লগইন রেজিস্ট্রেশন

ভিক্ষে

লিখেছেন: ' আবু আনাস' @ সোমবার, এপ্রিল ৫, ২০১০ (১০:১৬ অপরাহ্ণ)

আস-সালামু আলাইকুম, সকল প্রশংসা আল্লাহ’র জন্য, শান্তি অবতীর্ণ হোক মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি। পরম করুণাময়-দয়াশীল আল্লাহ’র নামে শুরু করছি -

“মহীনের ঘোড়াগুলি” ব্যান্ডের একটা গান আমার খুব অদ্ভুত লাগতো – “ভিক্ষেতেই যাবো”। (এটা সেই সময়ের কথা বলছি যখন আমি গান শুনতাম, এখন আর শোনা হয়না, গান ব্যাপারটা আমাকে ছেড়ে পুরোপুরি চলে গেছে) গানটা আমার তেমন ভালো না লাগলেও ক’দিন ধরে মনে হচ্ছে এটাকে আধুনিক বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করা উচিত।

জাতি হিসেবে আমাদের শুরুটাই বেশ লজ্জাজনক। বাংলাদেশ তৈরি হবার পরপরেই আমরা ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলাম। কুরবানির ঈদে ঢাকার ফকিররা যেমন ভিক্ষে করা মাংস জমিয়ে বিক্রি করে দেয় তেমন স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু নেতা বিদেশিদের দেওয়া ভিক্ষের জিনিস রাতের অন্ধকারে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিত। চাল-চুলোহীন গ্রামের লোকগুলো ক্ষুধার জ্বালায় শহরে আসত এবং সেসব ভুখা-নাঙ্গা মানুষদের দেখিয়ে নেতাদের ভিক্ষে চাইতে ভারী সুবিধে হত।
এই সরকারের সময় অবশ্য সেসব কথা মনে না করাই ভালো।

যাহোক সে অভ্যাস আমরা ছেড়ে দেইনি, প্রয়াত একজন অর্থমন্ত্রী আমলাদের উপর রাগ করে বলেছিলেন – আমরা এত কষ্ট করে ভিক্ষা করে আনি আর এরা দুর্নীতি করে সব খেয়ে ফেলে। এখনো আমাদের বাজেটের আয়ের খাত হিসেবে “দাতা সহায়তা” এবং “খয়রাতি সাহায্য” উল্লেখযোগ্য উৎস। খয়রাতি সাহায্য কথাটা খুব গর্বের সাথে সরকারি খবরে প্রচার করা হয়। আর “দাতা সহায়তা” তো আরো ভয়াবহ ব্যাপার। যারা ঋণ দেয় তারা নানা ফন্দি-ফিকির করে আমাদের দেশ থেকেই টাকাটা লুটে-পুটে খেয়ে যায়। একটা নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করে বিলিয়ন কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ আর চক্রবৃদ্ধির সুদের বোঝা মাথায় নিয়ে।

ভিক্ষের ব্যাপারে আমাদের মাহাত্ম্য হচ্ছে আমাদের দেশের আগা থেকে গোড়া সব শ্রেণীর মানুষই ভিক্ষে করে, তবে তাদের ভেন্যু আলাদা। লাল পাসপোর্টধারী মন্ত্রীরা বিদেশে, স্যুট-টাই পড়া ব্যবসায়ীরা ব্যাংকে আর ছেড়া লুঙ্গির অন্ধ মানুষটা গৃহস্থের দ্বারে।

সম্প্রতি কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলনের নামে বেশ একটা রগড় হয়ে গেল। যখন ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর প্রতিনিধিরা গলা ফাটাচ্ছিলেন তখন তথাকথিত উন্নত দেশের দূতেরা ঘুমুচ্ছিলেন; সে ছবি কাগজেও এসেছিল। শেষমেশ দাড়ালো যে গ্রিনহাউস গ্যাসে পৃথিবী সয়লাব করে দেয়া দেশগুলো কিছু ডলার ভিক্ষে দিতে রাজি হল। ভিক্ষের অংক নিয়ে অবশ্য আমাদের বেশ অভিমান আছে কিন্তু ভিক্ষের চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া। এই টাকা আসলে যারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে তাদের কাছে কতটুকু পৌছাবে জানিনা, তবে না পৌছালেও ক্ষতি নেই – যার মাথা গোঁজার ঠাইটুকু তলিয়ে যাবে, ফসলী জমিটুকু তলিয়ে যাবে তারা না হাওয়ায় ডলার পেতে শুতে পারবে, না কচকচিয়ে কাগজের ডলার চিবিয়ে খাবে। আমাদের প্রাক্তন প্রভু দেশটি ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে বেশ কিছু টাকা দান করেছে বাংলাদেশকে। কাগজ পড়ে জানলাম সে টাকা দিয়ে উপকূল অঞ্চলের কিছু জায়গায় নারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে কিভাবে সব ডুবে গেলে আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে উঠতে হবে। ভিক্ষের সদ্ব্যবহার বটে!

