“সুন্নাহ্” শব্দটি ব্যবহারে “ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ” এবং “উসূলিদের” মাঝে যে পার্থক্য দেখা যায়
লিখেছেন: ' মেরিনার' @ মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৯, ২০০৯ (১১:৪৫ অপরাহ্ণ)
[আমরা দেখবো কিভাবে স্কলারভেদে সুন্নাহর সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়। ফিকাহ শাস্ত্রবিদ, হাদীসের স্কলার, ইসলামী আইনতত্ত্ববিদ বা উসূলি এবং আক্বীদাহ্ বিশেষজ্ঞ - এই চার শ্রেণীর স্কলাররা যে ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় সুন্নাহর সংজ্ঞা দিয়ে থাকেন, তার সবক'টির সাথে পরিচিত না হয়ে, সুন্নাহ সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে আমরা অনেক সময়েই বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়াই।
এই লেখাটি সঠিকভাবে বুঝতে হলে এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়া আবশ্যক!! ]
“সুন্নাহ্” শব্দটি ব্যবহার করার বেলায় “ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদ” এবং উসূলিদের মাঝে যে পার্থক্য দেখা যায়
জামাল জারাবযো তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, বিভিন্ন পটভূমিতে এবং বিভিন্ন বিভাগে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি যেভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তার ভিতর পার্থক্য নির্ণয় করতে না পারাটা সুন্নাহর মর্যাদা নিয়ে দ্বিধা সংশয়ের একটা প্রধান কারণ৷ সুনিদিষ্ট ভাবে ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা যেভাবে ‘সুন্নাহ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন, তা থেকে অনেকেরই এমন ধারণা হয়েছে, যেমন অনেকে স্পষ্টও বলেই থাকেন : “যা কিছু কুর’আন থেকে এসেছে তা অবশ্যই প্রয়োগ করতে হবে ৷ আর কেউ যদি সুন্নাহ প্রয়োগ করে তবে তা ভাল, কিন্তু তা অবশ্যকরণীয় নয় ৷” কেউ কেউ এমন ধারণাও প্রকাশ করেছেন যে, কেবলমাত্র কুর’আনই কোন কিছুকে ফরজ বা অবশ্যকরণীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, আর সুন্নাহ শুধুমাত্র কোন কিছুকে পছন্দনীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে ৷ সে জন্য এই ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে, কিছু উদাহারণ দেবার প্রয়োজন রয়েছে ৷ প্রথম উদাহরণটা আমরা কুর’আনে আল্লাহর বাণী থেকে নেব :
“হে মু’মিনগণ, তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্য কারবার কর তখন তা লিখে রেখো ……..” (সূরা বাকারা ,২ : ২৮২)
বেশির ভাগ স্কলারদের মতেই, এখানে যে লেনদেন লিখে রাখার কথা বলা হয়েছে, তা পছন্দনীয় হিসাবে বলা হয়েছে , কিন্তু তা ফরজ বা অবশ্যকরনীয় হিসাবে নয় ৷ তাই এ ধরনের একটা লেনদেন লিখে রাখার ব্যাপারটাকে ফিকাহশাস্ত্রবিদরা একটা “সুন্নাহ” অর্থাৎ ফরজ নয় এমন পছন্দনীয় কাজ বলে বিবেচনা করে থাকেন – যদিও, এই কাজের উৎস হচ্ছে কুর’আন ৷
