ফিরে অসালে কিভাবে? যুবক উত্তরে জানাল যে, আমার আল্লাহ আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং তার সকলেই আল্লাহর আজাবে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়েছে।

এখান থেকে বাদশাহর শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত ছিল, কিন্তু ক্ষমতার মোহে যারা অন্ধ হয়, তারা কোনদিন শিক্ষা গ্রহণ করে না।

যুবককে সমুদ্রে নিক্ষেপ – যুবকের মুক্তি

যুবককে সমুদ্রে নিক্ষেপ

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে বাদশাহ আরো অধিক ক্ষুব্ধ হয়ে অন্য কর্মচারীদেরকে নির্দেশ করল যে, যুবককে নৌকায় উঠিয়ে সমুদ্রের মধ্যভাগে নিয়ে যাও। যদি সে একত্ববাদ বর্জন করে এবং আমার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তবে তো ভালো, অন্যথায় তাকে সমুদ্রে ডুবিয়ে চিরতরে শেষ করে দিবে। যাতে এরূপ আকীদা-বিশ্বাস পোষণের সাহস আর কেউ না পায়।

যুবকের মুক্তি

কর্মচারীগণ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। অবশেষে যুবককে নৌকায় চড়িয়ে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে তাকে পানিতে নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুতি নিল। যুবক পূর্বের ন্যায় দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করে বলে, “হে আমার মালিক! বিপদ মুক্তির একমাত্র উপায় আপনি। আপনার ক্ষমতা বলে আমাকে এদের হাত থেকে মুক্তি দান করুন।” যুবকের মুনাজাত গৃহীত হয়। সাথে সাথে শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড়। ঝড়ের তীব্র আঘাতে নৌকা ডুবে বাদশাহের সকল কর্মচারীগণ মৃত্যুবরণ করে। এদিকে আল্লাহর রহমতে বিশ্বাসী যুবক নিরাপদে ফিরে আসে। যুবককে দেখে বাদশাহ অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়ে। তার সমস্ত কলাকৌশল অকৃতকার্য হয়ে যাচ্ছে দেখে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।

যুবকের নসীহত

যুবক বাদশাহকে বলল, হে বাদশাহ! আমার প্রতি আপনার ইহসান রয়েছে, আপনি আমার যথেষ্ট উপকার করেছেন। আপনার এই ইহসানের বদলা হিসেবে আমি আপনাকে পৌত্তলিকতা বর্জন করে একত্ববাদের আকীদা পোষণ এবং আল্লাহর অসীম রহমত লাভ করে সৌভাগ্যবান হতে আহ্বান করছি। অন্যথায় জেনে রাখুন, আপনার বাদশাহী ক্ষণস্থায়ী এবং খুবই দুর্বল। একদিন অবশ্যই এই বাদশাহী শেষ হয়ে যাবে এবং আপনার কুফরী, জুলুম-অত্যাচার এবং পাপাচারিতার শাস্তি অবশ্যই আপনাকে ভোগ করতে হবে। হে বাদশাহ! আমি আপনাকে পুনরায় বলছি, জীবন-মরণ আপনার হাতে নয়, বরং সেই আল্লাহ পাকের হাতে, যিনি আমাকে আপনাকে এবং সমগ্র সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন। তার ইচ্ছা না হলে আপনি হাজার কৌশল করেও আমাকে কতল করতে সক্ষম হবেন না।