ভিক্ষে বাণিজ্যের মূল ব্যাপারটা হল পুঁজিবাদি উৎপাদন ব্যবস্থা। ধরি আমেরিকা বছরে এক কোটি গাড়ি তৈরি করে যার প্রতিটি থেকে তাদের লাভ হয় ১০০ ডলার। এখন পরিবেশবাদীরা গিয়ে যদি বলে – তোমরা উৎপাদন অর্ধেক করে দিলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন অনেক কমে যাবে। উৎপাদন অর্ধেক করলে লাভ কমে যাবে ৫০ কোটি ডলার, পুঁজিবাদি ব্যবস্থায় সেটা করা যায়না। তখন তারা উৎপাদন না কমিয়ে ১০০ কোটি ডলার লাভ করে তা থেকে ১ কোটি ডলার ভিক্ষে দিয়ে দেবে, ঢাকঢোল পিটিয়ে। পরিবেশের ক্ষতি তো আর দেখা যায়না – ভিক্ষুকের দল তাই “ক্ষতিপূরণ” পেয়েই খুশি।

ঢাকায় ঢোকার মুখে লালনের মূর্তি না হলে নাকি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। জাতি হিসেবে যে আমরা অন্যদের ভিক্ষেতে খাই-পরি এই সত্যটা কি ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে? লালনের মুর্তি না গড়ে যদি এক লক্ষ টাকা বাঁচানো যায় আর তা যদি আমাদের ঋণের ০.০০০০০০১% ভাগও কমায় তাই কি আমাদের কাম্য নয়? কোপেনহেগেন থেকে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দল লাথি খাওয়া কুকুরের মত মুখ করে দেশে ঢুকল; আমরা যদি খয়রাত নিয়ে আমাদের মেরুদন্ডটা ভেঙ্গে না ফেলতাম তবে কি আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারতামনা – ভিক্ষে চাইতে আসিনি, অধিকার আদায় করতে এসেছি, তোমাদের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাও, এই পৃথিবীটাকে আর ধর্ষণ করোনা।

আলোকিত সচল প্রগতিবাদীরা যে মানুষটিকে দিবানিশি যাচ্ছেতাই ভাষায় গাল পাড়েন সেই মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন –
“যে নিজের জন্য ভিক্ষের দরজা খুলে নিল, আল্লাহ তার জন্য অভাবের দরজা খুলে দেন”
তাই যে একবার মানুষের দয়া পেতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তার জন্য চাহিদার রাশ টেনে ধরা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মানুষ। আমাদের সামর্থ্য অনেক সীমিত। আমাদের চাইবার প্রয়োজন আছে বৈকি। কিন্তু সে চাওয়াটা যেন অন্য মানুষের কাছে না হয়। মানুষের কাছে মানুষের ভিক্ষে চাওয়া মনুষ্যত্বের অপমান। এতে আত্মগ্লানি বাড়ে, আত্মসম্মানবোধ কমে। তাই আল্লাহর রসুল বলেছেন যে হাত নিচে থাকে তার চেয়ে যে হাত উপরে থাকে তা উত্তম।