আরেকটা উদাহরণ আসছে একই বাক্যের পরবর্তী অংশ থেকে যেখানে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে বেচাকেনা কর তখন সাক্ষী রাখ….”( সুরা বাকারা, ২:২৮৩)
কুর’আনের এই আদেশ এমন একটা কাজের আদেশ যা কিনা পছন্দনীয় কিন্তু ফরজ বা অবশ্যকরণীয় নয় ৷ সুতরাং উল্লিখিত কাজের সূত্র যদিও বা কুর’আনের আয়াত, তবুও তার মানে এই নয় যে, কাজটি ফরজ বা অবশ্যকরনীয় ৷
অপর পক্ষে কেউ চাইলে দাড়ি রাখার ব্যাপারটাকে একটা উদাহরণ হিসাবে নিতে পারে, কুরা’আনে দাড়ি রাখা সংক্রান্ত কোন স্পষ্ট নিদের্শনা নেই, তা “সুন্নাহ” বা রাসূল (সা.)-এঁর উক্তিসমূহের আওতায় আসে ৷ যেমন রামূল (সা.) বলেছেন: “মোচ ছোট করে ছাঁট এবং দাড়ি রাখ (দাড়িকে ছেড়ে দাও)৷”(বুখারী )৷ রাসূল(সা.)-এঁর এই উক্তি এবং আরো অনেক বক্তব্য থেকে বেশীর ভাগ স্কলারই দাড়ি রাখাকে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করেন ৷ এই ক্ষেত্রে তাহলে কেউ দাড়ি রাখার কাজটিকে কেবল মাত্র “সুন্নাহ” বা নবীর বক্তব্যের মাঝে দেখতে পান ৷ কিন্তু ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা “সুন্নাহ” শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করে থাকেন, ব্যাপারটা সেই পর্যায়ের নয় , বরং এই কাজটির ব্যাপারে বিধান হচেছ যে, তা অবশ্যকরণীয় বা ফিকাহ শাস্ত্রবিদদের ভাষায় “ওয়াজিব”৷
এ ধরনের আরেকটি উদাহরণ হচেছ রামজান মাসের শেষে যে যাকাত (ফিতরা) দেওয়া হয়ে থাকে ৷ বুখারী ও মুসলিমের নথিতে ইবন ওমরের (রা.) বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূল(সা.) রামাজান মাসের শেষে যাকাত আল-ফিতর আদায় করাটা মুসলিমদের জন্য অবশ্যকরণীয় করে দিয়েছেন ৷ এই বর্ননা এবং এরকম আরো অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে (স্কলারদের) ইজমা রয়েছে যে, যাকাত আল-ফিত্র ওয়াজিব ৷ কুর’আনে যাকাত আল-ফিত্র সম্বন্ধে কোন কথাই নেই ৷ অথচ এব্যাপারে (স্কলারদের) ইজমা হচেছ যে, এটা ওয়াজিব ৷
সারকথা হচেছ , কোন একটা কাজ সম্বন্ধে আইনী অনুশাসনের ব্যাপারে ঐ কাজটির উৎস বা নথিপত্র প্রাসঙ্গিক নয় – তা সে কাজটা ফরজ বা ওয়াজিব হোক আর পছন্দনীয় (ফিকহশাস্ত্রবিদরা যেটাকে‘সুন্নাহ’ বলে থাকেন) যাই হোক না কেন ৷ কুর’আনের একটি আয়াত কোন কাজের বর্ণনা দিয়ে থাকতে পারে, তথাপি সে কাজটা কেবলমাত্র “সুন্নাহ” (অর্থাৎ পছন্দনীয়) বলে পরিগণিত হতে পারে ৷ অপর পক্ষে রাসূল (সা.)-এঁর একটা কথা যা এমনিতে কেউ “সুন্নাহ” বলে অভিহিত করতে পারতো, তা থেকেও এটা নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে যে, কাজটা অবশ্যকরণীয় – অর্থাৎ ফরজ বা ওয়াজিব ৷ এই প্রসঙ্গে প্রায় সবাই যে ভুলটা করে থাকেন, তার উৎস হচেছ এই বাস্তবতা যে, “সুন্নাহ” শব্দটি এখানে দুই ধরণের নিহিতার্থ বা দুটো ভিন্ন শাখার নিজস্ব সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত ৷
[Page19~21, The Authority and Importance of Sunnah - Jamaal al-Din M. Zarabozo থেকে অনুদিত।]
Processing your request, Please wait....