যুবকের শাহাদাত বরণ – সমস্ত দেশবাসীর ইসলাম গ্রহণ

যুবকের শাহাদাত বরণ

যুবক আরো বলল, “একান্ত যদি আমার মৃত্যুই যদি আপনার কাম্য হয় তাহলে আপনি যেভাবে চাচ্ছেন সেভাবে আমার মৃত্যু কার্যকার করা মোটেই সম্ভব হবে না। বরং আপনি আপনার রাজ্যের সর্বশ্রেণীর জনসাধারণকে এক বিশাল ময়দানে জমায়েত করুন। অতঃপর সকলের সম্মুখে ‘বিইসমি রাব্বিল গোলাম’যুবকের প্রভুর নামে বলে আমার প্রতি তীর নিক্ষেপ করুন। তাহলেই আমর মৃত্যু কার্যকর হবে। অন্যথায় আর কোন উপায়ে আমাকে মারা সম্ভব হবে না।” পরিতাপের বিষয় যে, ক্ষমতার লোভে লোভাতুর বাদশাহ এখান থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হলো না। অদূরদর্শী বাদশাহ পরিণাম সম্পর্কে সজাগ না হয়ে যুবকের কথামত রাজার সব শ্রেণীর লোকদেরকে বিশাল ময়দানে একত্রিত করে “যুবকের প্রভুর নামে” বলে যুবকের প্রতি তীর নিক্ষেপ করল। তীরটি যুবকের কানের কাছে বিদ্ধ হলে যুবক স্বীয় হাত দিয়ে তীরটিকে ধরে বলে উঠেঃ ‘আমি ধন্য, আমার জীবন সফলকাম। আমি জুলুম-নির্যাতম সহ্য করে ঈমানের সাথে শাহাদাতের গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এই বলে সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

সমস্ত দেশবাসীর ইসলাম গ্রহণ

এভাবে যুবকের শাহাদাত বরণ সমস্ত দেশবাসীর অন্তরে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়। শাহাদাতের মুহূর্তে যুবকের বক্তব্য শুনে সমবেত বিশাল জনতার মনে প্রভাব সৃষ্টি হয়। তারা সকলে একসাথে একমুখে বলে উঠল, “আমরা সকলেই ঐ যুবকের প্রভুর প্রতি ঈমান স্থাপন করলাম।” এভাবে একজন যুবকের জীবনের বিনিময়ে সমগ্র দেশবাসীর জীবন হয় ধন্য। তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করে।

মন্ত্রী পরিষদের ভরাডুবি – হতভাগা বাদশাহ

মন্ত্রী পরিষদের ভরাডুবি

এহেন পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে মন্ত্রী পরিষদ বাদশাহকে বলল যে, “আপনি যে পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য যুবককে হত্যা করেছিলেন, সে পরিস্থিতিতো আরও অধিক তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজ্যের সমস্ত জনগণ আপনার ধর্ম ত্যাগ করে যুবকের ধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে এবং আপনার প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। কারণ আপনি যুবককে হত্যা করার ক্ষেত্রে প্রথমত অক্ষম প্রমাণিত হয়েছিলেন। পরে যুবকের কথামত যুবকের প্রভুর নাম নিয়ে তাকে শহীদ করতে সক্ষম করেছেন। এতে জনগণ বুঝে নিয়েছে যে, আপনার তুলনায় আপনার উপর আরও একজন শক্তিশালী প্রভু রয়েছেন। তিনিই যুবকের প্রভু, তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

হতভাগা বাদশাহ

এ মুহূর্তে অন্ততঃপক্ষে বাদশাহর জন্য সতর্ক হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু ক্ষমতার লোভ আর অহংকার সত্য অনুধাবন ও ন্যায় পথ অবলম্বনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের সামনে সব সময় বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। হতভাগা এই বাদশার ক্ষেত্রেও তাই ঘটল। এবারো তার দৃষ্টি সত্যের দিকে আকৃষ্ট হল না বরং এমন এক পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যত হলো, যে কারণে সে নিজেও ধ্বংস হলো। বরবাদ হলো তার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ইহকাল-পরকাল সবই।