তবে আমরা কার কাছে চাইবো? তার কাছে চাইবো যিনি দিতে সক্ষম। তার কাছে চাইবো যার কাছে চাইলে অন্য দশজনের কাছে চাওয়া লাগেনা, আমারই মত আরেকটা মানুষের সামনে মাথা নিচু করে করূণাপ্রার্থী হতে হয়না। আর সেই সত্ত্বা হলেন আল্লাহ। যে মানুষটি অন্তত শুধু সুরা ফাতিহার শিক্ষা অন্তরে ধারণ করেছে – “ইয়্যাকা না’আবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তা’ঈন” – “আমি শুধুমাত্র তোমার ইবাদাত করি এবং শুধুমাত্র তোমার সাহায্য চাই” তাহলে সেই মানুষটি কি কোনদিন অন্যের দুয়ারে দয়াভিক্ষা করতে পারে? আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সামান্য জাগতিক কোন স্বার্থের জন্য অন্যের পদলেহন করতে পারে? আমাদের যত আত্মমর্যাদা সব আমরা আল্লাহর জন্য তুলে রেখেছি। সবার কাছে চাওয়া যায় খালি আল্লাহ ছাড়া। অথচ রসুলুল্লাহ (সাঃ) শিক্ষা দিলেন পায়ের জুতার ফিতার মত অতি তুচ্ছ জিনিসও যেন আমরা আল্লাহর কাছে চাই। আমরা কি আল্লাহর কাছে চাইতে পারিনা তিনি যেন সালোকসংশ্লেষণের হার বাড়িয়ে দেন। এমনিতেই কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়লে সালোকসংশ্লেষণের হার বেড়ে যায়। আর যদি কোনভাবে পৃথিবীতে প্রচুর আছে এবং প্রচুর বাড়ে এমন একটা গাছে এমন কোন মিউটেশন হয়ে যায় যেন রুবিসকোর কার্বন-ডাই-অক্সাইডের প্রতি “এফিনিটি” বা আকর্ষণ বেড়ে যায় তাহলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা কমতে কতক্ষণ? টেকটোনিক প্লেটের গুতোগুতিতে যদি আস্তে আস্তে আমাদের নিচু ভূমিগুলো আরেকটু উচুতে উঠে যায় তাহলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে আমাদের কি করবে? আল্লাহ যদি না চান তাহলে “আইলা” বা “সিডর” কি ক্ষতি করবে আমাদের? কিন্তু আমরা “দুর্যোগ মোকাবেলা” করি। দুর্যোগ কি মোকাবেলা করা যায়? সেনাবাহিনী কি ঝড় থামাতে পারে? বিধস্ত জনপদে সামান্য ত্রাণ তৎপরতার নাম কি “মোকাবেলা”? আমরা কি বুঝি আমরা কি বলছি? কার বিপক্ষে বলছি? কার শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে পেশি ফুলাচ্ছি? ঝড়ের পর ভাঙ্গা ঘর আর মরা মানুষের ছবি তুলে বিশ্বের কাছে অর্থ ভিক্ষে চাওয়ার চেয়ে ঝড়ের আগে বিশ্বের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা ভিক্ষে করা কি শ্রেয় নয়? রসুলুল্লাহ (সাঃ) যে মূর্খ-জাহিল মানুষগুলোর কাছে এসেছিলেন তারাও বিপদে পড়লে সব মূর্তি ছেড়ে আল্লাহকে ডাকতো, আর আমরা বিপদ এলে আল্লাহকে বেমালুম ভুলে যাই এবং বিপদে দমবন্ধ হয়ে এলে আল্লাহকে কষে গালাগালি করি। নাউযুবিল্লাহ? অবশ্যই, তবে বাংলা ব্লগগুলো কি আমি একা পড়ি?

সাধু সাবধান! চুলায় গ্যাস নেই, কলে নেই জল আর নেই ঘরে আলো। এখনো কি বুঝবোনা যে এটা আল্লাহর পরীক্ষা? নিজেদের সামষ্টিক পাপগুলোর জন্য ক্ষমা কি চাবোনা এখনো?

আমরা স্থান-কাল-পাত্র ভেদাভেদ ব্যতিরেকেই ভিক্ষে মাগি এবং মানিক বন্দোপাধ্যায়ের “প্রাগৈতিহাসিক” গল্পের ভিখু’র মত ভিক্ষে না পেলে গালাগালিও করি। আমরা বুঝিনা এ গালাগালিতে কারো কিছু এসে-যায় না। সরকারের কাছে গ্যাস-পানি-বিদ্যুত ভিক্ষা চাইছি তো চাইছি। সরকারকে খারাপ না বলে নিজেদের দোষ খুঁজি। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যা zazaযা দরকার তাও তার কাছেই চাই। কার সামনে মাথা উঁচু করতে হয়, আর কার সামনে নিচু করতে হয় এটা শেখার এখনি সময়। নইলে ইহকালে তো পস্তাচ্ছি, পরকালেও পস্তাতে হবে।

Processing your request, Please wait....
  • Print this article!
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google Bookmarks
  • LinkaGoGo
  • MSN Reporter
  • Twitter
৯৩ বার পঠিত
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars ( ভোট, গড়:০.০০)

৩ টি মন্তব্য

  1. ভাই মনপবন
    আপনি চমৎকার একটি পোষ্ট লিখেছেন আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আপনার এই পোষ্টটি পড়ে আল্লাহ সকলকে বোঝার তৌফিক দান করুন।

  2. আলহামদুলিল্লাহ, ভালো লিখেছেন। (F)