গর্ত খনন ও নির্যাতন

বাদশাহ অধিক ক্ষিপ্ত হয়ে জনগণের ঐক্য ও ঈমানী শক্তির মুকাবিলার জন্য অকথ্য জুলুম-নির্যাতন এবং অবর্ণনীয় নিপীড়নের পথ অবলম্বন করল। শহরের বিভিন্ন স্থানে বিরাট বিরাট গর্ত খনন করে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে ঈমান ও একত্ববাদ বর্জনে অসম্মতি প্রকাশকারী জনগণকে নির্মমভাবে সেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে শুরু করে দিল। কিন্তু এতে করেও বাদশার উদ্দেশ্য সফল হলো না। ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা দলে দলে উপস্থিত হয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু যুবকের ধর্ম ত্যাগে সম্মত হয় না কেউ। এভাবে অসংখ্য মুসলমান নর-নারীকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আর বাদশাহ তার রাজ পরিষদ নিয়ে বসে বসে তামাশা উপভোগ করতে থাকে। আগুনে জ্বলতে থাকা মানুষদের জন্য তাদের কারো অন্তরে এতটুকু অনুকম্পা সৃষ্টি হয় না।

ভাগ্যবান মা জননী

বাদশাহ যাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল যুবতী এক মহিলা। সে তার ছোট বাচ্চার মায়া-মমতার কারণে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে ইতস্তঃত বোধ করছিল। বাদশাহ যুবতীর দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থা দেখে তাকে সময় দেয়ার নির্দেশ দেয় এবং তার শিশু বাচ্চাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই যে, শিশু বাচ্চাটি আগুন থেকে উচ্চস্বরে বলে উঠেঃ “হে আম্মাজান! ইতস্তঃত বোধ করে মোটেই পিছপা হবেন না। আপনি হকের উপর আছেন, এ আগুনে ঝাপিয়ে পড়ুন। এটা মোটেই আগুন নয়। দেখতে মনে হচ্ছে আগুন, আসলে জান্নাত। আল্লাহ পাক তার কুদরতের দ্বারা এখানে জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন।

সন্তানের আহ্বান শুনে মা জননী কাল বিলম্ব না করে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং চির শান্তি অর্জনে ধন্য হয়।

কোন কোন রেওয়াতে আছে যে, ঈমানদারকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার পর আগুন তাদের স্পর্শ করার আগেই আল্লাহ তা’আলা তাদের রূহ কবজ করে নিতেন। এভাবেই মুসলমানগণ আগুনের যন্ত্রণা থেকে নিরাপদে থাকেন।

বাদশাহ ও পরিষদের করুণ পরিণতি

এরপর ক্রমেই এ আগুন বেড়ে যেতে থাকে। আগুনের লেলিহান শিখা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুসলমানদের অগ্নিদগ্ধ করে যারা তামাশা দেখছিল, বাদশার সেই পরিষদ ও মন্ত্রীরাও আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে বাদশাহ শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আগুন থেকে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে জীবন বাঁচাতে গিয়ে সে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর সেই সমুদ্রেই তার সলিল সমাধি ঘটে।

(মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম, নাসায়ী, তিরমিজী, ইবনে জারীর, মুসনাদে ইবনে হুসাইদ, তাবারানী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী, মাযহারীসহ বিভিন্ন হাদীস, তফসীর ও ইতিহাসের কিতাব সমূহে হযরত ছুহাইব রূমীর সূত্রে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।)

শিক্ষণীয় বিষয়

একজন যুবক। দেশের বাদশার ভালোবাসা ও সুদৃষ্টি লাভে যে ধন্য, যৌবনের কামনা-বাসনা, মন্ত্রীত্বের পদ-মর্যাদার মোহ প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ পাকের প্রতি তাঁর ঈমান স্থপন, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করা, অবশেষে শাহাদাত বরণ অতঃপর তার শাহাদাতের বদৌলতে দেশ ও জাতির অসংখ্য মানুষের ঈমান ও ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম হওয়ার পিছনে কোন শক্তি কাজ করছে? এখন এ নিয়েই সামান্য আলোচনা করা হবে।

(চলবে ইনশাল্লাহ)

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
১,৮৮২ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

৩ টি মন্তব্য

  1. শুকরিয়া,আরো অল্প অল্প করে ধারাবাহিক দিলে ভাল হতো।

    Tarek000

    @এম এম নুর হোসেন, চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।